অনেকের মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাকাত আদায় করলে সম্পদ বাড়ে জেনে আমি তো ঠিকমতো যাকাত আদায় করে থাকি কিন্তু আমার তো সম্পদ বাড়ে না।
দেখুন, যাকাত দিলে সম্পদ বৃদ্ধির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নিজে বলেছেন,
وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ
‘মানুষের ধনসম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এ আশায় সূদে যা কিছু তোমরা দিয়ে থাক, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা বৃদ্ধি পায় না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তোমরা যা দান কর, তার পরিবর্তে তোমরা বহুগুণ প্রাপ্ত হবে’ (আর-রূম, ৩০/৩৯)।
আল্লাহ যেহেতু বলেছেন যাকাত দিলে সম্পদ বৃদ্ধি পায়, তাই অবশ্যই বাড়ে। এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা যে অর্থে বৃদ্ধি পাওয়া বুঝি সে অর্থের বাইরেও আরেকটি বৃদ্ধি আছে। আর সেটি হচ্ছে বরকতের বৃদ্ধি। প্রসঙ্গত, বরকত মানে কল্যাণ। উপকারিতা পাওয়া যায় এমন কিছুকে বরকত বলে।
যারা মানুষ দেখানোর জন্য নয়, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যাকাত মনগড়া আদায় না করে আল্লাহর বলা অনুসারে আদায় করে তাদের সম্পদে আল্লাহ বারাকাহ ঢেলে দেন। তাদের অল্প থাকলেও তারা মনে অন্যরকম এক শান্তি অনুভব করে। পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যাকাত দেয় না কিংবা সঠিক পন্থায় যাকাত দেয় না, যাদের যাকাত দেওয়ার পেছনে মানুষ দেখানোর বিষয় কাজ করে তাদের সম্পদে বরকত তথা কল্যাণ থাকে না। সেজন্য তাদের অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তাদের নিকট সবসময় কম কম মনে হয়। শান্তির সকল উপকরণ হাতের নাগালে থাকা সত্ত্বেও তাদের মনে শান্তি থাকে না, ভেতরে সবসময় অস্থিরতা কাজ করে।
ধরুন, আপনার ব্যাংকে বছরের উপর ১ লক্ষ টাকা পড়ে আছে। এখন আপনার উপর যাকাত ফরয হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আপনি আপনার মাল কমে যাওয়ার ভয়ে আল্লাহর ফরয বিধান লঙ্ঘন করে যাকাত আদায় করলেন না। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী আপনার উপর থাকা অন্যের হক্ব তথা যাকাত আদায় না করে আপনি যে কাবীরা গোনাহ করেছেন দুনিয়ার জীবনে তার নগদ শাস্তি হিসেবে আপনার কী হতে পারে, জানেন?
দেখবেন, আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ হয়তো হঠাৎ কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার বিল বাবদ আপনার ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। কী, কমে যাওয়ার ভয়ে যে টাকা দিয়ে আপনি যাকাত আদায় করেননি, সে টাকা কি আপনি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পেরেছেন? পারেননি। কোনো না কোনোভাবে তা খরচ হয়েছেই। অথচ আল্লাহর হুকুম পালন করলে আল্লাহই আপনার ঐ টাকার মধ্যে বরকত বাড়িয়ে দিতেন। তখন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বিশাল অংকের যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ থেকে আল্লাহই আপনাকে বাঁচিয়ে দিতেন। কিন্তু আপনি আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে পারেননি, কেবল ভরসা রেখেছিলেন আপনার জমাকৃত টাকার উপর যা শেষ পর্যন্ত আপনার দ্বারা ধরে রাখাই সম্ভব হয়নি।
পক্ষান্তরে, আপনি যদি আল্লাহর নির্দেশ মতো আপনার উপর থাকা মানুষের হক্ব তথা যাকাত সঠিকভাবে আদায় করেন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে হঠাৎ কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেবেন কিংবা অন্য কোনো খাতে খরচ হওয়া থেকে রক্ষা করবেন। জীবনে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে আল্লাহ তাআলা আপনার যে টাকা খরচ করা থেকে বাঁচিয়ে দিলেন সে টাকা বাড়ল না কমল, এবার একটু চিন্তা করুন তো?
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরুন ঐ ১ লক্ষ টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হলে আপনার মোট টাকা কমে যদি অর্ধ লক্ষ টাকায় পরিণত হয়ে যায়, তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে আপনার রব আপনার ১ লক্ষ টাকা অক্ষত রাখায় কি টাকা কমল নাকি বাড়ল? নিশ্চয়ই এখানে ‘বৃদ্ধি’ হওয়ার স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে। আর এটাকেই বলে বরকত। যাকাত দিলে মূলত আল্লাহ সম্পদে বরকত বাড়িয়ে দেন, যা হয়তো আপনি আপাতদৃষ্টিতে বুঝতেই পারছেন না।
মনে রাখবেন, যাকাত দিলে আপনার অনেক টাকা কমে যাচ্ছে ব্যাপারটি মোটেও তেমন নয়। আড়াই পার্সেন্ট করে হলে লাখে মাত্র আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়, আই রিপিট মাত্র আড়াই হাজার। আর লাখের বিপরীতে এ অর্থ আহামরি কিছুই নয়। আল্লাহর আপনাকে এতো কিছু দেওয়ার বিপরীতে এ টাকা একেবারেই সামান্য। এ সামান্য টাকার যাকাত দিতে গড়িমসি করা রবের প্রতি বান্দার চরম অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
আপনার কাছে মনে হতে পারে যে, যাকাত দেওয়ায় আপনার সম্পদ হয়তো কিছুটা কমেছে। আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হলেও আসলে ঐ খরচ হয়ে যাওয়া সম্পদ মূলত আপনার হাত থেকে চলে গেছে আপনার জন্য আরও সম্পদ নিয়ে আসার জন্য তা আপনি একটু চিন্তা করলে বুঝতে সক্ষম হবেন। সেজন্য যাকাত দিতে আমাদের কোনোভাবেই কৃপণতা করলে চলবে না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরয বিধান। তাই এমন বিধান পালনে গড়িমসি করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের উপর যাকাত ফরয হচ্ছে কিনা আর ফরয হয়ে থাকলে সঠিক পন্থায় তা আদায় করা হচ্ছে কিনা সেসব বিষয়ে খেয়াল রাখা অতি আবশ্যক।
-রাকিব আলী
* আম্বরখানা, সিলেট।
