(মিন্নাতুল বারী-৯ম পর্ব)
باب طَرْحِ الإِمَامِ الْمَسْأَلَةَ عَلَى أَصْحَابِهِ لِيَخْتَبِرَ مَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ .
পরিচ্ছেদ: ৩/৫. ছাত্রদের জ্ঞান পরীক্ষা করার জন্য তাদেরকে প্রশ্ন করা:
حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ مَخْلَدٍ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ دِينَارٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «إِنَّ مِنَ الشَّجَرِ شَجَرَةً لاَ يَسْقُطُ وَرَقُهَا، وَإِنَّهَا مَثَلُ الْمُسْلِمِ ، حَدِّثُونِى مَا هِىَ». قَالَ فَوَقَعَ النَّاسُ فِى شَجَرِ الْبَوَادِى. قَالَ عَبْدُ اللَّهِ فَوَقَعَ فِى نَفْسِى أَنَّهَا النَّخْلَةُ، ثُمَّ قَالُوا حَدِّثْنَا مَا هِىَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ « هِىَ النَّخْلَةُ».
৬২. ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন খালেদ ইবনু মাখলাদ, তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন সুলায়মান, তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনু দীনার, তিনি ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে, তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই গাছসমূহের মধ্যে এমন একটি গাছ আছে, যার পাতা ঝরে না—আর এ গাছটিই মুসলিমের উদাহরণ। তোমরা কি বলতে পারবে, সেটি কোন গাছ?’ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, তখন মানুষ মরু এলাকার (বনাঞ্চলের) গাছগুলোর কথা পরস্পরে বলতে লাগলেন। আব্দুল্লাহ (ইবনু উমার) বলেন, আমার মনে হলো সেটা তো খেজুরগাছ, কিন্তু আমি লজ্জা করলাম। তারপর তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে বলুন, এটা কোন গাছ? তিনি বললেন, ‘এটা হচ্ছে খেজুরগাছ’।
রাবীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
(১) খালেদ ইবেন মাখলাদ: ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও ইবনু হিব্বানসহ অনেকেই তাকে মযবূত বলেছেন। তবে ইমাম আবূ হাতেম তার বিষয়ে বলেছেন, তার কিছু মুনকার হাদীছ রয়েছে।[1] আর ইমাম ইজলী বলেছেন, তিনি শীআ ছিলেন।[2]
এই দুটি অভিযোগের জবাবে আমরা বলতে চাই, ইমাম ইবনু আদী রাহিমাহুল্লাহ তার ‘আল-কামিল’ গ্রন্থে উক্ত রাবীর সকল মুনকার হাদীছ জমা করেছেন। তার মধ্যে ছহীহ বুখারীতে উল্লিখিত এই রাবীর কোনো হাদীছ পড়েনি। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এই রাবীর প্রায় ৩০টির মতো হাদীছ তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। হাদীছগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়— প্রথমত, প্রায় সকল হাদীছে এই রাবীর মুতাবাআত রয়েছে তথা সেই হাদীছগুলো বর্ণনায় এই রাবী একক নন; বরং খালেদ ছাড়াও আরও অনেকেই হাদীছগুলো বর্ণনা করেছেন। যেমন আমাদের এই হাদীছটিই পূর্বের অধ্যায়ে খালেদের জায়গায় কুতায়বা বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, হাদীছগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ খালেদের বর্ণিত সেই হাদীছগুলোই শুধু গ্রহণ করেছেন, যখন হাদীছগুলো সুলায়মান ইবনে বেলাল থেকে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ খালেদ অন্য কারও থেকে হাদীছ বর্ণনা করলে—সেটি ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ গ্রহণ করেননি। হাদীছটি যখন শুধু সুলায়মান থেকে বর্ণিত হয়েছে, তখন গ্রহণ করেছেন।
