আক্বীদা
পবিত্রতা
ছালাত
প্রশ্ন (৮): আমাদের মসজিদের ইমাম বলেন, তিনি ইমাম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর মাযহাব অনুসারে ছালাত পড়ান। আমি ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী ছালাত আদায় করি। তিনি বলেছেন, এ কারণে তার পিছনে আমার ছালাত হবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে এ কথাটি কি সঠিক?
প্রশ্নকারী : মেহেদী
কোরবানপুর, মুরাদনগর, কুমিল্লা।
উত্তর: কথাটি সঠিক নয়; বরং এমতাবস্থায় ছালাত হয়ে যাবে। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তারা তোমাদের ছালাত আদায় করায়। সুতরাং যদি তারা ঠিকভাবে ছালাত আদায় করায়, তাহলে তোমাদের ও তাদের ছওয়াব হবে। আর যদি ভুল করে, তাহলে তোমাদের ছওয়াব হবে এবং এর দায় তাদের উপর বর্তাবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৬৪৮)।
প্রশ্ন (৯): ঈদেরছালাতেদ্বিতীয়রাকআতেইমামযদিপাঁচতাকবীরদিতেভুলেযায়তাহলেছালাতহবেকি? এর জন্যদ্বিতীয়রাকআতেসাহুসিজদাদেওয়াহলেসেইছালাতকিগ্রহণহবেনাকিআবারপড়তেহবে?
প্রশ্নকারী : মাসুদ রানা
সৈয়দপুর, নীলফামারী।
উত্তর: ঈদের ছালাতে অতিরিক্ত যে তাকবীরগুলো পাঠ করা হয় তা সুন্নাত; ওয়াজিব নয়। সুতরাং যদি ভুলবশত অতিরিক্ত তাকবীর পাঠ না করা হয়, তাহলে ছালাত আদায় হয়ে যাবে এবং সিজদায়ে সাহুর প্রয়োজন নেই (আল-মাজমূ‘, ইমাম নববী, ০৪/১২৩)।
প্রশ্ন (১০): আমার পিতা মৃত্যুর আগে ৫ দিন ICU/HDU-তে ছিলেন। শেষ ৪ দিন জ্ঞান ছিল, কিন্তু ছালাত আদায় করেছেন কি-না জানা নেই। যদি না পড়ে থাকেন, তাহলে কি কোনো কাফফারা বা অন্য কিছু আদায় করতে হবে?
উত্তর: কোনো ব্যক্তি জ্ঞান থাকা অবস্থায় অসুস্থ হলেও সামর্থ্য অনুযায়ী দাঁড়িয়ে, না পারলে বসে, তাও না পারলে কাত হয়ে ছালাত আদায় করা ফরয (ছহীহ বুখারী, হা/১১১৭)। কিন্তু আইসিইউ-তে থাকার কারণে শেষের দিনগুলো ছালাত আদায় করেছেন কি-না তা জানা না গেলে বা ছালাত আদায় করেননি মর্মে নিশ্চিতভাবে জানা গেলেও, তার জন্য শরীআতে নির্ধারিত কোনো কাফফারা নেই। বরং তার সন্তানগণ তার জন্য দু‘আ, ইস্তিগফার ও দান-ছাদাকা করতে পারেন (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩১)।
প্রশ্ন (১১): কোনকোনকারণেপুরুষদেরঘরেফরযছালাতআদায়করাযাবেএবংতাআল্লাহরকাছেকবুলহবে?
প্রশ্নকারী : আসাদুজ্জামান
চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর: সাধারণ অবস্থায় পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাআতের সাথে ছালাত আদায় করা ওয়াজিব। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আযান শুনল এবং তার কোনো ওযর না থাকা সত্ত্বেও জামাআতে উপস্থিত হলো না, তার ছালাত নাই’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৩; ইবনু মাজাহ, হা/৭৯৩)। তবে ভীষণ অসুস্থতা, প্রাণ বা সম্পদের নিরাপত্তা, প্রচণ্ড বৃষ্টি, কাঁদাযুক্ত রাস্তা অথবা জলাবদ্ধতার কারণে মসজিদে উপস্থিত না হয়ে বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জামাআতে ছালাত আদায় করা যায়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যদি কেউ ভয়ভীতি ও অসুস্থতার কারণে জামাআতে হাযির হতে অক্ষম হয়, তবে তার জন্য বাড়িতে ছালাত আদায় করা দূষণীয় নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৯০১; আবূ দাঊদ, হা/৫৫১)।
প্রশ্ন (১২): মসজিদের ভিতর মোবাইলে দ্বীনী আলোচনার ভিডিও অথবা অন্য ভালো কোনো ভিডিও দেখা যাবে কি? নাকি মসজিদে দেখলে পাপ হবে?
