কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে মসজিদের ভূমিকা (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

post title will place here

আদর্শ সমাজ গঠনে মসজিদগুলো যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারে:

১. শিশুদের জন্য প্রতিটি মসজিদ একটি পাঠশালা: কোমলমতি শিশুদের নীতি-নৈতিকতার উপর বড় করে তোলার ক্ষেত্রে একটি পরিবারে একজন আদর্শ বাবা-মায়ের ভূমিকার পাশাপাশি মসজিদগুলোর ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদে শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

عَنْ أَبَي قَتَادَةَ، يَقُولُ بَيْنَا نَحْنُ فِي الْمَسْجِدِ جُلُوسٌ خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَحْمِلُ أُمَامَةَ بِنْتَ أَبِي الْعَاصِ بْنِ الرَّبِيعِ وَأُمُّهَا زَيْنَبُ بِنْتُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهِيَ صَبِيَّةٌ يَحْمِلُهَا عَلَى عَاتِقِهِ فَصَلَّى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَهِيَ عَلَى عَاتِقِهِ يَضَعُهَا إِذَا رَكَعَ وَيُعِيدُهَا إِذَا قَامَ حَتَّى قَضَى صَلَاتَهُ يَفْعَلُ ذَلِكَ بِهَا.

আবূ ক্বাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা আমরা মসজিদে বসা ছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় কন্যা যায়নাবের মেয়ে উমামাহ বিনতু আবুল আছ ইবনু রবী-কে কাঁধে করে নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। তখন উমামাহ শিশু ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাঁধে নিয়ে ছালাত আদায় করেন। তিনি রুকূ করার সময় তাকে নামিয়ে রাখতেন এবং দাঁড়ানোর সময় তাকে আবার কাঁধে উঠিয়ে নিতেন। তিনি এভাবে ছালাত আদায় শেষ করেন।[1]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাত বছর বয়স থেকেই শিশুদেরকে ছালাতের প্রশিক্ষণ দিতে নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেন,مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর বয়সে ছালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়ে যাবে, তখন (ছালাত আদায় না করলে) তাদেরকে মারবে এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দিবে।[2] আর বাচ্চারা যদি মসজিদে না আসে, তাহলে তারা ছালাত শিখবে-ই বা কী করে? কথায় বলে, ‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস’।

শিশুদের কোমল মনকে আজ যেভাবে প্রতিপালন করা হবে, বড় হলে তারা অনায়াসে সেটাই প্র্যাকটিস করবে আর এটাই স্বাভাবিক। শিশুকালের শিক্ষাই স্থায়ী এবং টেকসই শিক্ষা। যে শিশু শৈশব থেকেই ছালাতের দীক্ষা পেয়েছে, সে শিশু কৈশোরে গিয়ে ছালাত ছেড়ে দিতে পারে না। মসজিদে উপস্থিতি তাদেরকে কেবল ছালাতের শিক্ষা দেয় না; বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সংস্পর্শে এসে তাদের সাথে কথা বলা, তাদেরকে সম্মান করা ইত্যাদি বিষয়গুলোও তারা শিখতে পারে। এছাড়া তারা জুমআর খুৎবা শুনে ছোট থেকেই দ্বীনের বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। বিশেষত মক্তবভিত্তিক মসজিদগুলোতে প্রতিদিন সকালে কচিকাঁচাদের যে জ্ঞানের আসর বসে, সেখান থেকে সে দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো শিখে নিতে পারে। কীভাবে ওযূ করবে, ঘুম থেকে উঠে কী বলবে, টয়লেটে প্রবেশের সময় কী বলবে ইত্যাদি বিষয়গুলো শেখার ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য মসজিদের থেকে উত্তম কোনো পাঠশালা হয় না। তুরস্কের কোনো এক মসজিদের দেয়ালে লেখা আছে, ‘ছালাত আদায়ের সময় যদি পেছনের সারি থেকে বাচ্চাদের হাসির আওয়াজ না আসে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাপারে ভয় করুন’।

