কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

পবিত্র কুরআন-ই সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী গ্রন্থ

উপক্রমণিকা :

পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহর শাশ্বত বিধান। মানবজাতির পার্থিব কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য আল্লাহ জিবরীল (আঃ)-এর মাধ্যমে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি সুদীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ এ কুরআন নাযিল করেছেন। পৃথিবীতে কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যেখানে সত্য-মিথ্যার লেশমাত্র নেই। এই কুরআন বিশুদ্ধ, নির্ভেজাল, শাশ্বত, অবিকৃত ও চিরন্তন গ্রন্থ। মানবজাতির হেদায়াতের মূল উৎস এই কুরআন। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহ সকল দিক ও বিভাগে কুরআনের সমাধানই চিরন্তন ও চিরস্থায়ী। কুরআন আরবী সাহিত্যাকাশে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক স্বরূপ। শব্দের গাঁথুনি, বাক্যের অলংকার, ভাবের ব্যঞ্জনা, বালাগাত-ফাছাহাতে পরিপূর্ণ উন্নত সাহিত্যের এক অনন্য দিক-নির্দেশক হল এই কুরআন। সাহিত্যগর্ভী আরব জাতির উন্নত সাহিত্য জ্ঞানের লালিত অহংকারকে এই কুরআনই চূর্ণ করে দিয়েছিল। এটিই আল্লাহ প্রদত্ত চূড়ান্ত সংবিধান। সকল সমস্যার সমাধান এখানে মওজূদ রয়েছে। তাই কুরআন সম্পর্কে সকল মুসলিমের জ্ঞান থাকা কর্তব্য। নিমেণ সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী গ্রন্থ হিসাবে পবিত্র কুরআনের মূল্যায়ন কতটুকু সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হল।

কুরআনের অর্থ :

কুরআন আরবী শব্দ, যা قرء মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। আর اسم مفعول হিসাবে অর্থ হবে পঠিত বা যা পাঠ করা হয়। এই قرآن শব্দটি فُعْلَانٌ-এর ওযনে قرن থেকে আসলে অর্থ হবে সন্নিবেশিত, মিলিত।[1]

ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায় কুরআন হল-

هو كلام اللّه المعجز المنزّل على النّبي محمد ﷺ باللفظ العربي المكتوب في المصاحف المتعبّد بتلاوته المنقول بالتواتر المبدوء بسورة الفاتحة المختوم بسورة الناس.

এটি আল্লাহর চিরন্তন বাণী, যা নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর আরবী ভাষায় নাযিলকৃত, মু‘জিযাহ, মুছহাফে যা লিপিবদ্ধ, যার তেলাওয়াত ইবাদত এবং বর্ণনা মুতাওয়াতির পর্যায়ের, যার শুরু সূরা ফাতিহা ও শেষ সূরা নাস দ্বারা।[2]

সূরা ও আয়াতের প্রকার ও বৈশিষ্ট্য :

কুরআনের সূরা ও আয়াতসমূহ সাধারণত দুই প্রকার, যথা: (১) মাক্কী ও (২) মাদানী।

মাক্কী সূরার বৈশিষ্ট্য :

(১) মাক্কী সূরা ও আয়াতসমূহ আকারে ছোট (২) ইসলামের মৌলিক আক্বীদা, বিশ্বাস, তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, শিরক, কুফর, জান্নাত-জাহান্নাম, হিসাব-নিকাশ ইত্যাদির উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে (৩) يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا হে মানবম-লী’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে (৪) ‘কাল্লা’ শব্দের আধিক্য দেখা যায় (৫) আদম (আঃ), শয়তান ও অতীত নবী-রাসূলগণের ইতিহাস অধিক বর্ণিত হয়েছে।[3]

মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য :

১. মাদানী সূরা ও আয়াতসমূহ আকারে দীর্ঘ ও বড় (২) হে ঈমানদারগণ! বলে সম্বোধন করা হয়েছে (৩) আহকামে শরী‘আহ, হারাম, হালাল, বিবাহ, তালাক, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন প্রভৃতি ব্যবহারিক জীবনের বিশুদ্ধ আলোচনা করা হয়েছে (৪) উত্তরাধিকার আইন, জিহাদ, রাষ্ট্রীয় আইন-ক্বানূন, আন্তর্জাতিক আইন ইত্যাদির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।[4] 

