কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত (পর্ব-১৯)

ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতে হবে :

عَنْ نَافِعٍ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ إِذَا دَخَلَ فِى الصَّلَاةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَامَ مِنَ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ وَرَفَعَ ذَلِكَ ابْنُ عُمَرَ إِلَى نَبِىِّ اللهِ صلى الله عليه وسلم.

নাফে‘ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা যখন ছালাত শুরু করতেন, তখন তাকবীর দিতেন এবং দু’হাত উঠাতেন। যখন রুকূ করতেন, তখনও দু’হাত উঠাতেন। যখন ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন, তখন হাত উঠাতেন। যখন দুই রাক‘আতের পর দাঁড়াতেন, তখন দু’হাত উঠাতেন। ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হাদীছটি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন।[1] ইবনে ওমর ও মালেক ইবনে হুওয়াইরিছ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা যখন তাকবীর দিতেন, যখন রুকূ করতেন এবং যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন, তখন রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন।[2] ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন।[3] বনী আসাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর গোলাম আবু হামযাহ বলেন, আমি ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখেছি, তিনি যখন ছালাত শুরু করতেন, যখন রুকূ করতেন এবং যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন, তখন রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন।[4] ‘আতা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আবু সাঈদ খুদরী, ইবনে ওমর, ইবনে আববাস ও ইবনে যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহুম-কে দেখেছি তারা সকলেই রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন।[5]

রাফ‘উল ইয়াদাঈন না করার হাদীছ যঈফ :

عَنْ عَلْقَمَةَ قَالَ قَالَ عَبْدُ اللهِ بْنُ مَسْعُوْدٍ أَلَا أُصَلِّى بِكُمْ صَلَاةَ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا مَرَّةً. قَالَ أَبُوْ دَاوُدَ هَذَا مُخْتَصَرٌ مِنْ حَدِيْثٍ طَوِيلٍ وَلَيْسَ هُوَ بِصَحِيْحٍ عَلَى هَذَا اللَّفْظِ.

আলক্বামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি কি তোমাদেরকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত শিক্ষা দিব না? বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি ছালাত পড়ালেন। কিন্তু তিনি মাত্র একবার দু’হাত উঠালেন। ইমাম আবুদাঊদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হাদীছটি লম্বা হাদীছের সংক্ষিপ্ত অংশ। এ শব্দে হাদীছটি ছহীহ নয়।[6]

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ صَلَّيْتُ خَلْفَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم وَأَبِىْ بَكْرٍ وَعُمَرَ فَلَمْ يَرْفَعُوْا أَيْدِيَهُمْ إِلَّا عِنْدَ افْتِتَاحِ الصَّلَاةِ.

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবুবকর ও ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সাথে ছালাত আদায় করেছি কিন্তু তারা ছালাত শুরু করার তাকবীর ছাড়া আর কোথাও হাত উঠাননি।[7] হাদীছটি বাতিল।[8]

عَنِ الْبَرَاءِ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَى قَرِيْبٍ مِنْ أُذُنَيْهِ ثُمَّ لَا يَعُوْدُ.

বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাত আরম্ভ করতেন, তখন দুই কানের নিকটবর্তী পর্যন্ত দু’হাত উঠাতেন। অতঃপর তিনি আর এরূপ উঠাতেন না।[9] হাদীছটি যঈফ।[10] এই হাদীছের শেষাংশ হাদীছ গ্রন্থে নেই অর্থাৎ ‘অতঃপর তিনি আর হাত উঠাননি’ এ অংশ কূফার কেউ বৃদ্ধি করেছে।[11]

ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাত আরম্ভ করতেন, তখন দু’হাত উঠাতেন। তারপর আর উঠাতেন না।[12] মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি ইবনে ওমরের পিছনে ছালাত আদায় করলাম। তিনি প্রথম তাকবীর ছাড়া আর রাফ‘উল ইয়াদাঈন করলেন না।[13] হাদীছটি যঈফ।[14] আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদাঈন করে, তার ছালাত হয় না’।[15] হাদীছটি বাতিল।[16] আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রুকূতে রাফ‘উল ইয়াদাঈন করবে, তার ছালাত হবে না’।[17] ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদাঈন করবে, তার ছালাত নষ্ট হয়ে যাবে।[18] ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ থেকে, ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রথম তাকবীরে হাত উঠাতেন তারপর আর হাত উঠাতেন না। আর এটা তিনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন।[19] হাদীছটি জাল।[20]

عَنْ عَاصِمِ بْنِ كُلَيْبٍ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّ عَلِيًّا كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ إذَا افْتَتَحَ الصَّلاَةَ ثُمَّ لَا يَعُوْدُ.

