اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
একটি সমাজে সাধারণ মানুষ যখন চারদিকে নৈতিকতার সংকট দেখে, তখন বুকভরা আশা নিয়ে তাকায় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসাগুলোর দিকে। মাদরাসাকে মানুষ মনে করে নৈতিকতা, শুদ্ধাচার, আমানতদারিতা এবং আল্লাহভীতি অর্জনের পবিত্র আঙিনা। কিন্তু যখন সেই পরম আস্থার জায়গা থেকেই শিশু নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, বলাৎকার কিংবা গুরুতর নৈতিক স্খলনের খবর আসে, তখন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই গভীর আঘাত লাগে। আস্থার সর্বশেষ জায়গাতেও যদি পচন ধরে, সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই পরবর্তী সময়ে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান এবং আলেম-উলামার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যৌন ও চারিত্রিক অপরাধের বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এগুলোর সবকটিকে মিথ্যা বা ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কিছু ঘটনায় মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে এবং কোনো কোনো ঘটনায় তদন্তে গুরুতর তথ্যও উঠে এসেছে। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে, জুলাই অভ্যুত্থানে মাদরাসাগুলোর ব্যাপক ভূমিকার পর থেকে মাদরাসাগুলো বিদেশী শক্তির চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে। যেহেতু এতদিন জঙ্গী কার্ড খেলে মসজিদ-মাদরাসার উপর থেকে মানুষের বিশ্বাস সরানো যায়নি; বরং মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসা আরও বেড়েছে, তাই এবার জঙ্গী কার্ড নয়; এবার এমন এক কার্ড খেলা হয়েছে, যা মাদরাসাগুলোর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ধ্বংস করে দিবে। যখন সবাই দাড়ি-টুপির মানুষগুলোকে চারিত্রিকভাবে অধঃপতিত ভাবতে শুরু করবে, তখন তাদের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা আছে, সেটি শেষ হয়ে যাবে। পাশাপাশি তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর থেকেও আস্থা উঠে যাবে। মাদরাসাগুলোতে অপরাধ হতো না, এমন নয়। যেহেতু মাদরাসায় ফেরেশতা থাকে না, মানুষই বসবাস করে, সেহেতু সেখানেও অপরাধ হতো। কিন্তু এখন যেভাবে মাদরাসা-কেন্দ্রিক অপরাধগুলোকে মিডিয়াতে এনে হাইলাইট করা হচ্ছে, এটা অবশ্যই পূর্বপরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আওড়িয়ে মাদরাসাগুলো নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। বরং তাদেরকে বাস্তবতা মেনে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
যেহেতু শিক্ষকের আসন একটি পবিত্র আমানত। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّمَابُعِثْتُمُعَلِّمًا ‘নিশ্চয় আমাকে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে’ (ইবনে মাজাহ, হা/২২৯)। অতএব, শিক্ষকের পোশাক পরে যে ব্যক্তি তার কাছে আমানত হিসেবে দেওয়া অসহায় শিশুর ওপর নিজের বিকৃত লালসা মিটায়, সে শুধু প্রচলিত আইনে অপরাধী নয়; সে শিক্ষকতার মর্যাদা, অভিভাবকের বিশ্বাস এবং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের আমানতের সঙ্গেও ভয়াবহ খিয়ানত করে। তাই জরুরী ভিত্তিতে মাদরাসা শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিম্নের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত।
১. একটি জাতীয় মাদরাসা শিক্ষার্থী সুরক্ষা নীতিমালা (Madrasah Child Safeguarding Policy) প্রণয়নকরা: ক্বওমী, আলিয়া, হিফযখানা, নূরানী ও আবাসিক মাদরাসা—সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষার্থী নীতিমালা থাকা উচিত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে লিখিতভাবে নির্ধারিত থাকবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আচরণবিধি, শাসন ও আনুগত্যের সীমা, আবাসিক তদারকি, অভিযোগের পদ্ধতি, অভিযোগ পাওয়ার পর করণীয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কখন জানাতে হবে ইত্যাদি।
