কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

মিন্নাতুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী (পর্ব-২)

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

মহান আল্লাহ্র নামে শুরু করছি, যিনি পরম করুণাময় ও দয়ালু।

كَيْفَ كَانَ بَدْءُ الوَحْيِ إِلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟

‘কীভাবে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অহির আগমন শুরু হয়েছিল?’

وَقَوْلُ اللهِ جَلَّ ذِكرُهُ : ﴿إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ﴾ْ ]النساء [163 :

‘আর মহান আল্লাহ্র বাণী, ‘নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি অহি প্রেরণ করেছি, যেমন অহি প্রেরণ করেছিলাম নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের প্রতি’ (নিসা, ১৬৩)

حَدَّثَنَا الحُمَيْدِيُّ عَبْدُ اللهِ بْنُ الزُّبَيْرِ قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيْدٍ الْأَنْصَارِيُّ قَالَ أَخْبَرَنِيْ مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيْمَ التَّيْمِيُّ أَنَّهُ سَمِعَ عَلْقَمَةَ بْنَ وَقَّاصٍ اللَّيْثِيَّ يَقُوْلُ سَمِعْتُ عُمَرَ بْنَ الخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَلَى المِنْبَرِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيْبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ.

হাদীছ নং ১:

ইমাম বুখারী বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন হুমায়দী। তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন সুফিয়ান। তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন ইয়াহ্ইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনছারী। তিনি বলেন, আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আত-তায়মী, তিনি আলক্বামার নিকট থেকে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মিম্বারের উপর বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয় সকল আমল নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে, যা সে নিয়্যত করে। অতএব যার হিজরত দুনিয়া হাছিলের লক্ষ্য হবে অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার লক্ষ্য হবে, তার হিজরত সেদিকেই গণ্য হবে’।

নোট : এখানে হাদীছটি পূর্ণাঙ্গভাবে উল্লেখিত হয়নি। ইমাম বুখারী ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীছটিকে সংক্ষিপ্ত করেছেন! নিম্নে হাদীছটির পূর্ণরূপ পেশ করা হল:

‘নিশ্চয় সকল আমল নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে, যা সে নিয়্যত করে। অতএব যার হিজরত হবে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য, তার প্রাপ্যও হবে সেই উদ্দেশ্যে। আর যার হিজরত দুনিয়া হাছিলের লক্ষ্য হবে অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার লক্ষ্য হবে, তার হিজরত সেদিকেই গণ্য হবে’।

তাখরীজ : ছহীহ বুখারীতে আরো ছয় জায়গায় ইমাম বুখারী এই হাদীছটি এনেছেন। যথা: হা/৫৪, ২৫২৯, ৩৮৯৮, ৫০৭০, ৬৬৮৯, ৬৯৫৩। এছাড়া কুতুবে সিত্তাহর বাকী ৫ জনও হাদীছটি তাদের গ্রন্থে এনেছেন। যথা- মুসলিম, হা/৫০৩৬; ইবনু মাজাহ, হা/৪২২৭; আবুদাঊদ, হা/২২০৩; তিরমিযী, হা/১৭৪৮; নাসাঈ, হা/৭৫, ৩৪৫০, ৩৮১০।

নোট : তাখরীজ করার ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, হাদীছটি যদি ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমের হাদীছ হয়, তাহলে এই দু’টি গ্রন্থের তথ্যসূত্রই যথেষ্ট। আর হাদীছটি যদি বুখারী ও মুসলিমের হাদীছ না হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে যত গ্রন্থের তথ্যসূত্র উল্লেখ করা সম্ভব, উল্লেখ করা উচিত। বিশেষ করে যে সমস্ত গ্রন্থে হাদীছটি ভিন্ন সনদে এসেছে, সে সমস্ত গ্রন্থের তথ্যসূত্র উল্লেখ করা বেশী যরূরী। কেননা একই সনদের হাদীছ যত বেশী গ্রন্থেই আসুক না কেন তেমন কোন উপকার পাওয়া যায় না। যেহেতু একই সনদ হলে হাদীছের কোন শাহেদ, মুতাবা‘আত ও শব্দের ভিন্নতা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। কিন্তু যখন ভিন্ন সনদের তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়, তখন হাদীছটির তথ্য-উপাত্ত সবকিছু একজন মুহাদ্দিছের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। যেহেতু আমাদের লিখিত গ্রন্থের সকল হাদীছ ছহীহ বুখারীর, সেহেতু আমরা কুতুবে সিত্তাহ্্র তথ্যসূত্রের উপর বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নির্ভর করব। আর যদি হাদীছের উপর কোন কালাম বা শব্দের ভিন্নতা থাকে, তাহলে আমরা সেই আলোকে হাদীছটি আরো কত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, তার তথ্যসূত্র উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।

