বাংলাদেশে বর্ষা ও বন্যার মৌসুম এলেই সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। অতিবৃষ্টি ও বন্যার পানিতে সাপের গর্ত তলিয়ে গেলে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়, বসতঘর, খড়ের গাদা, গোয়ালঘর ও শস্যক্ষেতে চলে আসে। ফলে এ সময় সাপে কামড়ানোর ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রতি বছর দেশে বহু মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন। অনেকে মৃত্যুবরণ করেন, আবার অনেকেই দীর্ঘদিন শারীরিক অক্ষমতা কিংবা মানসিক আতঙ্কে ভোগেন। অথচ সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অধিকাংশ দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব। তাই বর্ষা ও বন্যাকালে সাপের উপদ্রব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
সাপের অনুপ্রবেশ রোধে করণীয়:
সাপ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বসতবাড়ির পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড়, লম্বা ঘাস, কাঠের স্তূপ, ভাঙা আসবাবপত্র ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। এসব স্থান সাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে।
ঘরের দেয়াল, মেঝে, দরজা-জানালা কিংবা পাইপের চারপাশে থাকা গর্ত ও ফাটল দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ এসব পথ দিয়েই অনেক সময় সাপ ঘরে প্রবেশ করে। বিশেষ করে বন্যার সময় এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বাড়ির আশপাশে ময়লা-আবর্জনা জমিয়ে রাখা যাবে না। নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলতে হবে এবং নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। ডাস্টবিন সবসময় ঢেকে রাখা উচিত। কারণ আবর্জনা ইঁদুরকে আকৃষ্ট করে, আর ইঁদুর হলো সাপের অন্যতম প্রধান খাদ্য।
বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা দূর করাও জরুরী। উঠান, ড্রেন, বাগান কিংবা ঘরের আশপাশে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে সাপসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর বিচরণ বাড়ে। তাই পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
রাতে বাইরে চলাফেরা করলে টর্চ ব্যবহার করা উচিত। অন্ধকারে খালি পায়ে হাঁটা, ঝোপঝাড়ে হাত দেওয়া কিংবা খড়, ইট বা কাঠের স্তূপে হাত ঢোকানোর আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গ্রামের মানুষ মাঠে কাজ করার সময় লম্বা বুট বা শক্ত জুতা ব্যবহার করলে ঝুঁকি অনেক কমে।
অনেকে গাঁদা ফুল, লেমনগ্রাস, রসুন বা কিছু সুগন্ধি তেল ব্যবহার করে সাপ দূরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে এগুলোর কার্যকারিতা এখনো নিশ্চিতভাবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। তাই এসব পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
সাপে কামড়ালে কী করবেন?
সাপে কামড়ানোর পর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো আতঙ্ক। ভয় পেলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, ফলে বিষ দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহস দিতে হবে এবং যতটা সম্ভব শান্ত রাখতে হবে।
রোগীকে শুইয়ে রেখে কামড়ানো অঙ্গটি নাড়াচাড়া কম করতে হবে। সম্ভব হলে আক্রান্ত অঙ্গটি স্প্লিন্ট বা কাঠের সাহায্যে স্থির রাখা যেতে পারে। আংটি, চুড়ি, ঘড়ি বা আঁটোসাঁটো পোশাক খুলে দিতে হবে, কারণ আক্রান্ত স্থানে ফোলা দেখা দিতে পারে।
যদি নিরাপদ হয়, তবে সাপটির রং বা বৈশিষ্ট্য মনে রাখার চেষ্টা করুন অথবা দূর থেকে ছবি তুলুন। তবে কোনো অবস্থাতেই সাপ ধরতে বা মারতে যাবেন না।
এরপর যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। বিষধর সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে অ্যান্টিভেনমই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। বাংলাদেশের জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনমের ব্যবস্থা রয়েছে।
যেসব ভুল কখনো করবেন না:
আমাদের সমাজে সাপে কামড়ানোর পর নানা ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা রোগীর জীবনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
কামড়ের স্থান কেটে রক্ত বের করার চেষ্টা করবেন না। মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করবেন না। খুব শক্ত করে দড়ি, রশি বা ফিতা বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ করবেন না। বরফ, আগুন, রাসায়নিক পদার্থ বা বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ করবেন না। অ্যালকোহল বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধও খাওয়ানো উচিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওঝা, কবিরাজ বা কুসংস্কারনির্ভর চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে মূল্যবান সময় নষ্ট করা যাবে না। সাপে কামড়ানোর একমাত্র গ্রহণযোগ্য চিকিৎসা হলো প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য চিকিৎসা গ্রহণ।
বাংলাদেশে বিষধর সাপ সম্পর্কে কিছু তথ্য:
বাংলাদেশে প্রায় ৮০টি প্রজাতির সাপের অস্তিত্ব রয়েছে। এর অধিকাংশই নির্বিষ। তবে গোখরা, কালাচ, চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার), কিং কোবরা, সবুজ বোড়া প্রভৃতি কয়েকটি প্রজাতি অত্যন্ত বিষধর।
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, সাপ কামড়ালেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। বাস্তবে অধিকাংশ সাপই নির্বিষ এবং বিষধর সাপের কামড় হলেও সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে গেলে অধিকাংশ রোগীকেই সুস্থ করা সম্ভব। তাই আতঙ্ক নয়, দ্রুত চিকিৎসাই জীবন বাঁচানোর প্রধান উপায়।
সচেতনতাই সর্বোত্তম প্রতিরোধ:
প্রতিরোধ সবসময় চিকিৎসার চেয়ে উত্তম। তাই বর্ষা ও বন্যাকালে পরিবারের সবাইকে সাপ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শিশুদের ঝোপঝাড়, পানিবন্দী এলাকা কিংবা অন্ধকার স্থানে একা যেতে নিরুৎসাহিত করতে হবে। রাতে বাইরে বের হলে টর্চ ব্যবহার করতে হবে এবং ঘুমানোর আগে বিছানা, মশারি ও জুতার ভেতর ভালোভাবে দেখে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণমাধ্যমেরও উচিত বর্ষা মৌসুমে সাপে কামড়ানোর ঝুঁকি ও করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপসংহার:
বর্ষা ও বন্যাকালে সাপের উপদ্রব একটি বাস্তব ও গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে কিছু সাধারণ সতর্কতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা রাখলে এ ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, সাপে কামড়ানো মানেই মৃত্যু নয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং কুসংস্কার পরিহার করাই জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আসুন, আমরা নিজেরা সচেতন হই, পরিবার ও প্রতিবেশীকেও সচেতন করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের বালা-মুছীবত থেকে হেফাযত করুন– আমীন!
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
চিকিৎসক, কলামিষ্ট ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।
