عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُلُّ سُلَامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ يَعْدِلُ بَيْنَ الِاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ وَيُعِينُ الرَّجُلَ عَلَى دَابَّتِهِ فَيَحْمِلُ عَلَيْهَا أَوْ يَرْفَعُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ وَكُلُّ خَطْوَةٍ يَخْطُوهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ وَيُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ.
সরল অনুবাদ : আবূ হুরায়রা রযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি গ্রন্থিলতা তার উপর ছাদাক্বা। প্রতিদিনের সূর্য উদয়ে সে যে দুইজনের মধ্যে মীমাংসা করে, তা তার জন্য ছাদাক্বা। মানুষকে বাহনে উঠতে বা মালপত্র উঠাতে তোমার সাহায্য ছাদাক্বা। পবিত্র বাক্য ছাদাক্বা। ছালাতের উদ্দেশ্যে তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ ছাদাক্বা আর রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া ছাদাক্বা’।[1]
ব্যাখ্যা : নিশ্চয় প্রত্যেক মানুষকে ৩৬০টি গ্রন্থিলতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।[2] কাজেই একটি বছরের প্রতিদিনের সূর্যোদয়ে প্রত্যেকের ছাদাক্বা করা উচিত। অর্থাৎ অন্তত বছরে ৩৬০ বার ছাদাক্বা করা উচিত। ছাদাক্বা শব্দটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। এটি শুধু কল্যাণকর ও উপকারী ক্ষেত্রে সম্পদের ব্যয়ের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। যে সকল কাজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সহায়ক হয়, তার প্রতিটি কাজই ছাদাক্বা হিসেবে বিবেচিত হবে। আল্লাহর আনুগত্যের যে কোনো কাজ বা ইবাদত যদি তাঁর প্রতি গভীর দাসত্বের নিদর্শন হিসেবে কাজ করে, তবে তা ছাদাক্বার অন্তর্ভুক্ত হবে। উক্ত আমলের প্রত্যেকটিই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে বান্দার গভীর নিষ্ঠার প্রমাণ বহন করে।
বিবাদমান দুই ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়সঙ্গত মীমাংসাও ছাদাক্বা। যদি বিবাদমান পক্ষ কারো নিকট মীমাংসার জন্য আসে এবং সে যদি তাদের মাঝে ন্যায়বিচার করে দেয়, তবে তা ছাদাক্বা হিসেবে গণ্য হবে। শরীআতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যে কোনো কাজই ছাদাক্বা। তবে যদি শরীআতবিরোধী হয়, তাহলে অন্যায় ও অবিচার হিসেবে গণ্য হবে। কিছু ছাদাক্বা এমন আছে, যার সুফল শুধু দাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আর কিছু ছাদাক্বা এমন আছে যার সুফল দাতা এবং তার চারপাশের লোককে শামিল করে। আলোচ্য হাদীছে ছাদাক্বা ঐ সকল ইবাদত ও আমলকে শামিল করে, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণে আসে; যা তাদেরকে একতাবদ্ধ জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে। সকলের মনকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায় থাকে এই পবিত্র বাক্যের ছাদাক্বা। এই বাক্যের শিক্ষা তাদেরকে স্থায়ী ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে।
