কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

দাম্পত্য জীবনের অবক্ষয় ও ইসলামী সমাধান

post title will place here

দাম্পত্য ভাঙন ও পরকীয়ার প্রবণতাকে কোনো একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক নানা প্রভাব একযোগে কাজ করে। আবেগের ঘাটতি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিনের দূরত্ব, প্রবাসজীবনের কারণে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, বয়স ও চিন্তাধারার পার্থক্য এবং দায়িত্বহীনভাবে গড়ে ওঠা বৈবাহিক সম্পর্ক— এসব কারণ দাম্পত্য বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়।

এর পাশাপাশি পারিবারিক চাপ, সামাজিক প্রভাব এবং মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্য যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলস্বরূপ, যে দাম্পত্য সম্পর্ক শান্তি ও প্রশান্তির আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা, অসন্তোষ ও শূন্যতা। আর এই বাস্তবতার মধ্যেই বহু পরিবারে ভাঙন এবং গভীর মানসিক ক্ষতের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘ছিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা নিজেদের সাথে খিয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন। অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান করো। আর আহার করো এবং পান করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত ছিয়াম পূর্ণ করো। আর তোমরা মসজিদে ই‘তিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন, যাতে তারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৭)

পোশাকের কাজ হলো মানুষকে আবৃত করা, সুরক্ষা দেওয়া এবং উষ্ণতা প্রদান করা। বিবাহবন্ধনও ঠিক তেমনি। বিবাহ কেবল কাবিননামায় সই করার বিষয় নয়; বরং প্রতিদিনের উপস্থিতি, পারস্পরিক কথোপকথন, স্পর্শ, ভালোবাসা ও যত্নের মধ্য দিয়েই তা জীবন্ত ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে শারীরিক ও মানসিক সান্নিধ্য, একে অপরের জন্য সময় দেওয়া এবং আন্তরিক যত্নের অভাব দেখা দিলে সম্পর্কের ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইসলামী ফিক্বহে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো স্বামী যদি চার মাসের বেশি সময় স্ত্রীকে একা রেখে দূরে অবস্থান করেন, তবে স্ত্রীর বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুমাল্লাহ-এর মতামত সুপরিচিত। আমাদের সমাজে অনেক পুরুষ জীবিকার প্রয়োজনে বছরের পর বছর প্রবাসে থাকেন এবং দেশে ফেরার সুযোগ পান না। ফলে স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি বা নিজ সংসারে একাই সন্তান লালনপালন, পারিবারিক দায়িত্ব পালন এবং নানাবিধ সামাজিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়।

তবে দাম্পত্য ভাঙন বা সম্পর্কের সংকটের পেছনে কেবল দীর্ঘ প্রবাসজীবনই দায়ী নয়, আরও নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করে। যেমন- অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, জীবিকার অনিশ্চয়তা, দাম্পত্য সম্পর্কে আবেগগত দূরত্ব, পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব এবং দীর্ঘ সময় আলাদা থাকার কারণে সম্পর্কের স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা কমে যাওয়া। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ, দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন বৃদ্ধি পায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মাঝে সে-ই উত্তম, যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম। আর তোমাদের কোনো সঙ্গী মৃত্যুবরণ করলে তার সমালোচনা পরিত্যাগ করো’।[1]

তাহলে কীভাবে সেই ব্যক্তি উত্তম হতে পারেন, যিনি অনিয়ম ও অবহেলার কারণে ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে শরীরকে দুর্বল করে ফেলেছেন; নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নেননি; যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় সম্পর্কহীনভাবে কাটিয়ে হঠাৎ বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেন; যার মধ্যে দাম্পত্য বোঝাপড়া ও মানসিক পরিপক্বতার ঘাটতি রয়েছে; যিনি ৫০ বছর বয়সে ১৮ বছরের এক তরুণীকে বিয়ে করেন, কিন্তু বয়স, অভিজ্ঞতা ও চাহিদার বিশাল ব্যবধান উপলব্ধি করেন না; যিনি বিবাহকে কেবল ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখেন; যিনি ভবিষ্যৎ, সন্তান, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বাস্তবসম্মত চিন্তা করেন না এবং যার মধ্যে ত্যাগ, ধৈর্য ও ন্যায়বিচারের ঘাটতি রয়েছে?

