ভূমিকা :
ধ্বংসত্মূপের ওপর দাঁড়িয়ে যারা নতুন করে গড়তে জানে, তারাই তরুণ। তারুণ্য যেমন গড়তে জানে তেমনি মহাপ্রলয়ের রূপ নিয়ে সবকিছু ধ্বংসও করতে পারে। তারা সকল ভ্রু-কুটি ও বাধার প্রাচীর উপেক্ষা করে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে দ্বিধা করে না। তারুণ্য এমন এক শক্তি, যার বিরুদ্ধে কখনো কোন শক্তি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে টিকে থাকতে পারে না। সর্বত্র কেবল তারুণ্যেরই জয়গান উচ্চারিত হয়। অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে তারুণ্য কেবল প্রতিবাদ করেই থেমে থাকেনি বরং সত্য-ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতেও তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই সমাজের সার্বিক সংস্কারে তারুণ্য অফুরন্ত শক্তির আধার। কিন্তু মানব জীবনের ‘স্বর্ণযুগ’ খ্যাত এই তারুণ্য সময়কালটি আজ অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সন্ত্রাসের হিংস্র ছোবলে তারা আজ ক্ষত-বিক্ষত। সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরী সংঘাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-রাহাজানী, হরতাল-অবরোধ, ভাংচুর প্রভৃতি তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রামেত্ম উপনীত করেছে। প্রবৃত্তিপূজা ও নৈতিকতাহীনতায় তারা আজ বন্দি। আজ তারা মাদকতা ও নেশার জগতে নিত্যদিনের সঙ্গী। তারা আজ দিশেহারা, হতাশাগ্রস্ত ও বিপদগামীতার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, অন্ধকার রাজ্যের পাপাচার ও অন্যায়ের লালনকারীতে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রচ- ঝড়-ঝাঞ্ঝা ও তরঙ্গ বিক্ষুব্দ সমুদ্রের গর্জনে বিপদজনক জাহাজের উদ্দেশ্যহীন গতিপথের যে দশা হয় ঠিক তেমনি গন্তব্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিহীন দিশেহারা ও বিপদগ্রস্ত তরুণ সমাজেরও আজ সেই একই দশা। এমতাবস্থায় আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করে দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য এবং তরুণ সমাজকে অন্ধকার নিগড় থেকে মুক্তিদানের প্রত্যাশায় ‘তরুণ সমাজের প্রতি আহবান’ শিরোনামে গবেষণায় প্রবৃত্ত হলাম।
হে তাওহীদী যুব কাফেলা!
পৃথিবীর শুরু থেকে ধ্বংস পর্যন্ত আগত সকল মানুষের নিকট থেকে এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা স্বীকৃতি নিয়েছেন যে, তিনিই আমাদের একমাত্র প্রতিপালক। মানুষ সহ আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, সমুদ্র, পশু-পাখি, গ্রহ-নক্ষত্র, উদ্ভিদ-প্রাণী, জড় পদার্থ প্রভৃতি সব সৃষ্টির একমাত্র স্রষ্টা হলেন কেবল আল্লাহ তা‘আলা। এজন্য আসমান-যমীনের মধ্যবর্তী যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর গুণকীর্তণ করে থাকে। মাটি আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে, সমুদ্রের পানি আল্লাহর আনুগত্য করে, তরঙ্গ বিক্ষুব্দ সমুদ্রের প্রচ- স্রোতও আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, প্রজ্জ্বলিত আগুন ঠা-া হয়ে যায় আল্লাহর নির্দেশ শ্রবণ করে, বয়স্ক বন্ধাকে আল্লাহ তা‘আলাই সন্তান প্রদান করেন, শুষ্ক মৃতপ্রায় খেজুর গাছও তরতাজা খেজুর ফলায় আল্লাহর আদেশ পেয়ে, মাছ আল্লাহর কথা শুনে, বাতাস আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে সব কিছু লণ্ডভ- করে দেয়, মৃতকে জীবিত করেন আল্লাহ আবার জীবিতকে মৃত করেন আল্লাহ, কোন গাছের পাতা নড়ে না আল্লাহর ইশারা ব্যতীত, বিশাল বিশাল পাহাড় পর্যন্ত আল্লাহর ভয়ে প্রকম্পিত হয়ে উঠে, মুহূর্তের মধ্যে প্রকম্পিত হয়ে উঠে সমগ্র পৃথিবী আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। এত কিছু মানুষের জ্ঞানের মধ্যে থাকলেও আশরাফুল মাখলূক্বাত খ্যাত চিন্তা-শক্তির স্বাধীনতার অধিকারী এই মানুষ আল্লাহর কথা শ্রবণ করে না, তাঁর নির্দেশ মেনে চলে না, তাঁর আনুগত্য থেকে মানুষ মস্তিষ্ক প্রসূত বিধানকে বেশী মূল্যায়ন করে থাকে। এই মানুষই আল্লাহর নির্দেশ সবচেয়ে বেশী অমান্য করে থাকে এবং তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে। অথচ মানুষের হাত, পা, চোখ, নাক, কান, মুখম-ল, মাথা প্রভৃতি সবই সেই মহান রাজাধিরাজ ও সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা‘আলাই অনুগ্রহ করে দান করেছেন। অতএব হে যুবক! তোমার প্রতি ফোঁটা রক্ত আল্লাহর দেয়া পবিত্র আমানাত। এসো! তা ব্যয় করি নির্ভেজাল তাওহীদের পথে, তাঁর এককত্বের পথে, তাঁর কালেমার প্রতিষ্ঠার পথে।
হে তরুণ সমাজ!
