কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ঈমানের শাখা (পর্ব-৫)

(এপ্রিল’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

(২০) ছিয়াম পালন করা :

মহান আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমনভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর; যাতে তোমরা মুত্তাক্বী হতে পার’ (আল-বাক্বারাহ, ২/১৮৩)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তিদের উপর মহান আল্লাহ ছিয়াম ফরয করেছেন, আর এ ফরয পূর্ববর্তী নবী-রাসূল এবং মুমিনদের উপরও ছিল। ছিয়াম পালনের মধ্যে মানবজাতি অন্যায়-অপচয় থেকে দূরে থাকে, নফসের যাকাত আদায় করা হয় এবং পবিত্রতা অর্জন করতে পারে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তম চরিত্র গ্রহণ করতে পারে, খারাপ চরিত্র থেকে দূরে থেকে পরহেযগারিতা অর্জন করতে পারে এবং ছিয়াম পালনের মাধ্যমে বান্দার ইহলোক-পরলোক কল্যাণময় হয়’।[1] 

ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,

بُنِىَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيْتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ.

‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর দণ্ডায়মান। এ মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য প্রদান করা যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র বান্দা এবং রাসূল। ছালাত ক্বায়েম করা। যাকাত আদায় করা। হজ্জ সম্পাদন করা এবং ছিয়াম পালন করা’।[2] ছিয়াম সাধনের মাধ্যমে বান্দা ইহলোক-পরলোকে কল্যাণ লাভ করতে পারবে। মহান আল্লাহ ছিয়াম সাধনের পুরস্কার নিজ হাতেই দিবেন। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

الصِّيَامُ جُنَّةٌ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَجْهَلْ وَإِنِ امْرُؤٌ قَاتَلَهُ أَوْ شَاتَمَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّىْ صَائِمٌ مَرَّتَيْنِ وَالَّذِىْ نَفْسِىْ بِيَدِهِ لَخُلُوْفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى مِنْ رِيْحِ الْمِسْكِ يَتْرُكُ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ وَشَهْوَتَهُ مِنْ أَجْلِى الصِّيَامُ لِى وَأَنَا أَجْزِىْ بِهِ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا.

‘ছিয়াম ঢাল স্বরূপ। সুতরাং সে অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মত কাজ করবে না। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তাহলে সে যেন দুইবার বলে, আমি ছিয়াম সাধনা করছি। ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, অবশ্যই ছিয়াম সাধনাকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ্র নিকট মিসকের সুগন্ধির চাইতেও উৎকৃষ্ট। সে আমার জন্য পানাহার ও কামাচার পরিত্যাগ করে। ছিয়াম আমারই জন্য সাধনা করা হয়। অতঃএব এর পুরস্কার আমি নিজেই দান করব। আর প্রত্যেক নেক কাজের বিনিময় দশগুণ করে দিব’।[3]

(২১) ই‘তিকাফ করা :

মহান আল্লাহ বলেন,

وَاتَّخِذُوْا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيْمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِيْنَ وَالْعَاكِفِيْنَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ.

‘তোমরা মাক্বামে ইবরাহীমকে ছালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই‘তিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’ (আল-বাক্বারাহ, ২/১২৫)। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত,

كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ.

‘নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন। তার মৃত্যু পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তার সহধর্মিনীগণও (সে দিনগুলোতে) ই‘তিকাফ করতেন’।[4]

(২২) হজ্জ আদায় করা :

মহান আল্লাহ বলেন,وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيْلًا ‘আর আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ্জ করা সেসব মানুষের উপর আবশ্যকীয় কর্তব্য, যারা সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে’ (আলে ইমরান, ৩/৯৭)। হাফেয ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ এর ব্যাখ্যায় বলেন, যে ব্যক্তি শারীরিক ও আর্থিক উভয় দিক দিয়ে হজ্জ করতে সমর্থবান, তাদের উপর হজ্জ করা ওয়াজিব।[5] মহান আল্লাহ আরো বলেন,

وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوْكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيْقٍ.

‘আর মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটে চড়ে দূর পথ পাড়ি দিয়ে’ (হজ্জ, ২২/২৭)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ ‘তোমরা আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে হজ্জ ও ওমরাহ সম্পন্ন কর’ (বাক্বারাহ, ২/১৯৬)

হাদীছে এসেছে, ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, ‘আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,

بُنِىَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ.

‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর দণ্ডায়মান। এ মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র রাসূল ও তাঁর বান্দা। ছালাত ক্বায়েম করা, যাকাত আদায় করা, হজ্জ সম্পাদন করা ও রামাযানের ছিয়াম পালন করা’।[6]

(২৩) আল্লাহ্ দ্বীন আল্লাহ্ যমীনে সমুন্নত করার জন্য জিহাদ করা :

মহান আল্লাহ বলেন, وَجَاهِدُوْا فِي اللهِ حَق جِهَادِهِ ‘আর তোমরা জিহাদ কর আল্লাহ্র পথে, যেভাবে জিহাদ করা উচিত (আল-হাজ্জ, ২২/৭৮)। হাফেয ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমাদের ধন সম্পদ দিয়ে, তোমাদের জিহবার দ্বারা এবং আত্মার মাধ্যমে আল্লাহ্র পথে জিহাদ করার মত জিহাদ কর।[7] মহান আল্লাহ আরো বলেন, يُجَاهِدُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ وَلَا يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ‘তারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করবে, আর তারা কোন নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না’ (আল-মায়েদাহ, ৫/৫৪)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন,قَاتِلُوْا الَّذِيْنَ يَلُوْنَكُمْ مِنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوْا فِيْكُمْ غِلْظَةً ‘তোমরা ঐ কাফিরদের সাথে যুদ্ধ কর, যারা তোমাদের আশে-পাশে অবস্থান করে, আর যেন তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা পায়’ (আত-তাওবাহ, ৯/১২৩)।

মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِين عَلَى الْقِتَال ‘হে নবী! মুমিনদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ কর’ (আল-আনফাল, ৮/৬৫)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ أَىُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ فَقَالَ إِيْمَانٌ بِاللهِ وَرَسُولِهِ قِيْلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ قِيْلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ حَجٌّ مَبْرُوْرٌ.

‘আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ আমল উত্তম? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞেস করা হল, অতঃপর কোন্টি? তিনি বললেন, আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করা। প্রশ্ন করা হল, অতঃপর কোন্টি? তিনি বললেন, মাক্ববূল হজ্জ সম্পাদন করা’।[8]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

قَالَ أَيُّهَا النَّاسُ لَا تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ وَسَلُوْا اللهَ الْعَافِيَةَ فَإِذَا لَقِيتُمُوْهُمْ فَاصْبِرُوْا وَاعْلَمُوْا أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوْفِ.

‘হে মানবমণ্ডলী! তোমরা শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলায় অবতীর্ণ হবার কামনা করবে না বরং আল্লাহ তা‘আলার নিকট নিরাপত্তার দো‘আ করবে। অতঃপর যখন তোমরা শত্রুর সম্মুখীন হবে, তখন ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রাখবে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে’।[9]

মোদ্দাকথা: জিহাদের বিষয়টি খুব কঠিন, জিহাদের জন্য অনেক শর্ত রয়েছে। সেগুলো আগে জানতে হবে, না জেনে হঠাৎ করে মানুষকে হত্যা করা, দুনিয়াবী স্বার্থে একে অপরকে হত্যা করা, এর নাম জিহাদ নয়; বরং এরূপ কাজ হচ্ছে সন্ত্রাস। তাই এ সম্পর্কে আলেম-ওলামা ও যারা কুরআন সুন্নাহ ও সালাফে ছালেহীনের পথ ধরে মানুষকে ডাকে, ঐসব আল্লাহভীরু ওলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করবে।

(২৪) আল্লাহ্ রাস্তায় সীমান্ত পাহারা দেওয়া :

মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوْا وَرَابِطُوْا وَاتَّقُوْا اللهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْن.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও’ (আলে ইমরান, ৩/২০০)। হাদীছে এসেছে,

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِىِّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ رِبَاطُ يَوْمٍ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا.

সাহ্ল ইবনু সা‘দ সাঈদী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ্র পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেয়া দুনিয়া ও এর উপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম’।

وَمَوْضِعُ سَوْطِ أَحَدِكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا وَالرَّوْحَةُ يَرُوْحُهَا الْعَبْدُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ أَوِ الْغَدْوَةُ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا.

‘জান্নাতে তোমাদের কারো চাবুক পরিমাণ জায়গা দুনিয়া এবং ভূপৃষ্ঠের সমস্ত কিছুর চেয়ে উত্তম। আল্লাহ্র পথে বান্দার একটি সকাল বা বিকাল ব্যয় করা দুনিয়া এবং ভূপৃষ্ঠের সব কিছুর চেয়ে উত্তম’।[10]

(২৫) শত্রুর মোকাবিলায় যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ় থাকা :

মহান আল্লাহ বলেন,إِذَا لَقِيْتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوْا وَاذْكُرُوْا اللهَ كَثِيْرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন দলের মুখোমুখি হও, তখন অবিচল থাক, আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হও’ (আনফাল, ৮/৪৫)। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيْرُ.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন কাফিরদের মুখোমুখি হবে বিশাল বাহিনী নিয়ে, তখন তাদের থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না। আর যে ব্যক্তি সেদিন তাদেরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে, সে আল্লাহ্র গযব নিয়ে ফিরে আসবে। তবে যুদ্ধের জন্য (কৌশলগত) দিক পরিবর্তন অথবা নিজ দলে আশ্রয় গ্রহণের জন্য হলে ভিন্ন কথা এবং তার আবাস জাহান্নাম আর সেটি কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল’ (আল-আনফাল, ৮/১৫-১৬)। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِيْنَ عَلَى الْقِتَالِ إِنْ يَكُنْ مِنْكُمْ عِشْرُوْنَ صَابِرُوْنَ يَغْلِبُوْا مِائَتَيْنِ.