উপরিউক্ত হাদীছে মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোঝাতে চেয়েছেন যে, সেই ব্যক্তিই প্রকৃত অর্থে উত্তম, যিনি স্ত্রী, সন্তান ও নিকটজনদের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের অধিকার রক্ষা করেন এবং দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ থাকেন।

এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ তখনই পূর্ণাঙ্গভাবে ভালো হতে পারেন, যখন তার শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক পরিপক্বতা এবং নৈতিক চরিত্র—তিনটিই সুসংহত থাকে। এদের যেকোনো একটির দুর্বলতা অন্য দুটিকেও প্রভাবিত করে।

প্রথমে শারীরিক প্রস্তুতির প্রসঙ্গ ধরা যাক। মানুষের শরীর একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, নিয়মিত যত্নের অভাবে তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তির ওপর নয়, তার পারিবারিক জীবনেও পড়ে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণা বলছে, ডায়াবেটিক পুরুষদের মধ্যে ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের হার সাধারণ পুরুষের তুলনায় তিন গুণ বেশি। এর কারণ হলো ডায়াবেটিস রক্তনালি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি সৃষ্টি করে, ফলে যৌন কার্যক্ষমতা সরাসরি ব্যাহত হয়। ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি যুক্ত হয়ে সমস্যাকে আরও খারাপ করে তোলে। জার্নাল অব সেক্সুয়াল মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে যৌন অক্ষমতার হার ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কমে। আমেরিকান ইউরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, ৪৫ বছরের পর প্রতি বছর প্রায় ১-২ শতাংশ হারে এই হরমোন হ্রাস পায়। ফলে যে ব্যক্তি বছরের পর বছর নিজের শরীরের যত্ন নেননি, পঞ্চাশের পরে তার পক্ষে তরুণী স্ত্রীর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়া স্বাভাবিক ও পূর্বানুমেয়। ইসলামও এই দায়িত্বকে এড়িয়ে যায়নি। ইসলামও এ দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়েছে। ফিক্বহে ‘হাক্কুল ইস্তিমতা’ অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শারীরিক সান্নিধ্য ও উপভোগের অধিকারকে বৈবাহিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তবে শারীরিক প্রস্তুতির ঘাটতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে মানসিক অপরিপক্বতা। দীর্ঘদিন একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন ব্যক্তির জন্য দাম্পত্য জীবনের পারস্পরিক সমন্বয় ও দায়িত্বের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কঠিন হতে পারে। মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুযায়ী, মানুষের সম্পর্ক গঠনের ধরন শৈশব থেকে বিকশিত হয় এবং পরবর্তী জীবনে তা আরও দৃঢ় হয়। দীর্ঘ সময় একাকী জীবনযাপন করা কিছু মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে অনীহা বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বয়সের সঙ্গে যদি মানসিক অনমনীয়তাও যুক্ত হয়, তাহলে নতুন সম্পর্কের চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

বয়সের ব্যবধানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের শুরু ও পরিণত পর্যায় দুটি ভিন্ন মানসিক ও সামাজিক বাস্তবতা নির্দেশ করে। মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসনের মনোসামাজিক বিকাশ তত্ত্ব অনুযায়ী, কৈশোর-পরবর্তী সময়ে মানুষ নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করে আর মধ্য ও পরবর্তী প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে মানুষ অর্জন, দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার নিয়ে বেশি মনোযোগী হয়। ফলে দুই প্রজন্মের মানুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে উঠলে তাদের প্রত্যাশা, চিন্তাভাবনা ও জীবনদৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। গবেষণায়ও দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান বেশি হলে বৈবাহিক দ্বন্দ্ব ও বিচ্ছেদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

সন্তান ও ভবিষ্যতের প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণী স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ, স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক ভবিষ্যৎ কামনা করতে পারেন। অন্যদিকে অধিক বয়সে পিতৃত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে সন্তানের লালনপালন, দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি এবং শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে বাস্তব প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় অধিক পিতৃবয়সের সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির সম্ভাব্য সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু বর্তমানের আবেগ নয়, ভবিষ্যতের দায়িত্ব, সন্তান এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সবশেষে আসে ত্যাগ, ধৈর্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গোলেম্যান তাঁর বিখ্যাত ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ গ্রন্থে বলেছেন, একজন মানুষের সাফল্য ও সম্পর্কের গুণমান তার IQ (Intelligence Quotient)-এর চেয়ে EQ (Emotional Quotient)-এর উপর বেশি নির্ভর করে অর্থাৎ আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার উপর। উল্লেখ্য, IQ হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার পরিমাপ, যার মাধ্যমে জানা যায় সে কতটা যুক্তি, বিশ্লেষণ ও শেখার দক্ষতা রাখে। আর EQ হলো আবেগ ও সম্পর্ক বোঝা ও সামলানোর ক্ষমতা এবং নিজের ও অন্যের অনুভূতি বুঝে সঠিকভাবে আচরণ করার দক্ষতা। সফল জীবনে দুটোরই প্রয়োজন থাকলেও সামাজিক ও দাম্পত্য জীবনে আলাইহিস সালামরাহিমাহুমাল্লাহ অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার মূল উপাদান হলো সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অপরের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার ক্ষমতা। যে পুরুষ বিয়েকে চাহিদা পূরণের মাধ্যমই মনে করেন এবং স্ত্রীর স্বপ্ন, ভয় ও প্রত্যাশার কথা ভাবেন না, তার আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা যে অপরিপক্ব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, ‘তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম…’-এই কথার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি শরীর, মন ও নৈতিকতাকে একসাথে সক্রিয় রাখার গভীর দায়িত্ববোধের কথাও বুঝিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম ম্যাসলোর চাহিদার সোপান তত্ত্বে শারীরিক চাহিদা নিচে থাকলেও এটিই মানুষের মৌলিক ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রয়োজন। দীর্ঘদিন প্রাথমিক চাহিদা অপূর্ণ থাকলে মানুষের মনে এক ধরনের মানসিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। আবেগীয় সংযোগ, বোঝাপড়া ও ঘনিষ্ঠতার অভাবজনিত মানসিক শূন্যতা পূরণের চেষ্টা ভুল হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে থাকে স্বাভাবিক মানবিক কারণ। তবে এমন আচরণকে অনুমোদন করার সুযোগ নেই, বরং এর পেছনের কারণ গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিপথগামিতাকে কখনও যুক্তিসংগত করা যায় না। ইসলামে ব্যভিচার কাবীরা গুনাহ এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর তোমরা যেনা-ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, তা হচ্ছে অশ্লীল কাজ আর অতি জঘন্য পথ’ (আল-ইসরা,১৭/৩২)