যৌবনের শক্তিমত্তা, তারুণ্যের উদ্দীপ্ততা, তারুণ্যদীপ্ত উন্নত মানসিকতা, অজেয় শক্তির অধিকারী তরুণ সমাজই জাতির একমাত্র কর্ণধার। তরুণ তো তারাই, যাদের ব্যাঘ্র হুংকারে বাতিল শক্তির মসনদ প্রকম্পিত হয়, মানুষরূপী পশুদের হৃদয়তন্ত্রীকে ভীত সন্ত্রস্ত করে, যাবতীয় অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীন থাকে, সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্যধারণ করে হক্বের উপর দৃঢ়পদে অটল থাকে, যেকোন প্রলোভনে তারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয় না, দুর্নীতি-দুরাচার, অত্যাচার-লুণ্ঠন, গুম-খুন-হত্যার বিরুদ্ধে সর্বদা আপোসহীন অবস্থান গ্রহণ করে, অসত্য ও অন্যায়কে শক্তহাতে দমন করে এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সংগ্রাম করে। তাই তো তারুণ্য বয়সের ফ্রেঁমে বাধা কোন নির্দিষ্ট সময়ের শক্তিমত্তা নয়, বরং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত উন্নত চেতনা, উদারতা, সাহসিকতা, উৎসাহ-অনুপ্রেরণার দিগ্বীজয়ী সংগ্রামের এক পথ-পরিক্রমাই তারুণ্য। অতএব হে তরুণ সমাজ! তোমার এই শক্তিমত্তা কি আজ ভোঁতা হয়ে গেছে? তুমি কি কাপুরুষের মত ভীত-সন্ত্রস্ত, না-কি ইবলীস শয়তানের এজেন্টে পরিণত হয়েছ? না-কি প্রবৃত্তিপূজা তোমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জরিয়ে ধরেছে? অতএব জেগে ওঠ, অলসতা ছুড়ে ফেল, এগিয়ে চল সম্মুখ পানে। সকল ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে সত্য সংগ্রামে বীরদর্পে ঝাঁপিয়ে পড়। শাহাদতের অমীয় সুধা জান্নাতে তোমার জন্য প্রস্ত্তত রয়েছে! তোমার শঙ্কা কিসের? তুমি তো তরুণ নওজোয়ান, বৃদ্ধ-অচল-অসাড় নয়!!
হে পাশ্চাত্যের পদলেহী যুবক!
