খুলে গেল আসল জট :
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ একই সঙ্গে একটি দৈশিক ও বৈশ্বিক সমস্যা। ইসলামের দুশমনরা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। যারা বোমাবাজি করে, আত্মঘাতী হামলা চালায়, নিরপরাধ মানুষকে খুন করে তারা কখনই প্রকৃত মুসলিম নয়। মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংস করার জন্য ইয়াহূদীদের চক্রামেত্ম যেমন চরমপন্থী খারেজীদের আবির্ভাব ঘটেছিল, তেমনি আজকেও গভীর ষড়যন্ত্রের নীলনকশা হিসাবে সাম্রাজ্যবাদী চক্রের এই দোসররা কুরআন-সুন্নাহর রক্ষাকবচ আহলেহাদীছ ও সালাফীদেরকে ধরা পৃষ্ঠ থেকে বিলীন করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে শুরু থেকেই হক্বপন্থী আলেম ওলামা ও সত্যানুসন্ধানী ইসলামী স্কলারগণ এই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা, কলম ও সংগঠনের মাধ্যমে ঐক্যের ডাক দিয়ে এসেছে। যদিচ একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল ইসলামকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসের ধর্ম বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে...তথাপি এখন সত্য প্রকাশ পাওয়ায় হক্বপন্থী আলেম ওলামার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজনেরা বলতে বাধ্য হচ্ছে যে, একমাত্র দ্বীন-ইসলামই শান্তির ধর্ম এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, আত্মঘাতী হামলা প্রভৃতিকে সমর্থন করে না; বরং হারাম ঘোষণা করে। এখন সবাই বুঝতে শুরু করেছে যে, ইসলামের নাম নিয়ে যারা এ ধরনের হামলা চালায় তারা মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত নয়, তারা বাহ্যিকভাবে নামে ও লেবাসে মুসলিম হলেও প্রকৃতপক্ষে তারা মুসলিমদের চরম শত্রু। আল-কুরআনের ভাষায়, ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; আর মিথ্যা তো বিলুপ্ত হয়েই থাকে’ (বানী ইসরাঈল ১৭/৮১)।
বক্ষ্যমান আলোচনায় সেই দীর্ঘ দিনের সত্য-মিথ্যার আসল জট খুলে যাওয়ার কয়েকটি মূল্যবান ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্ধৃতি বা বক্তব্য তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
(১) জঙ্গিবাদ প্রসারের মুখ্য দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের- সে কথা স্বীকার করেও তিনি (নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেন) যে সরল সত্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরলেন তা হল, সোভিয়েত বাহিনীকে তাড়াতে সে সময় মুসলিম দেশগুলো থেকে হাজার হাজার মুসলিম তরুণ আফগানিস্তানে গিয়েছিল মুজাহিদ বাহিনীতে নাম লেখাতে। বাংলাদেশ থেকেও গিয়েছিল কয়েক হাজার। পরবর্তী সময়ে তারা দেশে ফিরে তাদের প্রশিক্ষণ কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছেন। হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ বা হুজিবি নেতা মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীরা দেশে ফিরে সরাসরি জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালায়। বোমাবাজিতে লিপ্ত হয়। এরপরই সংঘটিত হয় উদীচী ট্রাজেডি হামলা, রমনা বটমূল হত্যাকা-, সিপিবি সমাবেশে হামলা, কোটালি পাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলে বিশাল আকারের বোমা পুঁতে রাখার ঘটনা। এরপর ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যতগুলো বোমা হামলা হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটির সঙ্গে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীরা জড়িত ছিলেন।[1]
(২) ১৯৭৯-১৯৮৯ এই দশ বছরে আফগানিস্তান থেকে রাশিয়াকে হটানোর জন্য আমেরিকা সেখানে ‘তালেবান’ সৃষ্টি করে। যা পরে ‘আল-কায়েদা’ নাম ধারণ করে। রাশিয়াকে হটানোর পর আমেরিকা ‘তালেবান’ উৎখাতে লেগে যায় এবং তাদেরকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে অভিহিত করে। এভাবে তাদের সৃষ্ট দুই প্রধান জঙ্গিগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তারা ইসলামকে জঙ্গি ধর্ম ও মুসলিমকে জঙ্গি বলে চিহ্নিত করছে।[2]