পবিত্র কুরআনের নামসমূহ :

আল্লাহ কুরআনে কারীমের পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি তুলে ধরার জন্য কুরআনের বিভিন্ন সূরায় এ মহাগ্রন্থকে ‘কুরআন’ ছাড়াও আরো ৩৩টি নামে অভিহিত করেছেন। যেমন : আল-ফুরক্বান, আল-কিতাব, আয-যিক্র, আল-হূদা, আল-হাকীম, আল-হিকমা, আল-বায়ান, আল-বুরহান, আন-নূর, আল-হক্ব ইত্যাদি।[5]

কুরআনের সংখ্যাতাত্বিক পরিসংখ্যান :

পবিত্র কুরআনে ৩০টি পারা, ১১৪টি সূরা রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় সূরা বাক্বারাহ, যার আয়াত ২৮৬টি এবং ছোট সূরা কাওছার, যার আয়াত ৩টি। মোট আয়াত সংখ্যা ৬২০৪-৬২৩৬টি, শব্দ ৭৭৪৩৯টি, বর্ণ ৩,৪০,৭৫০টি (কুরতুবী)[6] মাক্কী সূরা ১৫টি, মনযিল ৭টি। প্রথম নাযিলকৃত পূর্ণাঙ্গ সূরা ফাতিহা ও শেষ সূরা নাছর। প্রথম নাযিলকৃত সূরা আলাক্ব ১-৫ আয়াত ও শেষ বাক্বারাহ ২৮১। মর্যাদাপূর্ণ আয়াত বাক্বারাহ ২৫৫ আয়াত (আয়াতুল কুরসী), ছালাতের আয়াত ৮২টি, যাকাত ৮টি।[7] যের ২৯৫৮২টি, যবর ৫২২৪৩টি, পেশ ৮৮০৪টি, তাশদীদ ১২৭৪টি, মাদ্দ ১৭৭১, নুকত্বা ১০৫৬৮৪টি, আল্লাহ শব্দটি ২৫৮৪ বার, মু্হাম্মাদ ৪ বার, ছালাত ও যাকাত-এর বিধান ১৫০টি আয়াত।[8] আরবীসহ কুরআনে আরো ১৩টি ভাষার ১২০টি শব্দ আছে।[9] 

অহির প্রকারভেদ :  

অহি প্রধাণত দুই প্রকার। যথা : ১. الوحي المتلو অর্থাৎ তেলাওয়াত যোগ্য অহি। যেমন আল-কুরআন। ২.الوحي غير المتلو অর্থাৎ যা তেলাওয়াত যোগ্য নায়। যে অহির ভাবধারা আল্লাহর এবং ভাষা রাসূল (ছাঃ)-এর। যেমন : ছহীহ হাদীছসমূহ।

কুরআন অবতরণের পর্যায় :  

২১শে রামাযান সোমবার ক্বদরের রাত্রিতে জিবরীল (আঃ) আগমন করেন অতঃপর মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি সূরা আলাক্বের প্রথম ৫টি আয়াত নাযিল হয়। তারপর ফেরেশতা অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রথম কুরআন নাযিলের দিনটি ছিল ৬১০ খ্রীঃ ১০ই আগস্ট। ঐ সময় রাসূল (ছাঃ)-এর বয়স হয়েছিল চান্দ্র বর্ষ হিসাবে ৪০ বছর ৬ মাস ১২ দিন এবং সৌরবর্ষ হিসাবে ৩৯ বছর ৩ মাস ১২ দিন।[10]