তোমার যৌবন শক্তির দুর্জয় সাহস আজ ব্যয়িত হচ্ছে পাশ্চাত্য দর্শন প্রতিষ্ঠায়। রাস্তা-ঘাটে মিছিল-মিটিং, হরতাল-অবরোধ, গাড়ী ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ সহ যাবতীয় অন্যায় অপকর্মে তো আজ তোমার শক্তিই ব্যয়িত হচ্ছে! নেতা-নেত্রীদের মিথ্যা আশ্বাস-প্রলোভনের অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছ তো তোমরাই, তুমিই তো ব্যাংক ডাকাতি করে থাক! চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই-চাঁদাবাজী তো তোমার মাধ্যমেই সংঘটিত হচ্ছে! অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা আর বেলেল্লাপনা তো তোমাকে দিয়েই করানো হয়ে থাকে! দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত প্রায় ২২টি বেশ্যালয় তো তোমার জন্যই লাইসেন্স দিয়েছে!! মেয়েদের শ্লীলতাহানী, ইভটিজিং, ধর্ষণ তো তোমরাই করছ! বিড়ি-সিগারেট, মদ-ফেনসিডিল, হিরোইন, ইয়াবার মত নেশার মরণ ছোবলে তো আজ তোমরাই শিকার হয়েছ!! ইন্টারনেটে, ফেইসবুকে, ইউটিউবে, টুইটারে তো তোমারই পদচারণা সবচেয়ে বেশী! বস্নু ফ্লিম ও নগ্ন-অর্ধনগ্ন ভিডিওর দর্শক তো তুমিই!! তোমাকেই তো ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, হকি প্রভৃতি খেলাতে ব্যস্ত রাখা হয়েছে! তোমার তেজদীপ্ত খুনরাঙ্গা পথ ও আপোসহীন চেতনা থেকে বিরত রাখার জন্যই তো পাশ্চাত্য ইহুদী, খ্রিষ্টান ও ব্রাক্ষ্মাণ্যবাদী গোষ্ঠী উক্ত পথ উন্মোক্ত করে দিয়েছে। তোমাকে জড় পদার্থে পরিণত করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করছে। অতএব হে যুবক! তাকিয়ে দেখ ইসলামের সুমহান আদর্শের পানে। মুক্তির হাতছানি দিয়ে ডাকছে তোমাকে জান্নাত অভিমুখে, তাহলে কেন তুমি পড়ে থাকবে প্রজ্জ্বলিত হুতাশনে!!!
হে শিক্ষার্ত্রী!
অধ্যবসাই সফলতার চাবিকাঠি। আর পরিশ্রম ছাড়া অধ্যবসায় অচল। যে যত বেশী পরিশ্রমী সে তত বেশী সফল। পরিশ্রমী ছাত্রের কাজ খাতা-কলম-বই হাতে নিয়ে অধ্যবসায়ে নিমগ্ন থাকা, উদ্ঘাটন করা অজানা তথ্যের, উদ্ভাবিত করা নতুন নতুন আবিষ্কারের, বিজ্ঞানের সকল শাখায় পদচারণায় মুখর থেকে নিজেকে উদ্ভাসিত করা, তাত্ত্বিকতার বিচারে সকল বিষয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা, অপপ্রচারকারীদের শক্তভাবে জবাব দেয়া, সমাজে প্রতিষ্ঠিত ভ্রান্ত অপসংস্কৃতিগুলোর ভুল ও তার অপকারিতা প্রমাণ করে সুস্থ সংস্কৃতি ও তার উপকারিতা তুলে ধরা এবং যাবতীয় অন্যায়-অসত্য ও দুর্বিনীত সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে প্রতিহত করে ন্যায় ও সত্যকে জাতির সম্মুখে উন্মেচিত করা এবং সমাজ সংস্কারে নিঃস্বার্থভাবে আত্মনিয়োগ করা। অথচ ছাত্রদের হাতে আর বই-খাতা-কলম দেখা যায় না, বরং পিস্তল, রিভলভার, বোমা, মেশিনগান, রামদা ইত্যাদি শোভা পায়। সমাজ সংস্কারের পরিবর্তে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার সৃষ্টিতে তাদেরই অবদান বেশী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদের হাতে শিক্ষক-শিক্ষিকা লাঞ্ছিত হচ্ছে, আবার শিক্ষকের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছে ছাত্রী ও শিক্ষকা। ছাত্র আন্দোলন, ক্লাস বর্জন, অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট, ভর্তি ফী কমানোর আন্দোলন, সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিলের আন্দোলন ইত্যাদি শিক্ষার পবিবেশকে করেছে পর্যুদস্ত। আবার শিক্ষকগণও তাদের বিভিন্ন দাবী আদায়ে নামেন অনশন ধর্মঘট, বিক্ষোপ সমাবেশ, মানববন্ধন প্রভৃতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
