ছিয়াম ইসলামের ফরয একটি বিধান। ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ছিয়াম ভঙ্গ করলে কাফফারা হিসেবে একটানা ৬০টি ছিয়াম রাখতে হয়। এখান থেকে বোঝা যায়, ছিয়াম রাখার কত গুরুত্ব এবং ভেঙে দেওয়ার কত বড় দুনিয়াবি শাস্তি। এজন্য ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে ছিয়াম রাখার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর এ বিধানের সাথে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এখন ছোট মানুষ, আস্তে আস্তে আরও বড় হয়ে ছিয়াম রাখবে এই ভাবনা মাথায় এনে উদাসীন থাকলে চলবে না।
ছোট ছোট বাচ্চারা ছিয়াম রাখতে চাইলে তাদের নিষেধ করা উচিত নয়। কারণ ছাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম তাঁদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ছিয়াম রাখাতেন, মসজিদে নিয়ে যেতেন এবং তাদের জন্য তুলা, পশম ইত্যাদির খেলনা বানিয়ে দিতেন। ছিয়াম অবস্থায় (দিনের বেলা) ক্ষুধায় কান্না করলে, তাঁরা শিশুদের খেলনা দিতেন। ওরা খেলনা পেয়ে খেলত আর খাবারের কথা ভুলে যেত। আর এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত।[1]
বালেগ হওয়ার পর থেকে একজন মানুষের উপর ছিয়াম ফরয হয়ে যায়, যা সাধারণত ১০-১১ বছর বয়সের মধ্যে হয়ে যায়। এখন ৬-৭ বছর বয়স থেকে প্র্যাকটিস করা শুরু না করলে হঠাৎ করে ১০ বছর বয়সে ৩০টি ছিয়াম রাখা তাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য আগে থেকে বাচ্চাদের ছিয়াম রাখার প্র্যাকটিস করতে দিতে হবে। তা না হলে তাদের প্রতি একধরনের যুলুম করা হবে। কীভাবে? কেননা আগে থেকে ছিয়াম রাখার অভ্যাস না করলে তারা যখন হঠাৎ করে ফরয হওয়ার পর একসাথে ছিয়াম রাখতে পারবে না কিংবা রাখতে অনেক কষ্ট হবে, তখন বোঝা যাবে- আগে থেকে ছিয়াম রাখার প্র্যাকটিস করতে না দেওয়াটা তাদের প্রতি এক প্রকার যুলুমই ছিল, যা এতদিন অভিভাবকদের মায়ার চাদরে ঢাকা ছিল।
ছোট ছোট বাচ্চাদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক সময় ছিয়াম রাখতে দেই না। জীবনের প্রথম ছিয়াম রাখার জন্য খুব এক্সাইটেড থাকে। ছিয়াম রাখার জন্য সাহরী মিস করলে মা-র সাথে সে কী অভিমান যে, তাকে কেন উঠানো হলো না, কেন ছিয়াম রাখার সুযোগ দেওয়া হলো না। আর তারাও ছিয়াম রাখতে না পেরে মন খারাপ করে বসে। এজন্য ছিয়াম রাখার প্রতি তাদের যে আগ্রহ, সেটাতে পানি ঢেলে দেওয়া উচিত নয়।
তবে এটা ঠিক যে, ছোট মানুষ হওয়ায় ছিয়াম রাখলে খাবার খেতে না পারায় প্রথম প্রথম তাদের ক্ষুধার কষ্ট হতে পারে। এতে সন্তানের প্রতি অনেক মায়া হবে, যা খুব স্বাভাবিক। তবে এই মায়ায় আল্লাহর ফরয বিধানে তাকে অভ্যস্ত করানোর যে দায়িত্ব আপনার আছে, সেটার প্রতি যেন আপনাকে উদাসীন করে না তুলে—সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রথম প্রথম তাদেরকে অর্ধ দিন না খেয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। সারাদিন না খেলে শরীর খারাপ করার নাম করে ছিয়াম রাখতে না দেওয়ার মাধ্যমে বেশি আহ্লাদ দেখানো ভালো না। এমন আহ্লাদের ফল মোটেও ভালো কিছু বয়ে আনবে না। মনে রাখবেন, ছোটকাল থেকে অভ্যস্ত না করালে পরে তাদের ছিয়াম রাখানো সহজ হবে না। তখন ছিয়াম ছেড়ে দেওয়াকে তারা গুরুতর মনে করবে না।
ছোট বাচ্চাদের প্রথম ছিয়াম রাখা নিয়ে একটা আইডিয়া শেয়ার করি। আমাদের পরিবারের যে ছোটমণি তার জীবনের প্রথম ছিয়াম রেখেছে, তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আমরা তাকে কোনো উপহার দিতে পারি, যা তার জন্য অনেক স্পেশাল হবে। আর সেটা হতে পারে ক্রেস্ট। একজন মুমিন কাউকে উপহার দিতে গেলেও তার সেই উপহারকে ঘিরে দ্বীনি চিন্তা থাকবে, দ্বীনি স্বার্থ থাকবে। সেই জায়গা থেকে উপহার দেওয়ার এই সুযোগে আমরা ক্রেস্টে তার জীবনে প্রথম ছিয়াম রাখার তারিখ ও সময়কাল উল্লেখসহ সংক্ষেপে দ্বীনি নছীহত-সম্বলিত এমন কিছু কথা লিখে দিতে পারি, যা তাকে দ্বীনের পথে চলার নির্দেশ দিবে, যা তাকে দ্বীনের পথে চলার কথা মনে করিয়ে দিবে।
উপহার পেয়ে সে অনেক খুশি হবে, উৎসাহ পাবে। এছাড়া, তার জীবনের প্রথম ছিয়াম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কয়েক বছর পর সে যখন এই উপহার হাতে নিয়ে দেখবে, তখন তার স্মৃতির মানসপটে অনেক কিছু ভেসে উঠবে। দ্বীনের ঐ নছীহত তার জন্য রিমাইন্ডার হিসেবে কাজে দিবে। হতে পারে ঐ নছীহত তাকে দ্বীনের পথে চলার গুরুত্ব নিয়ে ভাবাবে, দ্বীন থেকে পথচ্যুত হয়ে থাকলে দ্বীনের পথে ফিরাবে ইনশা-আল্লাহ।
রাকিব আলী
আম্বরখানা, সিলেট।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৬০।