বিবাদমান দুই পক্ষের মধ্যে ন্যায়বিচারে সত্য বলাই হলো জিহ্বা নামক নেয়ামতের শুকরিয়া। সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে সে আলোকে বিচার করা হলো বিবেক নামক নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। যে বিবেক তাকে সত্য গ্রহণ ও তদনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনায় সাহায্য করেছে। সৎপথ লাভ ও বিচারিক সক্ষমতা অর্জন নেয়ামতের শুকরিয়া হলো বিবাদমান পক্ষের মধ্যে ন্যায়বিচার করা। যদি এভাবে আল্লাহর নেয়ামতের আলোচনা চলতে থাকে, তবে গণনা করে শেষ করা যাবে না। আমাদের এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, জিহ্বা যেমন আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম প্রধান মাধ্যম, তেমনি পরস্পর বিরোধী দুটি পক্ষের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। এটি মুসলিম সমাজের জন্য একটি বড় কল্যাণকর ছাদাক্বা।
এখানে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে আল্লাহ তাআলার এক মহান নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার দেহের শিরা-উপশিরা, অস্থি-মজ্জা, হাড়-হাড্ডি, গ্রন্থিলতা ইত্যাদি সবই উক্ত নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ মানুষকে তাঁর অফুরন্ত নেয়ামত, তাকে সৃষ্টিতে তাঁর একক ক্ষমতা, তার দেহের সংযোজন ও শৃঙ্খলায় তাঁর অভিনবত্ব ও অলৌকিকত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মানুষকে তার শক্তি ও সম্ভাব্যতার অপূর্ণতা ও অপারগতা সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন। আল-কুরআনের বেশ কয়েক স্থানে এই ইলাহী নেয়ামতের স্মৃতিচারণ করা হয়েছে এভাবে,﴿وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ﴾ ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেট থেকে বের করে এনেছেন, যে সম্পর্কে তোমরা কিছুই জানতে না। অতঃপর তিনি তোমাদের কান, চোখ ও অন্তঃকরণ দান করেছেন। আশা করা যায়, তোমরা শুকরিয়া আদায় করবে’ (আন-নাহল, ১৬/৭৮)। মহান আল্লাহ আরও বলেন,﴿يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ - الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ - فِي أَيِّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ﴾ ‘হে মানুষ! কোন জিনিস তোমার সম্মানিত প্রতিপালক সম্পর্কে তোমাকে প্রতারিত করল? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমার কাঠামোকে সুগঠিত করেছেন এবং তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সে আকৃতিতে তোমাকে গঠন করেছেন’ (আল-ইনফিত্বার, ৮২/৬-৮)।
এটি এমন একটি মহান নেয়ামত, যা মানুষকে আল্লাহর নিকট একনিষ্ঠ ও কৃতজ্ঞ হতে বাধ্য করে আর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় নেয়ামতকে বরকতময় ও স্থায়ী করতে সহায়তা করে। কিছু মানুষ মনে করে, নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ শুধু জিহ্বার সাথে সীমাবদ্ধ। বাস্তবতা হলো এটি নেয়ামতের পূর্ণাঙ্গ কৃতজ্ঞতা প্রকাশে যথেষ্ট নয়। যদিও শারঈ দৃষ্টিতে জিহ্বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। তাই এর সাথে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের শুকরিয়া আদায় যুক্ত হওয়া জরুরী। এভাবে স্রষ্টার জন্য সর্বোত্তম পর্যায়ের শুকরিয়া আদায় বাস্তবায়িত হতে পারে।
এটি শরীআতের এমন নীতি, যার উপর ভিত্তি করে যদি কোনো ব্যক্তি বিবাদমান মানুষের মধ্যে এমন মীমাংসা করে যা শারঈ নীতির বিরোধী, তবে তা কখনোই ন্যায়বিচার হিসেবে গণ্য হবে না। বরং এটি অবশ্যই যুলম, অবিচার ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। এরূপ অনৈতিক বিচারক যদি এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, তার এই বিচার আল্লাহর বিচারের অনুরূপ অথবা তাঁর বিচারের চাইতে উত্তম; তাহলে সে কাফের ও মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা সে নিজেকে আল্লাহর আয়াত ‘আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্য উত্তম ফয়সালাকারী কে?’ (আল-মায়েদা, ৫/৫০) এর অস্বীকারকারী সাব্যস্ত করেছে। অর্থাৎ বিচারের বিবেচনায় আল্লাহর চাইতে উত্তম কেউ নয়; তবে আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাসী ব্যতীত কেউ এটা অনুধাবন করতে পারে না। আর আল্লাহ তাআলা যার অন্তরকে অন্ধ করে দিয়েছেন, তার পক্ষে এই অনুধাবন অর্জন সম্ভব নয়। বরং শয়তান তার অন্যায় কাজগুলোকে তার নিকট মনোরম করে উপস্থাপন করে। ফলে সে তার অপকর্মকেই কল্যাণকর কাজ হিসেবে দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই ধরনের আচরণ ও বিশ্বাস থেকে রক্ষা করুন।
দুইজনের মধ্যে বিচারকের বিচার অবশ্যই তাদের সার্বিক কল্যাণ সাধনের জন্য হতে হবে। সে রাষ্ট্রের পক্ষ হতে নিয়োগকৃত হোক অথবা না হোক। কখনো কখনো এক পক্ষের সঠিক হওয়ার কারণ তার নিকট স্পষ্ট নাও হতে পারে। যখন কোনো এক পক্ষের প্রাধান্য পাওয়া স্পষ্ট হয় না; তখন বিচারকের উচিত হবে এমনভাবে বিচার করা যাতে উভয় পক্ষের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়। তিনি তার সক্ষমতা অনুযায়ী উভয়ের কল্যাণ কামনা করে ন্যায়বিচার করবেন। তবে এটি তার জন্য ছাদাক্বা হিসেবে বিবেচিত হবে।
যদি কারও অন্তরে কার্পণ্য অথবা অর্থের প্রতি লোভ থাকে, তবে তার পক্ষে পক্ষপাতমুক্ত বিচার করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ যখন কোনো কৃপণ ব্যক্তি বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন সে ন্যায়বিচার করতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মীমাংসা কল্যাণকর এবং মানুষের মধ্যে কৃপণতা বিদ্যমান রয়েছে’ (আন-নিসা, ৪/১২৮)।
এই আয়াতে পক্ষপাতমুক্ত বিচারকার্য পরিচালনার কথা বলে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, সে যেন লোভের বশবর্তী হয়ে পক্ষপাতদুষ্ট বিচার না করে। কোনো পক্ষেরই তার অধিকারের সম্পূর্ণটা চাওয়া উচিত নয়। যদি এক পক্ষ তার পূর্ণ অধিকার চায়, তবে অপর পক্ষও তার পূর্ণ অধিকার চাইবে। তখন উভয় পক্ষের মধ্যে মীমাংসা অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রত্যেককেই তার দাবীর ক্ষেত্রে নমনীয় হতে হবে। যখন ন্যায়সঙ্গতভাবে মীমাংসা করা সম্ভব হয় না, তখন তথ্য-প্রমাণ অথবা পক্ষদ্বয়ের অবস্থানের কারণে বিচার্য বিষয়টি বিচারকের নিকট অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন কল্যাণের চাহিদার আলোকে বিচার করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
একজন মানুষকে বাহনে আরোহণ বা বাহনের উপর মালামাল উঠাতে সাহায্য করা ছাদাক্বা। সৎকর্ম ও তাক্বওয়ায় সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। মানবিক দায়িত্ব গ্রহণ করার এক অনুপম উদাহরণ। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সৃষ্টিগতভাবে কোনো ব্যক্তিই তার সকল প্রয়োজন মেটাতে পারে না। বরং কোনো না কোনো ক্ষেত্রে সে অন্যের মুখাপেক্ষী হয়। জীবনে চলাচল ও লেনদেনের যে কোনো ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের অভাব দেখা দিতে পারে। তবে যখন তার দায়িত্ব পালনে তার ভাইয়ের সাহায্য পায় কিংবা তার ভাইয়ের সাহায্যে তার প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটে যায়, তখন মুমিনদের মধ্যে ভালোবাসা বিস্তার লাভ করে। কোনো ব্যক্তি বাহনে উঠতে অক্ষম হলে বা মালামাল বাহনে উঠাতে অপারগ হলে তাকে সাহায্য করা ছাদাক্বা।