সর্ব প্রথম তিনি লাওহে মাহফূযে পুরো কুরআন অবতীর্ণ করেন, অতঃপর সময়ের পরিপ্রেক্ষেতে বিভিন্ন সময় ধীরে ধীরে কুরআন অবতীর্ণ করেন। আল্লাহ বলেন, بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيْدٌ فِيْ لَوْحٍ مَحْفُوْظٍ ‘বরং এটা মহান কুরআন যা লাওহে মাহফুযে সংরক্ষিত’ (বুরূজ ৮৫/২১-২২)। আল্লাহ বলেন, إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِيْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ ‘নিশ্চয় আমরা ক্বদরের রাত্রিতে কুরআন নাযিল করেছি’ (ক্বদর ৯৭/১)। তিনি অন্যত্র বলেন, شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيْ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ ‘রামাযান মাসে কুরআন নাযিল করেছি মানুষের হেদায়াতের জন্য এবং স্পষ্ট পথপ্রদর্শক ও সত্য মিথ্যার মানদণ্ডকারী হিসাবে’ (বাক্বারাহ ২/১৮৫)। আরো বলেন,إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ  নিশ্চয় আমরা বরকতময় রাতে কুরআন অবতীর্ণ করেছি’ (দুখান ৪৪/৩)

চিরন্তন সত্য গ্রন্থ :

পবিত্র কুরআন এমন একটি গ্রন্থ, যাতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা কোন বই লিখতে গেলে প্রথমেই অপারগতা স্বীকার করি। কিন্তু আল্লাহ কুরআনের শুরুতেই বিশ্বের সমস্ত মানুষকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيْهِ هُدًى لِلْمُتَّقِيْنَ ‘এই কুরআনে কোন সন্দেহ নেই। এটি মুত্তক্বীদের জন্য পথপ্রদর্শক’ (বাক্বারাহ ২/২)। যারা কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, তাদের প্রতিবাদ করে আল্লাহ বলেন,

وَإِنْ كُنْتُمْ فِيْ رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوْا بِسُوْرَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوْا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُوْنِ اللهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِيْنَ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوْا وَلَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِيْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِيْنَ.

‘আমি আমার বান্দার উপর যা কিছু নাযিল করেছি, সে বিষয়ে যদি কোন সন্দেহের মধ্যে থাকো, তাহলে তোমরা এর অনুরূপ (ছোট্ট) সূরা রচনা কর। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমরা সকলকে সাহায্যকারী হিসাবে ডাক। যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অতঃপর তোমরা যদি না পার, তাহলে কখনই পারবে না। তাহলে তোমরা সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা কাফেরদের জন্য প্রস্ত্তত করে রাখা হয়েছে’ (বাক্বারাহ ২/২৩-২৪)। আল-কুরআনে সন্দেহ থাকা তো দূরের কথা; বরং তা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী। আল্লাহ বলেন,

وَمَا كَانَ هَذَا الْقُرْآنُ أَنْ يُفْتَرَى مِنْ دُوْنِ اللهِ وَلَكِنْ تَصْدِيْقَ الَّذِيْ بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيْلَ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيْهِ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ.

‘এই কুরআন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো রচিত নয়, বরং তার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার সত্যায়নকারী এবং বিধানসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা। এতে কোন সন্দেহ নেই, এটা বিশ্ব জগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত’ (ইউনুস ১০/৩৭)

আল্লাহ অন্যত্র বলেন, এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল এবং সৎকর্ম পরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য মহাপুরস্কার রয়েছে’ (বানী ইসরাইল ১৭/৯)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ وَمَا يَكْفُرُ بِهَا إِلَّا الْفَاسِقُوْنَ ‘নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ অবতীর্ণ করেছি। বস্ত্তত ফাসেক্বরা ব্যতীত অন্য কেউ তা অবিশ্বাস করে না’ (বাক্বারাহ ২/৯৯)

পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান :

মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়। কুরআনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ বলেন,مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ‘এ কিতাবে আমি কোন কিছু উল্লেখ করতে বাদ দেইনি’ (আন‘আম ৬/৩৮)

অবিকৃত ধর্মগ্রন্থ :