২. কিশোরদের জন্য মসজিদ হচ্ছে একটি বিদ্যালয়: কিশোর শব্দটা শুনতেই সবার হৃদয় কেঁপে ওঠে! এরা না জানি কোন কিশোর গ্যাং-এর সদস্য! আজকের অধিকাংশ কিশোরের সাথে না আছে পাঠ্য বইয়ের গভীর কোনো সম্পর্ক, না আছে পাড়ার মসজিদের সাথে কোনো সংশ্লিষ্টতা। বর্তমানে কিশোর মানে পাবজি খেলা, কিশোর মানে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, কিশোর মানে মাদকাসক্তি, কিশোর মানে বাইক চালানোর বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, কিশোর মানে মা-বাবার অবাধ্যতা, কিশোর মানে রাত জেগে মেয়েদের সাথে নোংরা চ্যাটিং, কিশোর মানে পথেঘাটে অযথা আড্ডাবাজি। অথচ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক কিশোর খাদেম ছিলেন, তার নাম রবীআহ ইবনে কা‘ব আল-আসলামী রাযিয়াল্লাহু আনহু, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আজকের কিশোরদের মধ্যে কল্পনাও করা যায় না। যেমনটি ছহীহ মুসলিম, নাসাঈ ও আবূ দাঊদসহ অসংখ্য হাদীছগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, রবীআহ ইবনু কা‘ব আল-আসলামী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

كُنْتُ أبِيتُ مع رَسولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فأتَيْتُهُ بوَضُوئِهِ وحَاجَتِهِ فَقالَ لِي: سَلْ فَقُلتُ: أسْأَلُكَ مُرَافَقَتَكَ في الجَنَّةِ. قالَ: أوْ غيرَ ذلكَ قُلتُ: هو ذَاكَ. قالَ: فأعِنِّي علَى نَفْسِكَ بكَثْرَةِ السُّجُودِ.

একদা আমি রাতের শেষ প্রহরে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (তাহাজ্জুদ ছালাতের জন্য) ওযূর পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করছিলাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমাকে বললেন, ‘হে রবীআহ! তুমি কিছু চাও’। আমি বললাম, ‘হে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে চাই’। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, ‘এ ছাড়া আর কিছু চাওয়ার নেই?’ আমি বললাম, ‘এটাই (আমার একমাত্র চাওয়া)’। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তাহলে তুমি বেশি বেশি সিজদা করে (নফল সালাত আদায় করে) এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো’।[3]

একইভাবে কিশোর ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা মসজিদে নববীতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংস্পর্শে এসে এমন ধীশক্তিসম্পন্ন হয়ে উঠেছিলেন যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর বয়োজ্যেষ্ঠ ছাহাবীদের বৈঠকে বসে মতামত দেওয়ার মতো মর্যাদা তিনি অর্জন করেছিলেন। আজকের সমাজের কিশোররা যদি মসজিদমুখী হতো, তাহলে পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের জন্ম হতো না, পিতামাতাকে ‍দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাতে হতো না। তাই কিশোরদের আদর্শবান হয়ে গড়ে উঠতে মসজিদের বিকল্প কোনো বিদ্যাপীঠ হয় না।s

৩. যুবকদের জন্য মসজিদ হচ্ছে একটি কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়: ‍যুবসমাজ একটি জাতি ও দেশের মূল চালিকাশক্তি। যুবকদের মেধার বিকাশ ও নীতি-নৈতিকতার উত্থানই মূলত একটি দেশ কিংবা জাতির প্রকৃত উন্নতি। কারণ নীতি-নৈতিকতা ছাড়া কখনো কেউ উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে পারে না। একইভাবে মুসলিম দেশ হিসেবে কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই দ্বীন ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব থাকা উচিত। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, আমার দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যায়গুলোতে নির্দিষ্ট সাবজেক্ট ছাড়া কোথাও ধর্মীয় কিংবা নৈতিক শিক্ষার কোনো সিলেবাস নেই বললেই চলে। শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিকুলামের এমন দৈন্যদশা থেকে দেশ ও জাতির ধ্বংস ঠেকাতে যুবকদের জন্য মসজিদ নামক দ্বীনী শিক্ষার মহাবিদ্যালয়গুলো একমাত্র আশার আলো। এখানে এসে যুবকরা শিখতে পারে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান, শিখতে পারে আদব-আখলাক, সৎ ও ছালাত আদায়কারী মানুষগুলোর সংস্পর্শে এসে সে নিজেও হয়ে ওঠতে পারে সৎ ও ধার্মিক যুবক। এজন্য মহান আল্লাহ একদিকে যেমন রুকূকারীদের সাথে রুকু করতে বলেছেন, ঠিক অন্যদিকে সত্যবাদীদের সঙ্গ দিতে বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ ‘আর তোমরা ছালাত ক্বায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ করো’ (আল-বাক্বারা, ২/৪৩)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো’ (আত-তাওবা, ১১৯)