(৩) আল-কায়েদা মাও সে-তুংয়ের গেরিলা কৌশল ধারণ করে বিস্তার করছে। অপরদিকে অস্ত্র-অর্থ আর সিরিয়া ও ইরাকের কিছু ভূখণ্ডর দখলে থাকা আইএস চে গুয়েভারার ‘ফকোইস্ট’ (Focoist) কৌশল ধারণ করেছে। আর এই আগ্রাসী গেরিলা তত্ত্বের তাত্ত্বিক উদ্ভাবক ছিলেন ফ্রান্সের বিপ্লবী চিন্তাবিদ রেগিস ডেবরে (Regis Debray)। এই তত্ত্বকে শাণিত করেন গুয়েভারা কিউবার বিপ্লবে। ফকোইস্ট তত্ত্বের মূলমন্ত্র হল, সুযোগ বা পরিবেশ তৈরির অপেক্ষায় নয়; শক্তি সঞ্চয় করে টার্গেটের ওপর পূর্ণ শক্তি দিয়ে আক্রমণ রচনা করতে হবে এবং বিভিন্ন আগ্রাসী কর্মকাণ্ডর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।[3]
(৪) গত ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ তারিখে মিউনিখে নিরাপত্তা বিষয়ক এক সম্মেলনে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল বলেন, ইসলাম সন্ত্রাসবাদের উৎস নয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা আবশ্যক।[4]
(৫) গত ৬ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) ২০১৭ তারিখে ঢাকায় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে আমন্ত্রিত মেহমান পবিত্র মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীর ভাইস চেয়ারম্যান শায়খ ড. মুহাম্মদ ইবনে নাছের আল-খুযাইম এবং মসজিদে নববীর ইমাম ও খত্বীব শায়খ ড. আব্দুল মুহসিন মুহাম্মাদ আল-ক্বাসেম বলেছেন, ‘ইসলাম হল শান্তির ধর্ম। ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কোন স্থান নেই। যারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সাথে লিপ্ত তাদের সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই’।[5]
(৬) সিঙ্গাপুরের নানীয়াং টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল সেনটার ফর পলিটিকাল ভায়োলেন্স অ্যান্ড টেরোরিজম রিসার্চ-এর অধ্যাপক ড. রোহান গুনারত্নে বলেন, ইসলাম জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে এ ধারণা ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, জঙ্গিবাদের সাথে সবাই ইসলামের নাম জড়ায়। অথচ বিশ্বে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, তামিল, খ্রীস্টানসহ নানা ধর্মাবলম্বী জঙ্গি ও সন্ত্রাসী রয়েছে।[6]
(৭) গত ১০ জুলাই (বুধবার) ২০১৬ তারিখে ফ্লোরিডার সানরাইজে এক নির্বাচনী সমাবেশে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে জঙ্গি গ্রুপ ‘আইএস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং এর আগে গত সপ্তাহে ফ্লোরিডাতেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটনকে জঙ্গি গ্রুপ ‘আইএস’-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে মন্তব্য করেছেন। অবশ্য উক্ত মন্তব্যের কারণে তিনি ব্যাপক সমালোচনারও মুখোমুখি হয়েছিলেন।[7]
ফ্লোরিডায় ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে ঐ সময়ে ৯/১১-এর হামলার ঘটনা ঘটত না।[8]
(৮) একজন মুসলিমের রক্ত সমগ্র পৃথিবীর চেয়ে অধিক মূল্যবান। একজন মুসলিমকে হত্যা করা পৃথিবী ধ্বংস করার শামিল। কাজেই জঙ্গিবাদীদের কর্মকা- ইসলামে বৈধ হওয়ার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।[9]
(৯) জঙ্গিদের কোন সুস্থ পারিবারিক জীবন থাকে না। পরিবার থেকে এরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিবার এবং সমাজ জঙ্গিদের ঘৃণার চোখে দেখে। জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসাবে রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় ধারণার সঠিক ব্যাখ্যা প্রদানের লক্ষ্যে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচার মাধ্যমগুলোকে তৎপর হতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। কেননা সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে কেউ জঙ্গি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে না।[10]