‘হে নবী! মুমিনদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ কর, তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন ধৈর্যশীল মুজাহিদ থাকে, তবে তারা দু’শ জন কাফিরের উপরে জয়যুক্ত হবে’ (আল-আনফাল, ৮/৬৫)

(২৬) গনীমতের মাল এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মাল এবং বাকী অংশ যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের জন্য :

মহান আল্লাহ বলেন,

وَاعْلَمُوْا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُوْلِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِيْنِ وَابْنِ السَّبِيْلِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا.

‘আর তোমরা যেনে রেখো যে, যুদ্ধে তোমরা যা কিছু গনীমতের মাল লাভ করেছ, এর এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রাসূল, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন এবং মুসাফিরের জন্য, (এই নিয়ম মেনে চলবে) যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহ্র প্রতি এবং আমাদের প্রতি যা আমি অবতীর্ণ করেছি’ (আল-আনফাল, ৮/৪১)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘আর কোন নবীর পক্ষে আত্মসাৎ করা শোভনীয় নয় এবং যে কেউ আত্মসাৎ করেছে, সে যা আত্মসাৎ করেছে তা উত্থান দিবসে আনয়ন করা হবে’ (আলে ইমরান, ৩/১৬১)। হাদীছে এসেছে,

أَبُوْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَامَ فِينَا النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ الْغُلُوْلَ فَعَظَّمَهُ وَعَظَّمَ أَمْرَهُ قَالَ لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رَقَبَتِهِ شَاةٌ لَهَا ثُغَاءٌ عَلَى رَقَبَتِهِ فَرَسٌ لَهُ حَمْحَمَةٌ يَقُوْلُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَغِثْنِى فَأَقُوْلُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ وَعَلَى رَقَبَتِهِ بَعِيْرٌ لَهُ رُغَاءٌ يَقُوْلُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَغِثْنِى فَأَقُوْلُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ وَعَلَى رَقَبَتِهِ صَامِتٌ فَيَقُوْلُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَغِثْنِى فَأَقُوْلُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ أَوْ عَلَى رَقَبَتِهِ رِقَاعٌ تَخْفِقُ فَيَقُوْلُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَغِثْنِى فَأَقُوْلُ لَا أَمْلِكُ لَكَ شَيْئًا قَدْ أَبْلَغْتُكَ.

‘আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে গনীমতের অর্থসম্পদ আত্মসাতের ভয়াবহতা সম্পর্কে বক্তব্য রাখলেন এবং ভয়াবহ পরিণামের বিষয়েও আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, আমি ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে এমন অবস্থায় দেখতে চাই না যে, সে ঘাড়ে একটি চিৎকাররত বকরী, একটি হ্রেষারত অশ্ব বহন করছে এবং আমাকে দেখে বলছে যে, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে এ বিপদ থেকে (রক্ষা) উদ্ধার করুন। তখন আমি বলব, আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারছি না। আমি তো আল্লাহ্র বিধি-বিধান তোমাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছিলাম। (অথবা) আমি তোমাদের কাউকে এমন অবস্থায়ও দেখতে চাই না যে, সে একটি চিৎকাররত উট ঘাড়ে বহন করে আমার কাছে এসে বলছে, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে বিপদমুক্ত করুন। আমি বলব, আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারছি না, আল্লাহ্র বাণী বা আদেশ-নিষেধ তো আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম। (অথবা) তোমাদের কাউকে আমি এমনও দেখতে চাই না যে, সে সম্পদের বোঝা ঘাড়ে করে আমার কাছে আগমন করে বলবে, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করুন। আমি বলব, আমি আল্লাহ্র বাণী তোমাদের নিকট পৌঁছিয়ে ছিলাম। (অথবা) তোমাদের কোন ব্যক্তি কাপড়ের বোঝা ঘাড়ে বহন করে আগমন করবে আর বাতাসে কাপড় তার ঘাড়ের উপরে উড়তে থাকবে। সে বলবে, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে বিপদমুক্ত করুন। আমি বলব, আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না। আল্লাহ্র বাণী তো আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম’।[11]

