কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকাই পরিপূর্ণ বুদ্ধির পরিচয়

[১৮ রবীউল আখের, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ১০ অক্টোবর, ২০২পবিত্র হারামে মাক্কীর (কা‘বা) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ ড. বান্দারইবনুআব্দুলআযীযবালীলাহ হাফিযাহুল্লাহউক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর আরবী বিভাগের সম্মানিত পিএইচডি গবেষক আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথমখুৎবা

যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের বুদ্ধি ও ঈমানের নেয়ামত দ্বারা সম্মানিত করেছেন এবং জ্ঞান ও বিবেচনাবোধ দ্বারা অনুগ্রহ করেছেন। আমরা একমাত্র তাঁরই প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, যিনি আমাদের ওপর কুরআন নাযিল করেছেন এবং আমাদেরকে সর্বোত্তম ধর্ম দ্বারা বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোনো অংশীদার নেই। আমরা এই সাক্ষ্যের মাধ্যমে আগুন থেকে মুক্তি লাভের কামনা করছি। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নেতা ও নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি মানব ও জিন উভয় জাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। আল্লাহ তাঁর প্রতি দরূদ ও বরকত অবতীর্ণ করুন। তাঁর সৎ, নেক, প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ পরিবারবর্গ ও ছাহাবীগণ এবং পরবর্তীতে বিচার দিবস পর্যন্ত সৎভাবে তাঁর অনুসরণকারীদের উপর শান্তির ধারা অবতীর্ণ হোক।

অতঃপর, হে লোকসকল! আমি নিজেকে ও আপনাদেরকে আল্লাহভীতি অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। অতএব, আল্লাহকে ভয় করে চলুন, গোপনে ও প্রকাশ্যে তাঁর নযরদারি সম্পর্কে সচেতন থাকুন। আপনারা নিজেদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হেফাযত করুন, বিশেষত জিহ্বার। কারণ একজন মুমিন কোনো বিষয়ে ভালোভাবে না জানলে সে বিষয়ে নিজেকে জড়িত করে না এবং যে বিষয়ের জন্য সে উপযুক্ত নয় তার সাথে নিজেকে জড়ায় না।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নিশ্চয় সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সম্মানিত করেছেন এবং তাকে অন্যান্য সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। তাকে ঈমানের সৌন্দর্যে সুশোভিত করেছেন এবং চিন্তাভাবনা ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গির নেয়ামত দ্বারা অলংকৃত করেছেন। তিনি মানুষের পূর্ণতাকে তার তাক্বওয়া ও সংযমের উপর নির্ভরশীল করেছেন এবং তার অপূর্ণতাকে অগভীর দৃষ্টিভঙ্গি ও অবাধ্যতার উপর নির্ভরশীল করেছেন।

মানুষের বুদ্ধির পরিপূর্ণতা, পরিণত মানসিকতা এবং তার দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠা ও পরহেযগারিতার অন্যতম বড় প্রমাণ হলো সে নিজের প্রয়োজনীয় ও উপকারী বিষয়ে মনোযোগী থাকে আর তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন বিষয় থেকে দূরে থাকে। হুসাইন ইবনু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অর্থহীন কথা বা কাজ ত্যাগ করা’।[1]

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে সংক্ষিপ্ত একটি বাক্যে পরহেযগারিতার পুরো বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘একজন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যের নিদর্শন হলো তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন বিষয় সে ত্যাগ করবে’। উক্ত বাণী অপ্রয়োজনীয় সকল কাজ তথা অনর্থক কথা বলা, দৃষ্টি দেওয়া, শ্রবণ করা, হাতের ব্যবহার, চলাফেরা, চিন্তা, অন্যান্য দৃশ্যমান ও অন্তরঙ্গ আচরণ ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। অতএব, পরহেযগারিতার ব্যাখ্যায় উক্ত বাক্যটিই যথেষ্ট।

এখানে ‘ইসলামের সৌন্দর্য’ বলতে বুঝানো হয়েছে ইসলামের সেই ওয়াজিব বিষয়সমূহ পরিপূর্ণভাবে পালন করা, যার অবহেলা দ্বীন পালনে ঘাটতি তৈরি করে এবং ঈমানে দুর্বলতা সৃষ্টি করে। এখানে আসল ইসলাম দ্বারা সেই ইসলামের মৌলিক ভিত্তি উদ্দেশ্য নয়, যার বিপরীতে শুধুই কুফরী রয়েছে।

ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এখানে (العناية) শব্দের অর্থ হলো কোনো বিষয়ে গভীর মনোযোগ ও আগ্রহ দেখানো। যেমন- কোনো বিষয়ে গুরুত্ব ও অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে যে, সে অমুক বিষয়ে মনোযোগ দিল।
এর দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নয় যে, মানুষ তার নিজের খেয়ালখুশি বা প্রবৃত্তি অনুযায়ী এমন বিষয় ত্যাগ করবে, যাতে তার আগ্রহ নেই; বরং সে শরীআত ও ইসলামের বিধান অনুযায়ী তা ত্যাগ করবে। এ কারণেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিষয়টিকে ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অতএব, যখন কারও ইসলাম সুন্দর ও পরিপূর্ণ হয়, তখন সে ইসলামের দৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় সকল কথা ও কাজ ত্যাগ করে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! মানুষের জন্য অর্থবহ ও প্রয়োজনীয় বিষয় হলো যা তার জন্য কল্যাণকর ও উপকারী, যা তার ধর্মীয় জীবনে মূল্যবান, যা উপকারী ও ছওয়াব বৃদ্ধি করে এবং যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করায়। যেমন- উপকারী ইলম অর্জন করা, সৎ আমল করা, অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করা, কুরআন পাঠ করা, আত্মশুদ্ধি অর্জন করা, নফল ইবাদত করা, সৃষ্টির উপকার করা ইত্যাদি। আর দুনিয়াবী জীবনের ক্ষেত্রেও তার জন্য অর্থবহ বিষয় হলো যা ছাড়া জীবন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না এমন সব প্রয়োজনীয় কাজ করা। যেমন- হালাল উপার্জন করা, পরিবার ও সন্তানদের দায়িত্ব পালন করা এবং নিজের দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা— যা তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! মানুষের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক কাজগুলো হলো এমন সব কাজ যা তার দ্বীন ও দুনিয়ায় কোনো উপকারে আসে না, যেসব কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা সময়ের অপচয়, নেকী বিনষ্ট হওয়া এবং গুনাহ অর্জনের কারণ হয়। যেমন- অন্যের বিষয়ে কথা বলা, তাদের ব্যক্তিগত জীবন অনুসন্ধান করা, তাদের এমন গোপন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যা না ক্ষতি ডেকে আনে, না উপকার করে; অতিরিক্ত তর্ক-বিতর্কে জড়ানো, দেখা বা শোনা সমীচীন নয় মানুষের এমন গোপন দোষত্রুটি অনুসন্ধান করা। সুতরাং মানুষের দোষ অনুসন্ধান থেকে বেঁচে থাকার মতো উত্তম কিছু নেই। তবে কোনো মুমিনের কাছে পরামর্শ চাওয়া হলে আন্তরিকতার সাথে তাকে সৎ পরামর্শ দেওয়া উচিত। কারণ সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো এমন পরামর্শ দেওয়া, যাতে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা থাকে না। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, তাকে বিশ্বস্ত হতে হয়’।[2]

একজন মুমিনের যে বিষয়ে যত্নবান হওয়া উচিত তা হলো সে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকবে, সে যে বিষয়ে অভিজ্ঞ নয় সেই বিষয়ে কথা বলবে না। আর তার জন্য ছোট বা বড় সকল বিষয়, প্রতিটি ঘটনা বা নতুন সব ধরনের সমস্যায় নিজের মতামত প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আছেন, ফতওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ আলেম আছেন, বিচারকার্যের জন্য বিচারক আছেন, অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ আছেন, চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষ ব্যক্তি আছেন, যাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বকে সম্মান করা বুদ্ধিবৃত্তিক শিষ্টাচার এবং শারঈ উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য বান্দার অনর্থক বিষয় পরিহার করা জরুরী। আর এ বিষয়ের প্রতি আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীছে ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বর্ণনা করেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মাঝে আবূ বকর উম্মতের জন্য সর্বাধিক দয়ালু। উম্মতের মধ্যে আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠোর উমার। উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে প্রকৃত লাজুক উছমান। উম্মতের মধ্যে মীরাছ সম্পর্কিত ব্যাপারে সর্বাধিক জানে যায়েদ ইবনু ছাবিত। উম্মতের মাঝে সর্বোত্তম কুরআন মাজীদের ক্বারী উবাই ইবনু কা‘ব। উম্মতের মধ্যে হালাল ও হারাম সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী মুআয ইবনু জাবাল। আর প্রত্যেক উম্মতের মাঝে একজন আমীন থাকেন, এ উম্মতের আমীন হলেন আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ’।[3]