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করে দেওয়া ছাদাক্বা: যখন রাস্তায় এমন বস্তু পড়ে থাকে, যা পথচারীর জন্য কষ্টদায়ক তা সরিয়ে দেওয়া ছাদাক্বা। সেটা ইট, পাথর, কাচ, কাঁটা, ফলের খোসা ইত্যাদির যে কোনোটি হতে পারে। ঝুলন্ত কাপড় কারও বিপদের কারণ হলে তা উঠাতে বলাও ছাদাক্বা। মোদ্দাকথা, রাস্তায় পড়ে থাকা ক্ষতিকারক বস্তু সরিয়ে ফেলা ছাদাক্বা হিসেবে গণ্য হবে। যদি কেউ সেটা সরিয়ে ফেলে তবে সে ছাদাক্বাকারী হিসেবে গণ্য হবে। মনে রাখতে হবে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া ছাদাক্বা আর রাস্তায় কষ্টদায়ক বস্তু ফেলা অন্যায়। আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘এমন তিনটি স্থানে মল ত্যাগ করা থেকে বিরত থাক, যেখানে মলত্যাগ অভিশাপের কারণ হয়— (ক) মানুষের সমবেত হওয়ার স্থান, (খ) রাস্তার মধ্যবর্তী স্থান ও (গ) গাছের ছায়া’।[3]
যারা ময়লা-আবর্জনা রাস্তায় নিক্ষেপ করে বা নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাজারের দিকে পানি ছেড়ে, দেয় যাতে মানুষ কষ্ট পায় ইত্যাদি অন্যায় বা পাপ হিসেবে গণ্য হবে। এখানে পানি বলতে ব্যবহৃত পানিকে বুঝানো হয়েছে। মাটির তলদেশের পানিকে বোঝানো হয়নি। এখন কোথাও যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাটি থেকে পানি বের হয় সেক্ষেত্রে কাউকে দায়ী করা যাবে না। কারণ মাটির অভ্যন্তরে পানির সংরক্ষক হলেন মহান আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿فَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَسْقَيْنَاكُمُوهُ وَمَا أَنْتُمْ لَهُ بِخَازِنِينَ﴾ ‘অতঃপর আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করলাম। সেই পানি আমি তোমাদেরকে পান করালাম। তোমরা কিন্তু এই পানির সংরক্ষণকারী নও’ (আল-হিজর, ১৫/২২)।
যারা পানির প্রবাহ উন্মুক্ত করে এর ব্যবহারে সীমালঙ্ঘন করে এবং এর গতিপথের ক্ষেত্রে কোনো পরোয়া না করে তারা সমগ্র উম্মতের জন্য ক্ষতিকারক। কারণ পানি সকল মানুষের ব্যবহারের বিষয়। যখন কেউ এর অপব্যবহার করবে, তার অপচয়ে কোনো পরোয়া করবে না তখন সে অপব্যয়কারী হিসেবে বিবেচিত হবে। আর আল্লাহ অপব্যয়কারীকে পছন্দ করেন না। এমতাবস্থায় সে পাপী হবে। কেননা পানির অপচয় ও অপব্যয়ে জড়িত ব্যক্তিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধমক দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ﴾ ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই’ (আল-ইসরা, ১৭/২৭)।
আর এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ওযূ করার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, তিনি তাকে (ওযূর প্রতিটি অঙ্গ) তিনবার করে ধৌত করে দেখালেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘এইভাবে ওযূ করতে হয়। যে এর বেশি করল সে অন্যায় করল, সীমালঙ্ঘন করল এবং নিজের প্রতি যুলম করল’।[4] আর এর অপব্যবহারের ক্ষতির সম্মুখীন হয় সাধারণ জনগণ। মোদ্দাকথা, যারা রাস্তায় বা জনসাধারণের গতিপথে এমন কিছু নিক্ষেপ করবে যা তাদের চলাচলে বিঘ্নতা সৃষ্টি করবে তারা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। আর যারা রাস্তা থেকে এসব কষ্টদায়ক বস্তু দূর করবে, তারা ছাদাক্বাকারীর মর্যাদা অর্জন করবে।
আর পবিত্র বাক্য হলো ছাদাক্বা। কালেমা ত্বায়্যেবা বা পবিত্র বাক্য দুইভাগে বিভক্ত— (ক) মৌলিক পবিত্র বাক্য ও (খ) ফলাফলের বিচারে পবিত্র বাক্য।