২. কঠোর নজরদারি ও নিরাপদ CCTV ব্যবস্থা: প্রবেশপথ, করিডর, ক্লাসরুম, অফিস, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সাক্ষাতের উপযুক্ত common area এবং আবাসিক রুমগুলোকে CCTV-এর আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ফুটেজ কতদিন সংরক্ষিত থাকবে, কারা দেখতে পারবেন এবং কোনো অভিযোগ এলে footage যেন নষ্ট বা মুছে ফেলা না যায়, তারও নীতিমালা থাকতে হবে।
৩. শিক্ষক নিয়োগে শুধু সনদ নয়; চরিত্র ও পূর্ব ইতিহাস যাচাই: কেবল ক্বিরাআত সুন্দর, হিফয ভালো বা প্রাতিষ্ঠানিক সনদ আছে, এগুলো শিক্ষক হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। নিয়োগের আগে জরুরীভিত্তিতে পরিচয় যাচাই, পূর্বের কর্মস্থলের reference, চাকরি ছাড়ার কারণ, গুরুতর অভিযোগের ইতিহাস এবং শিশুদের সঙ্গে কাজ করার উপযুক্ততা যাচাই করতে হবে। শীর্ষস্থানীয় মাদরাসা বোর্ডগুলো চাইলে একটি কেন্দ্রীয় Teacher Verification Database তৈরি করতে পারে। আইনগত কাঠামোর মধ্যে গুরুতর অসদাচরণের প্রমাণিত রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে এক প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত ব্যক্তি পরিচয় গোপন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে সহজে ঢুকতে পারবে না।
৪. শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে: অনেক দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক অসাধারণ জ্ঞানী বা হাফেয হলেও শিশুদের মন-মনাসিকতা নিয়ে আধুনিক child psychology, safeguarding, classroom management এবং child protection সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পাননি। ফলে কোথাও কোথাও ধমক, অপমান বা শারীরিক শাস্তিকেই শিক্ষাদানের স্বাভাবিক পদ্ধতি মনে করা হয়। অথচ একটি ছোট শিশুরও আত্মমর্যাদা আছে। প্রত্যেক শিক্ষককে নিয়োগের শুরুতে এবং নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
৫. স্বাধীন অভিযোগ সেল ও Safeguarding Officer: শিশু যেন সেই ব্যক্তির কাছেই অভিযোগ করতে বাধ্য না হয়, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে। প্রতিষ্ঠানে একাধিক reporting channel থাকতে হবে। যেমন অভিযোগ বক্স, complaint box বা নিরাপদ ডিজিটাল অভিযোগ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা digital reporting system থাকতে হবে।
৬. অভিভাবকদের দায়িত্ব বাড়াতে হবে: বিশেষ করে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে সন্তান দিয়ে মাসের পর মাস খোঁজ না নেওয়া উচিত নয়। সন্তান হঠাৎ চুপ হয়ে যাচ্ছে কি না, মাদরাসায় ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছে কি না, নির্দিষ্ট শিক্ষক বা ছাত্রের নাম শুনে আতঙ্কিত হচ্ছে কি না, ঘুম-খাবার বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না, অভিভাবকদের এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
৭. অভিযোগ মানেই দোষী নয় কিন্তু অভিযোগ মানে অবশ্যই তদন্ত: এখানে ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরী। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না। আবার প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার নামে অভিযোগ চাপাও দেওয়া যাবে না। বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ এলে নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুর নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিশুও সুরক্ষিত হবে, আবার মিথ্যা অভিযোগে কোনো নির্দোষ শিক্ষকও যেন ধ্বংস না হন, সেটিও নিশ্চিত হবে।
৮. অপরাধ প্রমাণিত হলে শুধু বহিষ্কার নয়; আইনের মুখোমুখি করা।
উপরিউক্ত উদ্যোগগুলো গ্রহণ করার পরও যদি কোনো অঘটন সংঘটিত হয়, তাহলে সেটিকে প্রতিষ্ঠানের সুনামের দোহাই দিয়ে কিংবা সামাজিক লজ্জার ভয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না। অপরাধীকে বহিষ্কার করেই দায়িত্ব শেষ মনে করা যাবে না। কেননা অপরাধী বহিষ্কৃত হয়ে অন্য মাদরাসায় গিয়ে চাকরি গ্রহণ করবে অথবা নিজেই একটা মাদরাসা খুলে বসতে পারে। অপরাধীকে আড়াল করার এই সংস্কৃতি অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ। এটি অন্য অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। যেহেতু মহান আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ধরনের অপরাধের সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন, সেহেতু দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ও উলামায়ে কেরামের উচিত হবে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মতোই কঠোর হওয়া। যেখানে মহান আল্লাহ লূত আলাইহিস সালাম ও তাঁর ক্বওমকে এই অপরাধে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। তাদের শহরকে উল্টিয়ে দেওয়া ও আকাশ থেকে আগুনের পাথর বৃষ্টি নিক্ষেপ করার মতো ভয়ংকর শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করেছেন। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ ‘তোমরা যাকে লূত আলাইহিস সালাম-এর জাতির মতো সমকামিতার অপরাধে লিপ্ত হতে দেখবে, তখন এই অপরাধে লিপ্ত উভয়কে হত্যা করো’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৪৬২; তিরমিযী, হা/১৪৫৬; ইবনে মাজাহ, হা/২৫৬১)। অতএব, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আলেম-উলামার উচিত এই ধরনের অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করত বাংলাদেশের পেনাল কোড ৩৭৭ অনুযায়ী তার বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশের পেনাল কোড ৩৭৭ ধারায় বলা আছে, Whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, woman or animal, shall be punished with imprisonment for life, or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine. অর্থাৎ প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনসংগমের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশে এই আইনের তেমন একটা প্রয়োগ নেই। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যদি তাদের শিক্ষকদের অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে এই আইনের মাধ্যমে বিচারের ব্যবস্থা করে তাহলে একসাথে দুটি কাজ হবে। প্রথমত, মাদরাসায় এই ধরনের অপরাধপ্রবণতা কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশী এনজিওগুলো বাংলাদেশে সমকামিতাকে আইনত বৈধতা দিতে চায় এবং তারা আইনের এই ধারা বাতিল চায়। তাদের এই দাবির বিরুদ্ধে আলেম-উলামার যে অবস্থা সেটিও আরও শক্ত ও পাকাপোক্ত হবে। তবে শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনায় সবসময় শুধু ৩৭৭ধারাই নয়; ঘটনার ধরন অনুযায়ী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, শিশু আইন, ২০১৩ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ফৌজদারি বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে। কোন ধারায় মামলা হবে, তা ঘটনার প্রকৃতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের বিষয়।
মসজিদ-মাদরাসা বাংলাদেশের শত শত বছরের ধর্মীয়, শিক্ষাগত ও সামাজিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার মানুষ নিজের ঘরের ভালো খাবারটি সম্মানের সঙ্গে মসজিদের ইমামের কাছে পৌঁছে দেয়; সন্তানকে অন্তত কুরআন শেখানোর আকাঙ্ক্ষা রাখে; নিজেদের কষ্টার্জিত সম্পদ থেকে মসজিদ-মাদরাসায় অকাতরে দান করে। এই আস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি; প্রজন্মের পর প্রজন্মের আলেম, শিক্ষক ও দ্বীনদার মানুষের ত্যাগের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। তাই এই আস্থা রক্ষার দায়িত্বও আমাদেরই। অপরাধ অস্বীকার করে নয়; অপরাধের বিরুদ্ধে অন্য সবার চেয়ে কঠোর হয়ে, সমালোচককে শত্রু বানিয়ে নয়; নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বচ্ছ করে আর শুধু অতীতের গৌরবের কথা বলে নয়; বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের জন্য বাস্তবে সবচেয়ে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে এই আস্থা রক্ষা করতে হবে।
মহান আল্লাহ বাংলাদেশের মসজিদ-মাদরাসাগুলোকে সকল অনিষ্ট থেকে হেফাযত করুন। আলেম-উলামা ও দ্বীনি শিক্ষকদের আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করার তাওফীক্ব দিন। আমাদের ভুলত্রুটি সংশোধনের সাহস দিন, নির্যাতিত শিশুদের হেফাযত করুন, অপরাধীদের ন্যায়বিচারের মুখোমুখি করুন এবং দ্বীনের বিরুদ্ধে সকল অন্যায় ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিন- আমীন! Top of Form(প্র. স.)