আছেম ইবনে কুলাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, নিশ্চয় আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ফরয ছালাতের প্রথম তাকবীরে দু’হাত উঠাতেন। এছাড়া তিনি অন্য কোথাও হাত উঠাতেন না।[21] হাদীছটি জাল।[22]

عَنْ أَبِيْ إِسْحَاقَ قَالَ كَانَ أَصْحَابُ عَبْدِ اللهِ وَأَصْحَابُ عَلِيٍّ لَا يَرْفَعُوْنَ أَيْدِيَهُمْ إِلَّا فِي افْتِتَاحِ الصَّلَاةِ قَالَ وَكِيْعٌ ثُمَّ لاَ يَعُوْدُوْنَ.

আবু ইসহাক্ব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথীগণ কেউ ছালাতের শুরু ছাড়া হাত উঠাতেন না। ওয়াক্বী রাহিমাহুল্লাহ ছালাতের শুরু ছাড়া হাত উঠাতেন না। ওয়াক্বী রাহিমাহুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তারা আর হাত উঠাতেন না।[23] কারণ আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু রাফ‘উল ইয়াদাঈন করার ছহীহ হাদীছ আছে।[24]

আসওয়াদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে একবার দু’হাত উঠাতে দেখেছি। অতঃপর তিনি আর উঠাতেন না।[25] হাদীছটি যঈফ।[26] ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দশজন ছাহাবীর জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা কেউ ছালাতের শুরুতে ছাড়া রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন না। হাদীছটির কোন সনদ নেই, এটি বানোয়াট কথা।[27] একদা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে দেখলেন, ছালাতে রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ থেকে উঠার সময় রাফ‘উল ইয়াদাঈন করছেন। তিনি তখন বললেন, না, তুমি এটা কর না। কারণ এগুলো সবই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, তবে পরে বাদ দিয়েছেন। এটা মিথ্যা ও বানোয়াট কথা।[28] ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত উঠাতেন, আমরাও উঠাতাম। তিনি ছেড়ে দিয়েছেন, আমরাও ছেড়ে দেয়েছি। এটা বানোয়াট কথা, যার কোন বর্ণনা নেই। রাফ‘উল ইয়াদাঈনের হাদীছগুলো মানসূখ হয়ে গেছে কথাটি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর একটি মিথ্যা অপবাদ এবং ছহীহ হাদীছকে অস্বীকারের নামান্তর।

রাফ‘উল ইয়াদাঈন করার ছহীহ হাদীছসমূহ :

ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাত শুরু করতেন, যখন রুকূতে যেতেন এবং যখন রুকূ হতে মাথা উঠাতেন, তখন রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন, সিজদার সময় তিনি এমনটি করতেন না আল্লাহ্র সাক্ষাৎ পর্যন্ত তাঁর ছালাত এভাবেই ছিল।[29]

