কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

আমল কবুলের পূর্বশর্ত ইখলাছ

post title will place here

[২৩ জুমাদাল উলা, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ১৪ নভেম্বর, ২০২৫ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খআব্দুল্লাহ আল-বুআইজান হাফিযাহুল্লাহউক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর আরবী বিভাগের সম্মানিত পিএইচডি গবেষক আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথমখুৎবা

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই এবং তাঁর নিকটই ক্ষমা প্রার্থনা করি। আর আমরা নিজেদের মন্দ ও খারাপ কাজের ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করছি। আল্লাহ যাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হেদায়াত করার কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও বিশ্বস্ত রাসূল। তিনি রিসালাত পৌঁছে দিয়েছেন, আমানত পূর্ণ করেছেন, উম্মতের প্রতি উপদেশ দিয়েছেন এবং মৃত্যু অবধি আল্লাহর পথে সত্যিকারের জিহাদে রত ছিলেন। আল্লাহ তাঁর উপর দরূদ অবতীর্ণ করুন এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও ছাহাবীদের উপর শান্তি ও বরকত নাযিল করুন। আর যারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাঁর পথ অনুসরণ করে চলবে এবং তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে থাকবে তাদের উপরও শান্তি অবতীর্ণ হোক।

অতঃপর, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনুগত্যের জন্য, যা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের কারণ এবং তিনি মানুষকে অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেছেন, যা আল্লাহর ক্রোধের কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, কেউ অণু পরিমাণও সৎ কাজ করলে, সে তা দেখবে আর কেউ অণু পরিমাণও অসৎ কাজ করলে, তাও সে দেখবে’ (আয-যিলযাল, ৯৯/৭-৮)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না’ (আলে ইমরান, ৩/১০২)। তিনি আরও বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে শুদ্ধ করে দেবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই এক মহাসাফল্য অর্জন করল’ (আল-আহযাব, ৩৩/৭০-৭১)

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নিশ্চয় মহান আল্লাহ আমল কবুলের জন্য এমন শর্ত করেছেন, যা ব্যতীত আমল কবুল হয় না, আমলের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয় না এবং আমলের প্রতিদানও পাওয়া যায় না। এটি অন্তরের কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি শর্ত এবং এ সম্পর্কে কেবল গায়েবের জ্ঞানের অধিকারী আল্লাহই অবগত রয়েছেন।

নিশ্চয় মহান আল্লাহ আমলে ছালেহ বা সৎ আমলের জন্য এমন একটি শর্ত করেছেন, যে শর্ত পূরণ না হলে সেসব আমল কবুল হয় না, তাদের উদ্দেশ্যও পূর্ণ হয় না এবং তার বিনিময়ে কোনো প্রতিদানও পাওয়া যায় না। এটি এমন একটি শর্ত, যা অন্তরের শ্রেষ্ঠ আমলগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং এর প্রকৃত অবস্থা কেবল সকল গোপন বিষয় সম্পর্কে অবগত মহান আল্লাহই জানেন। ইখলাছ হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে মহৎ ও উত্তম উপায় এবং পবিত্র ইবাদতসমূহের একটি।

আপনারা কি জানেন, ইখলাছ কী? ইখলাছ-ই হলো মুক্তি ও পরিত্রাণ লাভের মূল রহস্য, সফলতা ও সাহায্যপ্রাপ্তির পথ, প্রতিটি সৎকর্মের ভিত্তি, প্রত্যেক ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত এবং এটিই একনিষ্ঠ বান্দার চূড়ান্ত লক্ষ্য। কেননা ইখলাছ-বিহীন আমল করার অর্থই হলো সময় ও শক্তির অপচয়, যার কোনো প্রতিদান নেই। ইখলাছ ছাড়া ছালাত ও ছিয়ামের কোনো ছওয়াব নেই। এমনকি ইখলাছ-বিহীন ছাদাক্বারও কোনো মূল্য নেই।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! ইখলাছ হলো লোকদেখানো মনোভাবের মিশ্রণ থেকে অন্তরের পবিত্রতা অর্জন, নফসের খেয়ালখুশি থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা, অন্তরের গোপন অবস্থাকে নিজ স্বার্থলাভের চিন্তা থেকে মুক্ত রাখা, আল্লাহর জন্যই আমলকে একনিষ্ঠ করা এবং মানুষের সন্তুষ্টির দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কিংবা তাদের কাছ থেকে দুনিয়াবী কিছু লাভ করা বা অস্থায়ী কোনো উপকার পাওয়ার আশা না করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই অন্তরকে খালেছ করা। সর্বোপরি একজন বান্দার ইচ্ছাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিবদ্ধ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে নিজের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানোই হচ্ছে ইখলাছ।