মৌলিক পবিত্র বাক্য হলো আল্লাহর যিকির, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবর, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি। মৌলিক পবিত্র বাক্য মানুষকে ছালাত আদায়ের জন্য মসজিদে উপস্থিত হতে উৎসাহিত করে। এটি মানুষের কল্যাণ লাভ এবং প্রতিদান অর্জন নিশ্চিত করে। এর ফযীলতে কুরআন ও হাদীছে অনেক প্রমাণ বর্ণিত হয়েছে। যেমন, উছমান ইবনু আফফান রযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীছে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শেখায়’।[5]
আর ফলাফলের বিচারে পবিত্র বাক্য হলো যে কোনো বৈধ বাক্য। যখন এর দ্বারা উদ্দেশ্য থাকে কাউকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাকে আনন্দিত করা। এই জাতীয় বাক্য মৌলিকভাবে কল্যাণকর না হলেও ফলাফলের বিচারে কল্যাণকর। কারণ এটি একজন মানুষের মধ্যে এমন অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে, যার ফলে সে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে আগ্রহী হয়। যেমন- মানুষের প্রয়োজন মিটায় এমন সুপারিশ, বিপদে তাকে সান্ত্বনা প্রদান, আল্লাহর নৈকট্য লাভে সদুপদেশ, ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ, আনন্দদায়ক উপদেশ যা তার আত্মাকে প্রশান্তি দেয়। তাই কালেমা ত্বায়্যেবা বা পবিত্র বাক্য সাধারণ বাক্য, যা যে কোনো কল্যাণকর বাক্যকেই শামিল করে; চাই তা মৌলিকভাবে পবিত্র হোক কিংবা ফলাফলের বিচারে পবিত্র হোক।
পবিত্র বাক্য হলো ছাদাক্বার মধ্যে সব থেকে বড় ছাদাক্বা। এই বাক্যের বাহ্যিক প্রভাব কত মানুষের উপর যে রয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি নীতিবাক্যের প্রভাবের বহু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। জাযান নামক একজন সালাফ তার জীবনের একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি সুমধর কণ্ঠের একজন যুবক ছিলাম। আমি একতারা বাজাতে খুব দক্ষ ছিলাম। আমি আমার বন্ধুদের সাথে ছিলাম। আমরা ভিজানো খেজুর খাচ্ছিলাম আর গান করছিলাম। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রযিয়াল্লাহু আনহু সেখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি আমাদের নিকট আসলেন। তিনি একতারাটি মেঝেতে আঘাত করে ভেঙে দিয়ে বললেন, হে যুবক! তোমার কী মিষ্টি কণ্ঠস্বর! যদি তোমার কণ্ঠে কুরআনের আওয়ায শুনা যেত, তবে তুমি এমন মহান ব্যক্তি হতে! অতঃপর তিনি চলে গেলেন। আমি আমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তারা বললেন, ইনি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রযিয়াল্লাহু আনহু। তারপর আল্লাহ আমার হৃদয়ে তওবার অনুপ্রেরণা দান করলেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে তাঁর নিকট দৌঁড়ে গেলাম এবং তাঁর কাপড় ধরে নিলাম। তিনি আমার সামনে এসে আমার সাথে কোলাকুলি করলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। তিনি আমাকে বললেন, তাকে স্বাগত যাকে আল্লাহ ভালোবেসেছেন! হে পাঠক! আপনার ভেবে দেখা উচিত এই লোকটি যত সৎকাজ করবেন তার সবই আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রযিয়াল্লাহু আনহু-এর আমলনামায় লিপিবদ্ধ হবে। এর কারণ হলো আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রযিয়াল্লাহু আনহু-এর পবিত্র বাক্য তাঁর হেদায়াতের কারণ হয়েছে।[6] আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় জান্নাতে একটি কক্ষ আছে যার বাহির থেকে ভিতর এবং ভিতর থেকে বাহির দেখা যায়’। আবূ মালেক আল-আশআরী রযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এটা কার জন্য? আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যে মিষ্টি ভাষায় কথা বলে, মানুষকে খাদ্য দেয় আর এমন সময় ছালাত আদায় করে, যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে’।[7]
