কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কুরআন ও সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে ঈমান কমে এবং বাড়ে কি? (পর্ব-২)

(৬) পূর্ণাঙ্গ দ্বীন : পূর্ণাঙ্গ দ্বীন থেকে কিছু ছেড়ে দেওয়া হলে সেটা অপূর্ণাঙ্গ হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِيْناً.

‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩)। ইমাম বুখারী বলেন, পূর্ণ জিনিস থেকে কিছু বাদ দেয়া হলে তা অপূর্ণ হয়।[1]

অতএব আমাদের উপর আল্লাহ তা‘আলা যে ঈমান ওয়াজিব করেছেন তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি হয়, যেমনভাবে পবিত্র কুরআন ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর দ্বীন এভাবেই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।[2] অতএব ঈমান বাড়ে এবং কমে এবং মুমিন ব্যক্তিরাও ঈমানের দিক দিয়ে সবাই সমান নয়; বরং তাদের মধ্যে মর্যাদায় পার্থক্য রয়েছে।

(৭) অন্তরের প্রশান্তি : মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে বলেন,

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ رَبِّ أَرِنِيْ كَيْفَ تُحْيِـي الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَـكِن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِيْ.

‘আর যখন ইবরাহীম বলেছিল, হে আমার প্রভু! আপনি কিরূপে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে দেখান। তিনি বললেন, তবে কি তুমি বিশবাস কর না? সে (ইবরাহীম) বলল, হ্যাঁ; তবে এটা কেবল আমার আত্মিক প্রশান্তির জন্য’ (বাক্বারাহ ২/২৬০)। আয়াতটি থেকে বুঝা যায় ঈমান বৃদ্ধি হয়।[3]

প্রকাশ থাকে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সৎআমল করে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত অনুযায়ী তা সম্পন্ন করে থাকে, সে তার অন্তরে অবশ্যই প্রশান্তি লাভ করবে। আর এটাই হচ্ছে বাস্তবে আল্লাহর ওয়াদা। সুতরাং বান্দা যখন আল্লাহকে বেশী বেশী ডাকে, সৎআমল বেশী বেশী করে, তখন তার ঈমান বেড়ে যায়।

(৮) আল্লাহর প্রতি মুমিনদের ঈমান আনা : মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا آمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِيْ نَزَّلَ عَلَى رَسُوْلِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِيَ أَنزَلَ مِن قَبْلُ.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং ঐ কিতাবের প্রতি, যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর অবতীর্ণ করেছেন এবং ঐ কিতাবের প্রতি, যা পূর্বে অবতীর্ণ করেছিলেন’ (নিসা ৪/১৩৬)। তিনি আরো বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَآمِنُوْا بِرَسُوْلِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো, তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন’ (হাদীদ ৫৭/২৮)

মুমিন ব্যক্তিরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পর যখন তাঁর আনুগত্য করে, বেশী বেশী সৎআমল করে, তখন তার ঈমান বাড়ে। এভাবে তারা আল্লাহর প্রতি আরো দৃঢ় বিশ্বাসী হয় এবং তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবের প্রতি, তাঁর রাসূলদের প্রতি, পরকালের প্রতি ঈমান আনে। অতএব যে যত বেশী আল্লাহকে ভয় করে এবং সৎআমল করে, তার ঈমান তত বাড়তে থাকে।[4]

(৯) মুমিনদের স্তর : মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। এ থেকে বুঝা যায় ঈমান বাড়ে এবং কমে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِيْنَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ وَمِنْهُم مُّقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيْرُ.

‘অতঃপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে, যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি। তবে তাদের মধ্যে কেউ নিজের প্রতি যুলুম করেছে, কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে, কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণের কাজে অগ্রসর হয়েছে। এটাই (মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে) মহা অনুগ্রহ’ (ফাত্বির ৩৫/৩২)