পবিত্র কুরআনের পূর্বের সমস্ত আসমানী কিতাব বিকৃত হয়ে গেছে, শুধু কুরআন ব্যতীত। কেননা আল্লাহ একমাত্র কুরআনের হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন। এমনকি পূর্বের ধর্মগ্রন্থের নামও পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেমন মূসা (আঃ)-এর প্রতি নাযিলকৃত তাওরাতকে ওল্ড টেস্টামেন্ট ও ঈসা (আঃ)-এর প্রতি নাযিলকৃত ইঞ্জিলকে নিউ টেস্টামেন্ট বলা হয়। পৃথিবীতে অসংখ্য হাফেযে কুরআন রয়েছেন, যারা কুরআন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ বলতে পারছেন বা ক্বিয়ামত অবধি পারবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাযিল করেছি এবং স্বয়ং আমিই এর হিফাযতকারী’ (হিজর ১৫/৯)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘কুরআন দ্রুত আয়ত্ত করার জন্য তোমার জিহবাকে সঞ্চালন করবে না। নিশ্চয়ই কুরআন একত্রিত করা ও পাঠ করার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং আমি যখন তা পাঠ করি, তখন তুমি সে পাঠের অনুসরণ কর’ (ক্বিয়ামাহ ৭৫/১৬-১৮)। আল্লাহ বলেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوْا فِيْهِ اخْتِلَافًا كَثِيْرًا ‘তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া কারো পক্ষ থেকে হত, তাহলে অবশ্যই তারা এতে অনেক মতানৈক্য দেখতে পেত’ (নিসা ৪/৮২)

عَنْ أَبِي شُرَيْحٍ الْخُزَاعِيِّ، قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَبْشِرُوا وَأَبْشِرُوا، أَلَيْسَ تَشْهَدُونَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: فَإِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ سَبَبٌ طَرَفُهُ بِيَدِ اللَّهِ، وَطَرَفُهُ بِأَيْدِيكُمْ، فَتَمَسَّكُوا بِهِ، فَإِنَّكُمْ لَنْ تَضِلُّوا، وَلَنْ تَهْلِكُوا بَعْدَهُ أَبَدًا.

আবু শুরাইহ্্ আল-খুযাঈ (রাঃ) বলেন, একদা রাসূল (ছাঃ) আমাদের নিকট আসলেন এবং বললেন, ‘তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, আচ্ছা তোমরা কি এ কথার সাক্ষী দাতা নও যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সত্য মা‘বূদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল? ছাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ; অবশ্যই। অতঃপর বললেন, নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন একটি বস্ত্ত, যার এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে আর অন্য প্রান্ত তোমাদের হাতে। অতএব তোমরা এটা শক্তভাবে ধর। কেননা কুরআনকে অাঁকড়ে ধরার পর তোমরা কখনো গোমরাহ হবে না, ধ্বংসও হবে না’।[11]

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, كتاب الله هو حبل الله الممدود من السماء إلى الأرض ‘আল্লাহর কিতাব হচ্ছে আল্লাহর রজ্জু, যা আসমান হতে যমীন পর্যন্ত প্রসারিত’।[12]

কুরআন রহমত ও হেদায়াতের মানদণ্ড :

আল্লাহ কুরআনকে মুমিন ও বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসাবে দান করেছেন। আল্লাহ বলেন,وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِيْنَ وَلَا يَزِيْدُ الظَّالِمِيْنَ إِلَّا خَسَارًا ‘আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি, যা রোগের চিকিৎসা এবং মুমিনদের জন্য রহমত। সীমালঙ্ঘনকারীদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়’ (বানী ইসরাইল ১৭/৮২)। আল্লাহ বলেন,

يَاأَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُوْلُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيْرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُوْنَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُوْ عَنْ كَثِيْرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُوْرٌ وَكِتَابٌ مُبِيْنٌ يَهْدِيْ بِهِ اللهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيْهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيْمٍ.

‘তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ হতে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি এসেছে এবং সুস্পষ্ট গ্রন্থ। এর দ্বারা যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদেরকে তিনি নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালিত করেন’ (মায়েদাহ ৫/১৫-১৬)। অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেন,

اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيْثِ كِتَابًا مُتَشَابِهًا مَثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُوْدُ الَّذِيْنَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِيْنُ جُلُوْدُهُمْ وَقُلُوْبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللهِ ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِيْ بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ.

