কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অতঃপর…

post title will place here

[১]

জীবনে চলার পথে আমরা একে অপরের বিপদ-আপদে সাহায্য করে থাকি। সাহায্য করার বিষয় থেকেই মূলত কৃতজ্ঞতার বিষয়টি আসে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানুষের অনেক বড় একটি গুণ। এই গুণ মানুষের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অথচ মানুষের কাছ থেকে এই সুন্দর গুণটি কি-না দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যে অনেক বড় একটি বিষয়, তা যেন আমাদের অনেকের উপলব্ধিতেই আসে না। মূলত, কারো কাছ থেকে উপকৃত হলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়। মানুষ কারো উপকার করলে সে চায় উপকৃত ব্যক্তিটি যেন তার প্রতি অন্তত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আর সেটা হাসিমুখে সামান্য ধন্যবাদ বলার মাধ্যমেও হয়ে থাকে, এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুরুত্ব একটি হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না’।[1]

আপনি তখনই বুঝবেন যে, আপনি আপনার রবের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পেরেছেন, যখন দেখবেন আপনি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে পারছেন। অন্যথা মানুষের প্রতি অকৃতজ্ঞতা আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়ার নামান্তর। আর যে আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, সেই আল্লাহর প্রতি আপনি অকৃতজ্ঞ- কথাটি কি আবারও ভেবে দেখবেন?

কোনো মানুষ উপকার করার পর তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করলে সে মানুষটি পরবর্তীতে আরও উপকার করতে উৎসাহ পায়। তখন সে মানুষের উপকারে নিজেকে আরও বেশি আত্মনিয়োগ করার চেষ্টা করে এবং তার মধ্যে আনন্দ কাজ করে।

কৃতজ্ঞতা আদায় না করলে কেমন জানি বিষয়টি এরকম দাঁড়ায়- যে মানুষটি আপনার উপকার করল, সে মানুষটির প্রতি আপনি সন্তুষ্ট নন, সে মানুষের কৃত উপকারকে আপনি তুচ্ছ মনে করছেন কিংবা আপনি তার কৃত উপকারকে উপকারই মনে করছেন না। এগুলো সবই চরম অকৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীর বৈশিষ্ট্য। এজন্য কোনো মানুষ আমাদের কোনো উপকার করলে এমনকি ছোট্ট কোনো উপকার করলেও তার প্রতি গোমড়া মুখ না রেখে হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। কখনোই ভাবখানা এমন করে রাখা উচিত নয়, যেন সে কোনো উপকারই করেনি। এমন আচরণ খুবই কষ্টদায়ক। আমাদের দ্বারা নীরবে যেন এমন কোনো অকৃতজ্ঞ আচরণ করা না হয়, যে আচরণ অন্যকে কষ্ট দেয়, যে আচরণ অন্যের হৃদয়ে প্রবলভাবে দাগ কেটে যায়।

একটি কথা মনে রাখবেন, আপনি কারো উপকার করার পর উপকৃত ব্যক্তিটি যেমন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে আপনার নিজের খারাপ লাগে, ঠিক তেমনি অন্যের বেলায়ও একই বিষয় চিন্তা করবেন। যে আচরণ আপনার নিজের বেলায় খারাপ লাগার ও কষ্টের কারণ হয়, সেই একই আচরণ অন্যের বেলায়ও করবেন না, কখনোই নয়!