এখানে মহান আল্লাহ ঈমানের দিক দিয়ে মুমিন বান্দাদের তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। এদের মধ্যে যারা কল্যাণের পথে অগ্রসর হয়, তারা ওয়াজিব ও মুস্তাহাব কাজসমূহ সঠিক পদ্ধতিতে আদায় করে এবং হারাম বিষয়সমূহ ও অপসন্দনীয় বিষয়াবলী থেকে বিরত থাকে, তারাই নৈকট্য প্রাপ্ত। যারা মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী, তারা তাদের উপর অর্পিত ওয়াজিব বিষয়সমূহ সঠিক পদ্ধতিতে আদায় করে থাকে এবং হারামকৃত বিষয় থেকে বিরত থাকে। আর যারা নিজের আত্মার প্রতি যুলুম করেছে, তারা কিছু হারাম কাজে পতিত হয় এবং কিছু ওয়াজিব বিষয়সমূহ আদায়ে ত্রুটি করে। কিন্তু তাদের সাথে প্রকৃত ঈমান আছে। ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় প্রমাণ।[5]

(১০) পাপের কারণে মানুষের অন্তর থেকে ঈমান আস্তে আস্তে চলে যেতে থাকে। এমনকি তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوْبِهِم مَّا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ.

‘না এটা কখনও নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরের উপর মরিচারূপে জমে গেছে’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১৪)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘অবশ্যই কোন মুমিন ব্যক্তি যখন পাপ কাজে পতিত হয়, তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়। অতঃপর সে পাপ থেকে তওবা-ইস্তেগফার করলে অন্তর থেকে দাগটি উঠিয়ে নেওয়া হয়। ফলে তার অন্তর মসৃণ উজ্জ্বল হয়ে যায়। কালো দাগ বাড়তে থাকলে (পাপ বাড়লে) তার সম্পূর্ণ অন্তর ঘিরে ফেলে। এ মরীচিকা সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন, ‘না এটা কখনও নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচারূপে জমে গেছে’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১৪)[6]

উপরে বর্ণিত আয়াত এবং হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ঈমান কমে ও বাড়ে।[7]

ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির প্রমাণে হাদীছে নববী :

ঈমান বাড়ে ও কমে এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বহু প্রমাণ রয়েছে। ইতিপূর্বে আমরা কুরআনের দলীলগুলো উপস্থাপন করেছি। এখানে হাদীছ থেকে কয়েকটি দলীল পেশ করা হল।-

(1) عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ الله عَنْهُ قَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لاَ يَزْنِى الزَّانِىْ حِيْنَ يَزْنِىْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِيْنَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَسْرِقُ حِيْنَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيْهَا أَبْصَارَهُمْ حِيْنَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ.

(১) আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোন ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটেরা লুটতরাজ করে না মুমিন অবস্থায়; যখন সে লুটতরাজ করে, তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে’।[8]

হাদীছটি থেকে প্রমাণিত হয় যে, ঈমান কমে ও বাড়ে। কোন মুমিন ব্যক্তি যখন পাপে পতিত হয়, তখন তার ঈমান কমে যায়। আবার যখন সে তওবা করে পাপ থেকে ফিরে আসে, তখন তার ঈমান বাড়ে। আব্দুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, আমার পিতা থেকে শুনেছি, তাঁকে ইরজা (মুরজিয়া, যারা ঈমানকে আমলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমরা ঈমান সম্পর্কে বলব, কথা ও আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা, সেটা কমে ও বাড়ে। যখন (কোন মুমিন ব্যক্তি) যেনা করে ও মদ পান করে, তখন তার ঈমান কমে যায়।[9]

মোদ্দাকথা, কোন মুমিন ব্যক্তি বড় পাপ করলে তার ঈমান কমে যায়। তবে সে কাফের হয়ে যায় না। যেমন খারেজীরা এরূপ পাপে পতিত হওয়ার কারণে (মুসলিম ব্যক্তিদের) কাফের ধারণা করে থাকে।[10] উল্লেখ্য যে, কোন মুমিন ব্যক্তি কবীরা গোনাহ করলে (বড় শিরক ব্যতীত) এবং তওবা ছাড়া মারা গেলে সেটা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি ইচ্ছা করলে তার পাপ পরিমাণ শান্তি দিয়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।[11]

(2) عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الإِيْمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُوْنَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّوْنَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيْقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيْمَانِ.