(১০) গত ২৩ জুন (শুক্রবার) ২০১৭ তারিখে বিকালে আল-কুদস কমিটি বাংলাদেশের উদ্যোগে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে আল-কুদস দিবস উদযাপনের গুরুত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে মুসলিম বিশ্বকে ধ্বংস করার জন্য ‘আইএস’ সৃষ্টি করা হয়েছে। আমেরিকা মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে একে অপরের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দিচ্ছে। কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে সেই অস্ত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে’। তিনি আরও বলেন, ‘মুসলিম রাষ্ট্রের কাছে এটম বোমা থাকলে অবৈধ, আর বিশ্বের মোড়লদের কাছে থাকলে সেটা বৈধ’ এই নীতি আমরা মানি না।[11]
(১১) ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানকারী জীবন ব্যবস্থা। যেখানে সন্ত্রাসের কোন স্থান নেই। ইসলাম ও সন্ত্রাসের মধ্যে দূরত্ব এমন, যেমন আসমান ও যমীনের দূরত্ব। মৌলিকত্ব, সংজ্ঞা, কারণ, প্রকারভেদ, ফলাফল, উদ্দেশ্য এবং শরী‘আতের আলোকে বিধানগত দিক থেকে সন্ত্রাসবাদ ও জিহাদ সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ জিহাদ আইনসম্মত বিষয়। আর সন্ত্রাস হারাম। কেননা সন্ত্রাস মানেই সীমালঙ্ঘন।[12]
(১২) সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘দোষারোপের রাজনীতি না করে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের সমস্যাকে জাতীয়ভাবে মোকাবিলার জন্য আমি ক্ষমতাসীনদের প্রতি আবারো আহবান জানাচ্ছি। দেশের সকলকে আমি ঐ সমস্যা নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুরোধ করছি’।[13]
(১৩) গত ২৪ মার্চ (শুক্রবার) ২০১৭ তারিখে রাজধানীর জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) অডিটরিয়ামে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘ফাজিল অনার্স শিক্ষার মান উন্নয়ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘মাদরাসা জঙ্গিবাদের কারখানা, এটি সঠিক নয়। এই কথা মোটেও বলবেন না। কারণ গুলশান হামলার সঙ্গে জড়িতদের কেউ মাদরাসার ছাত্র ছিল না’।[14]
সকল বিশিষ্টজনের বক্তব্য এখানে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে এটা জানা কথা যে, জ্ঞানীদের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। তারপরেও সত্যানুসন্ধানী পাঠককে মাসিক ‘আল-ইতিছাম’ (কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা) পত্রিকার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য আহবান জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ :
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওলামা-মাশায়েখ মহা সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কেউ যাতে ইসলাম ধর্মকে হেয় করে কথা বলতে না পারে, এর জন্য আমাদের সোচ্চার হতে হবে। যারা জঙ্গিবাদে বিশ্বাস করে, তাদের ধর্ম নেই, দেশ নেই, সীমানা নেই, জঙ্গিবাদটাই তাদের ধর্ম। তারা ভুল পথে যাচ্ছে এটা আমাদের পবিত্র ইসলামের কথা। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সঊদী বাদশাহ সালমান ইবনে আব্দুল আযীযের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে যে কোন পদক্ষেপে বাংলাদেশ সঊদী আরবের পাশে আছে এবং একসঙ্গে কাজ করবে। তিনি বলেন, আমি মনে করি, আজকে একটা মহল থেকে আমাদের পবিত্র ধর্মকে কলুষিত করার জন্য চক্রান্ত চলছে। যদি প্রশ্ন করি, এই যে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ তাতে লাভবান হয় কারা? যারা অস্ত্র তৈরি করে, বিক্রি করে তারা লাভবান হয়। কিন্তু কার লাভের জন্য মুসলমান মুসলমানদের রক্ত নিচ্ছে, হত্যা করছে। মুসলমানদের রক্তের বিনিময়ে অন্যরা লাভবান হচ্ছে, এটা কী ধরনের কথা! এটাই বলতে চাই, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনের জন্য বাংলাদেশ সবসময় সঊদী বাদশাহর পাশে থাকবে এবং এক হয়ে কাজ করবে। যাতে আমাদের পবিত্র ধর্মের সম্মান কেউ ক্ষুণ্ণ করতে না পারে’।[15]
