কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কলুষিত অন্তরকে বিশুদ্ধকরণ

post title will place here

[১]

কারো সফলতায় বাহ্যিকভাবে খুশি হতে পারা কিংবা খুশি হতে পারার ভান করা অনেক সহজ। কিন্তু একদম মন থেকে খুশি হতে পারা এবং আরও সফল হওয়ার জন্য বিশুদ্ধ মনে দু‘আ করতে পারা মোটেও সহজ নয়। এটি অনেক বড় একটি গুণ, যা সবার মধ্যে থাকে না। নিঃসন্দেহে এমন গুণ মুত্তাক্বীদের গুণ। আর এই গুণ থাকা ব্যক্তিদের অভিনন্দন জানানো উচিত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের মধ্যে হিংসা, অহংকারের তীব্রতা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, আজকাল আমরা মানুষের ভালোটুকু সহ্য করতে পারি না। কাউকে কোনো কিছুতে সফল হতে দেখলেই আমাদের অনেকেরই গা জ্বালা শুরু হয়ে যায়, মনে মনে এক ধরনের কষ্ট অনুভব করতে শুরু করি। বাহ্যিকভাবে যদিও অনেক খুশি হতে পারার ভান করা হয়, তবুও তো মনের মধ্যে এক ধরনের অশান্তি থেকে যায়, বুকে চিনচিন ব্যথা করে। পক্ষান্তরে, কারো অকল্যাণ দেখলে আমরা ভিতরে ভিতরে কেমন জানি এক ধরনের সুখ অনুভব করি। মনে মনে খুশি হই, অট্টহাসি দেই। আর এগুলো সবই মুনাফেক্বীর বহিঃপ্রকাশ।

আল্লাহ তাআলা এ মর্মে বলেছেন, তাদের অর্থাৎ মুনাফেক্বদের অবস্থা হচ্ছে তোমাদের কোনো কল্যাণ হলে তাদের খারাপ লাগে, আবার তোমাদের কোনো অকল্যাণ দেখলে তারা আনন্দে ফেটে পড়ে; এ প্রতিকূল অবস্থায় যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করতে পারো এবং নিজেরা তাক্বওয়া অবলম্বন করে চলতে পারো, তাহলে তাদের চক্রান্ত (ষড়যন্ত্র) তোমাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিবেষ্টন করে আছেন (আলে ইমরান, ৩/১২০)

এই আয়াতকে সামনে রেখে আমাদের নিজেদের সাথে স্থির মনে একটু কথা বলে নেওয়া দরকার যে, আমি কি সত্যিকার অর্থেই অন্যের সফলতায় খুশি হতে পারছি নাকি আমার ভিতরে খুব জ্বালা যন্ত্রণা করে, অস্বস্তি লাগে, আমি সহ্য করতেই পারি না? যদি কারো কল্যাণ দেখলে আমাদের নিজেদের মধ্যে আসলেই জ্বালা শুরু হয়ে যায় কিংবা অন্তরে অস্বস্তিবোধ হয় এবং অকল্যাণ দেখলে অন্তরে শান্তি অনুভূত হয়, খুশি খুশি ভাব চলে আসে, তখন বুঝতে হবে আমাদের মধ্যে মুনাফেক্বী এসে গেছে, শয়তান আমাদেরকে প্রবলভাবে ডমিনেট করছে।

এমতাবস্থায় অচিরেই নিজের অন্তরের চিকিৎসা করাতে হবে। কেননা এ অন্তর ‘মুনাফেক্ব’ নামক অনেক জটিল এক রোগে আক্রান্ত। এমন আক্রান্ত অন্তর নিয়ে নিজেকে আর যাইহোক জান্নাতের উপযোগী করে তোলা যায় না। ফলে জরুরী ভিত্তিতে এর চিকিৎসা করাতেই হবে। আর এর চিকিৎসার জন্য দুনিয়ার কোনো ডাক্তারের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিতে হবে না। এর প্রেসক্রিপশন স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলাই ইতোমধ্যে বাতলে দিয়েছেন। তাহলে সেই প্রেসক্রিপশনটা কী?

