কাতারের মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না :
পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু এবং কাঁধের সাথে কাঁধ মিলানোর জন্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোরালোভাবে আদেশ করেছেন। যারা এটাকে অসম্মান মনে করে, তারা স্রেফ অজ্ঞতার কারণেই এটা বলে থাকে। এটা তাদের সুন্নাত অমান্য করার অপকৌশল এবং বড় মিথ্যাচার। এটাকে বেয়াদবী মনে করলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বেয়াদবী করা হবে। দেখুন, এ ব্যাপারে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর পক্ষে নির্দেশ সংক্রান্ত কিছু হাদীছ।
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কাতারের মাঝে ফাঁকা বন্ধ করে দাঁড়াবে, এর বিনিময়ে আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন এবং জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করবেন’।[1] আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ এবং ফেরেশতাগণ তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, যারা পরস্পরের মাঝে ফাঁকা বন্ধ করে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ এর বিনিময়ে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন’।[2]
عَنْ أَنَسٍ قَالَ أُقِيْمَتِ الصَّلَاةُ فَأَقْبَلَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِوَجْهِهِ فَقَالَ أَقِيْمُوْا صُفُوْفَكُمْ وَتَرَاصُّوْا فَإِنِّىْ أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِىْ.
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা ছালাতের তাকবীর বলা হল, অতঃপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে মুখ ফিরালেন এবং বললেন, ‘তোমাদের কাতার সোজা কর এবং পরস্পরে মিল হয়ে দাঁড়াও! নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আমার পিছন দিক হতেও দেখতে পাই’। অন্য বর্ণনায় আছে, ‘কাতার সমূহ পূর্ণ কর! নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আমার পিছন দিক হতেও দেখতে পাই’।[3]
عَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ سَوُّوْا صُفُوْفَكُمْ فَإِنَّ تَسْوِيَةَ الصُّفُوْفِ مِنْ إِقَامَةِ الصَّلاَةِ إِلَّا أَنَّ عِنْدَ مُسْلِمٍ: مِنْ تَمَامِ الصَّلَاةِ.
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা কাতার ঠিক করবে। কাতার ঠিক করা ছালাত প্রতিষ্ঠার অন্তর্গত। কিন্তু মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, ‘কাতার ঠিক করা ছালাত পূর্ণ করারই শামিল’।[4]
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ مَا لِىْ أَرَاكُمْ رَافِعِىْ أَيْدِيْكُمْ كَأَنَّهَا أَذْنَابُ خَيْلٍ شُمْسٍ اسْكُنُوْا فِى الصَّلَاةِ قَالَ ثُمَّ خَرَجَ عَلَيْنَا فَرَآنَا حَلَقًا فَقَالَ مَا لِىْ أَرَاكُمْ عِزِيْنَ قَالَ ثُمَّ خَرَجَ عَلَيْنَا فَقَالَ أَلَا تَصُفُّوْنَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا فَقُلْنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا قَالَ يُتِمُّوْنَ الصُّفُوْفَ الْأُوَلَ وَيَتَرَاصُّوْنَ فِى الصَّفِّ.
জাবের ইবনে সামুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন এবং দেখলেন, আমরা বৃত্তাকারে দলে দলে বিভক্ত। তখন তিনি বললেন, ‘তোমাদেরকে আমি বিচ্ছিন্নভাবে দেখছি কেন? অতঃপর আরেকদিন তিনি আমাদের নিকট আসলেন এবং (আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন দেখে) বললেন, কেন তোমরা ফেরেশতাদের ন্যায় সারি বেঁধে দাঁড়াচ্ছো না? যেমন তারা তাঁদের প্রভুর নিকট সারি বেঁধে দাঁড়ায়? আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ফেরেশতাগণ তাঁদের প্রভুর নিকট কীভাবে সারি বেঁধে দাঁড়ায়? তিনি বললেন, ‘প্রথম সারিসমূহ পূর্ণ করে এবং সারিতে পরস্পরে মিলিয়ে দাঁড়ায়’।[5]
عَنْ أَنَسِ قَالَ قَالَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رُصُّوْا صُفُوْفَكُمْ وَقَارِبُوْا بَيْنَهَا وَحَاذُوْا بِالْأَعْنَاقِ فَوَالَّذِىْ نَفْسِىْ بِيَدِهِ إِنِّى لأَرَى الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ مِنْ خَلَلِ الصَّفِّ كَأَنَّهَا الْحَذَفُ.