বর্তমানে শিক্ষাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ছাত্ররা পাঠ অনুশীলনের চেয়ে অর্থ উপার্জনকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ‘কোটিপতি হওয়ার সহজ উপায়’, ‘অল্প দিনেই স্বাবলম্বী হওয়ার কৌশল’, ‘ঘরে বসেই আয় করুন’ প্রভৃতি সুদৃশ্য ব্যানার প্রদর্শনের মাধ্যমে টাকা উপার্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হযেছে। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদেরকে ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, জাজ, চিকিৎসক প্রভৃতি হিসাবে তৈরি করার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু কেউ আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইমাম বুখারী, মুসলিম, আবুদাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, আহমাদ ইবনু তায়মিয়াহ, ইবনুল ক্বাইয়িম, শায়খ বিন বায, শায়খ উছায়মীন, শায়খ আলবানীর মত সন্তান গড়ে তুলতে চায় না। কেউ কাজী নজরুল ইসলামের মত সাহিত্যক ও অনেক উঁচু মানের লেখক বানাতে চায় না। অথচ ইসলামের জন্য, জাতির জন্য, রাষ্ট্রের জন্য সুনাগরিকের আজ বড়ই অভাব। তাই হে ছাত্র সমাজ! সফলতার চূর্ণ শিখরে আরোহণ করতে হলে অধ্যবসায়ের বিকল্প কোন পথ নেই। পরিশ্রম ছাড়া সম্মুখ পানে অগ্রসর হওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। কেননা হাদীছের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমাম মুসলিম (রহঃ) একটি তথ্য খুঁজতে খুঁজতে সারারাত অতিবাহিত করেন এবং এক ঝুড়ি খেজুর ভক্ষণ করে ফেলেন, ফলে বদহজমে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিছ আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) দৈনিক ১৬ ঘণ্টা অধ্যয়ন করতেন, তন্মধ্যে ৩ ঘণ্টা লাইব্রেরীতে দাঁড়িয়ে পড়তেন। বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠতম দাঈ ডাঃ যাকির আব্দুল করীম নায়েক দৈনিক ৩ ঘণ্টা ঘুমান। এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বিশ্বে যারাই প্রতিষ্ঠিত ও দেশ ও জাতির জন্য কিছু উপহার দিয়েছেন, তারা সকলেই ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী ও অত্যন্ত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। অতএব হে ছাত্র সমাজ! বেশী বেশী অধ্যয়ন কর, অধ্যবসায়ে আত্মনিয়োগ কর, গবেষণায় প্রবৃত্ত হও আর জীবনকে ফুলের মত সুবাসিত করে গড়ে তোল।
হে কর্মসংস্থানহীন হতাশাগ্রস্ত বেকার যুবসমাজ!
মৌলিক দায়িত্ব থেকে তুমি আজ বহু দূরে অবস্থান করছ! অর্থ ও পদমর্যাদার লোভ তোমাকে চতুর্দিক থেকে গ্রাস করে ফেলেছে। সমাজে জেঁকে বসা ও প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণার অসহায় শিকারে পরিণত হয়ে তুমিও তোমার নিরপেক্ষ ও সক্রিয় চিন্তা-চেতনাকে নিঃশ্বেষ করে দিয়েছ। প্রচলিত বিভিন্ন রসম, রেওয়াজ ও প্রথাকে তুমি বাপ-দাদার আমল বলে উড়িয়ে দিয়ে মূর্খতার পরিচয় দিচ্ছ বারবার। তুমি আজ অর্থ উপার্জনের দুনিয়াবী লালসার হিংস্র শিকারে পরিণত হয়েছ। নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার লোভ তোমার বিবেচনাবোধকে কবরে প্রোথিত করেছে। আত্ম-অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ তোমাকে দ্বিধাগ্রস্তের চোরাবালুতে নিমজ্জিত করেছে। ধনী হওয়ার উলঙ্গ নেশায় মদমত্ত হয়ে ন্যায় ও সত্যকে তুমি আজ মিথ্যাজ্ঞান করছ। কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশা ও বিকারগ্রস্ত হয়ে সমাজের নিকট বোঝা হয়ে গেছ। তুমি আজ ‘বেকার’ বলে সমাজে পরিচিত। প্রতিষ্ঠিত (?) মানুষের সকল অবহেলা, ঘৃণা ও লাঞ্ছনা যেন তোমার নিত্যদিনের সাথী হয়ে গেছ। তোমার পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তুমি যেন নির্জীব জড়-পদার্থ। অন্যদিকে প্রচলিত বিভিন্ন সূদী