সেই প্রেসক্রিপশনটা হচ্ছে কুরআনুল কারীম। অন্তরের রোগের চিকিৎসার জন্য এটিই হচ্ছে আসল এবং কার্যকরী সমাধান। ফলে এর দ্বারস্থ হতেই হবে। একমাত্র কুরআনই মানুষের অন্তর পরিবর্তন করে দিতে পারে, আল্লাহর সাথে সরাসরি কানেকশন তৈরি করে দিতে পারে। কেননা কুরআনের প্রতিটি কথাই মানুষের অন্তরে তাক্বওয়া তথা আল্লাহ ভীতির সৃষ্টি করে। 

মানুষের অন্তরে যখন আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়, তখন সে পাপ কাজ করতে পারে না। তখন তার প্রতিটি কাজের মধ্যে তার নিজের মনিটরিং থাকে। তখন সে কুরআনের আয়াতের সাথে নিজের কর্মকাণ্ড মিলিয়ে নিয়ে নিজেকে বিশুদ্ধ পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। এই সবকিছুর মূলেই তো তাক্বওয়া। তাক্বওয়াই মানুষকে নেক্কার বান্দা হিসেবে গড়ে তুলে, অন্তরকে কলুষমুক্ত রাখে, বান্দার অবস্থান তার রবের কাছাকাছি নিশ্চিত করে।

আল্লাহ তাআলা ওই আয়াতের শেষাংশে আরও বলেছেন যে, কেউ যদি আমাদের কারো কল্যাণে অখুশি হয় আবার অকল্যাণে খুশি হয়, তখন আমাদেরকে দুটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, মনোবল হারিয়ে না ফেলা বা ভেঙে না পড়া তথা ধৈর্যধারণ করা। দ্বিতীয়ত, চলার পথে তাক্বওয়া অবলম্বন করা। অর্থাৎ আল্লাহর সমস্ত আদেশ নিষেধ যথাযথভাবে মেনে চলার মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করে চলা। ব্যাস! এতটুকুই আমাদের কাজ। বাকিটা আল্লাহ তাআলাই কোনো না কোনোভাবে করে দিবেন। এ ব্যাপারে আমাদের চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।

অধিকন্তু, আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেন যে, তিনি দুষ্টদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিবেষ্টন করেই আছেন। অর্থাৎ তারা আল্লাহর বাউন্ডারিতেই আছে, যেকোনো সময়ই আল্লাহ তাদেরকে ধরে ফেলবেন। তাই আমাদের এতে চিন্তা কীসের? আল্লাহই তো আমাদের হেফাযতকারী, উত্তম অভিভাবক। 

[২]

অনেক সময় ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও মনের মধ্যে হিংসা-অহংকার চলে আসে। যেহেতু দুনিয়া হচ্ছে একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। আর হিংসা-অহংকার হচ্ছে সেই পরীক্ষার প্রশ্ন। তাই পরীক্ষার প্রশ্ন হিসেবে মনের মধ্যে হিংসা-অহংকার চলে আসা দূষণীয় কিছু নয়। তবে দোষ তখনই হবে, যখন আপনার হিংসা-অহংকার মানুষের ক্ষতির কারণ হবে, যখন আপনি এগুলোকে অন্তরে ঠাঁই দিবেন। এজন্য নিজের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হবেন যে, আমি কি হিংসা করছি? আমার কি কোনো কাজে অহংকার হয়ে যাচ্ছে? হিংসা ও অহংকার নামক সেই প্রশ্নদ্বয়ের সঠিক উত্তর হচ্ছে হিংসার বশবর্তী হয়ে কারো কোনো ক্ষতি না করা, ক্ষতির চিন্তা পর্যন্ত না করা। নিজেকে বড় মনে না করা, সত্যকে প্রত্যাখ্যান না করা। মোটকথা, এমন কিছু না করা, যার ফলে অহংকার প্রকাশ পায়। সহজ ভাষায়, হিংসা ও অহংকার থেকে নিজেকে কন্ট্রোল করাই হচ্ছে এ দুটো প্রশ্নের উত্তর।

মনের মধ্যে হিংসা চলে আসলে আপনার করণীয় হচ্ছে, যে মানুষের প্রতি আপনার হিংসা হচ্ছে সে মানুষের জন্য বেশি বেশি করে দু‘আ করা। আপনি যখন হিংসা না করে অন্যের জন্য মঙ্গলের দু‘আ করবেন, তখন ফেরেশতারা আপনার মঙ্গলের দু‘আ করবেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি তার অন্য ভাইয়ের আড়ালে তার জন্য দু‘আ করে, তখন ফেরেশতাগণ বলেন, আমীন এবং তোমার জন্যও তাই হোক, যা তুমি তোমার ভাইয়ের জন্য দু‘আ করলে।[1]