আর নিজ নিজ দায়িত্ব ও ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার এই মূলনীতির একটি সূক্ষ্ম প্রমাণ হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর মহান জ্ঞান, ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার আলোকে প্রতিটি দায়িত্বের জন্য বিশেষ ফেরেশতা নিয়োগ করেছেন। তিনি অহী পৌঁছানোর দায়িত্ব দিয়েছেন জিবরীল আলাইহিস সালাম-কে, বৃষ্টি বর্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন মীকাঈল আলাইহিস সালাম-কে, শিঙ্গা ফুঁকার দায়িত্ব দিয়েছেন ইসরাফীল আলাইহিস সালাম-কে, রূহ ক্ববযের দায়িত্ব দিয়েছেন মালাকুল মাউত আলাইহিস সালাম-কে এবং মানুষের কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব দিয়েছেন কিরামান কাতেবীন তথা সম্মানিত ফেরেশতাদের। তাছাড়া এমন ফেরেশতার দলও আছেন, যারা পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়ায় আল্লাহর যিকিরের সভা অনুসন্ধান করতে।

এভাবে মহান আল্লাহ অসংখ্য কাজ ও দায়িত্বকে নির্দিষ্ট ফেরেশতাদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন, যদিও তিনি চাইলে তাঁর জ্ঞান, ইচ্ছায় ও ক্ষমতায় সব দায়িত্ব এক ফেরেশতার ওপরই অর্পণ করতে পারতেন; কিন্তু তা তিনি করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে, কোনো কিছুকে যদি তিনি ‘হও’ বলতে চান, তখনই তা হয়ে যায়’ (ইয়াসী, ৩৬/৮২)। কিন্তু এটি আল্লাহ প্রদত্ত একটি শিক্ষা ও নির্দেশনা, যাতে মানুষ শিখে নেয় দায়িত্ব বণ্টনের নীতি এবং প্রত্যেকে যেন নিজের কাজেই মনোনিবেশ করে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! অতএব, আপনারা আল্লাহকে ভয় করে চলুন। মানুষের উচিত নিজের জিহ্বা ও নফসের হেফাযত করা। তার কেবল সেসব বিষয়ে কথা বলা বা চিন্তা করা উচিত, যাতে তার প্রকৃত উপকার রয়েছে। আর
যে বিষয়ে সে দক্ষ নয়, সে বিষয়ে তার কথা বলা উচিত নয়। এভাবে সে নিজের ধর্ম ও সম্মান রক্ষা করতে পারবে এবং অন্যের হক্ব রক্ষার ব্যাপারে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেও মুক্ত হতে পারবে।

أقولُ قولي هذا، وأستغفرُ اللهَ لي ولكم ولسائر المسلمينَ من كلِّ ذنبٍ؛ فاستغفِروه، إنه هو الغفور الرحيمُ.

দ্বিতীয়খুৎবা

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যাকে তন্দ্রা বা ঘুম আচ্ছন্ন করে না। আমরা তাঁর প্রতিটি নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। আমরা তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তওবা করি প্রতিটি ভুলত্রুটির কারণে। অতঃপর দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর, যাকে এমন এক সময়ে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে, যখন মানুষ ছিল অবহেলা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত। আর তাঁর পরিবার ও ছাহাবীদের ওপরও শান্তির ধারা অবতীর্ণ হোক, যারা ছিলেন মহান চরিত্র ও আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী।