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়োজ্যেষ্ঠ ছাহাবীদের মতো যুবক ছাহাবীদেরকেও সবকিছুতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। আবার যুবকরাও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যেকোনো ডাকে সবার আগে সাড়া দিতেন। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ নিতে যুবক ছাহাবী মুআয ও মুয়াওয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কৌশলের কথা কে না জানে? তেমনিভাবে হানযালা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ‍যুদ্ধে যাওয়া, শহীদ হওয়া এবং জান্নাতে ফেরেশতা কর্তৃক তার গোসল করানোর ঘটনাও সবার জানা।

৪. বিবাহিত যুগলদের জন্য মসজিদ হচ্ছে শান্তির নীড়: স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব তথা পরিবারিক কলহ এ সমাজে এক ভয়াবহ মহামারিতে রূপ নিয়েছে। ‘দৈনিক প্রথম আলো’র ২০২৩ সালের ১৩ জুনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে তালাক সংঘটিত হয়। ‘এখন’ টিভি চ্যানেলের নিউজ অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০টিরও বেশি সংসার ভাঙছে। ২০২৩ সালে ঢাকার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৭ হাজার ৩০৬টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৬ হাজার ৩৯৯টি বিবাহবিচ্ছেদ রেকর্ড করেছে। বিবাহবিচ্ছেদের এ মহাপ্রলয়ের পিছনে বিভিন্ন কারণ থাকলেও মূল কারণ হিসেবে পরিবারগুলোর মধ্যে আল্লাহভীতির অভাব, দুনিয়াবী লোভ-লালসা, পরকীয়া, আকাশচুম্বী বাসনা আর আখেরাত বিমুখতাকেই সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়। আর এ সকল কারণের পিছনে যে কারণটি লুকিয়ে রয়েছে তা হচ্ছে, পরিবারগুলোর মসজিদ বিমুখতা। অতি নগণ্য সংখ্যক স্বামী-স্ত্রীর সাথে মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষার সম্পর্ক রয়েছে। মসজিদের মিম্বারগুলো থেকে প্রতিনিয়ত কমবেশি একটি আদর্শ পরিবারের বিভিন্ন দিক নিয়ে যে কথাগুলো বলা হয়, পরিবারগুলো যদি তা কাজে লাগাত, তাহলে সমাজের এমন করুণ চিত্র আমাদের কখনো দেখতে হতো না। কেননা মসজিদকেন্দ্রিক নৈতিক শিক্ষা তাদের মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীর করতে যে ভূমিকা রাখতে পারে, অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তা পারে না।