[২)

‘তাকে আমি খাওয়ালাম বা ট্রিট দিলাম, তার বিপদ-আপদে তাকে আমি থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে তার পাশে দাঁড়ালাম, তাকে আমি বিভিন্ন সময় টাকা-পয়সা বা এটা-সেটা দিয়ে সাহায্য করলাম, তার আমি এত উপকার করলাম আর সে কি-না আমাকে সামান্য ধন্যবাদটুকু পর্যন্ত দিল না’- এমন বাক্য হরহামেশাই আমাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়ে থাকে। আর এগুলো নিঃসন্দেহে হীন মানসিকতার পরিচয় বহন করে। কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা কারো সামান্য উপকার করলেই অন্যদেরকে গদগদ করে বলে বেড়ায়। এটাতেই তাদের যত আনন্দ। আর হবেই-বা না কেন, তারা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেনি, মানুষকে বলে বেড়ানোর জন্য করেছে। এদের আচরণ পুকুরের শৈবালের মতো। কথায় বলে, ‘শৈবাল দীঘিরে বলে উচ্চ করি শির, লিখে রেখো, এক ফোঁটা দিলেম শিশির’।

কারো প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া যেমন মোটেও কাম্য নয়, তেমনি কেউ অকৃতজ্ঞ আচরণ করে ফেললে তার সাথে রাগ করা, তাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা কিংবা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাও কাম্য নয়। কেননা আল্লাহর নেককার বান্দাগণ কখনো মানুষের কৃতজ্ঞতা পাওয়ার আশায় কারো উপকার করে না। তাদের প্রতি কারো অকৃতজ্ঞ আচরণে তাদের কিছু আসে যায় না। তাদের চিন্তা মানুষ পর্যন্ত নয়, বরং তাদের চিন্তা স্বয়ং তাদের মহান রব পর্যন্ত। রব কীসে খুশি হবেন বা না হবেন, সেটাই সবসময় তাদেরকে ভাবিয়ে তুলে। তারা মানুষের কাছ থেকে প্রতিদান নিতে চায় না, নিতে চায় কেবল জান্নাতের মালিকের কাছ থেকে।

এটা অস্বীকার করা যায় না যে, কারো উপকার করলে সে যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে কিংবা অকৃতজ্ঞ আচরণ করে, তবে খুবই খারাপ লাগে। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দা কখনো মানুষের উপকার করে মানুষের কৃতজ্ঞতা পাওয়ার আশায় বসে থেকে নিজেকে কষ্টের আগুনে পোড়ায় না। কারণ সে মানুষের উপকার করে কেবলই তার রবের সন্তুষ্টির আশায়। রবকে খুশি করাই তার একমাত্র লক্ষ্য। সে বরং সবসময় এই ভয়ে থাকে যে, তার করা উপকার আদৌ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে কেন্দ্র করে করা হলো কি-না তথা আমলে ‘রিয়া’ থেকে গেল কি-না, এটাই বরং তাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলে। ফলশ্রুতিতে মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়ে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল কি-না এসব কখনো তার চিন্তায় ঠাঁই পায় না।

মনে রাখবেন, রবকে খুশি করার জন্য কারো উপকার করলে কোনো কিছু হারানোর থাকে না; কিন্তু মানুষকে খুশি করার উদ্দেশ্যে উপকার করলে হারানোর অনেক কিছু থাকে। ঠিক এই বিষয়টি যত দ্রুত বুঝা যাবে, ততই নিজেকে কষ্টের আগুনে পোড়ানো থেকে বাঁচানো যাবে, আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার লাভের আশায় নিজ সাধ্য অনুযায়ী মানুষের উপকারে লেগে থাকা যাবে এবং নিরুৎসাহিত হওয়ার ব্যাপারটি আপনার কাছ থেকে দূরে থাকবে। মানুষের উপকারের পিছনে একমাত্র রবের সন্তুষ্টির বিষয়টি আপনাকে পুরস্কার পাওয়ার আশায় বুক বাঁধতে সাহায্য করবে। অপরদিকে মানুষের সন্তুষ্টির বিষয় একসময় হতাশা ও দুশ্চিন্তায় রূপ নিবে। তখন ভীষণ এক কষ্ট অনুভব করবেন।

