কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সালাফদের অমিয় বাণী

post title will place here

ভূমিকা:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য নিবেদিত, যিনি সকল প্রশংসার একমাত্র যোগ্য। অজস্র ধারায় ছালাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সকল ছাহাবায়ে কেরামের প্রতি।

এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, সালাফগণের কথায় রয়েছে মহান বরকত। তাদের জ্ঞানের গভীরতা ছিল অপরিসীম। তারা কৃত্রিমতাকে অপছন্দ করতেন এবং তারা ছিলেন সুন্দর উপদেশ ও সুদূরপ্রসারী দূরদৃষ্টির অধিকারী।

অতএব, বক্ষ্যমাণ সংকলনটি সালাফগণের বর্ণিত আছারসমূহ নিয়ে সংকলিত হয়েছে এবং প্রতিটি আছারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত টীকাও সংযোজিত হয়েছে। ফলে এর মাধ্যমে আমরা সরল পথ, সঠিক কর্মপন্থা এবং নির্ভেজাল জ্ঞানের সন্ধান পাব। পাশাপাশি এতে রয়েছে মর্মস্পর্শী হিতোপদেশ ও পরিণত প্রজ্ঞাপূর্ণ নছীহতের সন্ধান।

কাজেই যে ব্যক্তি তাদের জীবনধারা অনুসরণ করে, সে সফলতার রাজপথে অগ্রসর হয়। আর যে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে, সেও সফলতার পথে অগ্রসর হয়।

আল্লাহ তাআলার সমীপে একনিষ্ঠ নিবেদন এই যে, তিনি যেন আমাদেরকে তাদের আলোকিত আদর্শে আদর্শিত হওয়ার সৌভাগ্য নসীব করেন এবং তাদের মজবুত চেতনা ধারণ করে তাদের সোনালি মানহাজ অনুসরণ করার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা এবং উত্তম সাড়াদানকারী।

১. সার্বজনীন উপদেশ

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে জনৈক ব্যক্তি চিঠি লিখে অনুরোধ করলেন, আমাকে পুরো জ্ঞানের সমষ্টিস্বরূপ কিছু লিখে পাঠান। তিনি উত্তরে লিখলেন, নিশ্চয়ই জ্ঞান অনেক! কিন্তু তুমি যদি পার, তাহলে কারও প্রতি যুলুম করো না, হারাম ভক্ষণ করো না, মানুষকে অপমানজনক কথা বলো না এবং গীবত করো না। পাশাপাশি তাদের জামাআত বা ঐক্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না, যেন তুমি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ (মৃত্যুবরণ) করতে পার। বাস্তবিকপক্ষে, এভাবেই তুমি জীবনযাপন করো।[1]

আল্লাহু আকবার! অল্প কয়েকটি কথার মধ্যেই মানুষের সার্বিক অধিকার ও উত্তম চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিহিত রয়েছে। অথচ এসব বিষয়ে আমাদের কতই না অবহেলা! বিশেষ করে যখন ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন আমাদের এই অবহেলা আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এসব থেকে রক্ষা করুন- আমীন!

২. মরীচিকার পেছনে ছুটো না!

আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, দুনিয়া অতি দ্রুত বিদায় নিচ্ছে, আর আখেরাতও অতি সন্নিকটে। উভয়েরই সন্তান রয়েছে। কাজেই তোমরা আখেরাতের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত হও; দুনিয়ার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। কারণ দুনিয়াতে আমল করার সুযোগ রয়েছে, কোনো প্রকার হিসাব নেই। আর আখেরাতে শুধু হিসাবের পালা, আমল করার কোনো সুযোগ নেই।[2]

উক্ত বাণীর বাস্তব প্রেক্ষাপটে প্রাজ্ঞজনেরা বলেছেন, চরম আশ্চর্যের বিষয়! দুনিয়া তো বিদায় নিচ্ছেই, আবার আখেরাতও অতি সন্নিকটে। তাহলে মানুষ কীভাবে আখেরাতের জন্য ছুটে না গিয়ে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পেছনে ছুটছে? [3]

৩. রক্তপাত থেকে সাবধান!

