কীসের মাধ্যমে হদ্দ (শাস্তি) প্রমাণিত হয়?
হদ্দ (শাস্তি) দুটির যেকোনো একটির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়— (১) ইক্বরার (স্বীকারোক্তি) অথবা (২) সাক্ষ্য (শাহাদাত)।[1]
ইক্বরারের (স্বীকারোক্তির) প্রমাণ হলো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়েয রাযিয়াল্লাহু আনহু ও গামিদিয়্যাহ নারীকে তাদের নিজেদের অপরাধ স্বীকার করার কারণে রজম (পাথর নিক্ষেপ করে শাস্তি) প্রদান করেছিলেন। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,لَمَّا أَتَى مَاعِزُ بْنُ مَالِكٍ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ لَعَلَّكَ قَبَّلْتَ أَوْ غَمَزْتَ أَوْ نَظَرْتَ قَالَ لاَ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ أَنِكْتَهَا لاَ يَكْنِي قَالَ فَعِنْدَ ذَلِكَ أَمَرَ بِرَجْمِهِ যখন মায়েয ইবনু মালেক নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসল, তখন তিনি তাকে বললেন, ‘সম্ভবত তুমি চুম্বন করেছ অথবা ইশারা করেছ অথবা (খারাপ দৃষ্টিতে) তাকিয়েছ?’ সে বলল, না, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, ‘তাহলে কি তার সঙ্গে তুমি সঙ্গম করেছ?’ কথাটি তিনি তাকে অস্পষ্টভাবে জিজ্ঞেস করেননি, (বরং স্পষ্টভাবে জিজ্ঞেস করেছেন)। সে বলল, হ্যাঁ। তখন তাকে রজম করার নির্দেশ দিলেন।[2] সুলায়মান ইবনু বুরায়দা রাহিমাহুল্লাহ, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
أَنَّ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَتْهُ امْرَأَةٌ مِنْ غَامِدٍ مِنَ الْأَزْدِ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللهِ طَهِّرْنِي فَقَالَ وَيْحَكِ ارْجِعِي فَاسْتَغْفِرِي اللهَ وَتُوبِي إِلَيْهِ فَقَالَتْ أَرَاكَ تُرِيدُ أَنْ تُرَدِّدَنِي كَمَا رَدَّدْتَ مَاعِزَ بْنَ مَالِكٍ قَالَ وَمَا ذَاكِ؟ قَالَتْ إِنَّهَا حُبْلَى مِنَ الزِّنَى فَقَالَ آنْتِ؟ قَالَتْ نَعَمْ فَقَالَ لَهَا حَتَّى تَضَعِي مَا فِي بَطْنِكِ قَالَ فَكَفَلَهَا رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ حَتَّى وَضَعَتْ قَالَ فَأَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ قَدْ وَضَعَتِ الْغَامِدِيَّةُ فَقَالَ إِذًا لَا نَرْجُمُهَا وَنَدَعُ وَلَدَهَا صَغِيرًا لَيْسَ لَهُ مَنْ يُرْضِعُهُ فَقَامَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ فَقَالَ إِلَيَّ رَضَاعُهُ يَا نَبِيَّ اللهِ قَالَ فَرَجَمَهَا.
আযদ গোত্রের গামিদী পরিবারের এক মহিলা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন। তখন তিনি বললেন, তোমার দুর্ভাগ্য তুমি ফিরে যাও এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তওবা করো। তখন মহিলা বলল, আপনি কি আমাকে সেভাবে ফিরিয়ে দিতে চান, যেভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মায়েয ইবনু মালেককে? তখন তিনি বললেন, ‘তোমার কী হয়েছে?’ মহিলা বলল, আমি ব্যভিচারের কারণে গর্ভবতী হয়েছি। তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি এমন কাজ করেছ?’ সে প্রত্যুত্তরে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি তাকে বললেন, ‘তোমার গর্ভের সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো’। বর্ণনাকারী বলেন, এক আনছারী ব্যক্তি তার গর্ভের সন্তান প্রসবকাল পর্যন্ত তার দায়িত্ব গ্রহণ করল। বর্ণনাকারী বলেন, কিছুদিন পর ঐ ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, গামিদী মহিলা তো সন্তান প্রসব করেছে। তখন তিনি বললেন, ‘এমতাবস্থায় তার ছোট শিশু সন্তানকে রেখে আমি তাকে রজম করতে পারি না। কেননা তার শিশু সন্তানকে দুধ পান করানোর মতো কেউ নেই’। তখন এক আনছারী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তার দুধ পান করানোর দায়িত্ব নিলাম। তখন তিনি তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার আদেশ করলেন।[3]
অতঃপর যদি সে তার স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে আসে, তবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কারণ নুআইম ইবনু হাযযাল রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীছে এ বিষয়ে প্রমাণ এসেছে, তিনি বলেন,
كَانَ مَاعِزُ بْنُ مَالِكٍ يَتِيمًا فِي حِجْرِ أَبِي فَأَصَابَ جَارِيَةً مِنَ الْحَيِّ.......الْحَدِيْثُ إِلَىٰ أَنْ قَالَ فَأَمَرَ بِهِ أَنْ يُرْجَمَ فَأُخْرِجَ بِهِ إِلَى الْحَرَّةِ فَلَمَّا رُجِمَ فَوَجَدَ مَسَّ الْحِجَارَةِ جَزِعَ فَخَرَجَ يَشْتَدُّ فَلَقِيَهُ عَبْدُ اللهِ بْنُ أُنَيْسٍ وَقَدْ عَجَزَ أَصْحَابُهُ فَنَزَعَ لَهُ بِوَظِيفِ بَعِيرٍ فَرَمَاهُ بِهِ فَقَتَلَهُ ثُمَّ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ هَلَّا تَرَكْتُمُوهُ لَعَلَّهُ أَنْ يَتُوبَ فَيَتُوبَ اللهُ عَلَيْهِ.