এদেশে মসজিদের সাথে পুরুষদের তুলনামূলক বাড়তি সম্পর্ক থাকলেও নারীদের কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে। প্রতিটি মসজিদেই পারিবারিক কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা থাকা উচিত। বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ডিভোর্স-এর ক্ষেত্রে অধিকাংশ ঘটনাতেই নারীর ভূমিকা পুরুষের তুলনায় বেশি। এ দেশে নারীরা হাট-বাজার, অফিস-আদালত, মাঠ-ময়দান, বিনোদন স্পটসহ যত্রতত্র যখন তখন বাধাহীনভাবে যাতায়াত করার অধিকার রাখলেও কেন যেন আল্লাহর ঘর মসজিদে উপস্থিত হয়ে দ্বীনের দুটি কথা শোনার অধিকার তারা রাখে না। শরীআহ তাদেরকে বারণ না করলেও সমাজের আবেগী অজ্ঞ মুসলিমরা তাদেরকে সে পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সমাজের অধিকাংশ নারীরা দ্বীনের ব্যাপারে অজ্ঞতা নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়। তারা খ্রিষ্টান মিশনারিদের পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ঠিকই অংশ নেয়। অসংখ্য নারী ঘর থেকে বের হয়ে ক্ষুদ্রঋণের মতো সূদী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে, নিয়মিত কিস্তির হাযিরা দিচ্ছে। পরপুরুষের সাথে হাসিতামাশা করছে তাতে কোনো সমস্য হচ্ছে না, কেবল মসজিদে আসাতেই যত সমস্যা। ফলে অনবরত পারিবারিক কলহ লেগেই থাকে এবং প্রতিনিয়ত বিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েই চলেছে। তাই মসজিদের সাথে একটি দম্পতির সম্পর্ক গভীর ও দৃঢ় করতে পুরুষের ন্যায় একজন নারীরও অবাধে মসজিদে আসতে পারার অধিকার ও অভ্যাস থাকা উচিত। সে জন্য মসজিদে দ্বায়িত্বশীল যোগ্য সুপুরুষ আর স্বনির্ভর আলেমের উপস্থিতিও জরুরী। প্রত্যেকটা মসজিদকে জুমআর মসজিদ না বানিয়ে একটা গ্রামে একটি থেকে সর্বোচ্চ দুটি জামে মসজিদ রাখা উচিত, যেখানে সুযোগ্য আলেম থাকবেন।

৫. বয়োবৃদ্ধদের জন্য মসজিদ হচ্ছে প্রশান্তির ঠিকানা: ঘরে ঘরে বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলোর হতাশা এবং একাকিত্বের দুর্বিষহ জীবনযুদ্ধ এখন উত্তাল সাগরের পানির ঢেউয়ের গতিতে বেড়েই চলছে। কারণে বা অকারণে সন্তানেরা পিতামাতার কাছ থেকে দূরে থাকছে অথবা পরিস্থিতির কারণে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বৃদ্ধ পিতামাতা নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আশার বাণী হচ্ছে, ছালাতকে কেন্দ্র করে মসজিদগামী বয়োবৃদ্ধরা মসজিদমুখী অন্যান্য মুছল্লীদের সাথে ছালাতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ার সুযোগ পায়, তা তাদের হতাশা এবং মানসিক কষ্ট দূর করতে বড় ভূমিকা রাখে। যখন নিকটজনদের সকলেই তাদের ছেড়ে বহু দূরে থাকে, তখন শৈশবের মতো তারা তাদের আনন্দ-বেদনার কথাগুলো শেয়ার করার মতো কিছু সৎজন ও ছালাত আদায়কারী বন্ধু পেয়ে যান। আর এ সৎসঙ্গ তাদের মাঝে স্বর্গীয় সুখ ফিরিয়ে দেয়। মসজিদের মিম্বারগুলো থেকে প্রতিনিয়ত তারা যে কথাগুলো শুনতে পান, তা একদিকে তাদের মনের পিপাসা যেমন দূর করে, অন্যদিকে তেমনি তাদের মনে সাহস ও সান্ত্বনা যোগায়। মাঝেমধ্যেই হতাশার অন্ধকার ছেয়ে আসলেও ঈমানের আলো দিয়ে তা তারা দূর করতে সক্ষম হন। ঠিক এভাবেই মুছল্লীদের সাথে তাদের একে অপরের যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক জন্মায় তা তাদেরকে একাকিত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, একটা সময় বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলোকে মসজিদে পড়ে থাকতে দেখা গেলেও আজ তা হারিয়ে গেছে। অজ্ঞতা, উদাসীনতা এবং লালসার দাসত্ব তাদেরকে পেয়ে বসেছে। দিনের অধিকাংশ সময়ই তারা বিভিন্ন ধরনের বিনোদন কিংবা ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস নিয়ে পড়ে থেকে দিন পার করে দিচ্ছে, যা তাদের হতাশা আর একাকিত্বের যন্ত্রণা আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই বেলা শেষে পরিণত বয়সে প্রশান্তি ফিরে পেতে তাদের ফিরে আসা উচিত আল্লাহর ঘরে, পড়ে থাকা উচিত আল্লাহর কিতাব নিয়ে। এ বয়সে একমাত্র মসজিদ-ই হতে পারে তাদের জন্য পৃথিবীতে সেরা প্রশান্তির ঠিকানা।