আর রাবীর শীআ হওয়ার বিষয়ে অভিযোগের উত্তর হচ্ছে, এই ধরনের বিদআতী রাবীর বর্ণিত অসংখ্য হাদীছ ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে রয়েছে। সেক্ষেত্রে ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পরই রাবীর হাদীছ গ্রহণ করে থাকেন আর তা হচ্ছে রাবীর সত্যবাদিতা। রাবী যদি বিদআতী হয় এবং সে যদি নিজ বিদআতের প্রচারকারী না হয়, তাহলে এমন সত্যবাদী রাবীর হাদীছ ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ গ্রহণ করে থাকেন। যা আমরা বিস্তারিত ‘মিন্নাতুল বারী’ বইয়ের প্রথম খণ্ডে আলোচনা করেছি।
(২) সুলায়মান ইবনে বেলাল: তাকে সকলেই মযবূত বলেছেন।
(৩) আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার: তার পরিচয় পূর্বে চলে গেছে।
(৪) আব্দুল্লাহ ইবেন উমার: তার পরিচয় পূর্বে চলে গেছে।
একই হাদীছ আবার নিয়ে আসার কারণ:
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ যখন একই হাদীছ কয়েকবার নিয়ে আসেন, তখন তিনি ভিন্ন সনদে ও ভিন্ন অধ্যায়ে নিয়ে আসেন। ভিন্ন মাসআলা ইস্তিম্বাত বা বের করার জন্য নিয়ে আসেন। আমাদের আলোচিত হাদীছটি পূর্বের অধ্যায়েও ছিল। হাদীছ বর্ণনার বিভিন্ন শব্দ বা ছীগাহ প্রমাণ করার জন্য হাদীছটি পূর্বের অধ্যায়ে গ্রহণ করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে ছাত্রদের জ্ঞান যাচাই করার জন্য তাদের পরীক্ষা নেওয়া জায়েয প্রমাণে হাদীছটি উল্লেখ করা হয়েছে আর এখানে সনদের পার্থক্যও স্পষ্ট। প্রথমবার ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটি কুতায়বা ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি ইসমাঈল ইবনে জা‘ফর থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার থেকে। আর দ্বিতীয়বার হাদীছটি ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ খালেদ ইবনে মাখলাদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি সুলায়মান ইবনে বেলাল থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার থেকে।
بَابُ مَا جَاءَ فِي العِلْمِ. وَقَوْلِهِ تَعَالَى: وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا [طه: ١١٤]
পরিচ্ছেদ: ৩/৬. শিক্ষা সম্পর্কিত: আর আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘আর বলুন, হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান আরও বৃদ্ধি করে দাও’ (ত্ব-হা, ২০/১১৪)।
الْقِرَاءَةُ وَالْعَرْضُ عَلَى الْمُحَدِّثِ. وَرَأَى الْحَسَنُ وَالثَّوْرِىُّ وَمَالِكٌ الْقِرَاءَةَ جَائِزَةً، وَاحْتَجَّ بَعْضُهُمْ فِى الْقِرَاءَةِ عَلَى الْعَالِمِ بِحَدِيثِ ضِمَامِ بْنِ ثَعْلَبَةَ قَالَ لِلنَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آللَّهُ أَمَرَكَ أَنْ نُصَلِّىَ الصَّلَوَاتِ قَالَ «نَعَمْ». قَالَ فَهَذِهِ قِرَاءَةٌ عَلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخْبَرَ ضِمَامٌ قَوْمَهُ بِذَلِكَ فَأَجَازُوهُ. وَاحْتَجَّ مَالِكٌ بِالصَّكِّ يُقْرَأُ عَلَى الْقَوْمِ فَيَقُولُونَ أَشْهَدَنَا فُلاَنٌ. وَيُقْرَأُ ذَلِكَ قِرَاءَةً عَلَيْهِمْ، وَيُقْرَأُ عَلَى الْمُقْرِئِ فَيَقُولُ الْقَارِئُ أَقْرَأَنِى فُلاَنٌ. حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلاَمٍ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ الْوَاسِطِىُّ عَنْ عَوْفٍ عَنِ الْحَسَنِ قَالَ لاَ بَأْسَ بِالْقِرَاءَةِ عَلَى الْعَالِمِ. وَأَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ الْفِرَبْرِىُّ وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ الْبُخَارِىُّ قَالَ حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى عَنْ سُفْيَانَ قَالَ إِذَا قُرِئَ عَلَى الْمُحَدِّثِ فَلاَ بَأْسَ أَنْ يَقُولَ حَدَّثَنِى . قَالَ وَسَمِعْتُ أَبَا عَاصِمٍ يَقُولُ عَنْ مَالِكٍ وَسُفْيَانَ الْقِرَاءَةُ عَلَى الْعَالِمِ وَقِرَاءَتُهُ سَوَاءٌ.