আবু হুমাইদ সায়েদী রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দশজন ছাহাবীর মধ্যে বললেন, আমি আপনাদের অপেক্ষা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত সম্পর্কে অধিক অবগত। তাঁরা বললেন, তা আমাদেরকে বলুন। তখন তিনি বললেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাতের জন্য দাঁড়াতেন, তখন দু’হাত উঠাতেন, এমনকি তারা দুই কাঁধ বরাবর করতেন, অতঃপর তাকবীর বলতেন। অতঃপর ক্বিরাআত পড়তেন, অতঃপর তাকবীর বলতেন এবং দুই হাত উঠাতেন, এমনকি উপরে রাখতেন, এসময় পিঠ সোজা রাখতেন (অর্থাৎ) মাথা নীচের দিকেও ঝুঁকাতেন না এবং উপরের দিকেও উঠাতেন না। অতঃপর মাথা উঠাতেন এবং বলতেন, ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’। তারপর সোজা হয়ে দু’হাত উঠাতেন এমনকি হাত দু’টিকে দুই কাঁধ বরাবর করতেন। অতঃপর বলতেন, ‘আল্লাহু আকবার’। অতঃপর সিজদার জন্য যমীনের দিকে ঝুঁকতেন, সিজদায় দুই হাতকে দুই পার্শ্ব হতে পৃথক রাখতেন এবং দুই পায়ের অঙ্গুলীসমূহ (ক্বিবলার দিকে) মুড়িয়ে দিতেন। অতঃপর মাথা উঠাতেন এবং নিজের বাম পা বিছিয়ে দিয়ে তার উপর বসতেন। অতঃপর মাথা উঠাতেন এবং নিজের বাম পা বিছিয়ে দিয়ে নিজ জায়গায় ঠিকভাবে বসতেন। অতঃপর (দ্বিতীয়) সিজদায় যেতেন এবং মাথা উঠাতে উঠাতে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন আর বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসতেন। এসময় তিনি সোজা হয়ে থাকতেন, যাতে তাঁর সমস্ত হাড় নিজ নিজ জায়গায় বসে যায়, অতঃপর দাঁড়াতেন। অতঃপর দ্বিতীয় রাক‘আতেও এরূপ করতেন। অতঃপর যখন দুই রাক‘আত পড়ে দাঁড়াতেন, তখনও তাকবীর বলতেন এবং দুই হাত উঠাতেন, এমনকি হস্তদ্বয়কে দুই কাঁধ বরাবর করতেন, যেভাবে ছালাত আরম্ভ করতেন, তাকবীর বলতেন। অতঃপর তিনি এইরূপ করতেন তাঁর অবশিষ্ট ছালাতে, অবশেষে যখন শেষ সিজদায় পৌঁছতেন, যার পরে সালাম ফিরাতে হয়, তখন বাম পা ডান দিকে বাড়িয়ে দিতেন এবং বাম নিতম্বের উপর চেপে বসতেন, অতঃপর সালাম ফিরাতেন। তখন তাঁরা (ছাহাবীগণ) বলে উঠলেন, সত্য বলেছেন, রাসূল রাযিয়াল্লাহু আনহু এভাবেই ছালাত পড়তেন। আর তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ এই মর্মে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী বলেছেন, ইহা হাসান ছহীহ হাদীছ।[30]

আবু দাঊদের অপর বর্ণনায় আবু হুমাইদের হাদীছে এটাও আছে, অতঃপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকূ করলেন এবং দুই হাত দুই জানুর উপর রাখলেন যেন তাদেরকে (মযবূত করে) ধরেছেন, এসময় তিনি উভয় হাতকে ধনুকের ন্যায় করলেন এবং তাদেরকে দূরে রাখলেন দুই পার্শ্ব হতে। আবু হুমাইদ আরও বলেন, অতঃপর তিন সিজদা করলেন এবং নাক ও কপালকে ভালভাবে যমীনে ঠেকালেন এবং দুই হাত দুই পাঁজর হতে দূরে রাখলেন, এসময় তিনি দুই হাত যমীনে স্থাপন করলেন, দুই কাঁধ বরাবর (বাইরে নয়) এবং দুই ঊরুকে ফাঁক করে রাখলেন (অর্থাৎ) পেটকে ঊরুদ্বয়ের উপরে ঠেকালেন না, এভাবে তিনি সিজদা শেষ করলেন। অতঃপর বসলেন, বাম পা বিছিয়ে দিলেন এবং ডান পায়ের অগ্রভাগকে ক্বিবলার দিকে মুড়িয়ে দিয়ে এবং ডান হাতকে ডান জানুর উপরে ও বাম হাতকে বাম জানুর উপরে স্থপন করলেন এবং শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করলেন।

আবু দাঊদের অপর বর্ণনায় আছে, যখন তিনি দুই রাক‘আতের পর বসতেন, তখন বসতেন বাম পায়ের পেটের উপরে এবং খাড়া করে রাখতেন ডান পা আর যখন তিনি চতুর্থ রাক‘আতে পৌঁছতেন, তখন বাম নিতম্বকে যমীনে ঠেকাতেন এবং উভয় পা একদিক দিয়ে বের করে দিতেন (অর্থাৎ ডান দিক দিয়ে)।[31]

عَنِ الْحَسَنِ قَالَ كَانَ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَرْفَعُونَ أَيْدِيَهُمْ إِذَا رَكَعُوْا وَإِذَا رَفَعُوْا رُءُوْسَهُمْ مِنَ الرُّكُوْعِ كَأَنَّمَا أَيْدِيهِمْ مَرَاوِحُ.

হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাহাবীগণ যখন রুকূ করতেন এবং রুকূ হতে তাদের মাথা উঠাতেন, তখন তারা রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন। তাদের হাতগুলো পাখার মত মনে হত।[32] এই হাদীছ প্রমাণ করে, ছাহাবীগণ রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন। অতএব রাফ‘উল ইয়াদাঈনের হাদীছ রহিত হয়ে গেছে- একথা বড় মিথ্যাচার।

عَنْ سَعِيْدِ بْنِ جُبَيْرٍ أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ رَفْعِ الْيَدَيْنِ فِى الصَّلَاةِ فَقَالَ هُوَ شَىْءٌ يُزَيِّنُ بِهِ الرَّجُلُ صَلَاتَهُ كَانَ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَرْفَعُوْنَ أَيْدِيَهُمْ فِى الاِفْتِتَاحِ وَعِنْدَ الرُّكُوْعِ وَإِذَا رَفَعُوْا رُءُوْسَهُمْ.

সাঈদ ইবনে জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদাঈন করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটা এমন একটা কর্ম, যার দ্বারা মুছলস্নী তার ছালাতকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাহাবীগণ ছালাত শুরু করার সময় এবং রুকূ থেকে মাথা উঠানোর সময় রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন।[33] এই হাদীছ প্রমাণ করে, ছাহাবীগণ রাফ‘উল ইয়াদাঈন করতেন। অতএব রাফ‘উল ইয়াদাঈনের হাদীছ মানসূখ হয়ে গেছে একথা ছাহাবীগণের উপর অপবাদ।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ وَإِذَا كَبَّرَ لِلرُّكُوْعِ وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ رَفَعَهُمَا كَذَلِكَ وَقَالَ: سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ وَكَانَ لَا يَفْعَلُ ذَلِكَ فِي السُّجُوْدِ.

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাত শুরু করতেন, তখন উভয় হাত তাঁর কাঁধ বরাবর উঠাতেন। আর যখন রুকূতে যাওয়ার জন্য তাকবীর বলতেন এবং যখন রুকূ হতে মাথা উঠাতেন, তখনও একইভাবে দু’হাত উঠাতেন এবং سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ বলতেন। কিন্তু সিজদার সময় এমন করতেন না।[34]

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا قَامَ فِى الصَّلَاةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يَكُوْنَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ وَكَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ حِيْنَ يُكَبِّرُ لِلرُّكُوْعِ وَيَفْعَلُ ذَلِكَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ وَيَقُولُ « سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ » وَلَا يَفْعَلُ ذَلِكَ فِى السُّجُوْدِ.

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, তিনি যখন ছালাতের জন্য দাঁড়াতেন, তখন উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন এবং যখন তিনি রুকূর জন্য তাকবীর বলতেন, তখনও এ রকম করতেন। আবার যখন রুকূ হতে মাথা উঠাতেন, তখনও এমন করতেন এবং سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলতেন। তবে সিজদার সময় এরকম করতেন না।৩৫

عَنْ أَبِىْ قِلَابَةَ أَنَّهُ رَأَى مَالِكَ بْنَ الْحُوَيْرِثِ إِذَا صَلَّى كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَرْكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ رَفَعَ يَدَيْهِ وَحَدَّثَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم صَنَعَ هَكَذَا .

আবু ক্বিলাবাহ রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি মালিক ইবনু হুয়াইরিছ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখেছেন, তিনি যখন ছালাত আদায় করতেন, তখন তাকবীর বলতেন এবং তাঁর দু’হাত উঠাতেন। আর যখন রুকূ করার ইচ্ছা করতেন, তখনও তাঁর উভয় হাত উঠাতেন, আবার যখন রুকূ হতে মাথা উঠাতেন, তখনও তাঁর উভয় হাত উঠাতেন এবং তিনি বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করেছেন।৩৬

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ رَأَيْتُ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم افْتَتَحَ التَّكْبِيْرَ فِى الصَّلَاةِ فَرَفَعَ يَدَيْهِ حِيْنَ يُكَبِّرُ حَتَّى يَجْعَلَهُمَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ وَإِذَا كَبَّرَ لِلرُّكُوْعِ فَعَلَ مِثْلَهُ وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَعَلَ مِثْلَهُ وَقَالَ « رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ » وَلَا يَفْعَلُ ذَلِكَ حِيْنَ يَسْجُدُ وَلَا حِيْنَ يَرْفَعُ رَأْسَهُ مِنَ السُّجُوْدِ . 