প্রশ্নকারী : সাজিদ
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
উত্তর: মসজিদ নির্মাণ করা হয় জামাআতে ছালাত আদায়, খুৎবা শোনা, যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত এবং দ্বীনী আয়োজনে অংশগ্রহণ করার জন্য। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই ছালাত, এতে মানুষের কোনো কথাবার্তা বলা বৈধ নয়; এটি তো কেবল তাসবীহ, তাকবীর এবং কুরআন তিলাওয়াত’ (আবূ দাঊদ, হা/৯৩০)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إياكم وهيشات الأسواق ‘খবরদার! তোমরা (মসজিদে) বাজারের মতো শোরগোল, ঝগড়া ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩২)। অতএব, মসজিদে এসব কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজ করা সমীচীন নয়। তবে দ্বীনী বক্তব্য হলে শালীনতা রক্ষা করে শুনতে পারে।
প্রশ্ন (১৩): জানাযার ছালাতে কীভাবে দাঁড়াব? পায়ের সাথে পা লাগাতে হবে কি?
প্রশ্নকারী : মুসতাকিম
ফেনী।
উত্তর: হ্যাঁ, জানাযার ছালাতে পায়ের সাথে পা মিল করেই দাঁড়াতে হবে। কারণ এটাও ছালাত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাশীর জানাযায় সারিবদ্ধ হন এবং চার তাকবীরে জানাযা পড়ান (ছহীহ বুখারী, হা/১২৪৫; মিশকাত, হা/১৬৫২)। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমরা জনৈক ব্যক্তির জানাযায় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম (ছহীহ বুখারী, হা/১৩২১; মিশকাত, হা/১৬৫৮)।
যাকাত-দান-ছাদাকা
প্রশ্ন (১৪): বাবা-মায়ের দেওয়া হাতখরচ থেকে দান করলে ছওয়াব কার হবে—দানকারী সন্তানের, নাকি অর্থদাতা বাবা-মায়ের, নাকি উভয়ের?
প্রশ্নকারী : জাকারিয়া ইসলাম
পিরোজপুর।
উত্তর: বাবা-মায়ের দেওয়া হাতখরচ বা অর্থ থেকে সন্তান দান করলে সন্তান দানকারী হিসেবে পূর্ণ ছওয়াব পাবে। একইসঙ্গে বাবা-মাও অর্থ উপার্জন করে সন্তানকে দেওয়ার কারণে সমপরিমাণ ছওয়াবের অংশীদার হবেন। এতে কারও ছওয়াব অপরের কারণে সামান্যও কমবে না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো স্ত্রী যদি তার ঘর হতে ক্ষতির উদ্দেশ্য ছাড়া খাদ্যদ্রব্য ছাদাকা করে, তবে এ জন্য সে ছওয়াব লাভ করবে আর উপার্জন করার কারণে স্বামীও ছওয়াব পাবে এবং খাজাঞ্চিও অনুরূপ ছওয়াব পাবে। তাদের একজনের কারণে অন্য জনের ছওয়াবে কোনো কমতি হবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৪২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১০২৪)।
প্রশ্ন (১৫): বিভিন্ন ফাউন্ডেশন কিংবা ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে যাকাত কালেক্ট করে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন, কিংবা মানুষকে আর্থিক সহযোগিতা করেন, আবার কেউ কেউ স্বাবলম্বী প্রকল্পও পরিচালনা করেন। এই ক্ষেত্রে যদি আমার যাকাতের টাকা তাদের কাছে দেই এবং তারা যদি যাকাতের প্রাপ্য হক্বদারের কাছে বিতরণ না করেন, তাহলে আমার যাকাত আদায় হবে কি?