মায়েয ইবনু মালেক ইয়াতীম ছিলেন এবং সে আমার পিতার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত। অতঃপর তিনি এলাকার এক বাঁদির সাথে যেনা করেন। ...এরপর হাদীছটি বর্ণিত হতে থাকে, এক পর্যায়ে এসে বলা হয়েছে, বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি রজমের আদেশ দিলে তাকে হাররাহ নামক অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর যখন তাকে পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করা হলো, তখন পাথরের আঘাতের অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি অধৈর্য হয়ে পড়লেন এবং দৌড়ে পালিয়ে গেলেন। তারপর আব্দুল্লাহ ইবনু উনায়স তাকে এরূপ অবস্থায় পেলেন যে, তার সঙ্গীরা পাথর মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তখন আব্দুল্লাহ উটের একটি পায়ের হাড্ডির আঘাতে তাকে মেরে ফেললেন। অতঃপর তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে পুরো বিষয় বর্ণনা করলেন। তখন তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা তাকে কেন ছেড়ে দিলে না? সম্ভবত সে তওবা করত এবং আল্লাহ তাআলাও তার তওবা কবুল করে নিতেন’।[4] অন্য বর্ণনায় রয়েছে, জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,فَلَمَّا رَجَعْنَا إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَخْبَرْنَاهُ قَالَ فَهَلَّا تَرَكْتُمُوهُ وَجِئْتُمُونِي بِهِ لِيَسْتَثْبِتَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْهُ فَأَمَّا لِتَرْكِ حَدٍّ فَلَا অতঃপর আমরা যখন ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসব কথা বললাম, তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে না কেন এবং আমার নিকট নিয়ে এলে না কেন?’ যাতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অনুতাপ কবুল করতেন। কিন্তু তিনি হদ্দ পরিত্যাগ করার জন্য একথা বলেননি’।[5] এর অর্থ হলো নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ কথাটি বলেছিলেন বিষয়টি নিশ্চিতভাবে যাচাই করা ও বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করার উদ্দেশ্যে। অতঃপর যদি তিনি এমন কোনো সন্দেহ (শুবহা) পেতেন, যার কারণে হদ্দ রহিত হয়ে যায়; তবে সেই সন্দেহের কারণেই তিনি হদ্দ প্রয়োগ করতেন না। আর যদি তেমন কোনো সন্দেহ না পেতেন, তবে তিনি তার উপর হদ্দ কার্যকর করতেন। এর দ্বারা এ উদ্দেশ্য নয় যে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তাকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এটাও উদ্দেশ্য নয় যে, হদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির শাস্তি থেকে পালিয়ে যাওয়াকে হদ্দ বাতিল হওয়ার কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কারণেই তিনি বলেছেন, فَهَلَّا تَرَكْتُمُوهُ وَجِئْتُمُونِي بِهِ ‘তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে না কেন এবং আমার নিকট নিয়ে এলে না কেন?’[6]
যে ব্যক্তি বলে, সে (فُلَانَةَ) অমুকের সঙ্গে যেনা করেছে, তার শাস্তির বিধান:
যদি সে নিজের বিরুদ্ধে স্বীকার করে বলে, সে অমুক নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করেছে; তবে তার উপর হদ্দ (শাস্তি) কার্যকর করা হবে। আর যদি সে নারী নিজে নিজের বিরুদ্ধে স্বীকার করে, তবে তার উপরও হদ্দ কার্যকর করা হবে। আবূ হুরায়রা ও যায়দ ইবনু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أَنَّ رَجُلَيْنِ اخْتَصَمَا إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ أَحَدُهُمَا اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ وَقَالَ الآخَرُ وَهُوَ أَفْقَهُهُمَا أَجَلْ يَا رَسُولَ اللهِ فَاقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللهِ وَأْذَنْ لِي أَنْ أَتَكَلَّمَ قَالَ تَكَلَّمْ قَالَ إِنَّ ابْنِي كَانَ عَسِيفًا عَلَى هَذَا قَالَ مَالِكٌ وَالعَسِيفُ الأَجِيرُ فَزَنَى بِامْرَأَتِهِ فَأَخْبَرُونِي أَنَّ عَلَى ابْنِي الرَّجْمَ فَافْتَدَيْتُ مِنْهُ بِمِائَةِ شَاةٍ وَبِجَارِيَةٍ لِي ثُمَّ إِنِّي سَأَلْتُ أَهْلَ العِلْمِ فَأَخْبَرُونِي أَنَّ مَا عَلَى ابْنِي جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ وَإِنَّمَا الرَّجْمُ عَلَى امْرَأَتِهِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَا وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللهِ أَمَّا غَنَمُكَ وَجَارِيَتُكَ فَرَدٌّ عَلَيْكَ وَجَلَدَ ابْنَهُ مِائَةً وَغَرَّبَهُ عَامًا وَأَمَرَ أُنَيْسًا الأَسْلَمِيَّ أَنْ يَأْتِيَ امْرَأَةَ الآخَرِ فَإِنِ اعْتَرَفَتْ فَارْجُمْهَا فَاعْتَرَفَتْ فَرَجَمَهَا.
দুজন লোক রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তাদের বিবাদ নিয়ে আসল। তাদের একজন বলল, আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করে দিন। অন্যজন (আর সে ছিল দুজনের মাঝে অধিক বিজ্ঞ) বলল, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করে দিন আর আমাকে কথা বলার অনুমতি দিন। তিনি বললেন, ‘বলো’। সে বলল, আমার ছেলে তার মজুর ছিল। মালিক (বর্ণনাকারী রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আসীফ’ অর্থ মজুর। সে তার স্ত্রীর সাথে যেনা করে ফেলে। লোকেরা আমাকে বলল যে, আমার ছেলের উপর রজম বর্তাবে। আমি এর বিনিময়ে তাকে ১০০ ছাগল ও আমার এক দাসী দিয়ে দেই। তারপর আলেমদের জিজ্ঞেস করি। তারা আমাকে বললেন যে, আমার ছেলের শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন। আর রজম তার স্ত্রীর উপর-ই বর্তাবে। তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘জেনে রেখো! কসম ঐ সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! অবশ্যই আমি আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী তোমাদের উভয়ের মাঝে ফয়সালা করব। তোমার ছাগল ও দাসী তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে’। তারপর তার ছেলেকে ১০০ বেত্রাঘাত করলেন ও এক বছরের জন্য নির্বাসিত করলেন। আর উনাইস আল-আসলামী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আদেশ করলেন, যেন সে অপর ব্যক্তির স্ত্রীর নিকট যায় এবং যদি সে স্বীকার করে, তবে যেন তাকে রজম করে। সে স্বীকার করল। ফলে তাকে সে রজম করল।[7]
সাক্ষীর মাধ্যমে এর প্রমাণ সাব্যস্ত হওয়া:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ‘আর যারা সতীসাধ্বী নারীর প্রতি (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয়। অথচ চারজন (প্রত্যক্ষদর্শী) সাক্ষী হাযির করতে পারে না, তাদের ৮০টি বেত্রাঘাত করো। আর তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। বস্তুত, এরাই হলো পাপাচারী’ (আন-নূর, ২৪/৪)।
অতঃপর যদি মুসলিমদের মধ্য থেকে চারজন স্বাধীন ও ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষ্য দেয় যে, তারা অমুক পুরুষের পুরুষাঙ্গকে অমুক নারীর যোনিতে প্রবেশ করতে স্বচক্ষে দেখেছে, যেমনভাবে সুরমা লাগানোর শলকা সুরমাদানিতে প্রবেশ করে এবং যেমনভাবে কূপে পানি তোলার দড়ি প্রবেশ করে; তাহলে ওই পুরুষ ও ওই নারীর উপর (যেনার) শাস্তি কার্যকর করা হবে।
