ভূমিকা :
জাহেলিয়াতের যুগ থেকে চলে আসছে নারীদের উপর নির্যাতন। জাহেলি সমাজে নারীদের কোন মূল্য ছিল না। তারা ছিল ভোগ বিলাসের বস্তু। ইচ্ছা হলে গ্রহণ করত, ইচ্ছা হলে ছেড়ে দিত। তাদের কোন মর্যাদা ছিল না। তারা ছিল সমাজে নির্যাতিত ও অবহেলিত। তাদের মানুষ হিসাবে কোন অধিকার ছিল না। ইসলাম আসার পর নারীকে এই নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে নারীদের কোন মূল্যই ছিল না, সেখানে ইসলাম নারীকে মূল্য দিয়েছে। যেখানে নারীরা বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিল, সেখানে ইসলাম নারীকে বেঁচে থাকার পথ দেখিয়েছে। যে সমাজে পুরুষের কাছে নারীর কোন মূল্য ছিল না, ইসলাম সে সময় তাদেরকে পুরুষের পরিপূরক বানিয়ে নারীর মান-মর্যাদা উন্নীত করেছে।
জাহেলি যুগে নারীর অবস্থান :
মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুঅতপ্রাপ্তির পূর্ব যুগকে আইয়্যামে জাহেলিয়া (الأيام الجاهلية) বা অন্ধকার যুগ বলা হয়। আইয়্যাম (الأيام) অর্থ- যুগ এবং জহেলিয়া (الجاهلية) অর্থ- অন্ধকার, কুসংস্কার, বর্বরতা, অজ্ঞতা। যে যুগে আরব দেশে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মীয় অনুভূতি হারিয়ে গিয়েছিল, সে যুগকেই অন্ধকার যুগ বলা হয়। তবে অন্ধকার যুগের সময়কাল সম্বন্ধে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এই অন্ধকার যুগে নারীর অবস্থা কেমন ছিল? তাদের কী করা হত? তাদের অবস্থান কোথায় ছিল, তা আমরা জানব।
জাহেলী সমাজে নারীর স্থান ছিল অতি নিম্নে। সামাজিক মর্যাদা বলতে তাদের কিছুই ছিল না। নারী ছিল ভোগ বিলাসের সামগ্রী ও অস্থাবর সম্পত্তির মত। অবৈধ প্রণয়, অবাধ মেলামেশা ও একই নারীর বহু স্বামী গ্রহণ প্রথা ব্যাপক ছিল। ব্যভিচার এত জঘন্য আকার ধারণ করেছিল যে, স্বামীর অনুমতিক্রমে কিংবা স্বামীর নির্দেশে অথবা পুত্র সন্তানের আশায় নারীরা বহু পুরুষের সান্নিধ্যে গমন করত। বিষয় সম্পত্তিতে স্ত্রীর কোন অধিকার ছিল না। গৃহপালিত পশুর মত ব্যবহার করা হত নারীদেরকে। নারীও যে মানুষ একথা তাদের স্মরণে আসত না। কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাকে জীবন্ত কবরস্থ করা হত। এমনকি কন্যা সন্তান জন্মদানকারী মাতার ভাগ্যেও নেমে আসত কঠিন অত্যাচারের তীব্র কষাঘাত। নারীরা শুধু ছিল ভোগ বিলাসের বস্তু। নারীর কোন মূল্য ছিল না জাহেলী যুগে। আল্লাহ তা‘আলা সেই জাহেলী সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيْمٌ - يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُوْنٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُوْنَ.