প্রশ্নকারী : রাজু আহমেদ
কুমিল্লা।
উত্তর: কোনো ব্যক্তি বা ফাউন্ডেশন যদি যাকাত বিতরণের প্রতিনিধি وَكِيل)) হিসেবে যাকাত সংগ্রহ করে, তাহলে তাদের দায়িত্ব শরীআত নির্ধারিত খাতসমূহে যাকাতের সম্পদ যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া। তারা যদি যাকাতের অর্থ নির্ধারিত হক্বদারদের কাছে না দিয়ে অন্য কোনো অননুমোদিত খাতে ব্যয় করে, তাহলে শুধু তাদের কাছে যাকাতের অর্থ হস্তান্তর করার মাধ্যমে যাকাত আদায় হবে না। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যাকাত ব্যয়ের খাত নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ছাদাকা (যাকাত) তো কেবল ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়ের কাজে নিযুক্ত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন তাদের জন্য, দাসমুক্তিতে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ (আত-তাওবা, ৯/৬০)।
জায়েয-নাজায়েয
প্রশ্ন (১৬): গ্রামে ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি ছেড়ে দিয়ে পালন করার কারণে অনেক সময় অনেকের ফসল নষ্ট হয়। ফসল বা ক্ষতির বিনিময়ে ছাগল ধরে খেয়ে ফেললে গুনাহ হবে কি? অন্যের ক্ষতি করে এভাবে গবাদিপশু পালন করা যাবে কি?
প্রশ্নকারী : তোফায়েল আমিন
গাইবান্ধা।
উত্তর: পশু যদি দিনের বেলায় শস্য খেয়ে নেয়, তাহলে এতে জমির মালিক দায়ী। আর যদি রাতের বেলা শস্য খেয়ে নেয়, তাহলে পশুর মালিক দায়ী। বারা ইবনু আযেব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (নিম্নরূপ) ফায়সালা প্রদান করেছিলেন, ‘বাগ-বাগিচার দেখাশোনার দায়িত্ব দিনের বেলা তার মালিকের উপর (দিনের বেলা লোকসানের জন্য মালিক দায়ী থাকবে)। গৃহপালিত জন্তুর রাতের বেলায় দেখাশোনার দায়িত্ব তার মালিকের উপর ন্যস্ত। রাতের বেলায় গৃহপালিত পশুর ক্ষতির জন্য পশুর মালিক দায়ী থাকবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৬৯; ইবনু মাজাহ, হা/২৩৩২)। তবে বর্তমান সামাজিক অবস্থায় গবাদিপশু অনেক ক্ষতি করে। কাজেই পশুর মালিককে দিনের বেলাও তার পশু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর ক্ষতির কারণে মালিকের অনুমতি ছাড়া তার পশু ধরে জবাই করে খাওয়া বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘ইসলামে নিজের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ, অন্যের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪১)। অতএব, ফসলের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি পশুর মালিকের সঙ্গে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে বৈধ বিচারিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে; নিজের হাতে প্রতিশোধ নেওয়া বা পশু জবাই করে নেওয়া বৈধ নয়।
প্রশ্ন (১৭): ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে কি? এতে সূদের সাথে জড়িত অনেক বিষয় ও কেনাকাটায় বিভিন্ন অফার থাকে। বিদেশ ভ্রমণেও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।
প্রশ্নকারী : আকরাম
বেরাইদ, ঢাকা।
উত্তর: স্বাভাবিকভাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা উচিত নয়। কেননা এতে ঋণ ও বিলম্বিত পরিশোধের ক্ষেত্রে সূদ নেওয়ার শর্ত রয়েছে, যা থেকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূরে থাকতে বলেছেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ছালাতে সর্বদাই ঋণ থেকে আশ্রয় চাইতেন (নাসাঈ, হা/৫৪৮৭)। জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা‘নত করেছেন সূদখোরের উপর, সূদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও তার সাক্ষী দুজনের উপর এবং বলেছেন, ‘এরা সবাই সমান’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮)। আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন (আল-বাকারা, ২/২৭৫)। তবে নিরুপায় হয়ে গ্রহণ করা ভিন্ন বিষয়।
প্রশ্ন (১৮): আমি অনলাইনে ব্যবসা করি এবং ফেসবুকে পণ্যের ভিডিও আপলোড করি। যদি এসব ভিডিওতে কোনো বাদ্যযন্ত্র বা মিউজিক ব্যবহার না করে শুধু মানুষের কণ্ঠে গাওয়া ভোকাল সাউন্ড ব্যবহার করি, যার কথায় কোনো অশ্লীলতা বা হারাম বিষয় নেই এবং ভিডিওও শরীআতসম্মত হয়, তাহলে তা ব্যবহার করা কি জায়েয?যদি জায়েয না হয়, তাহলে এর বিকল্প কী হতে পারে?