আলেমের সামনে কিতাব পাঠ করা ও হাদীছ উপস্থাপন করা। হাসান, ছাওরী ও মালেক রাহিমাহুমুল্লাহ এ মত পোষণ করেছেন যে, আলেমের সামনে হাদীছ পড়ে শোনানো (القِراءة على العالم) জায়েয।
কিছু আলেম এ ব্যাপারে যিমাম ইবনু ছা‘লাবাহ-এর হাদীছকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেছিলেন, আল্লাহ কি আপনাকে ছালাত ক্বায়েম করার আদেশ দিয়েছেন? নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ’ (অর্থাৎ যিমাম প্রশ্নের ভঙ্গিতে পড়লেন আর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা অনুমোদন করলেন)। তারপর যিমাম তার ক্বওমকে গিয়ে এ খবর জানালেন, তারা সেটি গ্রহণ করলেন (এ থেকে বুঝা গেল, আলেমের সামনে পড়ে শোনানোও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি)।
ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ আরও দলীল এনেছেন এভাবে, কোনো দলীল/দলীলনামা (صكّ) লোকদের সামনে পড়ে শোনানো হয়, তারপর তারা বলে, অমুকও আমাদের সাক্ষী অর্থাৎ তাদের ওপর সেটা পড়া হলো, তারাও সেই পড়াকে গ্রহণ করল। একইভাবে হাফেয বা ক্বারীর কাছেও পড়া হয়, তারপর ছাত্র বলে, অমুক আমাকে পড়িয়েছেন।
দলীল: ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু সালাম, তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-ওয়াসিতী, তিনি আওফ-এর মাধ্যমে, তিনি হাসান (বাছরী) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আলেমের সামনে পড়ে শোনানোতে কোনো অসুবিধা নেই।
আর আমাদেরকে খবর দিয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল-ফিরাবরী এবং আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আল-বুখারী, তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন উবায়দুল্লাহ ইবনু মূসা, তিনি সুফিয়ান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, হাদীছের আলেমের সামনে যদি (কিতাব) পড়ে শোনানো হয়; তাহলে বর্ণনাকারীর জন্য এতে অসুবিধা নেই যে, সে বলবে, আমাকে অমুক হাদীছ শুনিয়েছে। তিনি (ইমাম বুখারী) বলেন, আমি আবূ আছিম-কে মালেক ও সুফিয়ান সম্পর্কে বলতে শুনেছি, আলেমের সামনে পড়া আর আলেমের তাদেরকে পড়ে শোনানো— দুইটাই সমান।
পূর্বেরঅধ্যায়েরসাথেসম্পর্ক: আমরা পূর্বের অধ্যায়গুলোতে দেখেছি হাদীছ বর্ণনার ছীগাহ বা শব্দ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে ‘হাদ্দাছানা’, ‘আখবারানা’ ইত্যাদি শব্দ আলোচিত হয়েছে। যার মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, শায়খ ছাত্রকে হাদীছ শুনাবেন। আর এই অধ্যায়ের মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, ছাত্র কিতাব থেকে পড়বে আর শায়খ শুনবেন। এটিও হাদীছ বর্ণনার একটি গ্রহণযোগ্য ধরন। এই অধ্যায়ে সেই গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির পক্ষেই দলীল ও যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
অধ্যায়ের উদ্দেশ্য: ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-এর যুগে একদল মানুষ হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে শুধু শায়খ হাদীছ শুনাবেন আর ছাত্র শুনবে—এই পদ্ধতিকেই গ্রহণযোগ্য মনে করতেন। যেমন- আবূ আছিম আন-নাবিল ও ওয়াক্বী ইবনুল জাররাহ, তারা অন্য কোনো পদ্ধতিকে গ্রহণযোগ্য মনে করতেন না। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তাদের জবাবে উক্ত অধ্যায় রচনা করেছেন এবং বিভিন্ন দলীল ও যুক্তি দিয়ে হাদীছ বর্ণনার এই পদ্ধতির বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রমাণ করেছেন।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক*
ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।
[1]. ইবনু আবী হাতেম, আল-জারহ ওয়াত তা‘দীল, ৩/৩৫৪।
[2]. তাহযীবুত তাহযীব, ১/৫৩১।