সুতরাং যে নারী পরকীয়ায় জড়ায়, তার পাপ তার নিজের। স্বামীর ব্যর্থতা বা অবহেলা সেই পাপের বৈধতা বা কৈফিয়ত হতে পারে না। তবে সমাজ হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে, কোন পরিস্থিতিগুলো মানুষকে এ ধরনের পাপের দিকে ধাবিত করে বা সেই পথকে সহজ করে দেয়।

এ ক্ষেত্রে বয়সের বিশাল ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন পুরুষের সঙ্গে আঠারো বছরের এক তরুণীর বিবাহ বা সম্পর্ক অনেক সময় পারস্পরিকতার চেয়ে অসমতার দিকে বেশি ঝোঁকে। মেয়েটি হয়তো দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশায় বিবাহে সম্মত হয়েছে, আবার পরিবারও অর্থনৈতিক বা সামাজিক সুবিধার প্রত্যাশায় এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। কিন্তু একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য যে স্বাভাবিক মানসিক, আবেগিক ও জীবনগত সামঞ্জস্য প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রে শুরু থেকেই অনুপস্থিত থাকে।

মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যান তার দীর্ঘ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সফল দাম্পত্য সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো Emotional Attunement বা গভীর আবেগিক সংযোগ। অর্থাৎ একে অপরের অনুভূতি, চাহিদা ও মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা। কিন্তু বয়সের বড় ব্যবধানের কারণে স্বামী-স্ত্রীর অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা, জীবনদৃষ্টি ও আবেগের জগতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হতে পারে। ফলে সেই আবেগিক সংযোগ গড়ে তোলা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আর দীর্ঘ সময় আলাদা থাকা বা প্রবাসজীবনের কারণে এই সংযোগ বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে যায়।

ফলস্বরূপ, সম্পর্কের মধ্যে একাকিত্ব, অপূর্ণতা ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। যদিও এসব পরিস্থিতি কোনো অনৈতিক সম্পর্ক বা পরকীয়ার নৈতিক দায়কে লঘু করে না, তবুও এগুলো এমন কিছু বাস্তব কারণ, যা সম্পর্কের দুর্বলতা ও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইসলামে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য কী? সূরা আর-রূমে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে ক্বওমের জন্য, যারা চিন্তা করে’ (আর-রূম, ৩০/২১)। এই আয়াতে তিনটি শব্দ গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। প্রশান্তি তখনই আসে, যখন দুজন মানুষ একে অপরের পাশে থাকে; ভালোবাসা তখনই টিকে থাকে, যখন সম্পর্কে নিয়মিত বিনিয়োগ হয় এবং দয়া তখনই প্রকাশ পায়, যখন একজন আরেকজনের দুর্বলতাকে সম্মান করে। কিন্তু মানসিক দূরত্ব, দায়িত্বহীনতা, আবেগীয় সংযোগের অভাব, বয়স ও অভিজ্ঞতার বড় ব্যবধান, স্বার্থকেন্দ্রিক মনোভাব এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতির মতো বাস্তবতা এই তিনটি গুণের বিকাশকে গভীরভাবে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে এগুলো স্বাভাবিকভাবে পূর্ণতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। 

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিনের দূরত্ব সম্পর্ককে এমনভাবে দুর্বল করে যে, তা পুনরুদ্ধারে অনেক সময় প্রয়োজন হয়।