কারো প্রতি মনের মধ্যে হিংসা আসলে তার জন্য এভাবে দু‘আ করতে পারেন যে, ও আমার রব! আমার মধ্যে যার প্রতি হিংসা হচ্ছে, তাকে তুমি সবসময় ভালো রেখো এবং তাকে সমস্ত ক্ষতি থেকে হেফাযত করে রেখো। বিশ্বাস করুন, এভাবে দু‘আ করলে আপনার অন্তরে অন্যরকম এক শান্তি অনুভূত হবে। আর মজার বিষয় হচ্ছে, আপনার সাথে না পেরে শয়তান তখন বেইজ্জত হয়ে আপনার কাছ থেকে চুপি চুপি পালাবে।

একই সাথে, নিজের মনকে এভাবেও বোঝাতে পারেন যে, ও মন আমার! অন্যের যে জিনিস নিয়ে তুমি হিংসা করছ, বুকে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছো, সে জিনিস যেই আল্লাহ তাকে দান করেছেন, সেই আল্লাহ চাইলে তোমাকেও একই জিনিস দান করতে পারেন। এমনকি তোমাকে তার চেয়েও এমন উত্তম কিছু দান করতে পারেন, যা তোমার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। অতএব তুমি অন্যের প্রতি হিংসা না করে একটু সবর করো।

পক্ষান্তরে, মনের মধ্যে অহংকার চলে আসলে মনকে এভাবে বোঝাতে পারেন যে, ও মন! তুমি এতটাই দুর্বল যে, প্রতিদিন তোমাকে কয়েকবার তোমার নিজের প্রস্রাব-পায়খানার মতো দুর্গন্ধময় জিনিস পরিষ্কার করতে হয়। এছাড়া, এই মুহূর্তে মালাকুল মউতের সাথে তোমার সাক্ষাৎ হয়ে গেলে কিছুক্ষণ পরই তুমি পোকামাকড়ের খাবার হতে চলছ। ফলে তোমাকে দিয়ে মোটেও অহংকার সাজে না গো মন। তুমি নিজেকে নিয়ে অহংকার না করে নিজের চোখে নিজেকে ছোট হিসেবে দেখো এবং নিজের ঈমান আমল এমনভাবে সাজাও যেভাবে সাজালে তোমার রব মানুষের দৃষ্টিতে তোমাকে বড় করে দেবেন।

[৩]

আপনি যদি আপনার অন্তরকে শিরক, বিদআত, হিংসা, অহংকার মুক্ত অর্থাৎ পাক্কা বিশুদ্ধ রাখতে পারেন, তবে রবের পক্ষ থেকে আপনার জন্য বিরাট এক সুখবর রয়েছে। সে সুখবর সম্মানের সুখবর। অন্তরকে কলুষমুক্ত রাখতে পারলে আপনার জন্য অনেক বড় এক সম্মান অপেক্ষা করছে। আপনি কি জানেন, সেটা কী? যাদের অন্তর পবিত্র, তাদেরকে উদ্দেশ্য করে রব্বে কারীম বলেছেন, সেদিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আসবে। সেদিন জান্নাতকে আল্লাহভীরুদের একান্ত কাছে নিয়ে আসা হবে (আশ-শুআরা, ২৬/৮৯-৯০)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ চাইলে কিন্তু এটা বলতে পারতেন যে, বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আসলে তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাব। এটা বলাই যথেষ্ট ছিল। কারণ জান্নাতে প্রবেশ করা এমনিতেই সম্মানের বিষয়। কিন্তু রহমানুর রহীম তার মুত্তাক্বী বান্দাদেরকে আরও বেশি সম্মান দিয়ে বলেছেন, মুত্তাক্বীদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে না, বরং জান্নাতকে মুত্তাক্বীদের কাছে নিয়ে আসা হবে। সুবহানাল্লাহ! বান্দার জন্য রবের পক্ষ থেকে এর চেয়ে বড় সম্মানের বিষয় আর কী হতে পারে, ভাবুন তো। এখন এমন বিষয় জানা সত্ত্বেও কি আমরা আমাদের অন্তরকে শিরক-বিদআত মুক্ত রাখতে তৎপর হব না? এরপরও কি আমরা আমাদের অন্তরকে অহংকার থেকে হেফাযত করব না? শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাআলা অন্তর বিশুদ্ধকারী বান্দাকে এত বেশি সম্মান দিবেন—এমনটা জেনেও কি আমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকব না? ভাবুন, পরিবর্তনের মানসিকতা নিয়ে নিজেকে নিয়ে আরও ভাবুন।

রাকিব আলী

 আম্বরখানা, সিলেট।


[1]. আবূ দাঊদ, হা/১৫৩৪।

Magazine