‘আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন উত্তম বাণী, সাদৃশ্যপূর্ণ একটি কিতাব, যা পুনঃপুনঃ আবৃত্তি করা হয়। এতে যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের গায়ের চামড়া শিহরিত হয়, অতঃপর তাদের দেহ-মন বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটাই আল্লাহর পথ নির্দেশ, তিনি এটা দ্বারা যাকে ইচ্ছা, তাকে পথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথ প্রদর্শক নেই’ (যুমার ৩৯/২৩)

ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ ‘এই কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ কোন জাতির উন্নতি করেন এবং অন্যদের অবনমিত করেন’।[13]

কুরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব ও ফযীলত :

পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এর ফলে তেলাওয়াতকারী অশেষ নেকীর অধিকারী হয়। আল্লাহ বলেন, اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ ‘হে নবী (ছাঃ)! কিতাব থেকে তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করা হয়েছে, তা তেলাওয়াত কর’ (আনকাবূত ২৯/৪৫)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيْلًا ‘আর তোমরা তারতীলের সাথে কুরআন তেলাওয়াত কর’ (মুযযাম্মিল ৭৩/৪)

তিনি আরো বলেন, وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ كِتَابِ رَبِّكَ ‘তোমার প্রতিপালকের কিতাব হতে তোমার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তুমি তা তেলাওয়াত কর’ (কাহ্ফ ১৮/২৭)। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন,

الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِىْ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيْهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ.

‘কুরআন পাঠে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত লেখক ফেরেশতাদের সাথে থাকেন। আর যার পক্ষ কুরআন পড়া কষ্টকর, তার জন্য দুই গুণ বেশী নেকী রয়েছে’।[14]

উক্ববা ইবনু আমের (রাঃ) বলেন, আমরা মসজিদে আহলে ছুফফাদের মাঝে ছিলাম, এমন সময় রাসূল (ছাঃ) বের হয়ে আসলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে চায় যে, সে প্রত্যহ সকালে ‘আক্বীক্ব’ নামক বাজারে যাবে আর বড় কুঁজওয়ালা দু’টি মাদী উট নিয়ে আসবে, কোন অপরাধ না করে ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন না করে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমরা এমন সুযোগের সন্ধান পেতে চাই। (তিনি বললেন), তবে তোমাদের কোন ব্যক্তি মসজিদে গিয়ে দু’টি আয়াত শিক্ষা দেয় না, বা নেয় না কেন? অথচ এ কাজ তার জন্য দু’টি মাদী উট অপেক্ষা উত্তম, ৩টি আয়াত ৩টি মাদী উট অপেক্ষা উত্তম এবং ৪টি আয়াত ৪টি মাদী উটের চেয়ে উত্তম। মোটকথা, যত আয়াত পড়বে, তত মাদী উট অপেক্ষায় উত্তম’।[15] ক্বিয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে।[16]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُوْلُ ألم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيْمٌ حَرْفٌ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের কোন একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার বিনিময়ে সে একটি নেকী পাবে আর একটি নেকী দশ নেকীর সমান। আমি (ألم)-কে একটি অক্ষর বলছি না, বরং আলিফ একটি, লাম একটি ও মীম একটি অক্ষর’।[17]

কুরআন শিক্ষাদানকারী ও গ্রহণকারীগণ সর্বোত্তম :

কুরআন যেমন সর্বোত্তম, অনুরূপভাবে কুরআন শিক্ষাকারী ও দানকারীও সর্বোত্তম। আল্লাহ বলেন, الرَّحْمَنُ عَلَّمَ الْقُرْآنَ ‘দয়াময় আল্লাহ, যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন’ (রহমান ৫৫/১-২)। উছমান (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অপরকে তা শিক্ষা দেয়’।[18] আর কুরআন শিক্ষা বা ইসলামী শিক্ষার্জন করা ফরয।[19]وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ ‘কুরআন তেলাওয়াত করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়, আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে’ (আনফাল ৮/২)

কুরআন পাঠ করা আল্লাহ ও রাসূলের ভালবাসার নিদর্শন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, من سره أن يحب الله ورسوله فليقرأ في المصحف ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং রাসূল (ছাঃ)-কে ভালোবাসতে চায়, সে যেন কুরআন দেখে তেলাওয়াত করে’।[20]

কুরআন তেলাওয়াতকারীর মর্যাদা :