৬. বিচারপ্রার্থীদের জন্য মসজিদ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ বিচারালয়: রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় থেকেই মসজিদ ছিল মুসলিম রাষ্ট্রের বিচার-ফয়সালার কেন্দ্রবিন্দু। আজও অনেক মসজিদে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে আরব বিশ্বে ক্বিছাছ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিচার-ফয়সালা প্রতিটি অঞ্চলের কেন্দ্রীয় মসজিদের খোলা মাঠে কার্যকর করা হয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ মসজিদে বসে হাজারো মানুষের সুখ-দুঃখ আর আনন্দ-বেদনার কথা শুনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। মসজিদে নববী-ই ছিল মদীনা রাষ্ট্রের প্রধান বিচারালয়। বিচারকের মধ্যে আল্লাহভীতি এবং শান্ত মেজাজের উপস্থিতি অতীব জরুরী দুটি বিষয়। আর একজন বিচারক যখন আল্লাহর ঘরে বসে বিচার-ফয়সালা করেন, তখন তার মধ্যে বাড়তি আল্লাহভীতি এবং শান্ত মেজাজের বাড়তি উপস্থিতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তেমনিভাবে মসজিদে উপস্থিত আমজনতা যখন এ সকল বিচার-ফয়সালার প্রত্যক্ষদর্শী হয়, তখন সরাসরি তার একটা প্রভাব তাদের জীবনে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদের মতো আমাদের সমাজের মসজিদগুলোতে আজও যদি কোর্ট-কাছারির পাশাপাশি ছোটখাটো কিছু বিচার-ফয়সালার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে সমাজের চলমান অধঃপতন হয়তো আমাদের দেখতে হতো না। কোর্ট-কাছারির বিচার-ফয়সালাতে বাদী-বিবাদী আর বিচারক পক্ষ ছাড়া আর কোনো পক্ষ থাকে না বললেই চলে। আর মসজিদকেন্দ্রিক বিচার-ফয়সালাগুলো উল্লিখিত পক্ষগুলো ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তা দেখতে পায়। ফলে সকলেই এ থেকে শিক্ষা নিতে ও সতর্ক হতে পারে। মসজিদের এমন ভূমিকা সুখী ও আদর্শ সমাজের জন্য একান্ত প্রয়োজন।

৭. মসজিদ হচ্ছে আত্মার চিকিৎসাকেন্দ্র: আল্লাহর যিকির বা স্মরণ আত্মার প্রশান্তির সবচেয়ে সেরা ওষুধ। আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের মন প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো! আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়’ (আর-রা, ১৩/২৮)

আর আল্লাহর ঘর মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর যিকিরের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা। মহান আল্লাহ বলেন,فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَنْ تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ ‘সেসব ঘর যেগুলোকে সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। (কিছু লোক) তাতে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে’ (আন-নূর, ২৪/৩৬)। ‍বর্তমান দুনিয়াতে মানুষের শারীরিক সমস্যাগুলো চিকিৎসার জন্য উন্নত অনেক ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও অনেক আধুনিক ও বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা কেবলই মানুষের শারীরিক চিকিৎসা দিয়ে থাকে; কিন্তু হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা, রাগ, লোভ, লালসা, হতাশা, অকৃতজ্ঞতা ইত্যাদি মানসিক এবং সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বিধ্বংসী ব্যাধিসমূহের সুচিকিৎসা ও স্থায়ী সমাধানের কোনো ব্যবস্থাই এসকল হাসপাতালে নেই। সেক্ষেত্রে আল্লাহর ঘর মসজিদগুলো জন্মলগ্ন থেকেই এ সকল ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসালয়ের ভূমিকা পালন করে আসছে। আল্লাহর ঘর মসজিদের একেকজন ইমাম ও খতীব একেকজন সাইকোলজিস্ট ডাক্তারের ভূমিকা পালন করে থাকে। তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় আরোগ্য প্রত্যাশী সমাজের অসংখ্য মানসিক রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। আল-হামদুলিল্লাহ!