(২) আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তর অথবা ষাটের অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হল তাওহীদের ঘোষণা এ মর্মে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই। আর সর্বনিমণ হল রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্ত্ত দূর করা। আর লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা’।[12] অতএব বুঝা যাচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ ও সর্বনিমণ শাখা রয়েছে। এ হাদীছ প্রমাণ করে যে, ঈমান বাড়ে এবং কমে।[13]

হাদীছটি থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ঈমানের একটি অঙ্গ অপর অঙ্গ থেকে ভিন্ন হয়। আরো জানা যায় যে, মানুষ ঈমানের দিক দিয়ে অন্যের থেকে অনেক উপরে হতে পারে। অতএব যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয় না, সে তার জ্ঞান ও শরী‘আতের দলীলের বিরোধিতা করে।[14]

(3) عَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَفِىْ قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيْرَةٍ مِنْ خَيْرٍ وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَفِىْ قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَفِى قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ.

(৩) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং তার অন্তরে একটি যব পরিমাণ পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে। যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে। যে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকবে, তাকেও জাহান্নাম হতে বের করা হবে’।[15]

(4) عَنْ أَبِىْ سَعِيْدٍ الْخُدْرِىِّ قَالَ خَرَجَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِىْ أَضْحًى أَوْ فِطْرٍ إِلَى الْمُصَلَّى فَمَرَّ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ فَإِنِّىْ أُرِيْتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ. فَقُلْنَ وَبِمَ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيْرَ مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِيْنٍ أَذْهَبَ لِلُبِّ الرَّجُلِ الْحَازِمِ مِنْ إِحْدَاكُنَّ. قُلْنَ وَمَا نُقْصَانُ دِيْنِنَا وَعَقْلِنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ أَلَيْسَ شَهَادَةُ الْمَرْأَةِ مِثْلَ نِصْفِ شَهَادَةِ الرَّجُلِ قُلْنَ بَلَى قَالَ فَذَلِكَ مِنْ نُقْصَانِ عَقْلِهَا أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ قُلْنَ بَلَى قَالَ فَذَلِكَ مِنْ نُقْصَانِ دِيْنِهَا.

(৪) আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের ছালাত আদায়ের জন্য আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, হে মহিলা সমাজ! তোমরা ছাদাক্বাহ কর। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই সর্বাধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)? তিনি বললেন, তোমরা অধিক পরিমাণে অভিশাপ দিয়ে থাক এবং স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদা সতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তাঁরা বললেন, আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায় হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)? তিনি বললেন, একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তাঁরা উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, এটা হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি ছালাত ও ছিয়াম হতে বিরত থাকে না? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি’।[16] আমল কম করলে ঈমান কমে যায়। হাদীছটি ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি প্রমাণ করে।[17]

(৫) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيْمَانِ.

‘তোমাদের মধ্যে কেউ কোন অন্যায় দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে বাধা দেয়। এতে সামর্থ্য না হলে কথা দিয়ে, এটিতেও সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে সেটিকে ঘৃণা করবে। আর এটা হল দুর্বল ঈমান’।[18] ইমাম নববী বলেন, অন্যায় কাজে বাধা দেওয়াটা ঈমানের একটি শাখা।[19]

ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কে সালাফে ছালেহীনের বক্তব্য :

(ক) ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) তাঁর সাথীদের বলতেন, هلموا نزداد إيمانا ‘এসো! আমরা আমাদের ঈমান বৃদ্ধি করি’।[20]

(খ) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) দু‘আতে বলতেন, اللهم زدني إيمانا ويقينا ‘হে আল্লাহ! আমার ঈমান ও প্রত্যয় বৃদ্ধি করে দাও’।[21]

(গ) মু‘আয ইবনে জাবাল (রাঃ) তাঁর সাথীকে বলতেন, اجْلِسْ بِنَا نُؤْمِنُ سَاعَةً يَعْنِي نَذْكُرُ اللهَ. ‘আমাদের সাথে বস, আমরা আল্লাহর প্রতি কিছুক্ষণ ঈমান আনি। অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করি’।[22]

(ঘ) আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, اَلْإِيْمَانُ يَزِيْدُ وَيَنْقُصُ ‘ঈমান বাড়ে এবং কমে’।[23]

