কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে মসজিদের ভূমিকা

আল্লাহর যমীনে সর্বোৎকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে মসজিদ, যার অপর নাম বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর। আমরা যারা সমাজে বসবাস করছি এবং ক্ষণিকের এ দুনিয়াতে আমাদের আগমন যে পরিচয় নিয়ে, তা হচ্ছে আমরা আব্দুল্লাহ বা আল্লাহর গোলাম। বায়তুল্লাহর সাথে আব্দুল্লাহ বা আল্লাহর বান্দার সম্পর্কটাই একটু আলাদা ও সুগভীর।

মহান আল্লাহ প্রথম ঘর সম্পর্কে বলেন,إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ ‘নিশ্চয় প্রথম ঘর যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়, যা বরকতময় ও বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়াত বা পথনির্দেশিকা’ (আলে ইমরান, ৩/৯৬)

মসজিদ মুসলিম সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন। মুসলিম সমাজ আর মসজিদ একই সুতোয় গাঁথা। মুসলিমের সাথে মসজিদের সম্পর্ক যেন নাড়ির সম্পর্ক। মুমিনের হৃদয় সর্বদা মসজিদের সাথে আটকানো থাকে। মসজিদের সাথে মুমিন হৃদয়ের গভীরে যে মায়া বা টান থাকে, তা মুমিনকে ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর ছায়াতলে জায়গা করে দিবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ... وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسْجِدِ ‘ক্বিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ সাত শ্রেণির ব্যক্তিকে (তাঁর আরশের নিচে) ছায়া প্রদান করবেন… (তন্মধ্যে অন্যতম হলো) ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদে ঝুলন্ত থাকে’।[1]

মসজিদ নিছক একটি ইবাদতখানা বা ছালাত আদায়ের স্থান নয়, বরং মুসলিম জীবনের কল্যাণকর যাবতীয় সৎকর্মের মারকায বা কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই মসজিদ। একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে মসজিদের কোনো জুড়ি নেই। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মসজিদগুলোর যে ভূমিকা ছিল, আজ তা আর নেই। বিশেষত ভারতবর্ষের মসজিদগুলো আজ কেবলই ছালাতের স্থান। ফলে দিনে দিনে মসজিদের সাথে সমাজের সম্পর্ক হ্রাস পাচ্ছে এবং এ কারণেই প্রতিনিয়ত সমাজ নীতিহীনতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর মাদকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। আল্লাহ ও পরকাল বিমুখতা অন্ধকার সমাজকে প্রায় গ্রাস করে ফেলছে। আদর্শ সমাজ বলতে যা বুঝায়, বর্তমান সমাজে তার কোনো বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তাই একসময়কার আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের শক্তিঘর মসজিদগুলোকে মূলধারায় ফিরিয়ে এনে সমাজ ও সমাজে বসবাসরত মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে রক্ষা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। আল্লাহ চান তো এ প্রবন্ধে আমরা মসজিদ কীভাবে একটি আদর্শ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

আদর্শ সমাজ বলতে যা বুঝায়:

আদর্শ সমাজ বলতে মূলত সেই সমাজকে বুঝায়, যেখানে মানুষের মধ্যে থাকবে পারস্পরিক ভালোবাসা, স্নেহ, মায়ামমতা, হৃদ্যতা ও সহানুভূতি। যে সমাজ দাঁড়ায় সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, ইনছাফ আর বৈষম্যহীন কষ্টিপাথরের এক মজবুত ভিত্তির উপর। যে সমাজ অন্যায়, অবিচার, মিথ্যা, অপপ্রচার, প্রতারণা, পরনিন্দা, সূদ-ঘুষ, দুর্নীতি, জুয়া, মাদকাসক্তি, ধূমপান, গুম, খুন, অপহরণ, অধিকার হরণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, মারামারি, হানাহানি, হত্যা, আত্মহত্যা, যৌতুক, নারী নির্যাতনসহ নানাবিধ নৈতিকতাবিরোধী অপরাধ থেকে মুক্ত থাকে। একটি আদর্শ সমাজে প্রতিটি মানুষই হয়ে থাকে দায়িত্বশীল এবং একে অপরের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন, পরস্পরকে সম্মান করে এবং একে অপরকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এ সমাজের মানুষগুলো হয়ে থাকে একে অপরের সহযোগী। হিংসা-বিদ্বেষের মতো অন্যায় প্রতিযোগিতা থেকে এ সমাজ পরিচ্ছন্ন থাকে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর মদীনা ছিল একটি আদর্শ সমাজের বিশ্বখ্যাত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আদর্শ সমাজের সাথে মসজিদের সম্পর্ক:

আদর্শ সমাজ মানেই একটি মুসলিম সমাজ। কারণ ইসলাম ছাড়া কখনো কোনো সমাজকে সার্বিক বিবেচনায় একটি আদর্শ সমাজ হিসেবে কল্পনা করা যায় না। ইসলাম ছাড়া একটি সমাজ বিশেষ কোনো বিবেচনায় উন্নত কিংবা আধুনিক হতে পারে, কিন্তু সর্বিক বিবেচনায় কখনো একটি আদর্শ সমাজ হতে পারে না। মুসলিম সমাজ ও মসজিদ একটি আরেকটির পরিপূরক। এ যেন একই বৃক্ষের দুটি শাখা। মসজিদ ছাড়া যেমন কখনো একটি মুসলিম সমাজ গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি মুসলিম থাকবে আর সেখানে কোনো মসজিদ থাকবে না—তাও কখনো হয় না। ‍যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি অমুসলিম দেশেও আজ ছোট-বড় প্রায় তিন হাজার মসজিদ রয়েছে, যা ওই সমাজে মুসলিমদের উপস্থিতির প্রমাণ। ঠিক একইভাবে একটি মসজিদের যথাযথ ভূমিকা ছাড়া কখনো একটি আদর্শ সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। মুসলিম জাতির পিতা নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মহান মালিকের নির্দেশে তাঁর প্রিয়তমা সহধর্মিণী হাজেরা (আ.) ও কলিজার টুকরা ইসমাঈলকে জনমানবশূন্য বায়তুল্লাহর অদূরেই রেখে এসেছিলেন। ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে উঠল জনবসতি, যমযম কূপের পানির প্রবাহ, যা পবিত্র মক্কা নগরীকে একটি আদর্শ জনবসতিতে রূপান্তরিত করে। সেখানে গড়ে উঠল আরব ও মুসলিম সভ্যতা। একসময় নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এসে স্বীয় পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-কে নিয়ে এ ঘর পুনরায় নির্মাণ করলেন এবং এ ঘরের আশেপাশে বসবাসরত সকলকে তাওহীদ তথা ইসলামী একত্বের ওপর ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখলেন। তিনি উম্মাহর জন্য দু‘আ করলেন এই বলে,وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ- رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ ‘আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা‘বার ভিতগুলো উঠাচ্ছিলেন (এবং বলছিলেন) হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। হে আমাদের রব! আমাদেরকে আপনার অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধরের মধ্য থেকে আপনার অনুগত জাতি তৈরি করুন। আর আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের বিধিবিধান দেখিয়ে দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু (আল-বাক্বারা, ২/১২৭-১২৮)

অতঃপর তিনি পৃথিবীবাসীর জন্য এই ঘরমুখী হয়ে সকলকে এখান থেকে আদর্শের দিশা নিতে আহ্বান জানালেন। মহান আল্লাহ বলেন,وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَنْ لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ - وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ ‘আর স্মরণ করুন, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের (বায়তুল্লাহর) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখবে তাওয়াফকারী, দাঁড়িয়ে ছালাত আদায়কারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য। আর মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটে চড়ে দূর পথ পাড়ি দিয়ে (আল-হাজ্জ, ২২/২৬-২৭)

সোনার মদীনা বিনির্মাণে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদের ভূমিকা:

মুসলিম হিসেবে আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহরকে সোনার মদীনা বলে সম্বোধন করে থাকি। একসময়কার ইয়াছরিব শহর হঠাৎ করেই সোনার মদীনা হয়নি। এর পিছনে ছিল নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিজ হাতে নির্মিত মাসজিদ নববী বা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদের নিবিড় সম্পর্ক। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনাতে পৌঁছার পর সর্বপ্রথম যে কাজটি করলেন তা হচ্ছে, তিনি মদীনাবাসীকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ঐতিহাসিক মসজিদে নববীর জন্য ১০ দিনারের বিনিময়ে একটি জায়গা ক্রয় করলেন। অতঃপর সবার সহযোগিতায় সেখানে প্রথমত, খেজুরগাছ ও তার শাখা দিয়ে এবং তার কিছুদিন পরে কাঁচা ইট দিয়ে ৪২০০ বর্গহাতের একখানা মসজিদ নির্মাণ করলেন।[2] এ মসজিদ-ই আজকের মনোমুগ্ধকর ঐতিহাসিক মদীনার মসজিদ নববী বা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদ। ধীরে ধীরে এ মসজিদ হয়ে উঠল মদীনাবাসীদের সকল প্রয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে শুরু হলো জ্ঞানের চর্চা। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল জ্ঞানের সেই আলো। প্রিয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমের রূপকার ও স্বপ্নদ্রষ্টা। ছাহাবীদের একটি দল এখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর কাছ থেকে জ্ঞান ও বিশুদ্ধ আমল নিতে শুরু করলেন, যারা আহলুছ ছুফফাহ নামে পরিচিত ছিলেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদ কেবল ছালাত আর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রস্থল ছিল না। একইভাবে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদ ছিল একটি বিচারালয়, একটি সলিউশন সেন্টার, একটি ত্রাণকেন্দ্র ও একটি আশ্রয়কেন্দ্র। এককথায় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদ হয়ে উঠেছিল ধনী-গরীব, উঁচু-নিচু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের আস্থার ঠিকানা। এভাবেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদের বহুমুখী কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে মদীনার মানুষ দিনে দিনে সোনার মানুষে পরিণত হতে শুরু করল, যা অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। মদীনাবাসীদের এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই একসময়কার ইয়াছরিব হয়ে গেল সোনার মদীনা। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (Wরাযিয়াল্লাহু আনহুমারাহিমাহুমুল্লাহ) মদীনা শহরকে স্বাস্থ্যকর শহরের স্বীকৃতি সনদ প্রদান করেছে।[3] নারীর একাকী ভ্রমণের জন্যও কয়েকবার বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শহর নির্বাচিত হয়েছে মদীনা।

খেলাফত আমলে মসজিদসমূহের ভূমিকা:

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর চার খলীফার খেলাফতকালে দূরদেশ পর্যন্ত মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এবং পৃথিবীর দিগদিগন্তে মুসলিমদের ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন অসংখ্য মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিমরা যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই মসজিদ নির্মাণ করেছে এবং তা ইসলামী খেলাফত পরিচালনার মারকায বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। পাশাপাশি উমাইয়া ও আব্বাসীয় খেলাফতকালে মসজিদগুলো নতুন উদ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চার মহামিলন কেন্দ্রে রূপ নিয়েছিল। অধিকাংশ মসজিদেই কুরআন ও হাদীছের নিয়মিত দারস বা পাঠদান কর্মসূচি চলমান ছিল। এছাড়া মসজিদগুলোতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সংঘটিত কলহ-বিবাদের বিচার-ফয়সালা করা হতো। গুরুত্বপূর্ণ ওয়ায ও নছীহার মাধ্যমে অসুস্থ মানবাত্মার আত্মিক চিকিৎসা প্রদান করা হতো। চারদিকে মিনারে মিনারে আল্লাহু আকবার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতো। এভাবেই ইসলামী খেলাফতে দীর্ঘকাল ধরে মসজিদগুলো হয়ে ওঠে আদর্শ সমাজের চালিকাশক্তি।

বর্তমান আরব বিশ্বে মসজিদসমূহের ভূমিকা:

আজও আরব বিশ্বের অনেক মসজিদ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদের আদলে বহুমুখী কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে আদর্শ সমাজ গঠনে এক বৃহৎ ভূমিকা পালন করছে। আরবের প্রতিটি মসজিদেই রয়েছে নারীদের জন্য আলাদা ছালাত আদায়ের স্থান। নারীসমাজের উপর যার সুস্পষ্ট প্রভাব চোখে পড়ার মতো। অধিকাংশ মসজিদেই রয়েছে দ্বীনী ইলমের নিয়মিত চর্চা। নিয়মিত কুরআন ও সুন্নাহর এ সকল পাঠে অংশগ্রহণ করে নিজেকে জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ করার সুন্দর ও নিরাপদ নির্ধারিত স্থানে রূপ নিয়েছে অধিকাংশ মসজিদগুলো। সেন্ট্রাল মসজিদসমূহে প্রখ্যাত মুসলিম স্কলারগণের উপস্থিতিতে কখনো সাপ্তাহিক, আবার কখনো মাসিক ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ বয়ান প্রদানের ধারাবাহিকতা এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত এসকল আয়োজন সমাজ ও পরিবারের হাজারো কলহের শিকড় উপড়ে ফেলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আছরের পর আমাদের দেশের শিশুরা যখন খেলার মাঠে খেলা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে, ঠিক তখন আরবের মসজিদগুলো শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিতে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। তারা আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত ছোট ছোট হালাকায় অংশগ্রহণ করে কুরআন হিফয করে। আবার মাগরিবের পর অনেক হালাকাতে হাদীছ কিংবা মুতুন (আরবী মূল বইয়ের মূলকথা) মুখস্থের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। রামাযানে মাসব্যাপী লক্ষ লক্ষ ছিয়াম পালনকারীর ইফতার আয়োজনও চলে এ সকল মসজিদের আঙিনায়। এভাবেই বর্তমান আরবের মসজিদগুলো সমাজের মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করেছে, যা সমাজের স্থিতিশীলতার উপর এক বড় ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে মসজিদসমূহের ভূমিকা:

এদেশের গুটি কয়েক মসজিদ ছাড়া অধিকাংশ মসজিদই নিছক ছালাতের স্থান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। ছালাতের সময় ছাড়া মসজিদগুলোতে প্রাণবন্ত কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায় না বললেই চলে। সপ্তাহে শুধু শুক্রবারে যখন ধর্মপ্রাণ শিক্ষিত বা অর্ধ-শিক্ষিত কিংবা সাধারণ মানুষ জুমআর খুৎবা শুনতে কিংবা কিছু শিখতে মসজিদে আসে, তখন তাদেরকে কিছু আরবী বাক্য খুৎবার বই পড়ে শুনিয়ে দেওয়া হয়। সময়ের চাহিদা মোতাবেক তাদেরকে তেমন কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় না। আরবীতে যে কথাগুলো শুনিয়ে দেওয়া হয় অনেক ক্ষেত্রে খতীব সাহেব নিজেও তা বুঝেন কি-না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে, শ্রোতাদের বুঝা তো দূরের কথা!

তবে সঊদী সরকারের অনুদানে নির্মিত উপজেলাভিত্তিক মডেল মসজিদগুলোতে আরব বিশ্বের মসজিদগুলোর কিছুটা ছোঁয়া রয়েছে, আল-হামদুলিল্লাহ!

সমাজের প্রয়োজন ও সময়োপযোগী খুৎবা প্রদানের লক্ষ্যেই মূলত মসজিদে মিম্বার তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু খতীবগণ সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বললেও ভুল হবে না। আর একজন সম্মানিত খতীব সময়োপযোগী খুৎবা দিবেন-ই বা কী করে? তিনি তো উঁচু মাপের কোনো আলেম বা জ্ঞানী নন। আর তা হবেন-ই বা কেমন করে? এ সমাজে ইমাম ও খতীবের চাকরির জন্য খোঁজা হয় নামেমাত্র শিক্ষিত কাউকে, যারা অল্প হাদিয়াতেই মসজিদ আর মসজিদের হর্তাকর্তাদের গোলামি করতে রাজি। পদবিতে ইমাম হলেও অধিকাংশ মসজিদে গোলামি-ই তাদের বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীছ জানলেও নির্ভয়ে সে কথাগুলো তাদের বলতে বাধা প্রদান করা হয়। আবার ঠুনকো অজুহাতেই তাদের চাকরি চলে যায়। এমন অসংখ্য মসজিদ রয়েছে যেখানে একজন ইমামকে মসজিদ, ওযূখানা আর টয়লেট ক্লিন থেকে শুরু করে সব ধরনের গোলামির প্রতিশ্রুতি দিয়েই দায়িত্বে যোগদান করতে হয়।