৮. মসজিদ হচ্ছে সাম্যের প্রতীক: মসজিদ হচ্ছে একটি সমাজের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে একই সময়ে একই স্থানে এক কাতারে এবং পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, ‍শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্তসহ সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মিলিত হয় এবং ছালাত আদায় করে। তাদের মধ্যে তখন থাকে না কোনো ভেদাভেদ, পার্থক্য ও হিংসা-বিদ্বেষ। সকল পরিচয় ভুলে গিয়ে এক আল্লাহর সামনে চূড়ান্ত বিনয়ের সাথে তাঁর গোলাম দাঁড়াবে এটাই মহান আল্লাহর নির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেন, حٰفِظُوا عَلَى الصَّلَوٰتِ وَالصَّلٰوةِ الْوُسْطٰى وَقُومُوا لِلَّهِ قٰنِتِينَ তোমরা ছালাতের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী ছালাতের প্রতি এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা দাঁড়াবে বিনীতভাবে’ (আল-বাক্বারা, ২/২৩৮)

এভাবেই ছালাতের জন্য মসজিদে সবার উপস্থিতি সকলকে কোমলতা ও বিনয়ের শিক্ষা দেয়। এছাড়া রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতের কাতারে অত্যন্ত যত্নসহকারে যে কোনো প্রকার সৌন্দর্যহীনতা পরিহার করে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, أَقِيمُوا ‌الصُّفُوفَ، وَحَاذُوا بَيْنَ الْمَنَاكِبِ، وَسُدُّوا الْخَلَلَ، وَلِينُوا بِأَيْدِي إِخْوَانِكُمْ وَلَا تَذَرُوا فُرُجَاتٍ لِلشَّيْطَانِ، وَمَنْ وَصَلَ صَفًّا وَصَلَهُ اللهُ، وَمَنْ قَطَعَ صَفًّا قَطَعَهُ اللهُ ‘তোমরা কাতার সোজা করে দাঁড়াও, কাঁধের সাথে কাঁধ বরাবর করে দাঁড়াও, ফাঁকা জায়গাগুলো বন্ধ করো, তোমাদের ভাইদের সাথে বিনম্র থাকবে, কাতারের মধ্যে শয়তানের জন্য জায়গা ফাঁকা রেখে দাঁড়াবে না। আর জেনে রেখো! যে ব্যক্তি কাতারে মিলেমিশে দাঁড়ায়, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে থাকেন আর যে ব্যক্তি কাতারের মাঝে ফাঁকা রেখে দাঁড়ায়, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকেন’।[4] সাম্যের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি আর হয় না। মসজিদকেন্দ্রিক সাম্যের এ মহান শিক্ষা-ই দিতে পারে একটি আদর্শ পরিবার ও সমাজের জন্ম।

. মসজিদ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, গাম্ভীর্যপূর্ণ ও শান্তশিষ্ট হতে শেখায়: গোলাম তার মালিকের সামনে যাবে আর তার মধ্যে একটা আলাদা অনুভূতি থাকবে না, তা কি হয়? তার হাঁটার মধ্যে একটা গাম্ভীর্য থাকবে না, তাও কি হয়? তাই তো ইক্বামত হলে আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াহুড়ো করে কিংবা দৌড়ে এসে ছালাতে শামিল হতে বারণ করেছেন। বরং বিশেষ ভাবগাম্ভীর্যসহ আত্মসম্মানের সাথে, ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে এবং শান্তভাবে ছালাতে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِذَا ‌سَمِعْتُمُ ‌الْإِقَامَةَ ‌فَامْشُوا ‌إِلَى ‌الصَّلَاةِ، وَعَلَيْكُمْ بِالسَّكِينَةِ وَالْوَقَارِ، وَلَا تُسْرِعُوا ‘যখন তোমরা ইক্বামত শুনতে পাবে, তখন তোমরা স্বাভাবিকভাবে হেঁটে ছালাতে শামিল হবে, তোমাদের আবশ্যক হলো প্রশান্ত, গাম্ভীর্যভাব বজায় রাখা আর তোমরা তাড়াহুড়া করবে না’।[5] এভাবে একজন ছালাত আদায়কারী যখন প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে গাম্ভীর্য অবলম্বন করে মসজিদ পানে ছুটে যায়, তখন নিঃসন্দেহে তা তার মধ্যে একটি ভালো অভ্যাসের জন্ম দেয়, যা তাকে সমাজের সবার কাছে প্রিয় করে তোলে। এভাবেই যখন সমাজের মানুষ একে অপরের প্রিয় হয়ে ওঠে, তখন সে সমাজ একটি আদর্শ সমাজ হতে বাধ্য।