ইখলাছ হলো একমাত্র আল্লাহর জন্যই উদ্দেশ্যকে খালেছ করা, যার মাধ্যমে এক ও অদ্বিতীয় মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রতিটি আমল এমনভাবে করা যাতে তাঁর সন্তুষ্টি ও ছওয়াবের আশা করা যায় এবং তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তিকে ভয় করা হয়। এতে লোকদেখানো মনোভাব, মানুষের কাছে সুনাম কুড়ানোর ইচ্ছা বা মানুষের কাছ থেকে দুনিয়াবী কোনো ফায়েদা লাভের ইচ্ছা থাকে না।

আর প্রকৃত মুখলেছ সেই ব্যক্তি, যে তার ভালো কাজগুলোকে সেইভাবে গোপন রাখে যেভাবে তার গুনাহগুলোকে গোপন রাখে। যে একান্ত নির্জনতায় যেভাবে আমল করে, প্রকাশ্যেও সেভাবেই আমল করে। তার কাছে প্রশংসাকারী ও নিন্দাকারী উভয়ই সমান, কারও প্রশংসা বা নিন্দায় তার আমলে কোনো পরিবর্তন আসে না। দিনের আলোতে তার ইবাদত যেমন হয়, অন্ধকার রাতেও তার ইবাদত তেমনই হয়। তার কাছে গোপন আমল ও প্রকাশ্য আমল উভয়ই সমান, কারণ সে কেবল মহান আল্লাহর জন্যই ইবাদত করে এবং সে তার আমল দ্বারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিই কামনা করে।

হে মানুষ! ইখলাছ হলো বিশ্বাস ও আমলে সত্যবাদী হওয়া এবং অন্তরকে শিরক, লোকদেখানো মনোভাব, কপটতা ও কলুষতা থেকে সম্পূর্ণভাবে পরিশুদ্ধ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, আমার ছালাত, আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার জীবন, আমার মরণ (সবকিছুই) বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই (নিবেদিত)। তাঁর কোনো শরীক নেই, আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আর আমিই সর্বপ্রথম আত্মসমর্পণকারী’ (আল-আনআম, ৬/১৬২-১৬৩)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘অতএব, আল্লাহর ইবাদত করো তাঁরই আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। জেনে রেখো! খালেছ দ্বীন কেবল আল্লাহরই জন্য’ (আয-যুমার, ৩৯/২-৩)

মহান আল্লাহর নিকটে কোনো কাজের মূল্য নির্ধারিত হয় সে কাজের ইখলাছ অনুযায়ী। সুতরাং যে ব্যক্তি তার আমল মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে বা শোনানোর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করে, যাতে লোকেরা তাকে সম্মান করে, তাকে বড় মনে করে অথবা তার ব্যাপারে ভালো ধারণা করে; মহান আল্লাহ ক্বিয়ামত দিবসে তার সেই কাজ মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেবেন এবং তাকে সবার সামনে লজ্জিত করবেন।

ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জনসম্মুখে প্রচারের ইচ্ছায় নেক আমল করে আল্লাহ তাআলাও তার কৃতকর্মের অভিপ্রায়ের কথা লোকদেরকে জানিয়ে ও শুনিয়ে দিবেন। আর যে ব্যক্তি লৌকিকতার উদ্দেশ্যে কোনো নেক কাজ করে, আল্লাহ তাআলাও তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকদের মাঝে ফাঁস করে দিবেন’।[1]

