কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রবের বাণী (পর্ব-১১)

post title will place here

[সূরা আল-বাক্বারাহ: ৪১-৪২ আয়াত]

وَآمِنُوا بِمَا أَنْزَلْتُ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَكُمْ وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرٍ بِهِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَإِيَّايَ فَاتَّقُونِ

[আল-বাক্বারাহ: ৪১ আয়াত]

আর এখন সেই কিতাবের উপর ঈমান আনো, যা আমি নাযিল করেছি। এই কুরআন কোনো নতুন বা অচেনা সত্য নিয়ে আসেনি; বরং তাওহীদ, নবুঅত, আখেরাত এবং আল্লাহর আনুগত্যের সেই একই দাওয়াতকে সামনে এনেছে, যা মূল আসমানী কিতাবগুলোতে ছিল। কুরআন তোমাদের নিকটে থাকা আসমানী কিতাবগুলোর মিথ্যায়নকারী নয়, বরং সত্যায়নকারী।

তোমাদের কিতাবে যে শেষ নবীর আগমনের সংবাদ ছিল, যে প্রতিশ্রুত হেদায়াতের জন্য তোমরা যুগের পর যুগ অপেক্ষায় ছিলে, তারই বাস্তব রূপ আজ তোমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। তাই এই কিতাবকে প্রত্যাখ্যান করা তো বহু দূরের কথা, বরং সবার আগে তোমাদেরই এই কিতাব গ্রহণ করা উচিত ছিল।

অতএব, তোমরাই যেন এই সত্যের প্রথম অস্বীকারকারী না হয়ে যাও। এখানে প্রথম হওয়ার অর্থ সংখ্যাগত প্রথম নয়। আরবের মুশরিকদের অনেকেই ইতোমধ্যে কুরআন অস্বীকার করেছিল। কিন্তু যাদের কাছে কিতাব ছিল, নবুঅতের ইতিহাস ছিল, শেষ রাসূলের পরিচয় ছিল—তাদের পক্ষ থেকে এটা অস্বীকার করা ছিল আরও ভয়াবহ। ইবলীস জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও অহংকার ও হিংসার কারণে অবাধ্য হয়ে অভিশপ্ত হয়েছে। যাদের কাছে তাওরাত ও বাইবেল এসেছিল, তারা আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিজেদের সন্তানের চেয়েও বেশি চিনত। পরিচিত সত্যকে তারা শুধু গোষ্ঠীগত অহংকারের কারণে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই মহান আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন, আর তোমরা আমার আয়াতগুলোকে তুচ্ছ দুনিয়াবী স্বার্থের বিনিময়ে বিক্রি করো না। দুনিয়াবী স্বার্থ শুধু টাকাপয়সা বা ধনসম্পদ নয়; বরং সাময়িক ক্ষমতা, নেতৃত্ব, সামাজিক মর্যাদা, মানুষের প্রশংসা, জনিপ্রয়তা, গোষ্ঠীগত প্রভাব ও অহংকার এগুলোর সবই দুনিয়াবী স্বার্থ। আল্লাহর হেদায়াতের বিনিময়ে মানুষ যা-ই লাভ করুক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত অতি সামান্য ও ক্ষণস্থায়ী। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদও আল্লাহর একটি আয়াতের মূল্য সমপরিমাণ হতে পারে না।

একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় স্বার্থ হওয়া উচিত, আল্লাহর সন্তুষ্টি না হারানো। মানুষের জনপ্রিয়তা হারানোর ভয় নয়, বরং আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে ভয় করতে হবে। মানুষের প্রতিক্রিয়া, ক্ষমতা ও নেতৃত্ব হারানোর আশঙ্কা বা দুনিয়াবী ক্ষতির হিসাব নয়; বরং সবচেয়ে বেশি চিন্তা হওয়া উচিত আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর হিসাব নিয়ে।

অতএব, তোমরা সকল কিছুর উপরে আমাকে ভয় করো। আমার সীমারেখা অতিক্রম করা থেকে নিজেকে রক্ষা করো। আমার ক্রোধকে ভয় করো এবং এমন কোনো স্বার্থকে হৃদয়ে স্থান দিয়ো না, যা তোমাদেরকে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দিকে ঠেলে দেয়।

وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

[আল-বাক্বারাহ: ৪২ আয়াত]

সত্যকে অস্বীকার করার অনেকগুলো কুটকৌশল রয়েছে। তন্মধ্যে পূর্বের আয়াতে সরাসরি অস্বীকারের কথা বলা হয়েছে। আর এই আয়াতে সত্যকে গোপন করা এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে ফেলার কথা বলা হচ্ছে। মহান আল্লাহ বলেন, আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ো না। সরাসরি অস্বীকার না করে মিথ্যাকে যদি সত্যের মোড়কে পেশ করা হয়, তাহলে মানুষ দ্রুত সেটিকে বিশ্বাস করে। সত্যের সংমিশ্রণ থাকায় মানুষ পুরো কথাকেই সত্য মনে করে থাকে। বনূ ইসরাঈল এই কাজে খুবই দক্ষ ছিল। তারা তাওরাতের সাথে নিজেদের প্রবৃত্তি ও স্বার্থকে জুড়ে দিয়ে সত্যের চেহারা বিকৃত করে দিত। মানুষের সামনে এমন একটি মিশ্রিত ধর্ম উপস্থাপন করত, যেখানে আল্লাহর কথাও আছে, আবার মানুষের বানানো কথাও আছে। ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারত না যে, কোনটি আল্লাহর নির্দেশ আর কোনটি মানুষের সংযোজন।

আর জেনে-বুঝে তোমরা সত্যকে গোপন করো না। যে সত্য তোমাদের কিতাবে স্পষ্ট ছিল, যে সত্যের সাক্ষী হওয়ার দায়িত্ব তোমাদের উপর অর্পিত হয়েছিল, সেটিকে মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখো না। বিশেষ করে সেই সব নিদর্শন, যেগুলো শেষ নবীর আগমনের দিকে ইঙ্গিত করত, সেগুলোকে তারা গোপন করার চেষ্টা করত। অজ্ঞতার কারণে ভুল করা এক জিনিস আর সত্যকে চিনেও তাকে আড়াল করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। জ্ঞান এখানে সম্মান নয়, জ্ঞান এখানে জবাবদিহিতা।

আজকের যুগেও তারা সত্য-মিথ্যা বিকৃত করে। সত্যকে গোপন করে। তারা সারা পৃথিবীতে কম সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে, অথচ তারা নিজেরা সবচেয়ে বেশি সন্তান গ্রহণ করে। সারা পৃথিবীতে তারাই সবচেয়ে বেশি সূদের কারবার করে, কিন্তু নিজেরা কখনো নিজেদের সাথে সূদী লেনদেন করে না।

(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)

আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

Magazine