আর যদি তিনজন সাক্ষ্য দেয় এবং চতুর্থ ব্যক্তি অনুপস্থিত থাকে (বা সাক্ষ্য দিতে ব্যর্থ হয়), তাহলে ঐ তিনজনের উপর ‘কযফ’ (মিথ্যা অপবাদ)-এর শাস্তি কার্যকর হবে। এই বিধান মহান কুরআনুল কারীমের আয়াতের ভিত্তিতে এবং কাসামাহ ইবনু যুহাইর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত বর্ণনার কারণে। তিনি বলেছেন,
لَمَّا كَانَ مِنْ شَأْنِ أَبِي بَكْرَةَ وَالْمُغِيرَةِ الَّذِي كَانَ وَذَكَرَ الْحَدِيثَ قَالَ فَدَعَا الشُّهُودَ فَشَهِدَ أَبُو بَكْرَةَ وَشِبْلُ بْنُ مَعْبَدٍ وَأَبُو عَبْدِ اللهِ نَافِعٌ فَقَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ حِينَ شَهِدَ هَؤُلَاءِ الثَّلَاثَةُ شَقَّ عَلَى عُمَرَ شَأْنُهُ فَلَمَّا قَامَ زِيَادٌ قَالَ إِنْ تَشْهَدْ إِنْ شَاءَ اللهُ إِلَّا بِحَقٍّ؟ قَالَ زِيَادٌ أَمَّا الزِّنَا فَلَا أَشْهَدُ بِهِ وَلَكِنْ قَدْ رَأَيْتُ أَمْرًا قَبِيحًا قَالَ عُمَرُ اللهُ أَكْبَرُ حُدُّوهُمْ فَجَلَدُوهُمْ قَالَ فَقَالَ أَبُو بَكْرَةَ بَعْدَمَا ضَرَبَهُ أَشْهَدُ أَنَّهُ زَانٍ فَهَمَّ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنْ يُعِيدَ عَلَيْهِ الْجَلْدَ فَنَهَاهُ عَلِيٌّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ وَقَالَ إِنْ جَلَدْتَهُ فَارْجُمْ صَاحِبَكَ فَتَرَكَهُ وَلَمْ يَجْلِدْهُ.
যখন আবূ বাকরাহ ও মুগীরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর ঘটনার বিষয়টি ঘটেছিল, যা ঘটবার ছিল এবং বর্ণনাকারী সম্পূর্ণ হাদীছটি উল্লেখ করলেন, তিনি বলেন, অতঃপর (আমীরুল মুমিনীন) উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু সাক্ষীদের ডেকে পাঠালেন। তখন আবূ বাকরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু, শিবল ইবনু মা‘বাদ ও আবূ আব্দুল্লাহ নাফে‘ সাক্ষ্য দিলেন। এই তিনজন যখন সাক্ষ্য দিলেন, তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন মনে হলো। অতঃপর যখন যিয়াদ দাঁড়ালেন, তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি কি আল্লাহর ইচ্ছায় কেবল সত্যের ভিত্তিতেই সাক্ষ্য দিবে? যিয়াদ বললেন, যেনার বিষয়ে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি না; তবে আমি একটি অত্যন্ত অশ্লীল ও নিন্দনীয় কাজ দেখেছি। তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহু আকবার! এদের উপর (কযফের) শাস্তি কার্যকর করো। অতঃপর তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হলো। বর্ণনাকারী বলেন, যখন আবূ বাকরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে শাস্তি দেওয়া হলো, এরপর তিনি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, সে যেনা করেছে। তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তার উপর পুনরায় বেত্রাঘাত করার সংকল্প করলেন। কিন্তু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বাধা দিলেন এবং বললেন, যদি আপনি তাকে আবার বেত্রাঘাত করেন, তবে আপনার সঙ্গীকেও রজম (পাথর নিক্ষেপ) করতে হবে। অতঃপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ছেড়ে দিলেন এবং আর বেত্রাঘাত করলেন না।[8]
মাহরাম নারীর সাথে যেনায় লিপ্ত ব্যক্তির বিধান:
যে ব্যক্তি তার মাহরাম নারীর সাথে যেনা করে, তার শাস্তি হলো হত্যা। সে বিবাহিত (মুহছান) হোক অথবা অবিবাহিত (গায়রে মুহছান) হোক। আর যদি সে তাকে (মাহরাম নারীকে) বিবাহ করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে এবং তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,لَقِيْتُ عَمِّى وَمَعَهُ الرَّايَةُ فَقُلْتُ أَيْنَ تُرِيْدُ؟ قَالَ بَعَثَنِىْ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَىٰ رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةَ أَبِيْهِ بَعْدَهُ أَنْ أَضْرِبَ عُنُقَهُ وَآخُذَ مَالَهُ আমি আমার চাচার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম, তার হাতে ছিল পতাকা। আমি বললাম, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছেন এমন একজন ব্যক্তির নিকট, যে তার পিতার মৃত্যুর পর তার পিতার স্ত্রীকে বিবাহ করেছে। যেন আমি তার শিরশ্ছেদ করি এবং সম্পদ অধিগ্রহণ করি।[9]
যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে যেনায় লিপ্ত হয় তার বিধান সম্পর্কে ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ وَقَعَ عَلَى بَهِيمَةٍ فَاقْتُلُوهُ وَاقْتُلُوا الْبَهِيمَةَ ‘যে ব্যক্তি পশুর সাথে সহবাস করে, তোমরা তাকেও হত্যা করো এবং পশুটিকেও হত্যা করো’।[10]
সমকামিতার হদ্দ (শাস্তি):
যদি কোনো পুরুষ অন্য এক পুরুষের পায়ুপথে প্রবেশ করায়, তাহলে তাদের উভয়ের শাস্তি হলো হত্যা। তারা উভয়েই বিবাহিত (মুহছান) হোক কিংবা অবিবাহিত (হায়রে মুহছান) হোক, উভয় অবস্থাতেই। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ‘তোমরা কাউকে যদি লূত গোত্রের মতোই কুকর্মে লিপ্ত দেখতে পাও, তাহলে কর্তা ও যার সাথে করা হয়েছে তাদের উভয়কে হত্যা করো’।[11]
মূল: ড. আব্দুল আযীম আল-বাদাবী
অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
* শায়খ আব্দুল আযীম বাদাবী প্রণীত ‘আল-ওয়াজীয ফী ফিক্বহিস সুন্নাতি ওয়াল কিতাবিল আযীয’ বই থেকে সংগৃহীত।
* প্রিন্সিপ্যাল, দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাজীপুর।
[1]. ফিক্বহুস সুন্নাহ, ৩/৩৫২।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮২৪; আবূ দাঊদ, হা/৪৪২৭।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯৫; মিশকাত, হা/৩৫৬২।
[4]. আবূ দাঊদ, হা/৪৪১৯; মিশকাত, হা/৩৫৮১। আলবানী রাহিমাহুল্লাহ (لَعَلَّهُ أَنْ) ‘সম্ভবত সে’ এই অংশটি ব্যতীত হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। (وَظِيفِ بَعِيرٍ)-এর অর্থ হলো এমন উট এবং একইভাবে ঘোড়া বা অনুরূপ প্রাণী, যার বাহু ও পা চিকন, সরু ও ক্ষীণাকৃতির।
[5]. আবূ দাঊদ, হা/৪৪২০, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে হাসান বলেছেন।
[6]. নায়লুল আওত্বার, ৭/১২৩।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/২৭, ৬৮২৮, ৬৮৪২, ৬৮৪৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭, ১৬৯৮; আবূ দাঊদ, হা/৪৪৪৫; তিরমিযী, হা/১৪৩৩; ইবনু মাজাহ, হা/২৫৪৯; নাসাঈ, হা/৫৪১০; মিশকাত, হা/৩৫৫৫।
[8]. ইরওয়াউল গালীল, ৮/২৯; বায়হাক্বী, হা/১৭০৪২, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটির সনদ ছহীহ বলেছেন।
[9]. ইরওয়াউল গালীল, হা/২৩৫১; আবূ দাঊদ, হা/৪৪৫৭; নাসাঈ, হা/৩৩৩১, ৩৩৩২। এই হাদীছটি তিরমিযী ও ইবনু মাজাহতেও বর্ণিত হয়েছে, তবে সেখানে (وآخذ ماله) ‘এবং তার সম্পদ অধিগ্রহণ করব’—এই বাক্যটি উল্লেখ নেই’ (তিরমিযী, হা/১৩৬২; ইবনু মাজাহ, হা/২৬০৭, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন)।
[10]. তিরমিযী, হা/১৪৫৫; আবূ দাঊদ, হা/৪৪৬৪; ইবনু মাজাহ, হা/২৫৬৪, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে হাসান ছহীহ বলেছেন।
[11]. তিরমিযী, হা/১৪৫৬; আবূ দাঊদ, হা/৪৪৬২; ইবনু মাজাহ, হা/২৫৬১, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।