তাখরীজের আরো একটি নিয়ম হচ্ছে, কুতুবে সিত্তাহ ব্যতীত অন্য গ্রন্থের তথ্যসূত্র উল্লেখ করার সময় যে গ্রন্থের লেখক আগে মৃত্যুবরণ করেছেন, সে গ্রন্থের তথ্যসূত্র আগে উল্লেখ করতে হয়। আমরা এই নিয়মটিও অনুসরণ করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

রাবীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় :

(১) হুমায়দী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের। তার নিকট থেকে ইমাম বুখারী প্রায় ৭৫টি হাদীছ তার ছহীহ বুখারীতে উল্লেখ করেছেন।[1] তিনি সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নার ২০ বছরের ছাত্র।[2] বাগদাদে যেমন ইমাম আহমাদ, তেমন মক্কায় হচ্ছেন ইমাম হুমায়দী।[3] ইমাম বুখারীর নিকট তিনি এতটা মযবূত রাবী যে, ইমাম বুখারী তার হাদীছ পেলে সেই হাদীছের ক্ষেত্রে অন্য কোন মযবূত বর্ণনাকারী অন্বেষণের প্রয়োজন বোধ করতেন না, বরং তাকেই যথেষ্ট মনে করতেন।[4]

(২) সুফিয়ান। এখানে সুফিয়ান দ্বারা উদ্দেশ্য সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না। তিনি তার যুগের আহলেহাদীছগণের ইমাম বলে পরিচিত ছিলেন।[5] তিনি আমর ইবনে দীনার ও ইমাম যুহরীর মযবূত ছাত্রগণের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে হাদীছ, ফিক্বহ ও তাফসীরে জ্ঞানী ছিলেন।[6] তিনি কখনো কখনো তাদলীস করতেন।[7] তবে তার তাদলীসের পরিমাণ যেমন অল্প, তেমনি তিনি শুধুমাত্র মযবূত রাবীদের থেকে তাদলীস করতেন। ইলমের পাশাপাশি ইবাদতগুযার বান্দা ছিলেন। প্রচুর কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি সত্তর বারেরও বেশী হজ্জ করেছেন।[8]

(৩) ইয়াহ্ইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনছারী। তিনি ইমাম যুহরীর সাথে অত্যধিক সাদৃশ্য রাখতেন। তার মযবূতির বিষয়ে সকলেই একমত।[9]

(৪) মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আত-তায়মী। তিনি একজন মযবূত তাবেঈ। তবে অতি অল্প সংখ্যক ছাহাবী থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু।[10]

(৫) আলক্বামা ইবনে ওয়াক্কাছ আল-লায়ছী। তিনি ছাহাবী না তাবেঈ এ নিয়ে মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে তিনি তাবেঈ।[11]

সনদের সূক্ষ্ম দিকসমূহ :

(১) সনদে পরস্পর তিনজন তাবেঈ একে অপর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আলক্বামা, মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ও ইয়াহ্ইয়া আল-আনছারী।

(২) সনদের প্রথম দুইজন মক্কার, পরবর্তী সকলেই মদীনার।

(৩) ছহীহ বুখারীর প্রথম হাদীছের প্রথম রাবী হুমায়দী কুরাইশ বংশের এবং মক্কার অধিবাসী। অনেকেই মনে করেন, ইমাম বুখারী ইচ্ছাকৃতভাবে কুরাইশ বংশের ও মক্কার অধিবাসী রাবী দিয়ে গ্রন্থ শুরু করেছেন। যেহেতু অহি অবতীর্ণ হয়েছিল মক্কার অধিবাসী কুরাইশ বংশের মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপরে, তাই অহির অধ্যায়ে এমন রাবী দিয়ে হাদীছ শুরু করা যথার্থ।

ব্যাখ্যা : আমাদের আলোচ্য অধ্যায় ‘অহির সূচনা’-এর অধীনে ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ যে আয়াতটি পেশ করেছেন, তা একটি পূর্ণ আয়াতের খণ্ডিত অংশ। নিম্নে পূর্ণ আয়াতটি পেশ করা হল।

إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوْحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوْبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَارُوْنَ وَسُلَيْمَانَ وَآتَيْنَا دَاوُوْدَ زَبُوْرًا.