(ঙ) ওমাইর ইবনে হাবীব আল-খাতামী (রাঃ) বলেন,اَلْإِيْمَانُ يَزِيْدُ وَيَنْقُصُ. قِيْلَ وَمَا زِيَادَتُهُ وَنُقْصَانُهُ قَالَ إِذَا ذَكَرْنَا اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَحَمِدْنَاهُ وَسَبَّحْنَاهُ فَذَلِكَ زِيَادَتُهُ وَإِذَا غَفَلْنَا وَضَيَّعْنَا وَنَسِينَا. فَذَلِكَ نُقْصَانه. ‘ঈমান বাড়ে ও কমে। বলা হল, তার কিভাবে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে? তিনি বললেন, আমরা যখন আল্লাহর যিকির করি, তাঁর প্রশংসা করি, তাসবীহ (তাহলীল) পাঠ করি, তখন সেটি বাড়ে। আর যখন আমরা অলসতা করি, যিকির থেকে গাফেল হই, ভুলে যাই, তখন সেটি কমে’।[24]

(চ) ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহঃ) আদী ইবনু আদী (রহঃ)-এর নিকট এক পত্রে লিখেছিলেন, ঈমানের কতকগুলো হুকুম-আহকাম, বিধি-নিষেধ/ফরয এবং কতকগুলো সুন্নাত রয়েছে। যে এগুলো পরিপূর্ণ রূপে আদায় করে, তার ঈমান পূর্ণ হয়। আর যে এগুলো পূর্ণভাবে আদায় করে না, তার ঈমান অপূর্ণাঙ্গ হয়।[25]

(ছ) আব্দুর রহমান ইবনে ওমর আল-আওযাঈ (রহঃ) বলেন, اَلإِيْمَانُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ وَيَزِيْدُ وَيَنْقُصُ فَمَنْ زَعَمَ أَنَّ الإيْمَانَ يَزِيْدُ وَلاَ يَنْقُصُ فَاحْذَرُوْهُ فَأِنَّهُ مُبْتَدِعٌ ‘ঈমান হল কথা ও কর্ম দ্বারা বাস্তবায়ন করা। সেটি বাড়ে ও কমে। যে ধারণা করে যে ঈমান শুধু বাড়ে, কমে না, তার থেকে তোমরা সতর্ক থাকো। কেননা সে বিদ‘আতী’।[26]

আওযাঈ (রহঃ)-কে ঈমান বাড়ে কি-না এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,نعم حتى يكون كالجبال قيل فينقص قال نعم حتى يبقى منه شيء- ‘হ্যাঁ বাড়ে, এমনকি সেটি পাহাড় সমতুল্য হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করা হল, অতঃপর সেটি কি কমে? তিনি বললেন, হ্যাঁ! এমনকি তার যৎসামান্যই অবশিষ্ট থাকে’।[27]

(জ) সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, الإيمان يزيد وينقص ‘ঈমান বাড়ে ও কমে’।[28]

(ঝ) আব্দুর রাযযাক শায়বানী বলেন, আমি মা‘মার, সুফিয়ান ছাওরী, মালেক ইবনে আনাস, ইবনে জুরাইজ এবং সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা থেকে শুনেছি, তারা সবাই বলেন,اَلْإِيْمَانُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ وَيَزِيْدُ وَيَنْقُصُ ‘ঈমান হল কথা ও কর্ম দ্বারা বাস্তবায়ন করা। সেটি বাড়ে ও কমে’।[29]

(ঞ) ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, اَلْإِيْمَانُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ وَيَزِيْدُ وَيَنْقُصُ ‘ঈমান হল কথা ও কর্মের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা, সেটি বাড়ে ও কমে’।[30]

(ট) ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) বলেন,الإيمان بعضه أفضل من بعض وَيَزِيدُ وَيَنْقُصُ وزيادته في العمل ونقصانه في ترك العمل ‘ঈমানের কিছু অংশ কিছু অংশ থেকে উত্তম। সেটি বাড়ে ও কমে। আমলের মাধ্যমে তা বৃদ্ধি হয় এবং আমল ছেড়ে দিলে তা হ্রাস প্রায়।[31] তিনি আরো বলেন, الإِيمَانُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ وَيَزِيدُ وَيَنْقُصُ إذا عملت الخير زاد وإذا ضعت نقص- ‘ঈমান হল কথা ও কর্মের সমন্বয়। সেটি বাড়ে ও কমে। যখন তুমি ভালো আমল করবে, তখন তা বৃদ্ধি পাবে এবং নষ্ট করলে (খারাপ আমল দ্বারা) কমে যাবে।[32]

পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ এবং সালাফে ছালেহীনের কথা থেকে বুঝা যায়, ভাল কাজ করলে ঈমান বাড়ে এবং পাপ কাজ করলে কমে। এমনকি কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

(চলবে)

 

[1]. বুখারী, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩৩।

[2]. ইবনে তায়মিয়া, শারহুল আক্বীদা ইছফাহানিয়্যাহ, পৃঃ ১৩৯।

[3]. ইবনু বাত্তা, আল-ইবানাহ ২/৮৩৩।

[4]. ঐ ২/৮৩৪।

[5]. আব্দুর রহমান নাছের আস-সা‘দী, তানবীহাত লত্বীফাহ, পৃঃ ৫০; তাফসীর আস-সা‘দী, পৃঃ ৬৮৯; ইবনে কাছীর ৬/৫৬৮।

[6]. তিরমিযী ৫/৪৩৪; ইবনে মাজাহ হা/৪২৪৪; আহমাদ ২/২৯৭, সনদ ছহীহ।

[7]. যিয়াদাতুল ঈমান ওয়া নুক্বছানিহি, পৃঃ ৫৪-৮০।

[8]. বুখারী হা/২৪৭৫, ‘মাযালিম’ অধ্যায়; মুসলিম হা/২০২ ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[9]. আব্দুল্লাহ, আস-সুন্নাহ ১/৩০৭।

[10]. ইবনু আব্দিল বার্র, আত-তামহীদ ৯/২৪৩।

[11]. নববী, শরহে ছহীহ মুসলিম ২/৪১।

[12]. বুখারী হা/৯, ‘ঈমান’ অধ্যায়; মুসলিম হা/১৫৩ ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[13]. ছিদ্দীক হাসান খান, ফাৎহুল বায়ান ফী মাক্বাছিদিল কুরআন ৪/৬।

[14]. আব্দুর রহমান নাছের আস-সা‘দী, তাওযীহুল বায়ান লি শাজারাতিল ঈমান, পৃঃ ১৪।

[15]. বুখারী হা/৪৪, ‘ঈমান’ অধ্যায়; মুসলিম হা/৪৭৮ ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[16]. বুখারী হা/৩০৪, ‘হায়েয’ অধ্যায়; মুসলিম হা/২৪১ ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[17]. আন-নববী, শারহে ছহীহ মুসলিম ২/৬৫-৬৬।

[18]. মুসলিম হা/১৭৭, ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[19]. শরহে ছহীহ মুসলিম ২/২১।

[20]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ ১১/২৬; লালকাঈ, শারহু উছূলে ই‘তিক্বাদে আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ ৫/১০১২, হা/১৭০০।

[21]. আব্দুল্লাহ, আস-সুন্নাহ ১/৩৬৮, হা/৭৯৭; লালকাঈ, শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০১৩, হা/১৭০৪; ইবনে হাজার, ফাৎহুল বারী ১/৪৮, সনদ ছহীহ।

[22]. শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০১৪, হা/১৭০৭; ফাৎহুল বারী ১/৪৫, সনদ ছহীহ।

[23]. শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০১৬, হা/১৭১১।

[24]. শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০২০, হা/১৭২১।

[25]. বুখারী, ‘ঈমান’ অধ্যায়, পৃঃ ৪।

[26]. আজুর্রী, আশ-শারী‘আহ, পৃঃ ১১৭; শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০৩০, হা/১৭৩৯, সনদ মাক্ববূল।

[27]. শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০৩০, হা/১৭৪০।

[28]. আব্দুল্লাহ, আস-সুন্নাহ ১/৩১০, হা/৬০৪; শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০২৯, হা/১৭৩৮, সনদ ছহীহ।

[29]. আব্দুল্লাহ, আস-সুন্নাহ ১/৩৪৩; শারহু ই‘তিক্বাদ ৫/১০৩৯, হা/১৭৩৫, সনদ ছহীহ।

[30]. আবু নু‘আইম, আল-হিলইয়া ১০/১১৫; ফাৎহুল বারী ১/৪৭।

[31]. আল-খাল্লাল, আস-সুন্নাহ ২/৬৭৮, হা/১০০৮।

[32]. আস-সুন্নাহ ২/৬৮০, হা/১০১৩।

Magazine