১০. দায়িত্বশীলদের বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচি মসজিদ থেকে সে শিক্ষা পাওয়া যায়: যমীনের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট জায়গার ব্যবস্থাপনাও হতে হবে সবচেয়ে সুন্দর এ কথা-ই ঠিক। সুন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য দায়িত্বশীল মানুষও হওয়া চাই উত্তম মানুষ। মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ ‘তারাই তো আল্লাহর মসজিদের আবাদ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি, ছালাত ক্বায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হবে সৎপথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত’ (আত-তাওবা, ৯/১৮)

তাই যে কাউকে মসজিদের দায়িত্বশীল বা কমিটিতে স্থান করে দেওয়া মহান আল্লাহর নির্দেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উল্লিখিত পাঁচটি গুণ দায়িত্বশীলের মধ্যে থাকা চাই। সমাজের মানুষ মসজিদের দায়িত্বশীল নির্বাচন করতে অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে কাউকে দায়িত্ব দিতে এসকল বিষয়ে চিন্তা করবে এটাই স্বাভাবিক। সত্যিকারার্থে সমাজের প্রতিটি কাজে যদি এ পন্থা অবলম্বন করা যেত, তাহলে প্রতিটি সমাজ সোনার মদীনার ন্যায় সোনার সমাজে রূপান্তরিত হতো এবং সব ধরনের অস্থিরতা কেটে যেত।

১১. ছালাতের নির্ধারিত সময়ে জামাআতে ছালাত আদায়ের অভ্যাস ব্যক্তিকে নিয়মতান্ত্রিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হতে শেখায়: মানুষের জীবন মূলত কিছু সময়ের সমষ্টি। সময়ের মূল্য দিতে পারা মানে জীবনের মূল্য বুঝতে পারা। সময়ের যথাযথ ব্যাবহার-ই একজন মানুষকে সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে থাকে। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতকে আল্লাহ নির্দিষ্ট সময়ের সাথে বেঁধে দিয়েছেন, যা যথাসময়ে মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাতবদ্ধভাবে আদায় করা মুমিন পুরুষের উপর ফরয। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ الصَّلٰوةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتٰبًا مَّوْقُوتًا ‘নির্ধারিত সময়ে ছালাত ক্বায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য’ (আন-নিসা, ৪/১০৩)। একইভাবে আল্লাহ নিয়মিত জামাআতবদ্ধভাবে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যা ব্যক্তিকে সময়ের গুরুত্ব এবং নিয়মতান্ত্রিক হতে শেখায়। মহান আল্লাহ বলেন,وَأَقِيمُوا الصَّلٰوةَ وَءَاتُوا الزَّكٰوةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرّٰكِعِينَ ‘আর তোমরা ছালাত প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত দাও এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ করো’ (আল-বাক্বারা, ২/৪৩)

মসজিদ মানুষকে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে। তাই তো মসজিদে যেনতেন পোশাক পরিধান করে যেতে বারণ করা হয়েছে, যা ব্যক্তিকে পরিচ্ছন্ন জীবনে উৎসাহিত করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন,يٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوٓا إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ‘হে বনী আদম! প্রত্যেক ছালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক পরিধান করো, খাও এবং পান করো; কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (আল-রাফ, ৭/৩১)। এছাড়া রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁচা পেঁয়াজ এবং রসুনের মতো কড়া গন্ধযুক্ত খাবারের সামান্য ঘ্রাণ নিয়েও মসজিদে যেতে বারণ করেছেন, তা কারো অজানা নয়। মুমিন কখনো অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারে না, সে কারণেই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই সতর্কবাণী। এভাবেই মসজিদ আল্লাহর বান্দাদেরকে নিয়মতান্ত্রিক হতে শিক্ষা দিয়ে থাকে।