অতঃপর, হে আল্লাহর বান্দাগণ! জেনে রাখুন! সংযম ও ভদ্রতার দ্বারা এই যবান সংযত রাখার অন্যতম সহায়ক বিষয় হলো বান্দা এই কথা উপলব্ধি করবে যে, তাকে তার প্রতিটি উচ্চারিত শব্দের জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে। সে যা-ই বলুক না কেন, প্রতিটি বাক্যের হিসাব তাকে দিতে হবে। সে যে কোনো বাক্যই উচ্চারণ করুক না কেন, যে কোনো লিখিত অভিব্যক্তিই প্রকাশ করুক না কেন, সে তার প্রতিফল পাবে— চাই সেটি দৃষ্টিগোচর হোক অথবা শ্রুতিযোগ্য কিংবা পঠিত কোনো মাধ্যমে প্রকাশিত হোক।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে কথাই মানুষ উচ্চারণ করে (তা সংরক্ষণের জন্য) তার নিকটে একজন সদাতৎপর প্রহরী আছে’ (ক্বাফ, ৫০/১৮)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘আর উপস্থাপিত করা হবে আমলনামা, তখন তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে দেখবেন আতঙ্কগ্ৰস্ত এবং তারা বলবে, হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্ৰন্থ! এটা তো ছোট-বড় কিছু বাদ না দিয়ে সবকিছুই হিসাব করে রেখেছে। আর তারা যা আমল করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে আর আপনার রব তো কারো প্রতি যুলম করেন না’ (আল-কাহাফ, ১৮/৪৯)। উক্ববা ইবনু আমের আল-জুহানী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! মুক্তির উপায় কী? তিনি বললেন, ‘তুমি তোমার রসনা সংযত রাখো, তোমার বাসস্থান যেন তোমার জন্য প্রশস্ত হয় (অর্থাৎ তুমি তোমার বাড়িতে অবস্থান করো) এবং তোমার গুনাহের জন্য ক্ৰন্দন করো’।[4]

অতএব, হে আল্লাহর বান্দাগণ! সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে তার রবের ভয় অন্তরে ধারণ করে নিজের যবানকে সংযত রাখে, নিজের নফসের সংশোধনের জন্য কাজ করে এবং যা তার সাথে সম্পর্কিত নয় এমন বিষয় বর্জন করে চলে।

হে আল্লাহ! তুমি তোমার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুসলিম বান্দাদের উদ্বেগ দূর করো, বিপদগ্রস্তদের উৎকণ্ঠা দূর করো, ঋণগ্রস্তদের ঋণের বোঝা লাঘব করো এবং আমাদের ও সমস্ত মুসলিমদের অসুস্থতা থেকে আরোগ্য দান করো।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের অসহায় ও দুর্বল ভাইদের প্রতি সকল স্থানে রক্ষাকর্তা হও। হে আল্লাহ! তুমি তাদের জন্য সাহায্যকারী হয়ে যাও। হে আল্লাহ! তুমি ফিলিস্তীন ও বিশ্বের সকল মুসলিমদের জন্য সাহায্যকারী হয়ে যাও। হে আল্লাহ! তুমি জবরদখল ও সীমালঙ্ঘনকারী ইয়াহূদীদের ধ্বংস করো।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে উপকারী কাজে ব্যস্ত রাখো, আমাদেরকে ক্ষতিকারক বিষয় থেকে দূরে রাখো, আমাদেরকে পথভ্রষ্ট কিংবা পথভ্রষ্টকারী হিসেবে নয়; বরং হেদায়াতপ্রাপ্ত ও হেদায়াতদাতা হিসেবে কবুল করো। হে মহান দয়ালু! আমরা তোমার রহমতের ভিখারী।

হে আল্লাহ! যতদিন তুমি আমাদের জীবিত রাখবে, ততদিন গুনাহ ত্যাগ করার মাধ্যমে রহমত দান করো। আমাদের প্রতি রহম করো, যেন আমরা অনর্থক বিষয়ের সাথে জড়িয়ে না পড়ি। আমাদেরকে এমন দৃষ্টি ও বিবেচনা দান করো, যা তোমাকে সন্তুষ্ট করবে। হে উদারদের মধ্যে মহান উদার! আমরা তোমার অনুগ্রহ ও উদারতা কামনা করি- আমীন!


 [1]. তিরমিযী, হা/২৩১৮।

 [2]. আদাবুল মুফরাদ, হা/২৫৫।

 [3]. আহমাদ, হা/১৪০২২।

 [4]. আহমাদ, হা/২২২৮৯; তিরমিযী, হা/২৪০৬, হাদীছ ছহীহ।

Magazine