‘তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়, তার গস্নানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে; সে চিন্তা করে যে, হীনতা সত্ত্বেও সে তাকে রেখে দিবে, না মাটিতে পুঁতে দিবে। সাবধান! তারা যা সিন্ধান্ত নেয়, তা কতই না নিকৃষ্ট’ (নাহল ১৬/৫৮-৫৯)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ، بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ ‘যখন জীবন্ত প্রথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল’ (তাকবীর, ৮-৯)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,إِنَّ اللهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوْقَ الْأُمَّهَاتِ وَوَأْدَ الْبَنَاتِ وَمَنَعَ وَهَات ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর তোমাদের মাতাদের অবাধ্যতা, কন্যাদেরকে জীবন্ত পুঁতে দেওয়া এবং কৃপণতা হারাম করেছেন’।[1] উক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায়, জাহেলী যুগে নারীর অবস্থান কতটা করুণ, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ছিল।
ইসলামে নারীর অবস্থান :
ইসলাম ব্যতীত কোন ধর্ম বা জাতি নারীর সঠিক মর্যাদা দিতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক ধর্ম ও জাতির লোকেরা নারী শব্দটাকেই ঘৃণা করত। নারীদের যথাযথ সম্মান ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করত। অপরপক্ষে ইসলামই সর্বপ্রথম নারীর মর্যাদা দান করেছে, তাদের নিরাপত্তা দিয়েছে; পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার বানিয়েছে। ইসলাম যেভাবে নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, তার কিছু দৃষ্টান্ত সংক্ষেপে পেশ করা হল :
(১) কন্যা হিসাবে :
ইসলাম পুত্রের তুলনায় কন্যাকে কোন অংশে খাঁটো করে দেখেনি। বরং অপেক্ষাকৃত নারীকে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَا مِنْ رَجُلٍ تُدْرِكُ لَهُ ابْنَتَانِ فَيُحْسِنُ إِلَيْهِمَا مَا صَحِبَتَاهُ أَوْ صَحِبَهُمَا إِلَّا أَدْخَلَتَاهُ الْجَنَّةَ ‘কোন ব্যক্তির দু’টি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করলে তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে’।[2] অন্য হাদীছে এসেছে,
عُقْبَةَ بْنَ عَامِرٍ يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ مَنْ كَانَ لَهُ ثَلاَثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ وَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَتِهِ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
উক্ববা ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কারো তিনটি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করলে, যথাসাধ্য তাদের পানাহার করালে ও পোশাক-আশাক দিলে, তারা ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে অন্তরায় হবে।[3] রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ وَضَمَّ أَصَابِعَهُ ‘যে ব্যক্তি দু’টি কন্যার লালন-পালন করবে, তাদের পূর্ণ বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, ক্বিয়ামতের দিন সে আমার সাথে এভাবে আসবে। এ বলে তিনি নিজের আঙ্গুলসমূহ একত্রিত করে দেখালেন’।[4]
উক্ত হাদীছগুলো থেকে বুঝা যায় যে, ইসলাম নারীর মর্যাদাকে উন্নত করেছে; কন্যা সন্তানের লালন-পালনের বিনিময় হিসাবে পিতা-মাতার জন্য জান্নাত বলে ঘোষণা দিয়েছে।
(২) মা হিসাবে :
ইসলাম নারীকে মা হিসাবে সম্মানিত করেছে। মায়ের মর্যাদা সবার উপরে। মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ جَاهِمَةَ السُّلَمِىِّ أَنَّ جَاهِمَةَ جَاءَ إِلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ وَقَدْ جِئْتُ أَسْتَشِيرُكَ فَقَالَ هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ قَالَ نَعَمْ قَالَ فَالْزَمْهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلَيْهَا.
মু‘আবিয়া ইবনে জাহিমা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, একদা আমার পিতা জাহিমা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি জিহাদে যেতে ইচ্ছুক। আমি আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছি। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা জীবিত আছে কি? লোকটি বলল, হ্যাঁ। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার সেবা কর, তার পায়ের তলে জান্নাত রয়েছে।[5]
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُ قِيْلَ مَنْ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তার নাক ধুলায় মলিন হোক (এ কথা তিনি তিনবার বললেন) বলা হল, সে ব্যক্তি কে, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অথবা দু’জনের একজনকে পেল (অথচ তাদের সেবা করল না) সে জান্নাত লাভ করতে পারল না।[6]
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِىْ قَالَ أُمُّكَ. قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ أُمُّكَ . قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ أُمُّكَ. قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ أَبُوْكَ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আরয করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক সৌজন্যমূলক আচরণ পাওয়ার অধিকারী কে? তিনি বললেন, তোমার মা। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা।[7]
নারী ও স্ত্রী হিসাবে :
নারী ও স্ত্রী হিসাবে ইসলাম নারীকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নারীর ওপর পুরুষের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি নারীরও অধিকার রয়েছে পুরুষের উপর’ (বাক্বারাহ, ২/২২৮)। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الدُّنْيَا كُلَّهَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ ‘সম্পূর্ণ পৃথিবী সম্পদ। আর পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তম সম্পদ হচ্ছে সৎ-চরিত্রবান নারী’।[8]
ইসলাম নারীর মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। পুত্রের ন্যায় পিতার সম্পদের উত্তরাধিকারী বানিয়েছে। পিতার সম্পদের অংশীদার করেছে। শিক্ষা গ্রহণের পথ দেখিয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রে মোহরানার ব্যবস্থা করেছে। সংসারের কাজ-কর্মের জন্য নারীকে দিয়েছে ধৈর্য।
নারীরা কেন নির্যাতিত ও অবহেলিত?