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন কুরআন হাযির হয়ে বলবে, হে আল্লাহ! একে (হাফেযে কুরআনকে) অলংকার পরিয়ে দিন। অতঃপর তাকে সম্মান ও মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। সে আবার বলবে, হে আমার রব! তাকে পোশাক দিন। সুতরাং তাকে মর্যাদার পোশাক পরানো হবে। সে পুনরায় বলবে, হে আমার রব! তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। কাজেই তিনি তার উপরে সন্তুষ্ট হবেন। অতঃপর তাকে বলা হবে, তুমি এক একটি আয়াত পড়তে থাক এবং উপরে উঠতে থাক। এমনিভাবে প্রতি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে নেকী বাড়ানো হবে’।[21]

এমনকি মাতা-পিতাকে এমন সম্মানের মুকুট পরানো হবে যে, অন্যান্য জান্নাতীরা হিংসা করবে।[22] হাফেযে কুরআনের মত মর্যাদাবান হতে তাদের সাথে হিংসা করে বেশি বেশি আমল করতে রাসূল (ছাঃ) অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।[23]

বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ ও সতর্ককারী :

পূর্বের কিতাবগুলো নির্দিষ্ট জাতি বা ক্বওমের জন্য ছিল। কিন্তু কুরআন মুসলিম, অমুসলিম, জিন-ইনসান সকলের জন্য জীবন বিধান, উপদেশবাণী ও সতর্ককারী। আল্লাহ বলেন, إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِيْنَ ‘এটা বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশবাণী’ (তাকভীর ৮১/২৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, تَبَارَكَ الَّذِيْ نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُوْنَ لِلْعَالَمِيْنَ نَذِيْرًا ‘কত বরকতময় তিনি, যিনি তার বান্দার উপর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী’ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। যাতে তা বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে’ (ফুরক্বান ২৫/১)। অন্যত্র তিনি বলেন, قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِنَ الْجِنِّ فَقَالُوْا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا ‘বলো! আমার প্রতি অহি নাযিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কুরআন মনোযোগ সহকারে শুনেছিল। অতঃপর তারা বলেছে, আমরা তো বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি’ (জিন ৭২/১)

মর্যাদাপূর্ণ আয়াত ও সূরা :

কুরআনে এমন কিছু আয়াত ও সূরা রয়েছে, যার মর্যাদা অতুলনীয়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ফরয ছালাত শেষে আয়াতুল কুরসী পাঠকারীর জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য আর কোন বাধা নেই মৃত্যু ব্যতীত।[24] শয়নকালে পাঠ করলে একজন ফেরেশতা হিফাযতকারী হিসাবে থাকবেন।[25]

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تَجْعَلُوْا بُيُوْتَكُمْ مَقَابِرَ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِىْ تُقْرَأُ فِيْهِ سُوْرَةُ الْبَقَرَةِ ‘তোমাদের ঘরসমূহকে কবরস্থানে পরিণত কর না। নিঃসন্দেহে শয়তান সেই ঘর হতে পলায়ন করে, যে ঘরে সূরা বাক্বারাহ তেলাওয়াত করা হয়’।[26] যে ব্যক্তি সূরা কাহ্ফের প্রথম ৩ আয়াত[27] বা দশ আয়াত পড়বে সে দাজ্জালের ফিৎনা হতে মুক্তি পাবে।[28] আর তার ঈমানী জ্যোতি এক জুম‘আ হতে আপর জুম‘আ পর্যন্ত চমকাতে থাকবে।[29] রাসূল (ছাঃ) সূরা সাজদাহ না পড়ে ঘুমাতেন না।[30] রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘সূরা যিলযাল কুরআনের অর্ধেকের সমান, ইখলাছ এক-তৃতীয়াংশের সমান ও কাফেরূন এক-চতুর্থাংশের সমান’।[31] রাসূল (ছাঃ) ঘুমানোর সমায় নাস, ফালাক্ব ও ইখলাছ পড়ে সম্ভবপর সারা শরীর মুছে ফেলতেন।[32] তিনি এক ব্যক্তিকে বলেছেন, সূরা ইখলাছের ভালবাসা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।[33] 

বিভিন্ন মনীষীর দৃষ্টিতে পবিত্র কুরআন :

কুরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। কুরআন সম্পর্কে মুসলিমদের পাশাপাশি বিভিন্ন অমুসলিমদের যবানীতেও কুরআনই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ।