অন্যদিকে মসজিদ হতে দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়া হেদায়াতের আলো থেকে নারী সমাজ বঞ্চিত। আজ এ সমাজের অধিকাংশ পরিবার ধ্বংসের অন্যতম কারণ হচ্ছে নারীর অবাধ্যতা, অবাধ চলাফেরা, অশ্লীলতায় গা ভাসিয়ে দেওয়া আর বোরকার নামে ফ্যাশন শো তথা পর্দাহীনতার সংস্কৃতি। আদর্শ নারী মানে একটি আদর্শ পরিবার আর কয়েকটি আদর্শ পরিবার মানেই একটি আদর্শ সমাজ। কিন্তু সমাজের নারীদের পরিবর্তন কিংবা তাদেরকে আদর্শ নারী হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের জন্য মসজিদের বন্ধ দরজাগুলো খুলে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। বিশেষত জুমআ ও ঈদের ছালাতের খুৎবার কথাগুলো যদি তারা শুনতে পেত, তাহলেও তাদের মধ্যে অনেক গুণগত পরিবর্তন আসত। মসজিদে যদি নারীরা না-ই আসে, অন্তত খুৎবাগুলো যদি মাইকে প্রচার করা হতো এবং মা-বোনদেরকে যদি তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে উৎসাহিত করা হতো, তাহলেও অনেক উপকার হতো। নারীরা আজ প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে কিংবা জীবিকার তাগিদে হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ থেকে অফিস-আদালত পর্যন্ত সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াতে পারেন তাতে তাদের জাত, মান কিংবা ধর্ম কোনোটারই ক্ষতি হয় না; কিন্তু তারা দ্বীন শিখতে মসজিদমুখী হলেই নাকি সবকিছু বরবাদ হয়ে যাবে। অথচ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋতুবতী নারীকে পর্যন্ত ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে দ্বীনী আলোচনা শুনতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আজ চারদিকে পারিবারিক কলহ ও বিচ্ছেদের যে করুণ আর্তচিৎকার আকাশে বাতাসে ভেসে আসছে, তার মূল কারণগুলোর একটা হচ্ছে নারীরা ছোট থেকেই মসজিদভিত্তিক দ্বীনী শিক্ষা হতে বঞ্চিত। আজ নারীদের জন্য যদি মসজিদকেন্দ্রিক দ্বীন শিক্ষার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো সমাজের এমন দুরবস্থা আমাদের দেখতে হতো না। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়,

‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

তাই নারীদের পরিবর্তন ছাড়া কখনোই একটি সমাজের পরিবর্তন সম্ভব নয়। আর এক্ষেত্রে মসজিদভিত্তিক শিক্ষার সাথে তাদের সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই। তাই এ দেশের মসজিদগুলোকে মূলধারায় ফিরিয়ে এনে নারী-পুরুষ সকলের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে সমাজের পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।

(ইনশা-আল্লাহ! আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

-সাইফুল্লাহ আল-মামুন মাদানী

সাবেক দাঈ, ইসলামিক সেন্টার, আবহা, সঊদী আরব; পরিচালক, আস-সুন্নাহ একাডেমী, তাফালবাড়ী, শরণখোলা, বাগেরহাট।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬০।

[2]. সীরাতুর রাসূল (ছা.), পৃ. ২৬০।

[3]. দৈনিক ইত্তেফাক, ২ আগস্ট, ২০২৫।

Magazine