‘আর নিশ্চয় আমরা আপনার নিকট অহি প্রেরণ করেছি, যেমন অহি প্রেরণ করেছিলাম নূহের প্রতি এবং তার পরবর্তী নবীদের প্রতি এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক্ব, ইয়াকূব, তার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূন এবং সুলায়মানের প্রতি। আর আমরা দাঊদকে দিয়েছি যাবূর কিতাব’।

আয়াতের সাথে অধ্যায়ের সম্পর্ক :

এই আয়াতের সাথে অধ্যায়ের সম্পর্ক হচ্ছে, অন্য নবীদের নিকট যেভাবে অহি এসেছিল, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অহি আসার ধরনও ঠিক অনুরূপ। যেমন সকল নবীর নিকট অহি স্বপ্নের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। ঠিক তেমনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটেও অহি স্বপ্নের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। যা বিস্তারিত আসবে ইনশাআল্লাহ।

আয়াতের সাথে হাদীছের সম্পর্ক :

আর এই আয়াতের সাথে হাদীছের সম্পর্ক হচ্ছে, প্রত্যেক নবীর নিকট নিয়্যত বিষয়ে অহি অবতীর্ণ করা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَا أُمِرُوْا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ.

‘আর তাদেরকে (তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জীলে) আদেশ করা হয়েছে, যেন তারা ইখলাছের সাথে মহান আল্লাহ্র ইবাদত করে।[12] তথা বিশুদ্ধ নিয়্যতে মহান আল্লাহ্র ইবাদত করে।

অধ্যায়ের সাথে হাদীছের সম্পর্ক :

আমরা দেখেছি, ইমাম বুখারী অধ্যায়ের নাম রেখেছেন অহির সূচনা, আর হাদীছ নিয়ে এসেছেন নিয়্যত বিষয়ক। এজন্য যুগে যুগে মুহাদ্দিছগণ এই অধ্যায়ের নাম ও হাদীছটির সাথে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করেছেন। নিম্নে তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ মতগুলো পেশ করা হল:

(১) ইমাম বুখারী মূলত হাদীছটি বইয়ের ভূমিকা হিসাবে নিয়ে এসেছেন। এজন্যই ইমাম ইসমাঈলী তার মুস্তাখরাজে ও ইমাম খাত্ত্বাবী তার ব্যাখ্যায় হাদীছটিকে অধ্যায়ের নামের পূর্বেই ভূমিকা হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

(২) ইমাম বুখারী এই হাদীছটি পেশ করে ছহীহ বুখারী লেখার পিছনে নিজের নিয়্যত ও ছহীহ বুখারীর পাঠকের নিয়্যতকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। নিয়্যতের শুদ্ধতাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য।

এক নতুন ব্যাখ্যা : আমার শ্রদ্ধেয় উস্তাদ সাইয়িদ আহমাদ পালানপুরী এই বিষয়ের নতুন একটি ব্যাখ্যা আমাদের দারসে বলেছিলেন। গবেষণার খোরাক হিসাবে তার ব্যাখ্যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে পেশ করা হল। তিনি বলেন, ‘উপরের দু’টি মন্তব্যের মধ্যে কিছু ত্রুটি আছে। যথা-

(১) ইমাম বুখারী যদি ভূমিকা হিসাবে আনতেন, তাহলে বইয়ের শুরুতেই অধ্যায়বিহীন ভাবে নিয়ে আসতে পারতেন। যেমন মিশকাতের লেখক সহ অনেকেই এনেছেন।

(২) ইমাম বুখারীর যদি ভাল নিয়্যত বুঝানো উদ্দেশ্য হত, তাহলে তিনি পূর্ণ হাদীছ নিয়ে আসতেন। বিশেষ করে হাদীছের যে অংশে ভাল নিয়্যতের কথা আছে, সে অংশটুকু বিলুপ্ত করতেন না। অন্যদিকে এই হাদীছটি তিনি ছহীহ বুখারীর আরো ৬ জায়গায় নিয়ে এসেছেন; কোথাও তিনি হাদীছের এই অংশকে বাদ দেননি। অতএব তিনি এখানে ইচ্ছা করেই হাদীছের এই অংশকে বাদ দিয়েছেন এবং অবশ্যই এর পিছনে তার কোন উদ্দেশ্য আছে। কেননা ইমাম বুখারীর প্রতিটি কাজের মধ্যে সূক্ষ্মতা রয়েছে।

মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে কয়েকটি বিষয় আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে।

(১) ইমাম বুখারী এই অধ্যায়ের পর কুরআনের যে আয়াতটি নিয়ে এসেছেন, তা অহি বিষয়ক। 

(২) তিনি হাদীছের একটি অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলুপ্ত করেছেন।

(৩) তিনি যে বিষয়ে বই লিখতে যাচ্ছেন, তা কুরআন নয়; বরং হাদীছ বিষয়ক।

সুতরাং অহি বিষয়ক অধ্যায় এবং তার অধীনে অহি বিষয়ক আয়াত প্রমাণ বহন করে যে, এই হাদীছটিও মূলত অহি বিষয়ক। ইমাম বুখারী মূলত বুঝাতে চেয়েছেন অহি দুই প্রকার।