(১) ফরাসী রাষ্ট্রনায়ক নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট (১৭৬৯-১৮২১) বলেন, আমি আশা করি এমন একটি সময় বেশী দূরে নয়, যখন আমি দেশের বুদ্ধিজীবী এবং বিদ্বান ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারব একটি একক শাসক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য, কেবল পবিত্র কুরআনের মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ হল, কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যা সত্য এবং মানুষকে সুখ এবং শান্তির পথে পরিচালিত করে।[34]

(২) ফরাসী ভাষায় কুরআনের অনুবাদক ডঃ মরিস বুকাইলি বলেন, বিষয়বস্ত্তর পরিপাট্যে এবং ভাবের গাম্ভীর্যে পবিত্র কুরআন সমস্ত আসমানী কিতাবকে ছাড়িয়ে গেছে। অনাদি অনন্ত প্রভু তাঁর অসীম অনুগ্রহ মানুষের জন্য যেসব গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, পবিত্র কুরআন সেগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষের মঙ্গল সাধনার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের সুর গ্রীক দর্শনের সুর হতে অনেক ঊর্ধ্বে। দাঊদ (আঃ)-এর যুগ থেকে যে সমস্ত আসমানী গ্রন্থ নাযিল হয়েছে, তার কোনটিই পবিত্র কুরআনের একটি ছোট্ট সূরার সাথেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে উঠতে পারেনি। এর সত্য সনাতন ও অনবদ্য ভাব ব্যঞ্জন যা দিনের পর দিন মানুষের মনোজগতে সেকেলে হবার নয়। প্রত্যেক মুসলিম মাত্রই একে একটি গর্বের বস্ত্ত বলে মনে করে।[35]

(৩) প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও দার্শনিক টলস্টায় বলেন, পবিত্র কুরআন মানব জাতির একটি শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক। এর মধ্যে আছে শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, জীবিকা অর্জন ও চরিত্র গঠনের নিখুঁত দিকদর্শন। দুনিয়ার সামনে যদি এই একটি মাত্র গ্রন্থ থাকত এবং কোন সংস্কারকই না আসত, তবু মানব জাতির পথ প্রদর্শনের জন্য এটাই ছিল যথেষ্ট।[36]

(৪) সাহিত্যিক দার্শনিক কারলাইল বলেন, পবিত্র কুরআনকে এমন এক সময়ে দুনিয়ার সামনে তুলে ধরা হয়, যখন পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, তথা দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্তে ছিল ধর্মহীনতার অবাধ রাজত্ব। মিটে গিয়েছিল মানবতা, সৌজন্যতা এবং সভ্যতা সংষ্কৃতির নাম নিশানা। দিকে দিকে ছিল অশান্তি ও অরাজকতার আধিপত্য এবং ব্যক্তি পূজার ঘনঘটা। পরিত্র কুরআন মানুষকে বাতলে দিল শান্তির পথ, তাদের অন্তর ভরে দিল প্রেম ভালবাসায়। ফলে কেটে গেল ফিৎনা-ফাসাদের কালো প্রেম, প্রতিহত হল যুলুম-অত্যাচারের অবাধ গতি। পথভ্রষ্টরা পথে এলো, বর্বররা সভ্য হল। এই গ্রন্থ পাল্টে দিল দুনিয়ার অবয়ব। পবিত্র কুরআন মূর্খকে জ্ঞানী, অত্যাচারীকে হৃদয়বান এবং আল্লাহদ্রোহীকে আল্লাহভীরুতে পরিণত করল। এই গ্রন্থ আজ ৪০ কোটি (বর্তমানে একশত আশি কোটির ঊর্ধ্বে) মানুষের মনোরাজ্যের অধিপতি এবং তাদের পরম শ্রদ্ধার বস্ত্ত।[37]

(৫) ঐতিহাসিক গীবন বলেন, Quran is a glorious testmoney of the unity of God।[38]

উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায় যে, পবিত্র কুরআনই সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী গ্রন্থ ও অবিকৃত এবং স্বয়ং আল্লাহ এর ধারক-বাহক। তাই আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে কুরআনের অনুশাসন মেনে চলতে হবে। আর কুরআনী শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রসার করতে হবে। এভাবেই পৃথিবী থেকে বাতিলের অমানিশা দূরীভূত করে অহির পতাকা উড্ডীন হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!