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহু পূর্বেই শায়খ মুযাফফর বিন মুহসিন উপরিউক্ত বক্তব্য জনতার মাঝে পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোন মুসলিম ব্যক্তি জঙ্গি হতে পারে না।পাশ্চাত্যের খুদকুঁড়ো দেশদ্রোহী কতিপয় মিডিয়া ‘ইসলামী জঙ্গি’ বা ‘মুসলিম জঙ্গি’ নামে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তা ইসলামকে কলঙ্কিত করার শামিল। এই শব্দগুলো বিশ্ব সন্ত্রাসী আমেরিকা, বৃটেনের তৈরি। তারাই অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে এই গোষ্ঠী তৈরি করেছে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করছে। কারণ যে জঙ্গি, সে তো জঙ্গিই। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সাথে তার কোন যোগসূত্র নেই। মূলত ইসলামের বিরুদ্ধে এটি একটি আন্তার্জাতিক ষড়যন্ত্র। ইহুদী-খ্রীস্টান সাম্রাজ্যবাদের নীল নকশা’।[16]
শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ বলেছেন, ‘‘জঙ্গিবাদীরা ধর্মের নামে যে বর্বরোচিত ভয়াবহ কর্মকা- করে থাকে তা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। ইসলাম বিরোধী এসব নাশকতামূলক কর্মকা-কে রুখে দাঁড়ানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কারণ তারা ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে অনৈসলামিক কাজ করে ইসলামের নিষ্কলুষ আদর্শকে বিশ্বের দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারা কুরআনের অপব্যাখ্যা করে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে’।[17]
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য শুরু থেকেই দেশ-বিদেশে বলেছেন, ইসলামের সাথে জঙ্গিবাদের কোন সম্পর্ক নেই, ইসলাম সন্ত্রাস- জঙ্গিবাদ ও আত্মঘাতী হামলা সমর্থন করে না। যেভাবেই হোক, এই বর্বরোচিত হত্যাকা- আমাদেরকে বন্ধ করতেই হবে। ঢাকায় জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা চাই না, আমাদের দেশটা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হোক, যেভাবেই হোক এগুলো বন্ধ করতেই হবে’।[18]
জঙ্গি দমনে যতটা প্রয়োজন ততটাই কঠোর হবে সরকার, এমন প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের। দেশে জঙ্গিবাদের দানব যখন তার ভয়াল থাবা বিস্তারের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, তখন সরকারের কঠোরতাও উল্লেখ করার মত। তাই জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমন ও নির্মূল করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার যে ত্বরিত ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিচ্ছে....... সেজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
উল্লেখ্য যে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আহলেহাদীছ ও সালাফী ওলামা-মাশায়েখের দৃঢ় অবস্থান সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠা সত্ত্বেও তাঁদেরকে সাম্প্রতিক জঙ্গি তৎপরতার সাথে সম্পৃক্ত করার গভীর ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আহলেহাদীছ ও সালাফীগণ কোন চরমপন্থী আন্দোলনে বিশ্বাস করে না। এরা কখনো জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী নয়। এরা কখনই কোন সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না। মানুষকে জবরদস্তি করে, পিটিয়ে, হত্যা করে, রাইফেলের ভয় দেখিয়ে, বোমা মেরে কস্মিনকালেও এরা মানুষকে হেদায়াতের দা‘ওয়াত দেয় না। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) যে তরীকায় মানুষকে আহবান করেছেন, সেই তরীকায় এরা মানুষকে আহবান করে।
‘আহলেহাদীছগণ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নিঃশর্ত অনুসারী। তাই তাদের সেই অভ্রান্ত পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য সদা-সর্বদা আহলেহাদীছ বিদ্বেষী মহল খড়গহস্ত। তারা যে কোন মূল্যে আহলেহাদীছদেরকে ছিরাতে মুস্তাক্বীমের পথ থেকে ভ্রষ্ট পথের দিকে ধাবিত করার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা অনেক হীন পরিকল্পনা আঁটলেও মহান আল্লাহ আহলেহাদীছদেরকে এসব মরণ ফাঁদ থেকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেন’।[19]