প্রথম প্রকার ভাল অহি : কুরআনের আয়াত থেকে এই প্রথম প্রকার অহি বুঝা যায়। আর কুরআনের এই আয়াতে বর্ণিত অহি দ্বারা ইমাম বুখারী অহিয়ে গায়রে মাতলু বা হাদীছকে বুঝিয়েছেন। ইমাম বুখারী প্রমাণ করতে চাচ্ছেন যে, পূর্ববর্তী নবীদের উপর যেমন অহি আসত, হাদীছ ঠিক অনুরূপ অহি। কেননা-

(১) এই আয়াতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর করা অহিকে অন্য নবীদের উপর করা অহির সাথে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনকে কোথাও অন্য নবীদের উপর অবতীর্ণ কিতাবের সাথে তুলনা দেওয়া হয়নি।

(২) কোথাও তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জীলকে আল্লাহ্র কালাম বলেননি। কিন্তু কুরআনকে আল্লাহ্র কালাম বা কথা বলেছেন।

(৩) তাওরাত, যাবূর, ইঞ্জীল মু‘জিযা ছিল না। এছাড়া সেগুলোতে পরিবর্তন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। যদি আল্লাহ্র কালাম হত, তাহলে পরিবর্তন করা সম্ভব হত না।

এই বিষয়গুলো প্রমাণ বহন করে যে, হাদীছ মূলত তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জীলের মত অহি। এর দ্বারা ইমাম বুখারী হাদীছকে ‘হুজ্জাত’ প্রমাণ করতে চেয়েছেন। হাদীছ অনুসরণের অপরিহার্যতা ফুটিয়ে তুলেছেন!

দ্বিতীয় প্রকার শয়তানী অহি : নিয়্যতের হাদীছ থেকে এই প্রকারটি অনুধাবন করা যায়। কেননা ইমাম বুখারী নিয়্যতের হাদীছের ভাল অংশকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। শুধু সেই অংশকে উল্লেখ করেছেন, যা খারাপ নিয়্যতের প্রমাণ বহন করে। আর খারাপ নিয়্যত শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আসে। আর শয়তানের ওয়াসওয়াসাই হচ্ছে তার অহি।

সারমর্ম : যেহেতু ইমাম বুখারী ১৬ বছর পরিশ্রম করে একটি হাদীছ গ্রন্থ লিখেছেন, তাই গ্রন্থের শুরুতে হাদীছকে মহান আল্লাহ্র অহি প্রমাণ করতে চেয়েছেন। যাতে কেউ হাদীছ অস্বীকারের মাধ্যমে তার এই পরিশ্রমকে নষ্ট করার সুযোগ না পায়। (পালানপুরী উস্তাদজীর মন্তব্যের সার-সংক্ষেপ শেষ হল)

ন্তব্য : পালানপুরী উস্তাদজীর উপরের মন্তব্যের পিছনে অকাট্য দলীল প্রয়োজন। তিনি যে বিষয়গুলো থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন, সেগুলোর জন্যও অকাট্য দলীল চাই। যেমন তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জীল যে মহান আল্লাহ্র বাণী নয়; বরং হাদীছের মত অহি এটা অকাট্য দলীল ছাড়া প্রমাণ করা অসম্ভব। তাই অতীতের মুহাদ্দিছগণের ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করাই বেশী শ্রেয়। এছাড়া যেহেতু ইমাম বুখারী নিজে কিছু বলেননি, তাই তার উদ্দেশ্য কি ছিল তা সঠিকভাবে একমাত্র মহান আল্লাহই অবগত আছেন। আমরা শুধুমাত্র ধারণা করতে পারি।

(চলবে)


[1]. আসক্বালানী, তাহযীবুত তাহযীব, ২/৩৩৪ পৃঃ।

[2]. আলাউদ্দীন মুগলতয়ী, ইকমালু তাহযীবিল কামাল, ৭/৩৫৪ পৃঃ।

[3]. প্রাগুক্ত।

[4]. আসক্বালানী, তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং- ৩৩৪০।

[5]. ইকমালু তাহযীবিল কামাল, ৫/৪১১ পৃঃ।

[6]. তাহযীবুত তাহযীব, ২/৫৯ পৃঃ।

[7]. আসক্বালানী, তা‘রীফু আহলিত তাকদীস, ১/১১৪ পৃঃ।

[8]. ইবনু হিববান, কিতবুছ ছিক্বাত, ৬/৪০৩ পৃঃ।

[9]. ইমাম মিযযী, তাহযিবুল কামাল, ৩১/৩৪৬ পৃঃ।

[10]. আলায়ী, তুহফাতুত তাহসীল, ১/৪৩৭ পৃঃ; মিযযী, তাহযিবুল কামাল, ২৪/৩০১ পৃঃ।

[11]. আসক্বালানী, ইসাবা, ৮/৯৪ পৃঃ।

[12]. বাইয়েনাহ, ৫।

Magazine