হে আল্লাহর বান্দাগণ! ইখলাছ হলো আমল কবুলের অন্যতম একটি শর্ত। আমল কবুল হওয়ার মাধ্যমে ছওয়াব ও প্রতিদান প্রাপ্তির জন্য তাতে ইখলাছ থাকা জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে’ (আল-বাইয়িনাহ, ৯৮/৫)। যখন কোনো আমল থেকে ইখলাছ দূর হয়ে যায়, তখন তার ছওয়াব বিনষ্ট হয় এবং সেই আমল বাতিল হয়ে যায়। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মহান আল্লাহ বলেন, আমি শরীকদের শিরক হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি কোনো লোক কোনো কাজ করে এবং এতে আমি ছাড়া অন্য কাউকে শরীক করে, তবে আমি তাকে ও তার শিরকী কাজকে প্রত্যাখ্যান করি’।[2] আল্লাহ কেবল সেই আমলই গ্রহণ করেন, যা তাঁর জন্য খালেছ নিয়্যতে করা হয় এবং যা তাঁর শরীআত ও তাঁর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুসারে করা হয়।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! ইখলাছ হলো শয়তানের কৌশল ও ধোঁকা থেকে বাঁচার মযবূত দুর্গ এবং মন্দ পরিণতি ও অপমান থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢালস্বরূপ এবং নাজাত ও নিরাপত্তা লাভের অন্যতম মাধ্যম। আর শয়তান আল্লাহর মহিমার কসম করে বলেছিল, যে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সে বলল, আপনার ইযযতের কসম! আমি তাদের সকলকেই বিপথগামী করে ছাড়ব। তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের বাদে’ (ছোয়াদ, ৩৮/৮২-৮৩)। অতঃপর মহান আল্লাহ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর শানে ইরশাদ করেন, ‘আমি তা দেখিয়েছিলাম তাকে অসৎ কর্ম ও নির্লজ্জতা থেকে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে, সে ছিল বিশুদ্ধ হৃদয়ের বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত’ (ইউসুফ, ১২/২৪)

হে আল্লাহর বান্দাগণ! ইখলাছ হলো ঈমানের ভিত্তি, একটি মৌলিক স্তম্ভ এবং এটি ইবাদত, দায়িত্বপালন ও সব ধরনের আমলের ক্ষেত্রে অপরিহার্য একটি শর্ত। ইখলাছের মাধ্যমে কাজে উদ্যম জন্মায়, আলস্য ও দুর্বলতা দূর হয়, কাজের মান উন্নত হয়, আল্লাহ পরিশ্রমে বরকত দান করেন, ভালো ফলাফল অর্জিত হয়, কাজের স্থায়ী সুফল পাওয়া যায় এবং আমল সফলতা ও কল্যাণ দ্বারা সুশোভিত হয়।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! ইখলাছের মাধ্যমে সাধারণত ছওয়াব পাওয়া যায় না এমন সাধারণ অভ্যাস ও বৈধ কাজগুলো ইবাদতে পরিণত হয়, যা মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে, ছওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং যার মাধ্যমে গুনাহ মুছে যায়। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও’।[3] অতএব, হে আল্লাহর বান্দাগণ! বিশুদ্ধ নিয়্যত ব্যতীত আমল কেবল পণ্ডশ্রম, তার কোনো মূল্য নেই। ইখলাছ-বিহীন নিয়্যতের মধ্যে লোকদেখানো মনোভাব থাকে আর সুন্নাহর অনুসরণ ব্যতীত ইখলাছও শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে যায়।

جعلنا الله وإيَّاكم من عباده المخلصين، الذين يستمعون القول فيتبعون أحسنه، أولئك الذين هداهم الله وأولئك هم أولو الألباب.

দ্বিতীয়খুৎবা

আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করার কারণে যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য জ্ঞাপন করছি। তওফীক্ব ও দয়ার কারণে তাঁরই শুকরিয়া আদায় করছি। আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক। আর তাঁর পরিবারবর্গ, ছাহাবীগণ, অনুসারীগণ এবং সাহায্যকারীদের প্রতিও শান্তির ধারা অবতীর্ণ হোক।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাদের চেহারা-আকৃতি ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি আপনাদের অন্তর ও কর্মের দিকে তাকান। আর নফসের সংশোধন সত্যবাদিতা ও ইখলাছ ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব নয়। আর আমলের সংশোধন শরীআতের অনুসরণ ব্যতীত হয় না। নফস হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মূল ও তাদের নেতা। অন্তর ঠিক থাকলে সব অঙ্গ ঠিক থাকে আর অন্তর নষ্ট হলে সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গও নষ্ট হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘জেনে রেখো! দেহের মধ্যে এক টুকরা গোশত আছে। যখন তা সুস্থ থাকে, তখন সমস্ত দেহই সুস্থ থাকে আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায়, তখন সমস্ত দেহই নষ্ট হয়ে যায়। স্মরণ রেখো! তা হলো ক্বলব বা অন্তর’।[4]

