কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রবের বাণী (পর্ব-১০)

post title will place here

[সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩৯-৪০ আয়াত]

وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

[আল-বাক্বারাহ: ৩৯ আয়াত]

আর যারা আমার পাঠানো হেদায়াত প্রত্যাখ্যান করবে, আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে এবং নিজেদের স্বাধীনতাকে আমার অবাধ্যতায় ব্যবহার করবে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে।

আদম আলাইহিস সালাম-এর কাহিনি শুধু মানবজাতির সূচনার ইতিহাস নয়; বরং এর মধ্যেই পৃথিবীতে মানুষের সমগ্র জীবনপথের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলের পর তার জন্য তওবার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত। পৃথিবীতে শয়তানের প্ররোচনা থাকবে, তবে তার মোকাবিলায় মহান আল্লাহর হেদায়াতও থাকবে।

অতএব, প্রতিটি মানুষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে কি নিজের প্রবৃত্তি ও শয়তানের অনুসরণ করবে, নাকি নিজের রবের পাঠানো হেদায়াত অনুসরণ করে নিরাপত্তা, সফলতা ও চিরস্থায়ী মুক্তির পথে চলবে। মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের পরিণতি নির্ভর করবে এই একটিমাত্র সিদ্ধান্তের উপর।

يَابَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ

[আল-বাক্বারাহ: ৪০ আয়াত]

পূর্বের আয়াতগুলোতে মানুষকে পৃথিবীর দায়িত্বশীল হিসেবে সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে। তারপর মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াত আসবে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। ইবলীসের শত্রুতা অব্যাহত থাকবে। আল্লাহর পাঠানো হেদায়াত অনুসরণ করলে সকল ভীতি ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির সুসংবাদ জানানো হয়েছে। এবার মহান আল্লাহ মানুষদের মধ্যে এমন এক জাতির কথা আলোচনা করছেন, যারও এক সময় পৃথিবীর দায়িত্বশীল হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। হেদায়াত আসার ক্ষেত্রে অসংখ্য নবী ও কিতাব এই জাতির মধ্যেই পাঠানো হয়েছে। আল্লাহর বাছাইকৃত সেই জাতি কীভাবে ইবলীসের মতো হিংসা ও অহংকারের বেড়াজালে পড়ে পদস্খলিত হয়ে গেছে, তার হৃদয়বিদারক ইতিহাস এই আয়াতগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে।

হে বনূ ইসরাঈল! তোমরা আমার সেই নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করো, যা আমি বিশেষভাবে তোমাদেরকে দিয়েছিলাম। তোমরা একসময় ছিলে অহী বহনকারী জাতি। তোমাদের মধ্য থেকে নবী-রাসূল এসেছেন। তোমাদেরকে ফেরাউন, নেবুচাদনেজারের মতো যালেম শাসকের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তোমাদের জন্য কিতাব, শরীআত ও হেদায়াত নাযিল করা হয়েছে। তোমাদের হাতে মানবজাতির নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।

কিন্তু মনে রেখো, এসব মর্যাদা তোমাদের বংশগত অধিকার ছিল না। এগুলো তোমাদের নিজের শক্তি, যোগ্যতা বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ফলও ছিল না। এগুলো ছিল তোমাদের রবের দান। আর আল্লাহর নেয়ামত শুধু গর্ব করার বিষয় নয়, নেয়ামতের সঙ্গে দায়িত্বও আসে। যে জাতিকে কিতাব দেওয়া হয়, তার দায়িত্ব হলো কিতাবের সত্যকে আঁকড়ে ধরা। যে জাতি নবীদের উত্তরাধিকার পায়, তার দায়িত্ব হলো নবীদের পথ অনুসরণ করা। যে জাতি হেদায়াত চিনে, তার দায়িত্ব হলো পরিচিত সত্যকে অস্বীকার না করা।

তাই তোমরা আমার সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূরণ করো। তোমরা যে অঙ্গীকার করেছিলে তথা আমার নির্দেশ মেনে চলবে, আমার কিতাবকে বিকৃত করবে না, আমার নবীদের অনুসরণ করবে এবং আমার পাঠানো সত্যকে গ্রহণ করবে সে অঙ্গীকারে ফিরে এসো। বিশেষ করে সেই শেষ রাসূলের প্রতি ঈমান আনো, যার আগমনের সংবাদ তোমাদের কিতাবে পূর্ব থেকেই দেওয়া হয়েছিল। সত্যকে চিনেও গোপন করো না। পরিচিত হেদায়াত যখন তোমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন ইবলীসের মতো নিজেদের হিংসা, গোষ্ঠীগত অহংকার, দুনিয়াবী স্বার্থ ও নেতৃত্বের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করো না।

তোমরা যদি আমার অঙ্গীকার পূরণ করো, আমিও তোমাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করব। তোমাদেরকে পুনরায় হেদায়াত দান করব, রহমতের দরজা খুলে দেব, দুনিয়ায় সত্যের পথে দৃঢ়তা দেব এবং আখেরাতে সফলতার মর্যাদা দান করব। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ হয় না; কিন্তু তাঁর প্রতিশ্রুতি লাভের পথ হলো তাঁর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করা।

আর সত্য গ্রহণের পথে মানুষের ভয়কে বড় করে দেখো না। ক্ষমতা হারানোর ভয়, নেতৃত্ব হারানোর ভয়, সমাজে অবস্থান নষ্ট হওয়ার ভয়, অনুসারী কমে যাওয়ার ভয় কিংবা দুনিয়াবী স্বার্থ হারানোর ভয় যেন তোমাদেরকে আল্লাহর আয়াত থেকে ফিরিয়ে না দেয়। মানুষের হাতে সাময়িক লাভ-ক্ষতি থাকতে পারে; কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা, সম্মান, রিযিক্ব, হেদায়াত এবং শেষ পরিণতি সবই আল্লাহর হাতে।

সুতরাং ভয় যদি করতেই হয়, তবে একমাত্র আমাকেই ভয় করো। মানুষের ভয়ে সত্য গোপন করো না। দুনিয়ার স্বার্থে আখেরাত বিক্রি করো না। যে রব তোমাদের নেয়ামত দিয়েছেন, মুক্তি দিয়েছেন, কিতাব দিয়েছেন এবং মর্যাদা দিয়েছেন, তাঁর সামনে দাঁড়ানোর ভয়কেই সকল কিছুর উপরে প্রাধান্য দাও।

(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)

* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

Magazine