আর মসজিদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছাদাক্বা অর্থাৎ বাসা থেকে মসজিদ পর্যন্ত যত পদক্ষেপ দেওয়া হবে, তার সবই ছাদাক্বায় শামিল হবে। যদি কোনো ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে ওযূ করে বাসা থেকে একমাত্র ছালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে যায়, তবে তার প্রতিটি পদক্ষেপই ছাদাক্বা হবে। প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার পাপমোচন করবেন এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন।[8] এটি হলো আল্লাহ তাআলার এক বড় অনুগ্রহ। ছালাত ব্যতীত অন্য কিছু যদি তাকে বাসা থেকে বের না করে, তবে তার জন্য তিনটি সুসংবাদ রয়েছে— (ক) ছাদাক্বা, (খ) মর্যাদা বৃদ্ধি ও (গ) পাপমোচন। আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অন্ধকারে মসজিদের দিকে গমনকারীদের ক্বিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ আলোর সংবাদ দাও’।[9] যে ব্যক্তি ফজর এবং মাগরিবে মসজিদে যায় আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের খাবার তৈরি করে রাখেন। ফজর কিংবা মাগরিব যখনই সে যায় (তখনই তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এই ব্যবস্থা থাকে)।[10]
মোদ্দাকথা, আল্লাহ তাআলার অফুরন্ত নেয়ামতের তুলনায় বান্দার সমুদয় আমল খুবই নগণ্য। বান্দার আমল তাঁর নেয়ামতরাজির সামান্যতম অংশের সাথে তুলনীয় হতে পারে না। একজন মুমিন তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে পাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে যত যত্নশীলই হোক না কেন এবং আল্লাহ তাআলার ইবাদতে যত কৃচ্ছ্রসাধন করুক না কেন, তার বিশাল নেয়ামতের তুলনায় মোটেও তা যথেষ্ট নয়। বান্দা তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে স্রষ্টার অসন্তুষ্টিতে ব্যবহার থেকে সংরক্ষণের শত চেষ্টা করেও আল্লাহ তাআলার অফুরন্ত নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে সক্ষম হবে না। এখানে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের যতটুকু তাওফীক্ব ও সক্ষমতা দান করেছেন, তার সবটুকু দিয়ে আমরা তাঁকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব আর বলব, হে আল্লাহ! তোমার দয়া ব্যতীত তোমার সন্তুষ্টি অর্জন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। হে আল্লাহ! আমরা শুধু তোমার রহমতের ভিখারী। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল
প্রভাষক (আরবী), বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বরিশাল।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১০০৯; মিশকাত, হা/১৮৯৬।
[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০০৭।
[3]. আবূ দাঊদ, হা/২৬, হাসান।
[4]. আবূ দাঊদ, হা/১৩৫, হাসান; নাসাঈ, হা/১৪০।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০২৭।
[6]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/২৮১।
[7]. মুসানাদে আহমাদ, হা/৬৬১৫; মুসতাদরাক হাকেম, হা/১২০০।
[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৪৯।
[9]. আবূ দাঊদ, হা/৫৬১।
[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬২; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৬৯।