মনের মধ্যে বারবার একটাই প্রশ্ন উঁকি মারছে, তাহলে নারীরা এখন কেন নির্যাতিত? কেন তারা অবহেলিত? তাদের কেন মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে? তাদেরকে কেন ধর্ষিত হতে হচ্ছে? নারী ধর্ষণ এবং তাদের অধিকার হরণের পিছনে কারণ কী? এর উত্তরে বলা যায়, নারী জাতি যথাযথরূপে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা আল্লাহ্র দেখানো পথে না গিয়ে বক্র পথে সফর করছে। তারা ইসলামের দেওয়া নিয়ম-নীতি মেনে নিতে নারায, তাইতো তাদের উপর নিযার্তন ও অবহেলা নেমে আসছে। তারা ধর্ষিত হচ্ছে। নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আজ নারীরা অশস্নীল পত্রিকা, নিকৃষ্ট ম্যাগাজিন, উলঙ্গ সিনেমা, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট, ফাসেক্ব ও পাপিষ্ঠদের অনুসরণ করতে গিয়ে তাদের এই অবস্থা। এর জন্য যেমন বর্তমান সমাজের বিভিন্ন খারাপ দিকের দোষ আছে, ঠিক তেমন একজন নারীরও দোষ আছে। একজন নারী অশস্নীল গান-বাজনা-সিনেমা দেখে, তারপর সে ঐ সিনেমার উলঙ্গ নায়িকার অনুসরণ করে। ফলে সমাজের যুবকরা এ সকল নগ্ন-অর্ধনগ্ন মেয়েদের দেখে বিপথগামী হয়।
নারীদের নির্যাতন ও অবহেলা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় :
ইসলামের দেখানো পথ অনুসরণ করলেই একজন নারী নির্যাতন ও অবহেলা থেকে রক্ষা পেতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلَا يُبْدِيْنَ زِيْنَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِيْنَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُوْلَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِيْ أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِيْنَ غَيْرِ أُوْلِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِيْنَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ.
‘আপনি মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে, যা প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্যকে প্রকাশ না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়নাকে তাদের বুকের উপর দিয়ে পেচিয়ে রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সমন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো নিকট তাদের অবরণ প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন আবরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহ্র দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (নূর, ৩১)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,وَقَرْنَ فِيْ بُيُوْتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُوْلَى ‘তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর। প্রাচীন জাহেলী যুগের নারীদের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন কর না’ (আহযাব, ৩৩)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيْمَانِ وَالْإِيْمَانُ فِى الْجَنَّةِ ‘লজ্জা হচ্ছে ঈমান। আর ঈমান হচ্ছে জান্নাত লাভের মাধ্যম’।[9]
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, নারীরা যদি নির্যাতন ও অবহেলা থেকে রক্ষা পেতে চায়, তাহলে অবশ্যই তাদের পর্দা করে চলতে হবে। আল্লাহ্র দেওয়া নির্দেশগুলো মেনে জীবন পরিচালনা করতে হবে। অপরিচিত পুরুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوْهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوْبِكُمْ وَقُلُوْبِهِنَّ.