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা কাতারসমূহে পরস্পরে মিলিয়ে দাঁড়াবে এবং তাদেরকে কাছে কাছে রাখবে (আনুমাণিক আড়াই হাত ফাঁকা করে) আর তোমাদের ঘাড়সমূহকে সমপর্যায়ে সোজা রাখবে। সেই আল্লাহ্র কসম, যার হাতে আমার জীবন রয়েছে! নিশ্চয়, আমি শয়তানকে দেখি, সে কাতারের ফাঁকসমূহে প্রবেশ করে, কালো ভেড়ার বাচ্চার মত’।[6]
عَنْ أَبِيْ أُمَامَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى الصَّفِّ الْأَوَّلِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَعَلَى الثَّانِيْ قَالَ إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى الصَّفِّ الْأَوَّلِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَعَلَى الثَّانِيْ قَالَ إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى الصَّفِّ الْأَوَّلِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ الله وعَلى الثَّانِي قَالَ وعَلى الثَّانِي قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوُّوْا صُفُوْفَكُمْ وَحَاذُوْا بَيْنَ مَنَاكِبِكُمْ وَلِينُوْا فِيْ أَيْدِيْ إِخْوَانِكُمْ وَسُدُّوا الْخَلَلَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ بَيْنَكُمْ بِمَنْزِلَةِ الْحَذَفِ يَعْنِيْ أَوْلَادَ الضَّأْنِ الصِّغَارِ.
আবু উমামা বাহেলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘প্রথম কাতারের প্রতি আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণের ‘ছালাত’ বর্ষিক হোক’। তা শুনে ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দ্বিতীয় কাতারের প্রতিও? তিনি বললেন, ‘প্রথম কাতারের প্রতি আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণের ‘ছালাত’ বর্ষিত হোক’। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দ্বিতীয় কাতারের প্রতিও? তিনি বললেন, ‘প্রথম কাতারের প্রতি আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণের ‘ছালাত’ বর্ষিত হোক’। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দ্বিতীয় কাতারের প্রতিও। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, দ্বিতীয় কাতারের প্রতিও’। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বললেন, ‘তোমরা তোমাদের কাতার সোজা করবে, তোমাদের বাহুমূলসমূহকে একে অন্যের সাথে সমপর্যায়ে রাখবে এবং তোমাদের ভাইদের হাতে সেগুলোকে নরম রাখবে অর্থাৎ তারা মিলাতে চাইলে মিলিয়ে দিবে আর তোমাদের মধ্যেকার ফাঁকসমূহকে পূর্ণ করবে। কেননা শয়তান তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে ছোট কালো ভেড়ার বাচ্চার ন্যায়’।[7]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَقِيْمُوْا الصُّفُوْفَ وَحَاذُوْا بَيْن المنكاكب وَسُدُّوْا الْخَلَلَ وَلِينُوْا بِأَيْدِيْ إِخْوَانِكُمْ وَلَا تَذَرُوْا فرجات للشَّيْطَان وَمَنْ وَصَلَ صَفًّا وَصَلَهُ اللهُ وَمَنْ قَطَعَهُ قطعه الله.
ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা কাতার সোজা করবে, বাহুমূলসমূহকে সমপর্যায়ে রাখবে, ফাঁকসমূহ পূর্ণ করবে এবং তোমাদের ভাইদের হাতে নরম রাখবে, মাঝখানে শয়তানের (জন্য) ফাঁক রাখবে না। যে ব্যক্তি কাতারকে মিলায়, আল্লাহও তাকে (আপন রহমতের সহিত) মিলান। আর যে ব্যক্তি কাতারকে পৃথক করে, আল্লাহও তাকে (আপন রহমত হতে) পৃথক করেন’।[8]
জামা‘আত আরম্ভ করার সময় ইমামকে মুক্তাদীর দিকে মুখ করে কাতার সোজা করার কথা বলতে হবে :
অনেক ইমাম ইক্বামত শেষ না হতেই ছালাত শুরু করেন। অনেকেই ইক্বামতের সময় পাগড়ি পেঁচাতে থাকেন। অনেকেই ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এসব কর্ম ইমামকে যরূরীভাবে পরিহার করতে হবে। ইক্বামতের সময় ইমামকে মুক্তাদীর দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে। ইক্বামত শেষে মুক্তাদীর দিকে মুখ করেই কাতার সোজা করার জন্য বলতে হবে, যা অপরিহার্য। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মেনে চলার ব্যাপারে ছাহাবীগণ সবচেয়ে বেশী সচেতন ছিলেন। ছাহাবীগণ এত সতর্ক ও অনুরাগী হওয়া সত্ত্বেও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৩ বছর যাবৎ পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে ছাহাবীগণের দিকে মুখ করে কাতার সোজা করতে বলতেন, কোন দিন একথা না বলে ছালাত শুরু করতেন তার প্রমাণ নেই।
عَنْ أَنَسٍ قَالَ أُقِيْمَتِ الصَّلَاةُ فَأَقْبَلَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِوَجْهِهِ فَقَالَب أَقِيْمُوْا صُفُوْفَكُمْ وَتَرَاصُّوْا فَإِنِّيْ أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِيْ .
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন ইক্বামত দেওয়া হত, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে মুখ করতেন। অতঃপর বলতেন, ‘তোমরা কাতার সোজা কর এবং সীসা ঢালা প্রাচীরের মত দাঁড়াও। নিশ্চয় আমি আমার পেছন থেকে তোমাদেরকে দেখতে পাই’।[9]
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَلَّلُ الصَّفَّ مِنْ نَاحِيَةٍ إِلَى نَاحِيَةٍ يَمْسَحُ صُدُوْرَنَا وَمَنَاكِبَنَا وَيَقُوْلُ لَا تَخْتَلِفُوْا فَتَخْتَلِفَ قُلُوْبُكُمْ. وَكَانَ يَقُوْلُ إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى الصُّفُوْفِ الْأُوَلِ.
বারা ইবনে আযেব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাতারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বরাবর করতেন। তিনি আমাদের বুক ও কাঁধ স্পর্শ করতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা আগে-পিছে হয়ে দাঁড়াইও না। অন্যথা তোমাদের অন্তর পরস্পর বিরোধী হয়ে যাবে’। তিনি আরো বলতেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং ফেরেশতাগণ প্রথম কাতারের মুছল্লীদের উপর রহমত নাযিল করেন’।[10]
ইমামের পেছন থেকে কাতার পূর্ণ করতে হবে :
ডানদিকে থেকে কাতার পূর্ণ করার কোন ছহীহ হাদীছ নেই। ইমামের পেছনে থেকে কাতার পূর্ণ করতে হবে।
عَنْ أَنَسٍ قَالَ صَلَّى النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِىْ بَيْتِ أُمِّ سُلَيْمٍ فَقُمْتُ وَيَتِيْمٌ خَلْفَهُ وَأُمُّ سُلَيْمٍ خَلْفَنَا.
আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সুলাইমের বাড়ীতে ছালাত আদায় করলেন। তাই আমি এবং একজন ইয়াতীম তার পেছনে দাঁড়ালাম। আর উম্মু সুলাইম আমাদের পেছনে দাঁড়ালেন।[11]
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِيَلِنِىْ مِنْكُمْ أُوْلُو الْأَحْلاَمِ وَالنُّهَى ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثَلاَثًا وَإِيَّاكُمْ وَهَيْشَاتِ الْأَسْوَاقِ.