যখন কোনো মানুষ উপকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে উপকার পেয়েও তার সাথে অকৃতজ্ঞ আচরণ করে, এমন ভাব করে যেন লোকটি তার কোনো উপকার-ই করেনি, সর্বোপরি সদম্ভে এড়িয়ে চলে; তখন তাদের এমন কর্মকাণ্ড দেখে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, জানেন? সে কেবল মনে মনে মুচকি হাসে এবং রবের নিকট অকৃতজ্ঞ আচরণ করা লোকটির জন্য হেদায়াতের দু‘আ করে, যেন সে অন্তত অন্য কারো সাথে আর এমন আচরণ না করে, যে আচরণ মানুষের উপকারে এগিয়ে আসতে পরোক্ষভাবে নিরুৎসাহিত করে এবং নীরবে অন্তরে ছাপ রেখে যায়।

এমন নেককার লোকেরা কখনো কাউকে এভাবে বলে বেড়ায় না যে, আমি অমুক অমুককে এই এই সাহায্য করেছি; অথচ তারা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল না, আমাকে চিনল না। কারণ একটাই, মানুষের উপকার করার তাদের একমাত্র কারণই হচ্ছে রবের সন্তুষ্টি হাছিল করা, অন্য কারো সন্তুষ্টি নয়।

আপনি কি জানেন, এমন মানুষদের ব্যাপারে রব কী বলেছেন? রব শুরুতেই তাদের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘তারা (নেককারগণ) শুধু আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ফকীর, মিসকীন, ইয়াতীম ও কয়েদিদের খাবার দেয়। আর এই সাহায্য করার সময় তারা বলে, আমরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের খাবার দিচ্ছি, বিনিময়ে আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো রকম প্রতিদান ও কোনো রকম কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন চাই না। আমরা তো সেই দিনের ব্যাপারে আমাদের মালিককে ভয় করি, যে দিনটি হবে অতীব ভয়ংকর। তারা যেহেতু এ দিনটিকে বিশ্বাস করেছে, তাই আল্লাহ তাআলা আজ তাদের সে দিনের যাবতীয় অনিষ্ট বা ক্ষতি থেকে রক্ষা করবেন, তিনি তাদের সজীবতা দান করবেন’ (আদ-দাহর, ৭৬/৮-১১)

কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে আপনজন একজন আরেকজনকে চিনবে না, যেদিন উত্তপ্ত সূর্য মাথার একেবারে নিকটবর্তী থাকবে, যেদিন মানুষের মধ্যে পেরেশানি থাকবে, যেদিন মানুষ চরম আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকবে; সেদিন যদি আপনি সকল পেরেশানি থেকে মুক্তি পেতে চান এবং রবের বিশেষ অনুগ্রহ পেতে চান, তাহলে অবশ্যই মানুষকে সাহায্য করে তার কৃতজ্ঞতা পাওয়ার আশায় বসে থাকবেন না কিংবা মানুষটির অকৃতজ্ঞ আচরণের কারণে নিন্দার ঝড় বইয়ে দিবেন না।

মানুষের উপকার করে মানুষের কৃতজ্ঞতা পাওয়ার আশায় নিজেকে অপেক্ষমান না রেখে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি বলে তাদেরকে এড়িয়ে না চলে, তাদের সাথে তাদের মতো পাত্তাহীন আচরণ না করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে আল্লাহর নিকট থেকে পরকালে বড় পুরস্কার লাভের আশায় নিজেদের জায়গা থেকে আমাদের যা যা করে যাওয়া প্রয়োজন তা-ই বিনাবাক্যে করে যাওয়া উচিত। এতে অন্যরকম এক মানসিক প্রশান্তি রয়েছে। অন্যথা মানুষের কৃতজ্ঞতা পাওয়ার আশায় বসে থাকলে মনের মধ্যে এক ধরনের অশান্তি কাজ করবে। আর মুমিন সবসময় অশান্তির কাজ এড়িয়ে চলে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন- আমীন!


আম্বরখানা, সিলেট।

[1]. আবূ দাঊদ, হা/৪৮১১।

Magazine