উপসংহার :
আমরা চাই, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ চিরতরে নির্মূল হোক। কেননা এই অপশক্তি অনেক নিরপরাধ ও নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এবং দেশবাসীকে করে রেখেছে আতঙ্কগ্রস্ত। একটি শান্তিপূর্ণ দেশ জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হবে তা কখনো কাম্য হতে পারে না। যুগোপযোগী মানসম্মত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ’ (রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এবং কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা মাসিক ‘আল-ইতিছাম’-এর প্রধান সম্পাদক শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ বলেছেন, ‘বর্তমানে যারা ধর্মের নামে বিভিন্ন স্থানে বোমা মারার হুমকি দিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করছে এবং নির্বিচারে মানুষকে বোমা মেরে হত্যা করছে, তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয়। তাদেরকে ইসলামী দলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে তাদেরকে কোন সহযোগিতা করা যাবে না, তাদেরকে কোন প্রকার আশ্রয়ও দেয়া যাবে না; বরং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে’।[20]
[1]. দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ মে ২০১৬ (এখনো জঙ্গীবাদের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান), পৃঃ ১০।
[2]. মাসিক আত-তাহরীক, ২০তম বর্ষ, ৫ম সংখ্যা (ফেব্রুয়ারী ২০১৭), পৃঃ ৪৪।
[3]. দৈনিক প্রথম আলো, ৯ মে ২০১৬ (আল-কায়েদা ও আইএস : কতখানি ঝুঁকিতে আমরা?, এম সাখাওয়াত হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক), পৃঃ ১০।
[4]. মাসিক আল-ইতিছাম, ১ম বর্ষ, ৫ম সংখ্যা (মার্চ ২০১৭), পৃঃ ৪৬।
[5]. দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ এপ্রিল ২০১৭, পৃঃ ১১।
[6]. মাসিক আল-ইতিছাম, ১ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা (এপ্রিল ২০১৭), পৃঃ ৪৮-৪৯।
[7]. www.banglatribune.com/foreign/news/130291.
[8].www.kalerkantho.com/online/world/2016/08/04/389561.
[9]. কে বড় লাভবান, আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ (দ্বিতীয় সংস্করণ : ডিসেম্বর ২০১১ ঈসায়ী), পৃঃ ১৮০।
[10]. সমাজবিজ্ঞান-দ্বিতীয় পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী (আইডিয়াল বুকস ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ : ২০১৫), পৃঃ ২০০।
[11].amardesh24.com/bangla/index.php/details/nationalnews/10762.
[12]. আল ‘আক্বায়েদ ওয়াল ফিক্বহ, দাখিল নবম-দশম শ্রেণী (বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ঢাকা, পুনঃমুদ্রণ : আগস্ট ২০১৬), পৃঃ ৮-৯।
[13]. www.ittefaq.com.bd/politics/2017/03/28/109243.
[14]. মাসিক আল-ইতিছাম, ১ম বর্ষ, ৭ম সংখ্যা (মে ২০১৭), পৃঃ ৪৭।
[15]. দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ এপ্রিল ২০১৭, পৃঃ ১১।
[16]. ভ্রামিত্মর বেড়াজালে ইক্বামতে দ্বীন, মুযাফফর বিন মুহসিন (বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, দ্বিতীয় সংস্করণ : জুলাই ২০১৪), পৃঃ ৭১।
[17]. কে বড় লাভবান, আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ (দ্বিতীয় সংস্করণ : ডিসেম্বর ২০১১ ঈসায়ী), পৃঃ ১৭৮।
[18]. www.bbc.com/bengali/news/2016/07/160726_sheikh _hasina_on_kallyanpur_attack.
[19]. ইসলামের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাস, ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর (আছ-ছিরাত প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ : ২০১৪ ঈসায়ী), পৃঃ ৪৩।
[20]. কে বড় লাভবান, আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ (দ্বিতীয় সংস্করণ : ডিসেম্বর ২০১১ ঈসায়ী), পৃঃ ১৮৫।