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বয়স্ক ও বুদ্ধিমান তারাই যেন আমার নিকটে দাঁড়ায়। অতঃপর যারা বয়স ও বুদ্ধিতে তাদের নিকটবর্তী, তারা তাদের পেছনে দাঁড়াবে’। এভাবে তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘তোমরা সাবধান! মসজিদে বাজারের মত হৈ চৈ করা হতে বেঁচে থাক’।[12]
মুক্তাদী ইমামের পেছন থেকে দাঁড়াবে, ডান দিকে থেকে নয়। আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তার ছাহাবীগণের মধ্যে কোন কোন ব্যক্তিকে পেছনে থাকতে দেখলেন। তখন বললেন, সামনের দিকে এগিয়ে যাও এবং আমার অনুসরণ কর, যাতে পেছনের লোকেরা তোমাদের অনুসরণ করতে পারে। কতক লোক সর্বদা পেছনে থাকতে চাইবে। ফলে আল্লাহ তাদের রহমত হতে পেছনে করে দিবেন’।[13] এই হাদীছ প্রমাণ করে মুক্তাদী ইমামের পেছন থেকে দাঁড়াবে এবং প্রথম কাতার ইমামকে অনুসরণ করবে এবং পরবর্তী কাতার তার সামনের কাতারকে অনুসরণ করবে।
প্রথম কাতার পূর্ণ না হলে দ্বিতীয় কাতারে দাঁড়ানো যাবে না :
প্রথম কাতার পূর্ণ হওয়ার পর দ্বিতীয় কাতারে দাঁড়াতে হবে। প্রথম কাতারে কিছু অংশ বাকী রেখে দ্বিতীয় কাতার শুরু করা জায়েয নয়।
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَآنَا حلقا فَقَالَ مَالِيْ أَرَاكُمْ عِزِيْنَ ثُمَّ خَرَجَ عَلَيْنَا فَقَالَ أَلَا تَصُفُّوْنَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا فَقُلْنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا قَالَ يُتِمُّوْنَ الصُّفُوْفَ الْأُوْلَى وَيَتَرَاصُّوْنَ فِيْ الصَّفِّ.
জাবের ইবনে সামুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন। তিনি আমাদেরকে বৃত্তাকারে দেখলেন। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে বিক্ষিপ্ত দেখছি কেন? তিনি আমাদের নিকট এসে বললেন, ‘তোমরা সারিবদ্ধ হচ্ছ না কেন, যেভাবে ফেরেশতাগণ তাদের প্রতিপালকের নিকট সরিবদ্ধ হয়?’। আমরা বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! ফেরেশতাগণ তাদের প্রতিপালকের নিকট কীভাবে সারিবদ্ধ হয়? তিনি বললেন, ‘তারা প্রথম কাতার আগে পূর্ণ করে আর তারা প্রাচীরের মত সারিবদ্ধ হয়’।[14] আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা প্রথম কাতার পূর্ণ কর। তারপর যে কাতার তার পরে আছে। অতঃপর কাতার পূর্ণ হতে যা কম থাকে, তা শেষ কাতারে থাকবে’।[15]
উক্ত হাদীছদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রথম কাতার আগে পূর্ণ করতে হবে।
কাতারে জায়গা না থাকলে একাই দাঁড়াবে, কাউকে টেনে নিবে না :
কোন মুছল্লী জামা‘আত চলাকালীন এসে যদি কাতার পূর্ণ দেখে, তাহলে সে একাকী কাতারের পেছনে দাঁড়িয়ে যাবে। কাতারের মাঝ থেকে টেনে নিবে না এবং কাতারের মাঝেও ঢুকে যাবে না। সামনের কাতার হতে টেনে নিলে সামনের কাতার পূর্ণ করা কঠিন হবে। আবার কাতারের মাঝে ফাঁকা রাখা কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে।[16] যদিও মাসআলাটি নিয়ে মতভেদ আছে।
সামনের কাতার হতে টেনে নেওয়ার হাদীছটি যঈফ :
ওয়াবেছাহ ইবনে মা‘বাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতে সালাম ফিরিয়ে দেখেন জনৈক ব্যক্তি কাতারের পেছনে ছালাত আদায় করছে। তখন তিনি বললেন, ‘হে একাকী ছালাত আদায়কারী মুছল্লী! তুমি কি কাতারের মধ্যে ঢুকে মুছল্লীদের সাথে মিলিত হতে পারোনি? অথবা তুমি কি একজনকে তোমার দিকে টেনে নিতে পারোনি? যাতে তোমাদের স্থান সংকীর্ণ হয়ে যায়। তুমি ছালাত পুনরায় আদায় কর। কারণ তোমার এ ছালাত হয়নি’।[17] হাদীছটি যঈফ।[18]
ছালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় ডান পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল নাড়ানো যায় :
ছালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় বৃদ্ধা আঙ্গুল নাড়ানো যায় না এ ধারণা মিথ্যা। এর প্রমাণে কোন দলীল নেই। এক শ্রেণীর মুরববী এই প্রথা সৃষ্টি করেছেন। ছালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় প্রয়োজনে মুছল্লী তার স্থান থেকে সামনে বা পেছনে, ডানে বা বামে সরে যেতে পারে।
عَنْ جَابِرٍ قَالَ قَامَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِيُصَلِّيَ فَجِئْتُ حَتَّى قُمْتُ عَنْ يَسَارِهِ فَأَخَذَ بِيَدِيْ فَأَدَارَنِيْ حَتَّى أَقَامَنِيْ عَن يَمِيْنِهِ. ثُمَّ جَاءَ جَبَّارُ بْنُ صَخْرٍ فَقَامَ عَنْ يَسَارِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخَذَ بيدينا جَمِيْعًا فدفعنا حَتَّى أَقَمْنَا خَلفه.
জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতে দাঁড়ালেন আর আমি তার বাম পাশে দাঁড়ালাম। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে ঘুরিয়ে তার ডান দিকে করে নিলেন। অতঃপর জাববার ইবনে ছাখর এসে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাম দিকে দাঁড়ালেন। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উভয়ের হাত ধরে তার পেছনে করে দিলেন।[19]
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ قَالَ بِتُّ فِيْ بَيت خَالَتِيْ مَيْمُوْنَةَ فَقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي فَقُمْتُ عَنْ يَسَارِهِ فَأَخَذَ بِيَدِيْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ فَعَدَلَنِيْ كَذَلِكَ مِنْ وَرَاءِ ظَهره إِلَى الشق الْأَيْمن.
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি একদা আমার খালা মায়মূনা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে রাতে ছিলাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতের জন্য দাঁড়ালেন। অতঃপর আমি তার বামে দাঁড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরলেন এবং তার পিঠের পেছনে দিয়ে আমাকে ডান পার্শ্বে নিয়ে আসলেন।[20]
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي تَطَوُّعًا وَالْبَابُ عَلَيْهِ مُغْلَقٌ فَجِئْتُ فَاسْتَفْتَحْتُ فَمَشَى فَفَتَحَ لِيْ ثُمَّ رَجَعَ إِلَى مُصَلَّاهُ وَذَكَرْتُ أَنَّ الْبَابَ كَانَ فِي الْقِبْلَةِ.
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নফল ছালাত আদায় করছিলেন, তখন দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। আমি আসলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। তিনি পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলেন এবং আমার জন্য দরজা খুলে দিলেন। তারপর তিনি তার ছালাতের স্থানে চলে গেলেন। আমি বললাম, সেই দিন দরজা ক্বিবলার দিকে ছিল।[21]
উক্ত হাদীগুলো দ্বারা প্রমাণ হয় যে, ছালাতে দাঁড়ানো অবস্থায় বৃদ্ধা আঙ্গুল নড়তে পারে।
যতবার জামা‘আত হবে, ততবার ইক্বামত দিতে হবে :
একবার জামা‘আত হওয়ার পর যারা আসবে, তারা ইক্বামত দিয়ে জামা‘আত করে ছালাত আদায় করবে।
عَن أبيْ سَعِيْدِ الْخُدْرِيِّ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ وَقَدْ صَلَّى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ أَلَا رَجُلٌ يَتَصَدَّقُ عَلَى هَذَا فَيُصَلِّيَ مَعَهُ فَقَامَ رَجُلٌ فيصلى مَعَه.
আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন এক লোক মসজিদে এমন সময় আসলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাত আদায় করে ফেলেছেন। তিনি (তাকে দেখে) বললেন, ‘এমন কোন মানুষ কি নেই যে তাকে ছাদাক্বাহ দিবে তার সঙ্গে ছালাত আদায় করে’। এ মুহূর্তে এক লোক দাঁড়ালেন এবং তার সঙ্গে ছালাত আদায় করলেন।[22] এই হাদীছ প্রমাণ করে এক মসজিদে একাধিক জামা‘আত হতে পারে। কারণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামা‘আত হওয়ার পরেই এ জামা‘আতের কথা বললেন।
عَنْ مَالِكِ بْنِ الْحُوَيْرِثِ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَأَذِّنَا وَأَقِيْمَا ثُمَّ لِيَؤُمَّكُمَا أَكْبَرُكُمَا.
মালিক ইবনে হুয়ায়রিছ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যখন ছালাতের সময় উপস্থিত হবে, তখন তোমাদের দুইজনের কেউ আযান ও কেউ ইক্বামত দিবে। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে বড়, সে ইমামতি করবে’।[23] এই হাদীছ প্রমাণ করে, যতবার জামা‘আত হবে ততবার ইক্বামত হবে।
উবাই ইবনে কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘একজনের সাথে আরেকজন ছালাত আদায় করা অধিক উত্তম একাকী ছালাত আদায়ের চেয়ে এবং একজনের সাথে দু’জন ছালাত আদায় করা আরো উত্তম। এভাবে মুছল্লীর সংখ্যা যত বেশী হবে, ততোই তা আল্লাহ্র নিকটে প্রিয়তর হবে’।[24] এই হাদীছ প্রমাণ করে, এক ওয়াক্ত ছালাতে একাধিক বার জামা‘আত হতে পারে।
(চলবে)
[1]. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, হা/৩৮২৪; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৮৯২।
[2]. ইবনে মাজাহ, হা/৯৯৫; মুসানাদে আহমাদ, হা/২৪৬৩১; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৫৩২।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৯; মিশকাত, হা/১০৮৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০১৮।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৩; মিশকাত, হা/১০৮৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০১৯।
[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩০; মিশকাত, হা/১০৯১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০২৩।
[6]. আবুদাঊদ, হা/৬৬৭; মিশকাত, হা/১০৯৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০২৫।
[7]. আহমাদ, হা/২২৩১৭; মিশকাত, হা/১১০১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০৩৩; ছহীহ লিগয়রিহী।
[8]. আবুদাঊদ, হা/৬৬৬; মিশকাত, হা/১১০২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০৩৪।
[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৯; মিশকাত, হা/১০৮৬।
[10]. আবুদাঊদ, হা/৬৬৪।
[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৭৪।
[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩২; মিশকাত, হা/১০৮৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০২১।
[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩৮; মিশকাত, হা/১০৯০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০২২।
[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩০; মিশকাত, হা/১০৯১।
[15]. আবুদাঊদ, হা/৬৭১; মিশকাত, হা/১০৯৪।
[16]. আবুদাউদ, হা/৬৬৪।
[17]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/৪৯৯২।
[18]. ইরওয়াউল গালীল, হা/৫৪১।
[19]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩০১০; মিশকাত, হা/১১০৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১০৩৯।
[20]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৬৩; মিশকাত, হা/১১০৬।
[21]. আহমাদ, হা/২৪০২৭; আবুদাঊদ, হা/৯২২; তিরমিযী, হা/৬০১; নাসাঈ, হা/১২০৬; মিশকাত, হা/১০০৫।
[22]. আবুদাঊদ, হা/৫৭৪; মিশকাত, হা/১১৪৬।
[23]. ছহীহ বুখারী, হা/ ৬৫৮।
[24]. আবুদাঊদ, হা/৫৫৪।