ও হারাম প্রতিষ্ঠান তোমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে। অথচ তুমি তো মুসলিম। ইসলাম বিরোধী যাবতীয় ক্রিয়াকর্মের ব্যাপারে তুমি তো আপোসহীন। তুমি তো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর গোলাম। তুমি তো তাঁরই দাসত্ব ও গোলামী করার জন্যই সৃষ্টি হয়েছ। তোমার একমাত্র ও মৌলিক কাজই তে কেবল আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (ছাঃ) প্রদর্শিত বিধানাবলীর প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য তোমার মেধা, সময়, শ্রম ও চিন্তা-চেতনা ব্যয়িত হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তুমি তো কর্মসংস্থানহীন হতাশাগ্রস্ত বেকার নয়। তুমি তো মুসলিম। মুসলিম কখনো বেকার হতে পারে না। হতাশাগ্রস্থ হতে পারে না। ঐ শোন মহান আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা- ‘যে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য চলার পথ করে দেন এবং রিযিকের ব্যবস্থা এমনভাবে করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না’ (আত-ত্বালাক্ব, ২-৩)। মারিয়াম (আঃ)-কে আল্লাহ যদি এমনিতেই রিযিক প্রদান করতে পারেন তার তাক্বওয়ার কারণে, মৃত ও শুকনা খেজুর গাছ থেকে যদি তাজা তাজা খেজুর আল্লাহ প্রদান করতে পারেন, তাহলে তুমি কেন আজ কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশাগ্রস্ত, তুমি কেন আজ দুনিয়াদার নাস্তিকদের ন্যায় হারাম পন্থায় অর্থ উপার্জনের পিছনে ছুটছ? তোমার রিযিক্বের ব্যবস্থা তো আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বছর পূর্বেই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তোমার ভাগ্যে যত টাকা লেখা আছে তার চেয়ে একটাকা কম থাকতে তোমার মৃত্যু হবে না। অতএব কিসের এত চিন্তা! কিসের এত হতাশা!! কিসের এত নীরবতা!!! অতএব হে যুবক! আল্লাহকে ভয় কর। প্রতিটি কাজে ও মুহূর্তে পরহেযগারিতা অবলম্বন কর। পরচর্চা, গীবত-তোহমত, চোগলখুরী, ছিদ্রান্বেষণ করা থেকে সর্বোতভাবে বিরত হও। প্রতিটি কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তের নিকট আত্মসমর্পণ কর। তাহলে দেখবে তুমি অফুরন্ত নে‘মতপ্রাপ্ত হবে। অতএব হে কর্মসংস্থাহীন হতাশাগ্রস্ত বেকার যুবসমাজ! তাক্বওয়া অবলম্বনের মাধ্যমেই আল্লাহর নে‘মত অন্বেষণে জোরালোভাবে প্রস্ত্ততি গ্রহণ কর।
হে সমাজ সংস্কারক তরুণ সমাজ!
‘সংস্কার’ একটি ব্যাপক ভিত্তিক পরিভাষা। এর ব্যাপ্তি সুদূরপ্রসারী এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত। মানব জীবনের সার্বিক দিক ও বিভাগে এর গুরুত্ব অত্যধিক। এমন কোন বিভাগ নেই, যেখানে সংস্কারের প্রয়োজন নেই। সমগ্র মানব জাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক সহ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে যখন মিথ্যা ও অনৈতিক কর্মকা- এবং চিন্তা-চেতনায় ব্যাধিগ্রস্ত হয়, তখন সংস্কারের প্রয়োজন হয়। ‘সংস্কার’-এর অর্থ পতিত অবস্থা থেকে উদ্ধার, উৎকর্ষ সাধন, উন্নতি বিধান, ত্রুটি বা অপূর্ণতা সংশোধন ইত্যাদি। সংস্কারের অন্য অর্থ হল- পুরাতনকে নতুনরূপে আবির্ভাব ঘটানো অর্থাৎ পুরাতনকে নতুনরূপে ফিরিয়ে আনা এবং সেখানে কোন কিছু পরিমার্জন, পরিবর্তন ও বিকৃত ছাড়াই যে জিনিস প্রথম অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করানো হয় তাই সংস্কার। পারিভাষিক অর্থে, প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বহাল রেখে তার দোষত্রুটি সংশোধনের জন্য গৃহীত কর্মকা-কে ‘সংস্কার’ (Reform) বলে। মূলত ধর্মীয় সংস্কার হল সবচেয়ে বড় সংস্কার। আর আল্লাহ প্রদত্ত স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন দ্বীনের উপর পতিত ও আরোপিত আবর্জনা দূরীকরণ এবং আসল রূপকে উন্মোক্তকরণই ধর্মীয় সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