নফসের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাকর আমল হলো ইখলাছ। এটি বান্দা ও তার প্রতিপালকের মধ্যকার এক গোপন রহস্য। এটি ইবাদতের মূল ও প্রাণস্বরূপ এবং আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড, যে সম্পর্কে কেবল তিনিই অবগত রয়েছেন।

অতএব, সকল ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইখলাছের বাস্তবায়ন আবশ্যক। কিন্তু এটি মানুষের পক্ষে অর্জন করা দুরূহ ব্যাপার, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল ও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এটি অর্জন করা নফসের জন্য ভারী ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ইখলাছ কেবল সেই অন্তরেই স্থির থাকে, যে অন্তর গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করে চলে এবং যে অন্তর সর্বদা সংগ্রামে রত থাকে। ইখলাছ অর্জনের জন্য অন্তরকে পরিশ্রম, আত্ম-সমালোচনা এবং স্বার্থ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা জরুরী।

হে মানুষসকল! ইখলাছ হলো আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে এক সর্ববৃহৎ গোপন রহস্য। মহান আল্লাহ একে বান্দাদের মধ্যে তাঁর চয়নকৃত বান্দাদের পরিচয়ের নিদর্শন হিসেবে স্থাপন করেছেন। তিনি যাকে ভালোবাসেন, তার অন্তরে এই ইখলাছ দান করেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তর, পথ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আলোকিত করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য খালেছ হয়, আল্লাহও তাকে নিজের জন্য চয়ন করেন, তাকে তাঁর দয়া দিয়ে বিশেষ মর্যাদা দান করেন, তার উপর অনুগ্রহ করেন এবং সর্বোপরি তার অন্তরে নূর, প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি স্থাপন করেন। মহান আল্লাহ খালেছ বান্দাদের বিষয়ে শয়তানের অক্ষম হওয়া সম্পর্কে ইরশাদ করেন, ‘সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! যেহেতু আপনি আমাকে ভ্রান্তপথে ঠেলে দিলেন, কাজেই আমিও পৃথিবীতে মানুষের কাছে পাপকাজকে অবশ্য অবশ্যই সুশোভিত করে দেখাব আর তাদের সবাইকে অবশ্য অবশ্যই বিভ্রান্ত করব। কিন্তু তাদের মধ্যে আপনার বাছাই করা বান্দাদের ছাড়া’ (আল-হিজর, ১৫/৩৯-৪০)। অর্থাৎ যে বান্দাকে আপনি ইখলাছ ও তাওহীদ দ্বারা সুরক্ষিত করেছেন, আমি তার ওপর কোনোভাবেই প্রভাব বিস্তার করতে বা তাকে বিপথে নিতে সক্ষম নই।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নিশ্চয়ই আমলের মূল্য নির্ভর করে নিয়্যতের ওপর এবং মানুষ তার নিয়্যত অনুসারেই প্রতিদান লাভ করে। আর মহান আল্লাহ কেবল মুত্তাক্বীদের আমলই কবুল করেন। অতএব, আপনারা আল্লাহকে ভয় করে চলুন, হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার পূর্বেই নিজেদের নফসের হিসাব নিন। আপনাদের অন্তর ও নিয়্যতকে পরিশুদ্ধ করুন এবং আপনাদের আমলকে খালেছ করুন। বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে কামনার পেছনে ছেড়ে দেয় এবং আল্লাহর নিকটে ভিত্তিহীন আশা পোষণ করে থাকে। সৌভাগ্য তার জন্য, যে তার অন্তরকে আল্লাহর জন্য খালেছ করেছে এবং তার আমলকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একান্ত নিবেদিত করেছে, যা তাকে জান্নাতের সফলতা ও কল্যাণ এনে দেবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর খালেছ বান্দা হিসেবে কবুল করুন- আমীন!


 [1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৮৬।

 [2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৮৫।

 [3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৮।

 [4]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৯।

Magazine