 

[1]. ফাতওয়া আশ-শাবাকাতিল ইসলামিয়া, প্রশ্ন নং ১৪৬৫১।

[2]. ড. ওয়াহবাহ ইবনে মুছত্বফা আয-যুহাইলী, তাফসীরুল মুনীর ফিল আক্বীদাতি ওয়াশ-শারী‘আতি ওয়াল মানহাজ, দারুল ফিকর আল-মু‘আছের, ২য় মুদ্রণ ১৪১৮হিঃ ১/১৩ পৃঃ।

[3]. মাসিক আত-তাহরীক ৬/৬ সংখ্যা, মার্চ ২০০৩ পৃঃ ৪।

[4]. প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪-৫।

[5]. প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪।

[6]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, তাফসীরুল কুরআন, ৩০তম পারা (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ, মে ২০১৩ খ্রীঃ), পৃঃ ৭।

[7]. সোনামণি প্রতিভা, ১৭তম সংখ্যা; মে-জুন ২০১৬ পৃঃ ৩০-৩১।

[8]. মাসিক আত-তাহরীক ৬/৬ সংখ্যা, মার্চ ২০০৩ পৃঃ ৫।

[9]. প্রাগুক্ত, ৯/৭ সংখ্যা, ২০০৬ পৃঃ ৯।

[10]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ, নভেম্বর ২০১৫ খ্রীঃ), পৃঃ ৮৪।

[11]. ছহীহ ইবনু হিববান হা/১১২; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৭১৩।

[12]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/২০২৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৪।

[13]. ছহীহ মুসলিম হা/১৯৩৪; মিশকাত হা/২১১৫।

[14]. ছহীহ বুখারী হা/৪৯৩৭; ছহীহ মুসলিম হা/১৮৯৮; মিশকাত হা/২১১২।

[15]. ছহীহ মুসলিম, মিশকাত হা/২১১০।

[16]. বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান হা/১৮৩৯; হাকেম হা/২০৩৬; মিশকাত হা/১৯৬৩।

[17]. তিরমিযী হা/২৯১০; মিশকাত হা/২১৩৭।

[18]. ছহীহ বুখারী হা/৫০২৭; আবুদাঊদ হা/১৪৫২; মিশকাত হা/২১০৯।

[19]. ইবনু মাজাহ হা/২২৪; মিশকাত হা/২১৮, সনদ হাসান।

[20]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৩৪২, সনদ হাসান।

[21]. তিরমিযী হা/২৯১৫; হাকেম হা/২৯০৯।

[22]. ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১৪৩৪; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৮২৯।

[23]. ছহীহ বুখারী হা/৫০২৬, ‘কুরআনের ফযীলত’ অধ্যায়।

[24]. নাসাঈ, সুনানে কুবরা হা/৯৮৪৮।

[25]. ছহীহ বুখারী হা/২৩১১; ছহীহ মুসলিম হা/৮১০; মিশকাত হা/৯৭৪।

[26]. ছহীহ মুসলিম হা/১৮৬০; মিশকাত হা/২১১৯।

[27]. তিরমিযী, মিশকাত হা/২৩৪৬।

[28]. ছহীহ মুসলিম, মিশকাত হা/২১২৬।

[29]. বায়হাক্বী, মিশকাত ২১৭৫।

[30]. শারহুস সুন্নাহ, হাদীছ সহীহ আলবানী, মিশকাত হা/২১৫৫।

[31]. তিরমিযী, মিশকাত হা/২১৫৬।

[32]. ছহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২১৩২।

[33]. ছহীহ বুখারী হা/৩১৩০।

[34]. তাওহীদের ডাক, ১৩তম সংখ্যা, জুলাই-আগস্ট ২০১৩ পৃঃ ৪৪।

[35]. মাসিক আত-তাহরীক ৬/৬ সংখ্যা, মার্চ ২০০৩ পৃঃ ৮।

[36]. প্রাগুক্ত।

[37]. প্রাগুক্ত।

[38]. প্রাগুক্ত।

Magazine