১২. মসজিদে ব্যক্তির নিয়মিত উপস্থিতি ব্যক্তিকে নিফাক্বী থেকে মুক্তি দেয়: একটি সমাজের অস্থিরতার পেছনে সমাজে বসবাসরত কপট মুনাফেক্বদের ভূমিকা বিরাট। তাদের মিথ্যাবাদিতা, খেয়ানত, গালমন্দ ইত্যাদি বিষয় প্রতিনিয়ত একটি সমাজকে ধীরে ধীরে অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়। তাই সমাজের কপট শ্রেণির মানুষের পরিশুদ্ধি ছাড়া কখনো একটি আদর্শ সমাজ গঠন সম্ভব নয় আর জামাআতবদ্ধ ছালাত মানুষকে কপটতা থেকে মুক্তি দেয়, বিশেষত এশা ও ফজরের ছালাত। আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ صلَّى للهِ أربعينَ يومًا في جماعةٍ يُدْرِكُ التَّكْبيرَةَ الأُولَى كُتِبَتْ لهُ بَرَاءَتَانِ بَرَاءَةٌ مِنَ النارِ، و بَرَاءَةٌ مِنَ النِّفَاقِ ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন যাবৎ তাকবীরে তাহরীমার সাথে জামাআতে ছালাত আদায় করবে, তাকে দুটি বিষয় থেকে মুক্তি দেওয়া হবে— ১. জাহান্নামের আগুন ও ২. নিফাক্বী’।[6]

তিনি আরও বলেন,لَيْسَ صَلاَةٌ أَثْقَلَ عَلَى الْمُنَافِقِينَ مِنَ الْفَجْرِ وَالْعِشَاءِ وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا ‘মুনাফেক্বের জন্য এশা ও ফজরের ছালাতের চেয়ে ভারী আর কোনো ছালাত নেই। তারা যদি জানত যে, এ দুই ছালাতে কী (পরিমাণ ছওয়াব ও কল্যাণ) আছে, তাহলে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও মসজিদে উপস্থিত হতো’।[7]

এজন্যই ছাহাবীগণ যখন কাউকে জামা‘আতে অনুপস্থিত দেখতেন, তখন তারা তাকে মুনাফেক্ব মনে করতেন। এ সকল হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, নিয়মিত জামাআতবদ্ধ ছালাত ব্যক্তি ও সমাজকে নিফাক্ব থেকে পবিত্র করে। এককথায় মসজিদ মানুষকে কপটতা পরিহারের শিক্ষা দেয়। এভাবেই মসজিদের ছোঁয়ায় একটি সমাজ কপটতা থেকে মুক্ত হয়ে আদর্শ সমাজে পরিণত হতে পারে। কোনো কোনো সালাফ বলেছেন, তোমরা কি জান সকালবেলার বাতাস কেন এত মনোমুগ্ধকর? এর কারণ হলো সকালের বায়ু মুনাফেক্বদের নিঃশ্বাস থেকে মুক্ত থাকে।

সমাপনী:

পরিশেষে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায় যে, আজকের এ অসুস্থ সমাজের মানবিক ও আদর্শিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজের মানুষকে সোনালী অতীতের দিকে ফিরিয়ে নিতে প্রথমত মসজিদগুলোকে মূলধারার আবাদী মসজিদে রূপান্তরিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মসজিদের সাথে সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের অধিকতর উপস্থিতি ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে আমরা গড়তে পারব একটি আদর্শ সমাজ, যেখানে থাকবে না মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি, খুনাখুনি, বৈষম্য আর মানবাধিকার লঙ্ঘন। পরিশেষে মহান মালিকের দরবারে ফরিয়াদ করি, তিনি যেন আমাদেরকে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার বিনিময়ে একটি সোনালি সমাজ উপহার দেন- আমীন!

সাইফুল্লাহ আল-মামুন মাদানী

সাবেক দাঈ, ইসলামিক সেন্টার, আবহা, সঊদী আরব; পরিচালক, আস-সুন্নাহ একাডেমী, তাফালবাড়ী, শরণখোলা, বাগেরহাট।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৯৬; নাসাঈ, হা/৭১০।

[2]. মুসনাদে আহমাদ, ২/১৮০, হা/৬৬৮৯; হাকেম, ১/১৯৭; বায়হাক্বী, ৩/৮৪।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৮৯।

[4]. ছহীহ আত-তারগীব, হা/৪৯৫।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৬।

[6]. সিলসিলা ছহীহা, হা/২৬৫২।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫৭।


Magazine