اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
মানুষ তার অভ্যাসের প্রতিচ্ছবি। যে কাজ মানুষ বারবার ও নিয়মিতভাবে করে, তা তার অবচেতন মনে গভীরভাবে স্থায়ী হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, মস্তিষ্ক সেই কাজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদনের জন্য সংকেত প্রেরণ করতে থাকে। যেমন, একজন আসক্ত ব্যক্তির জন্য নেশা ত্যাগ করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তার মস্তিষ্ক সেই অভ্যাসের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়। শুধু একদিনের উপদেশ বা অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য এই ধরনের অভ্যাস ভাঙার জন্য যথেষ্ট নয়।
তেমনি, যদি কেউ নিয়মিতভাবে ছালাত আদায় না করে, তবে তার মস্তিষ্কও ছালাতের সময়কে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। এভাবেই দিনগুলো অজান্তেই পেরিয়ে যায়। এই বদ অভ্যাস পরিবর্তন করে ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে কেবল একটি বক্তৃতা বা দারস যথেষ্ট নয়; বরং নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে অবচেতন মনে সেই ভালো অভ্যাসকে স্থাপন করতে হয়। যখন কেউ প্রতিনিয়ত ছালাত আদায় করবে, তখন মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছালাতকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করবে। এমনকি যদি কোনোদিন ছালাত আদায় না করা হয়, তখন মস্তিষ্কে এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতি সৃষ্টি হবে, যা মানুষকে পুনরায় সেই অভ্যাসের দিকে ধাবিত করবে।
অভ্যাস গঠনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তা সকল মনোবিজ্ঞানীই স্বীকার করেছেন। আল-হামদুলিল্লাহ! মুসলিমদের জন্য এমন ধারাবাহিক ভালো অনুশীলনের অনন্য এক সুযোগ হলো রামাযান। একটানা নিয়মিত ভালো অভ্যাসগুলো অনুশীলন করলে সেগুলো পরবর্তী সময়েও ধরে রাখা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। আসুন, আমরা দেখি রামাযানে কী কী উত্তম অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।
১. সঠিক খাদ্যাভ্যাস: স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য খাদ্যাভ্যাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। খাদ্যাভ্যাস ঠিক না থাকার কারণে বর্তমানে যুগে লিভার, কিডনি ও ডায়াবেটিস থেকে শুরু করে অসংখ্য মরণব্যাধিতে মানুষ আক্রান্ত। রামাযান মানুষের সঠিক খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে অনেক সহযোগিতা করে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার মাধ্যমে শরীরের কোষগুলো সজীব হয়, টক্সিন দূর হয়। নবোদ্যমে জেগে ওঠে আমাদের শরীর। রামাযান পার হয়ে যাওয়ার পরেও সাপ্তাহিক ও মাসিক নফল ছিয়ামগুলোর মাধ্যমে আমরা এই অভ্যাসটিকে ধরে রাখতে পারি।
২. নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত: কুরআন তেলাওয়াত মুসলিম জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভ্যাস। কুরআন বিহীন জীবন পশু-প্রাণীর মতো জীবন। জীবনের সকল চড়াই-উতরাই ও সমস্যায় কুরআন তেলাওয়াত ও কুরআন অনুধাবন আপনাকে নতুন দিশা দিবে। রামাযানের সাথে কুরআনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। রামাযান মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তাই আমাদের উচিত রামাযানে কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। রামাযানই আমাদের জন্য সবচেয়ে মোক্ষম সুযোগ কুরআন শেখার ও কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার।
৩. পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের অভ্যাস: রামাযানে আমাদের উচিত দুনিয়াবী কাজ কিছু কমিয়ে ভালো অভ্যাস গড়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া। তন্মধ্যে অন্যতম একটি অভ্যাস হতে পারে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের অভ্যাস। রামাযানে যদি আমরা কোনো কাজই করতে না পারি অন্তত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের টার্গেট করা উচিত। কোনো অভ্যাস গড়ে তুলতে না পারলেও অন্তত ছালাতের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে জীবন সার্থক। ছালাতের চেয়ে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ এই পৃথিবীতে নাই। তাই আসুন! রামাযান পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামাআতে আদায়ের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করি।
৪. দান-ছাদাক্বা করার অভ্যাস: মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও প্রশস্ত করতে দান-ছাদাক্বা করার অভ্যাসের বিকল্প নাই। দান এমন এক মহান ইবাদত যা মানুষের গুনাহকে মিটিয়ে দিতে পারে, কবরের আযাবকে কমিয়ে দিতে পারে এবং ক্বিয়ামতের মাঠে বিভিন্ন দেনা-পাওনা পরিশোধে সহযোগিতা করতে পারে। আমাদের প্রতিদিনই কিছু না কিছু দান করা উচিত। সেই দানের অভ্যাস গড়ে তুলতে রামাযানের বিকল্প নাই।
৫. রাতের ছালাতের অভ্যাস: যেকোনো বড় ধরনের সফলতার জন্য রাতের ছালাতের বিকল্প নাই। রাতের ছালাত আদায়ের মতো কঠিন কাজের অভ্যাস আমাদের জন্য রামাযানে সহজ হয়ে যায়। বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনদের নিয়ে রামাযানের রাতগুলোতে ছালাত আদায়ের পরিবেশ তৈরি করুন। অতি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় একটি অভ্যাস গড়ে তুলুন। যা আপনার জীবনকে আমূল পরিবর্তন করে ফেলতে পারে।
সর্বোপরি রামাযান মূলত শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাস। শয়তানের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের একটি চ্যালেঞ্জ কোর্স। এই ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জে উক্ত অভ্যাসগুলো সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে এই একটি রামাযান আমাদের সমগ্র জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে ইনশা-আল্লাহ! মহান আল্লাহ কবুল করুন! (প্র. স.)