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাকবীর দিয়ে ছালাত শুরু করতে দেখেছি, তিনি যখন তাকবীর বলতেন, তখন তাঁর উভয় হাত উঠাতেন এবং কাঁধ বরাবর করতেন আর যখন রুকূর তাকবীর বলতেন, তখনও এরকম করতেন। আবার যখন سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলতেন, তখনও এরকম করতেন এবং رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْد বলতেন। কিন্তু সিজদাতে যেতে এরকম করতেন না আর সিজদা হতে মাথা উঠাবার সময়ও এমন করতেন না।৩৭

عَنْ نَافِعٍ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ إِذَا دَخَلَ فِى الصَّلَاةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَامَ مِنَ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ وَرَفَعَ ذَلِكَ ابْنُ عُمَرَ إِلَى نَبِىِّ اللهِ صلى الله عليه وسلم.

নাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা যখন ছালাত শুরু করতেন, তখন তাকবীর বলতেন এবং দু’হাত উঠাতেন আর যখন রুকূ করতেন, তখনও দু’হাত উঠাতেন। অতঃপর যখন سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলতেন, তখনও দু’হাত উঠাতেন এবং দুই রাক‘আত আদায়ের পর যখন দাঁড়াতেন, তখনও দু’হাত উঠাতেন। ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা এসব কাজ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন বলে জানিয়েছেন।৩৮

(চলবে)


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৯, ৭৪১, ৭৪৫।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৭, ৭৩৯।

[3]. বায়হাক্বী, তুহফাতুল আহওয়াযী, ২/৯৫ পৃঃ।

[4]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/২৪৪৬।

[5]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/২৪৪৫।

[6]. আবুদাঊদ, হা/৭৪৮।

[7]. বায়হাক্বী কুবরা, হা/২৬৩৬।

[8]. মুসনাদে ইয়ালা, হা/৫০৩৯।

[9]. আবুদাঊদ, হা/৭৪৯।

[10]. যঈফ আবুদাঊদ, হা/৬৪০; আল-মুসনাদুল মাওযূঈ আল-জামে‘ লিল কিতাবিল আশরাহ, ১১/১১০ পৃঃ।

[11]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৪৩।

[12]. বায়হাক্বী, হাদীছটি যঈফ; সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৪৮।

[13]. ত্বাহাবী, হা/১৩৫৭।

[14]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৪৩।

[15]. ইবনে হিববান, ৩/৪৬ পৃঃ।

[16]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৫৬৮।

[17]. তানক্বীহ, পৃঃ ২৮২। হাদীছটি বাতিল।

[18]. সিলসিলা যঈফাহ, ২/৪১ পৃঃ। হাদীছটি জাল।

[19]. মুসনাদে ইমাম আযম, হা/৮০১।

[20]. ইরওয়াউল গালীল, ২/২৭৮ পৃঃ।

[21]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/২৪৫৭; ত্বাহাবী, হা/২৬৩৭।

[22]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৯৪৩; নায়লুল আউত্বার, ২/২১০ পৃঃ

[23]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/২৪৬১, হাদীছটি মুনকার বা যঈফ।

[24]. আবুদাঊদ, হা/৭৪৪।

[25]. ত্বাহাবী, হা/১৩৬৪।

[26]. তুহফাতুল আহওয়াযী, পৃঃ ৯৫।

[27]. উমদাতুল ক্বারী, ৯/৫ পৃঃ।

[28]. ছহীহ বুখারী, ১/১০২-এর টীকা দ্রষ্টব্য।

[29]. তালখীছুল হাবীর, হা/৩২৭।

[30]. আবুদাঊদ, হা/৭৩০, ৯৬৩; দরেমী, হা/১৩৯৬, তিরমিযী, হা/৩০৪; ইবনে মাজাহ, হা/১০৬১; মিশকাত, হা/৮০১।

[31]. আবুদাঊদ, হা/৭৩১-৭৩৫; মিশকাত, হা/৮০১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৭৪৫।

[32]. বায়হাক্বী কুবরা, হা/২৬২৬।

[33]. বায়হাক্বী কুবরা, হা/২৬২৭।

[34]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৫; নাসাঈ, হা/১০৫৯; ইবনে হিববান, হা/১৮৬১; দারেমী, হা/১২৮৫; মিশকাত, হা/৭৯৩।

[35]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৬, (আধুনিক প্রকাশনী, হা/৬৯২; ইসলামিক ফাউ--শন, হা/৭০০)।

[36]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯১।

[37]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৮, (আধুনিক প্রকাশনী, হা/৬৯৪; ইসলামিক ফাউ--শন, হা/৭০২)।

[38]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৯; আবুদাঊদ, হা/৭৪১; বায়হাক্বী কুবরা, হা/২৮৪১।

Magazine