পারিবারিক ভাঙনের কারণ হিসেবে স্বামীর অনুপস্থিতিকেই দায়ী করা বিপজ্জনক সরলীকরণ। এই যুক্তি মেনে নিলে স্বীকার করতে হয় যে, মানুষের নৈতিক অবস্থান পরিস্থিতির দাস অর্থাৎ পাশে কেউ না থাকলে মানুষ বিপথে যাবেই, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমাজ পর্যবেক্ষণে বুঝা যায়, প্রবাসী পরিবার ছাড়াও একই ছাদের নিচে থাকা দম্পতিদের মধ্যেও বিশ্বাসঘাতকতা ঘটে। শহরের মধ্যবিত্ত পরিবার, গ্রামের কৃষকের সংসার, এমনকি ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত পরিবারেও সম্পর্কের ফাটল দেখা দেয়। তাহলে প্রশ্ন জাগে, দূরত্ব যদি কারণ না হয়; তবে আসল কারণ কী? উত্তর একটাই, মূল্যবোধের ক্ষয়, দায়িত্ববোধের অনুপস্থিতি এবং সমাজের সামগ্রিক নৈতিক অবক্ষয়।

এই অবক্ষয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়া। পরিবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্বল হয়েছে, কারণ সমাজ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সম্পর্কের উপরে স্থান দিতে শিখেছে। প্রযুক্তি মানুষকে কাছে আনার বদলে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্যুতির নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। বিনোদনমাধ্যম সম্পর্কের গভীরতার চেয়ে উত্তেজনাকে মহিমান্বিত করেছে। শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রম থেকে কার্যত বিদায় দিয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসন সামাজিক চাপ থেকে ব্যক্তি-পছন্দের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো একসাথে এমন এক সমাজ তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেয়ে ব্যক্তিগত সুখের অনুসন্ধানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইসলামী ফিক্বহ বিয়ের ক্ষেত্রে কুফূর কথা বলেছে অর্থাৎ পাত্র-পাত্রীর মধ্যে সামঞ্জস্য। বয়স, শিক্ষা ও মানসিকতা ইত্যাদিতে সাযুজ্য থাকা উচিত।

পারস্পরিক দায়িত্ব ও বোঝাপড়ার অভাবই দাম্পত্য ভাঙনের মূল কারণ, যার মধ্যে স্বামীর অবহেলা, স্ত্রীর বিচ্যুতি, পরিবারের স্বার্থপর আচরণ ও সমাজের নীরবতা অন্তর্ভুক্ত। তবে সংসারের স্থিতি রক্ষার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের উপরই বর্তায়। কারণ পুরুষই দাম্পত্য সম্পর্কের উদ্যোক্তা, অভিভাবক ও কর্তা। নিজ হাতে গড়া বাগানের পরিচর্যার দায়িত্ব অন্য কারও নয়। যে মালি বাগানে আসা বন্ধ করে দেয়, সে আগাছার জন্য অন্যকে দোষ দেওয়ার অধিকার হারায়।

তাই পুরুষদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট আহ্বান, শরীরের প্রতি যত্নশীল হোন (অসুস্থ, বার্ধক্যক্লিষ্ট বা উদাসীন শরীর দিয়ে দাম্পত্যের পূর্ণ দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়), বয়সের বাস্তবতা মাথায় রেখে বিবাহের সিদ্ধান্ত নিন (তরুণী স্ত্রীর চাহিদা, স্বপ্ন ও প্রয়োজন বোঝার সক্ষমতা আপনার আছে কি-না, সেটি আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন)। পরিবার অর্থের ভিত্তিতে স্থায়ী হয় না; স্থায়ী হয় উপস্থিতি, মনোযোগ ও ভালোবাসার ধারাবাহিক অনুশীলনে। এই সত্য পনেরো শত বছর আগেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্পষ্ট করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা জোর করে নারীদের ওয়ারিছ হবে। আর তোমরা তাদেরকে আবদ্ধ করে রেখো না, তাদেরকে যা দিয়েছ তা থেকে তোমরা কিছু নিয়ে নেওয়ার জন্য; তবে যদি তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করো। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন’ (আন-নিসা, /১৯)

আয়াতটি আর্থিক দায়িত্বের পাশাপাশি সময় দেওয়া, সম্মান বজায় রাখা এবং স্ত্রীর মানবিক মর্যাদা রক্ষার নির্দেশনা দেয়। যে পুরুষ এই দায়িত্ব পালন করেন, তার সংসার স্বাভাবিকভাবে শৃঙ্খলিত ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে সরল, পবিত্র ও দায়িত্বশীল ইসলামী দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য অনুধাবন করার এবং সেই জীবন বাস্তবে উপভোগ করার তাওফীক্ব দান করেন, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা, ধৈর্য ও সচেতন দায়িত্ববোধের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবার গড়ে ওঠে- আমীন!

আয়াজ আহমাদ

আসাম, ভারত।


[1]. তিরমিযী, হা/৩৮৯৫।

Magazine