আক্বীদা, আমল, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা-সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও শিল্প সকল ক্ষেত্রেই সংস্কার অপরিহার্য। তাই বর্তমানে সংস্কার আন্দোলনের প্রয়োজীয়তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এর স্বরূপ চির ভাস্বর। কারণ ইসলাম স্বীয় স্বাতন্ত্র্যে বলীয়ান। নব্য জাহেলিয়াত যদি যাবতীয় শক্তি নিয়ে ইসলামকে মুখের ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়, তখনও ইসলাম অপ্রতিরোধ্য। কারণ সময়ের বাঁকে বাঁকে যখনই জাহেলিয়াত ও অপশক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, তখনই তোমাদের মত তরুণ নওজোয়ানদের মাধ্যমে সংস্কার আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ইসলাম আবার তার স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাযার বছরের জাহেলিয়াতকে উৎখাত করে ইসলামই সর্বপ্রথম পৃথিবীকে অহীর আলোকে আলোকিত করে শান্তিময় সোনালী সমাজ উপহার দিয়েছিল। তাই তো সে সময় নির্যাতিত-নিপীড়িত, ভুখা-নাঙ্গা মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেও পরকালে মুক্তির আশায় দুনিয়াবী শাস্তি মাথা পেতে নিতে নিজের অন্যায়কে অকপটে স্বীকার করেছে। এই দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে দৃষ্টান্ত আর কোন আদর্শ বা মতবাদ আজ পর্যন্ত উপস্থাপন করতে পারেনি।
অতএব হে যুবসমাজ! ঘুঁনে ধরা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থাকে তো তোমাকেই সংস্কার করতে হবে। কেননা তোমাদের মধ্যে কেউ সমাজে প্রচলিত পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণায় গড়ে ওঠা মানব রচিত বিভিন্ন মতবাদের হিংস্র ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত। কেউ খারেজী মতবাদের অনুকূলে জঙ্গী, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের মদদপুষ্ট আল-কায়েদা, আই.এস, বোকো হারাম, জেএমবি সহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনে তোমাদের ন্যায় তরুণ সমাজের সম্পৃক্ততা জাতিকে আজ ভাবিয়ে তুলছে। নগদ জান্নাত প্রাপ্তির প্রলোভনে তোমরা আজ প্রতারণার শিকারে পরিণত হয়েছ। এছাড়া সমাজে দানা বাধা সকল অনৈসলামিক কার্যক্রম, অন্যায়-অপকর্ম, শিরক-বিদ‘আত, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আক্বীদা রয়েছে, সেগুলো উৎপাটন করার দায়িত্ব তো তোমারই! কোথায় তোমার সেই ওমরের মত ব্যাঘ্র হুংকার, বেলালের মত ঈমানের দৃঢ়তা, মুছ‘আবের মত ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা, খাববারের মত নিশ্চিন্ততা? কোথায় হারিয়ে ফেললে সেই সোনালী ইতিহাস? স্বর্ণ যুগের ইতিহাস তো তোমার বংশধরের মাধ্যমেই রচিত হয়েছে! তোমার বক্ষ পিঞ্জরে তো জান্নাতের সুধা পানের ব্যাকুল হওয়ার চেতনা বিদ্যমান! তাহলে আজ তোমার এই মরণ দশা কেন? সুতরাং সংস্কার আন্দোলনের দাওয়াতী ময়দানে বীরদর্পে ঝাঁপিয়ে পড়। এগিয়ে চল বাধাহীন গতিতে সমাজ সংস্কারের খুনরাঙ্গা পিচ্ছিল পথে!! ঐ শুন! বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অব্যর্থ আহবান,
দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার হে
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিতে যাত্রিরা হুঁশিয়ার।।
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত।
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত
এ তুফান ভারি, দিতে হবে পারি, নিতে হবে তরী পার।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]