‘আব্দুল ক্বায়েসের প্রতিনিধি দল আল্লাহ্র রাসূলের নিকট আসলে, তিনি তাদেরকে চারটি বিষয়ের আদেশ এবং চারটি বিষয় হতে নিষেধ করলেন। তাদেরকে আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, এক আল্লাহ্র প্রতি কীভাবে বিশ্বাস করতে হয় তা কি তোমরা জান? তারা বলল, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, তা হচ্ছে, এ মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ব মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র রাসূল ও (বান্দা)। ছালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রামাযানের ছিয়াম পালন করা। আর তোমরা গনীমতের সম্পদ হতে এক-পঞ্চমাংশ আদায় করবে। তিনি তাদেরকে চারটি বিষয় হতে বিরত থাকতে বললেন। সেগুলো হচ্ছে, সবুজ কলস, শুকনো কদুর খোল, খেজুর বৃক্ষের গুঁড়ি হতে তৈরি বাসন এবং আলকাতরা দ্বারা রাঙানো পাত্র। তিনি অরো বলেন, তোমরা এ বিষয়গুলো ভালো করে জেনে নাও এবং অন্যদেরকেও এগুলো অবগত কর’।[12] 

(২৭) আল্লাহ্ নৈকট্য অর্জনের জন্য ক্রীতদাস আযাদ করা :

মহান আল্লাহ বলেন,فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ فَكُّ رَقَبَةٍ. ‘কিন্তু সে দুর্গম গিরিপথে প্রবেশ করল না। তুমি কি জান দুর্গম গিরি পথটি কী? এটা হচ্ছে, কোন দাসকে মুক্ত করা’ (আল-বালাদ, ৯০/১১-১৩)। হাদীছে এসেছে,

أَبُوْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيُّمَا رَجُلٍ أَعْتَقَ امْرَأً مُسْلِمًا اسْتَنْقَذَ اللهُ بِكُلِّ عُضْوٍ مِنْهُ عُضْوًا مِنْهُ مِنَ النَّار قَالَ سَعِيْدٌ ابْنُ مَرْجَانَةَ فَانْطَلَقْتُ إِلَى عَلِىِّ بْنِ حُسَيْنٍ فَعَمَدَ عَلِىُّ بْنُ حُسَيْنٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا إِلَى عَبْدٍ لَهُ قَدْ أَعْطَاهُ بِهِ عَبْدُ اللهِ بْنُ جَعْفَرٍ عَشَرَةَ آلاَفِ دِرْهَمٍ أَوْ أَلْفَ دِينَارٍ فَأَعْتَقَهُ.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে, তার (আযাদকৃত দাসের) প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ তার (মুক্তি দানকারী ব্যক্তির) প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। সাঈদ ইবনে মারজানা বলেছেন, আমি আলী ইবনে হুসাইন এর নিকট গিয়ে হাদীছটি বর্ণনা করলে আলী ইবনে হুসাইন- তার এমন একটি ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দেয়ার সংকল্প করলেন, যাকে খরীদ করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে জা‘ফর দশ হাযার দিরহাম অথবা এক হাযার দীনার দিতে প্রস্ত্তত ছিলেন। এরপর তিনি তাকে (দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে) মুক্ত করেছিলেন’।[13]

 (চলবে)


[1]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ২/১৭৩ পৃঃ।

[2]. বুখারী, হা/৮; মুসলিম, হা/১৬; আহমাদ, হা/৬০১৫।

[3]. বুখারী, হা/১৮৯৪; মুসলিম, হা/১১৫১; আহমাদ, হা/৯৯৯৮, ৯৯৯৯।

[4]. বুখারী, হা/২০২৬; মুসলিম, হা/২৮৪১; আহমাদ, হা/২৪৬৫৭।

[5]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ৩/১২০ পৃঃ।

[6]. বুখারী, হা/৮; মুসলিম, হা/১৬; ইমাম বায়হাক্বী, আল-জামে‘ শু‘আবিল ঈমান, ৫/৪৩৮ পৃঃ; আহমাদ, হা/৬০১৫।

[7]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ১০/৯৯ পৃঃ।

[8]. বুখারী হা/২৬; মুসলিম হা/৮৩; আহমাদ, হা/৭৫৮০।

[9]. বুখারী, হা/২৯৬৬; মুসলিম, হা/১৭৪২; আহমাদ, হা/১৯১১৪।

[10]. বুখারী, হা/২৮৯২; আহমাদ, হা/২২৯২৩।

[11]. বুখারী, হা/৩০৭৩।

[12]. বুখারী, হা/৫৩।

[13]. বুখারী, হা/২৫১৭; মুসলিম, হা/১৫০৯; আহমাদ, হা/১০৮০১।

Magazine