‘তোমরা তাদের নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটা তোমাদের এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ’ (আহযাব, ৫৩)। এই আয়াতের সারমর্ম এই যে, নারীর নিকট থেকে অন্য কোন পুরুষ কোন ব্যবহারিক পাত্র, বস্ত্র ইত্যাদি নেয়া যরূরী হলে সামনে এসে নিবে না বরং পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এতে অনেক প্রকার খারাপ কাজ হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নারীকে সম্মান প্রদর্শন করা হয়। মহান আল্লাহ আরো বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِيْنَ يُدْنِيْنَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيْبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللهُ غَفُوْرًا رَحِيْمًا.
‘হে নবী! তুমি তোমাদের স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলে দাও যে, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না’ (আহযাব, ৫৯)। এ আয়াতে স্বাধীন নারীদেরকে বিশেষভাবে পর্দার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তারা যেন তাদের চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে রাখে এবং নিজের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ ‘নারী হচ্ছে গোপন বস্ত্ত। যখন সে বাড়ী থেকে বের হয়, তখন শয়তান তাকে নগ্নতার প্রতি উদ্ধুদ্ব করে তুলে’।১০
নারী পর্দাবিহীন অবস্থায় বের হলে শয়তান তাকে পাপের প্রতি উৎসাহিত করে তোলে। ফলে সে নির্যাতনের শিকার হয়। নারী অবহেলার পাত্র হয়ে যায়। নারীর কোন মূল্য থাকে না। নারী হয়ে যায় সবার কাছে ভোগ বিলাসের বস্তু। তাই নারীকে ধর্ষণ, নির্যাতন এবং অবহেলার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই তাদেরকে ইসলামী শরী‘আতের নিয়ম অনুযায়ী চলতে হবে। পর্দার সহিত নারীকে চলতে হবে। পর্দা নারীকে বাঁচাতে পারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের হাত থেকে। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ اللَّاتِيْ لَا يَرْجُوْنَ نِكَاحًا فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتَبَرِّجَاتٍ بِزِينَةٍ وَأَنْ يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَهُنَّ وَاللهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ.
‘বৃদ্ধা নারী যারা বিবাহের আশা রাখে না, তাদের বহির্বাস পোশাক, চাদর, বোরকা ইত্যাদি খুলে রাখলে কোন অপরাধ হবে না।
তবে এটা হতে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (নূর, ৬০)। এখানেও পর্দার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নারীরা সচেতনতার মাধ্যমেও নিজেকে রক্ষা করতে পারে। এর মাধ্যমে সে তার সতীত্ব রক্ষা করতে পারে। সচেতন থাকতে হবে কখনো যেন কোন পরপুরুষ নিজের কাছে আশ্রয় নিতে না পারে। কেননা তারা যদি একবার আশ্রয় নেয়, তাহলে তোমাকে ওরা ধ্বংস করে ফেলবে। এদের কবলে পড়ে কোন নারী যদি তার অমূল্য সম্পদ হারায়, তার মর্যাদা নষ্ট হয় ও সতীত্ব চলে যায়, তাহলে তার হারানো সম্মান দুনিয়ার কেউ পুনরায় ফেরত দিতে পারবে না। সুতরাং নির্যাতনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।
উপসংহার :
নারী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। প্রথমে নারীকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে সঠিক পথের দিশা দিতে হবে। এই কলুষিত সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলে নতুন সমাজ গঠন করতে হবে। তাহলে নারী নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন- আমীন!
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৫৮১।
[2]. ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৭০।
[3]. ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৬৯; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১০২৭।
[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৩১; মিশকাত, হা/৪৯৫০।
[5]. নাসাঈ, হা/৩১০৪; মিশকাত, হা/৪৯৩৯।
[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৫১।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৭১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৪৮; মিশকাত, হা/৪৯১১।
[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৭; নাসাঈ, হা/৩২৩২; মিশকাত, হা/৩০৮৩।
[9]. আহমাদ, হা/১০৫১৯; তিরমিযী, হা/২০০৯; মিশকাত, হা/৫০৭৭।
[9]. তিরমিযী, হা/১১৭৩; মিশকাত, হা/৩১০৯।