জুনদুব ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, মানুষের দেহে প্রথম যে জিনিসটি পচে বা নষ্ট হয়ে যায়, তা হলো তার পেট। কাজেই যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে যে, পবিত্র ও হালাল ছাড়া হারাম কোনো কিছু সে ভক্ষণ করবে না, সে যেন তা-ই করার চেষ্টা করে। আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে যে, এক আঁজলা পরিমাণ রক্তপাত ঘটিয়েও তার এবং জান্নাতের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না, সে যেন অবশ্যই তা করে।[4]

উক্ত উক্তিটি হালাল ভক্ষণে উৎসাহ প্রদান এবং রক্তপাত থেকে বিরত থাকার এক মহৎ উপদেশ। প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত, কলুষমুক্ত চেতনা, কল্যাণসন্ধানী মন এবং আন্তরিক ও খাঁটি হৃদয়ের অধিকারী না হলে এ ধরনের শত শত উপদেশও কোনো কাজে আসবে না। এ কারণেই অন্তর কলুষিত হওয়ার ফলে মানুষ রক্তপাতের ফাঁদে পড়ে এবং চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা খারেজীপনার মাধ্যমে মুসলিমদের মাঝে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়, মুসলিম পুরুষ ও শিশুদের এলোপাতাড়ি হত্যা করে এবং সমাজে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করে।

৪. জটিল ও বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন থেকে সাবধান!

ইমাম আওযাঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ইলমের বরকত থেকে বঞ্চিত করতে চান, তখন তিনি তাকে জটিল ও বিভ্রান্তিকর প্রশ্নে ব্যস্ত করে দেন—যেসব প্রশ্নের মাধ্যমে সে মানুষকে সমস্যায় ফেলে।[5]

الأغاليط হলো অসুবিধা ও কষ্টে ফেলার উদ্দেশ্যে মানুষকে জটিল প্রশ্ন করা এবং বিচিত্র ও অস্বাভাবিক প্রশ্নের মধ্যে জড়িয়ে দেওয়া, যা চরম সংশয় সৃষ্টি করে। ফলে তীব্র ঝগড়া-বিবাদ ও কলহ বৃদ্ধি পায়।

কাজেই যে ব্যক্তি কেবল অস্বাভাবিক ও অদ্ভুত প্রশ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, অথচ মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানার কোনো আগ্রহ নেই এবং দৈনন্দিন জীবনে আমল করার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম জ্ঞানও অর্জন করে না, সে মূলত অযথা সময় অপচয় করে এবং ইলমের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়!

৫. রামাযান মাসের জন্য উত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করো!

জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, যখন তুমি ছিয়াম রাখবে, তখন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বাকেও মিথ্যা কথা ও অনর্থক কথা থেকে বিরত রেখে ছিয়াম করাও এবং প্রতিবেশী ও অধীনদের কষ্ট দিয়ো না। আর তোমার মধ্যে প্রশান্তি ও স্থিরতা থাকা উচিত। ছিয়াম রাখার দিন ও ছিয়াম না রাখার দিন যেন সমান না হয়।[6]

এটি রামাযানের জন্য প্রস্তুতির এক উজ্জ্বল চিত্র। কেননা আত্মার পরিশুদ্ধতা, অন্তরের পবিত্রতা, তাক্বওয়া অর্জন, পাপমুক্তি এবং হৃদয়, জিহ্বা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সংশোধন করার জন্যই ছিয়ামের বিধান দেওয়া হয়েছে।

যে ব্যক্তি এই বরকতময় মাস পেল, অতঃপর উত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করে এর প্রভূত কল্যাণগুলো লুফে নিল, সে কতই না উত্তম কাজ করল!

আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক্ব দান করুন, যেন আমরা আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে মিথ্যা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখতে পারি, শান্তি ও ধৈর্যের সঙ্গে ছিয়ামের পূর্ণতা দিতে পারি এবং যথাযথভাবে এর হক্ব আদায় করতে পারি। উপরন্তু, ছিয়াম রাখার দিন আর ছিয়াম না রাখার দিন যেন একই রকম না হয়; বরং ছিয়াম যেন আমাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে।

৬. আদব বা শিষ্টাচার

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শিষ্টাচার দ্বীন ইসলামের দুই-তৃতীয়াংশ।[7]

আদব বা শিষ্টাচার এত মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো- এটি মানুষের একটি মহান চরিত্র, যা তাকে প্রশংসনীয় কথা ও কর্মে উদ্বুদ্ধ করে। তদুপরি, এর মাধ্যমে ব্যাপক কল্যাণ সাধিত হয় এবং অনেক অকল্যাণ ও অনিষ্ট প্রতিহত হয়। এটি মানুষকে প্রতিটি মহৎ গুণ ও সৎকর্মের দিকে পরিচালিত করে এবং সব ধরনের মন্দ ও অকল্যাণ থেকে দূরে রাখে।

কাজেই শিষ্টাচারই দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের সফলতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায় এবং সৌভাগ্যের পরশপাথর।

৭. ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস

উমাইর ইবনু হাবীব আল-খাতমী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাসও পায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এর বৃদ্ধি ও হ্রাস কীভাবে হয়? তিনি বললেন, যখন আমরা আল্লাহকে স্মরণ করি এবং তাঁকে ভয় করি, তখন ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর যখন আমরা গাফেল হয়ে যাই, তাঁকে ভুলে যাই এবং তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত হই, তখনই ঈমান হ্রাস পায়।[8]

কাজেই যেসব কারণে মানুষের ঈমান বৃদ্ধি পায়, সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সেগুলো জানতে হবে, আঁকড়ে ধরতে হবে এবং সেগুলোর হেফাযত করতে হবে। একইভাবে, যেসব কারণে ঈমান হ্রাস পায়, সেগুলো থেকেও দূরে থাকতে হবে এবং সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এভাবেই মানুষ তার দ্বীন রক্ষা করতে এবং নিজের ঈমানকে সযত্নে সংরক্ষণ করতে পারবে।

৮. মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করো না!

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আলেমদের তুচ্ছজ্ঞান করে, তার পরকাল নষ্ট হয়। যে শাসকদের অবজ্ঞা করে, তার দুনিয়া ধ্বংস হয়। আর যে ব্যক্তি তার বন্ধুদের অবহেলা করে, তার ব্যক্তিত্ব ও মানবিকতা বিনষ্ট হয়।[9]

মানুষের প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকানো অহংকার ও আত্মম্ভরিতার প্রকাশ। জ্ঞানী ব্যক্তি কখনও কাউকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না। কাজেই যে ব্যক্তি মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হয়।

(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)

মূল: আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল মুহসিন আল-বদর হাফিযাহুল্লাহ

অনুবাদ: রিফাত সাঈদ

অধ্যয়নরত, মাদরাসাতুল হাদীস‚ নাজির বাজার‚ বংশাল‚ ঢাকা।


[1]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/২১৬।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১৭, হাদীছের প্রাসঙ্গিকতায় উদ্ধৃত।

[3]. ফাতহুল বারী, ১১/২৩৬।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৫২।

[5]. জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী লি-ইবনি আব্দিল বার্র, পৃ. ১০৮৭।

[6]. মুছান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, হা/৮৯৭৩।

[7]. ছিফাতুছ ছফওয়াহ লি-ইবনিল জাওযী, ৪/১৪৫।

[8]. মুছান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, হা/১৪।

[9]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৫/৪২৪।

Magazine