উত্তর: ভিডিওতে যদি কোনো মিউজিক/বাদ্যযন্ত্র না থাকে, কথায় অশ্লীলতা, শিরক, হারাম বা অনৈতিক বিষয় না থাকে, পুরুষের স্বাভাবিক কণ্ঠ হয়, নারীর কণ্ঠ না হয়, কণ্ঠকে এমনভাবে পরিবেশন করা না হয় যা অশ্লীল গান বা ফিতনার দিকে নিয়ে যায় এবং ভিডিওর দৃশ্যও শরীআতসম্মত হয়, তাহলে এ ধরনের ভোকাল ব্যবহার করা যায়। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ঈদের দিন তার কাছে দুই আনছারী কিশোরী ছিল, তারা বুআসের যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে গান করছিল। আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু আপত্তি করলে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫০)।
প্রশ্ন (১৯): AI কোনো মানুষের চরিত্র দিয়ে ফেসবুক বা ইউটিউবে কুরআনের আয়াত, হাদীছ, দু‘আ ও যিকির শেখানো এবং তা থেকে আয় করা কি জায়েয?
প্রশ্নকারী : নাফিউন হক্ব
কুমিল্লা।
উত্তর: ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামI-এ কোনো মানুষের চরিত্র ব্যবহার করে কুরআন, হাদীছ, দু‘আ ও যিকির শেখানো যাবে না। কেননা তাতে মিথ্যা আরোপ, প্রতারণা, চেহারা ও কণ্ঠের বিকৃতি, আয়াত ও হাদীছের মূল ইবারতে, অনুবাদে, সূত্রে, মাসআলায় ভুলের সম্ভাবনা, চরিত্রের অতিরিক্ত অভিনয়, হাস্যরস, নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি, আকর্ষণীয় মুখভঙ্গি বা বিনোদনমূলক উপস্থাপনা, দ্বীনের নামে বাণিজ্যিক আকর্ষণ (যেমন- ভিউ, সাবস্ক্রিপশন, বিজ্ঞাপন বা আয় বাড়ানোর জন্য কুরআন-হাদীছকে অতিরিক্ত ক্লিকবেইট, নাটকীয়তা ও চমকপ্রদ উপস্থাপনা), কণ্ঠ/চেহারার অপব্যবহার করা হয়, যেগুলো ইসলামী শরীআতে হারাম। সুতরাং সেখান থেকে আয় করাও জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তর—এসবের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (আল-ইসরা, ১৭/৩৬)।
প্রশ্ন (২০): সরকারি রাস্তা বা ফুটপাতের জায়গায় স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদনের ভিত্তিতে দোকান/অস্থায়ী ভ্যান বসিয়ে ব্যবসা করা কি জায়েয হবে? যদি জায়েয না হয়, তাহলে এটা কোন ধরণের গুনাহ হবে?
প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: সাধারণত সরকারি রাস্তা বা ফুটপাত জনসাধারণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত। যদি সেখানে দোকান বা অস্থায়ী ভ্যান বসানোর কারণে জনসাধারণের চলাচলে অসুবিধা হয় এবং তাদের কষ্ট হয়, তাহলে তা জায়েয নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি বৈধভাবে নির্দিষ্ট স্থান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্থায়ী দোকান বা ভ্যান বসানোর অনুমতি দেয় এবং এতে মানুষের চলাচলে ক্ষতি না হয়, তাহলে সেই অনুমতির সীমার মধ্যে ব্যবসা করা জায়েয (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৬৫)। অনথ্যায় জায়েয নয়।
প্রশ্ন (২১): বাইনান্সে Spot Trade করাযাবেকি? কেউআবারস্পটট্রেডকেস্টকব্যবসারমতোমনেকরেকাজকরছে।
প্রশ্নকারী : আব্দুর রাকিব
চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর: বাইনান্স একটি অনলাইন বাজার, যেখানে বিটকয়েন (Bitcoin), ইথারেয়াম (Ethereum) এবং বাইনান্স কয়েনের (BNB) মতো শত শত ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনা, বিক্রি ও বিনিময় করা যায়। এই বাইনান্সে স্পট ট্রেড (সরাসরি ডিজিটাল মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়) করা জায়েয নয়। কারণ এই ডিজিটাল মুদ্রাগুলো শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে মাল বা সম্পদ নয়, আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলো স্বীকৃত মুদ্রাও নয়। সুতরাং যারা স্পট ট্রেডকে স্টক বিজনেসের মতো মনে করছে তারা ভ্রান্তির শিকার। কারণ স্টক বিজনেসের জন্য পণ্যটি শরীআত স্বীকৃত সম্পদ হতে হবে। আর ডিজিটাল মুদ্রা শরীআত স্বীকৃত সম্পদ নয়। কারণ শরীআত স্বীকৃত সম্পদ হওয়ার জন্য অন্তত তিনটি শর্তে উত্তীর্ণ হতে হয়- ১. ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে এমন সম্পদ হতে হবে, যার মূল্য নির্ধারণ করা যায়। ২. মালিকানা বৈধ উপায়ে হস্তান্তর করা যায়। ৩. منفعة مباحة অর্থাৎ তার দ্বারা বৈধভাবে উপকৃত হওয়া যায় (ছহীহ ফিকহুস সুন্নাহ, ৪/২৫১)। এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একত্রে বিদ্যমান থাকে না ডিজিটাল মুদ্রার মধ্যে। তাই এটা সম্পদ নয়। আবার বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বাইনান্সের সরাসরি আইনি বৈধতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্রিপ্টো লেনদেনের বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বা ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা তোলা ঝুঁকিপূর্ণ ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অতএব, বাইনান্সে স্পট ট্রেডসহ যাবতীয় লেনদেন জায়েয নয়।
প্রশ্ন (২২): আমার নাম মো. আলমগীর হোসেন। ইতিছাম ফাতওয়া বোর্ড থেকে আমার নাম পরিবর্তন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এনআইডি, মাস্টার্স পর্যন্ত সকল সার্টেফিকেট, ছেলের জন্ম নিবন্ধনসহ অনেক কাগজে পরিবর্তন করা অত্যন্তজটিল। তাই কাগজে পরিবর্তন না করে মৌখিকভাবে ‘হোসাইন বিন আব্দুল আউয়াল’ নাম রাখা যাবে কি? এর জন্য কি পুনরায় আকীকা করতে হবে?
প্রশ্নকারী : মো. আলমগীর হোসেন
চারাবাগ, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা।
উত্তর: কাগজপত্রে নাম পরিবর্তন বিষয়টি অত্যন্ত জটিল হওয়ার কারণে কাগজপত্রে তা ঠিক রেখে শুধু মৌখিক ও সামাজিকভাবে ‘হোসাইন বিন আব্দুল আউয়াল’ নামে পরিচিত হওয়া যায়। আর এর জন্য পুনরায় আকীকা করতে হবে না। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ছাহাবীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার নাম কী?’ তিনি বললেন, হাযন (কঠিন)। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি সাহল (সহজ)’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬১৯০)। আকীকা শিশু জন্মগ্রহণের সপ্তম দিনে করতে হয়। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘প্রত্যেক শিশু তার আকীকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে। তার জন্মের সপ্তম দিনে আকীকা করতে হয়’ (আবূ দাঊদ, হা/২৮৩৮)।
প্রশ্ন (২৩): আমাদেরগ্রামেঈদেরদিনখেলাধুলারআয়োজনকরাহয়এবংগ্রামবাসীরকাছথেকেটাকা তুলেপুরস্কারদেওয়াহয়। এ রকমআয়োজনকরাযাবেকি?
প্রশ্নকারী : মুহাইমিনুল ইসলাম
দিনাজপুর।
উত্তর: বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ উপলক্ষ্যে যেসব খেলাধুলার আয়োজন দেখা যায় তা একাধিক কারণে জায়েয নয়। যেমন- ১. খেলাগুলো শরীআতসম্মত হয় না। ২. উচ্চ আওয়াজে গান বাজানো হয় ও প্রতিবেশীদের কষ্ট দেওয়া হয় (ছহীহ বুখারী, হা/৬০১৬)। ৩. নারী-পুরুষের অবাধ অংশগ্রহণ থাকে (আন-নূর, ২৪/৩০-৩১)। ৪. চাপ সৃষ্টি করে টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে ঈদের দিন বৈধ উপায়ে কাউকে কষ্ট না দিয়ে হালাল খেলাধুলা আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে। টাকা উঠিয়ে যদি হারজিতের পুরস্কার দেওয়া হয়, তাহলে তা জুয়া হবে এবং খেলায় অংশগ্রহণকারীদের টাকা দিয়ে পুরস্কার দেওয়া যাবে না। তৃতীয় পক্ষ বা স্পন্সর নিয়ে পুরস্কার দিলে সমস্যা নেই (আল-মায়েদা, ৫/৯০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৬৯৫)।
প্রশ্ন (২৪): বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আইনজীবী হওয়া কি ইসলামসম্মত? আমার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আইনি হয়রানি থেকে রক্ষা করা। তবে দেশের বিচারব্যবস্থায় ইসলামী শরীআহ চালু নেই, প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এ অবস্থায় আইনজীবী পেশা গ্রহণ করা কি জায়েয?
উত্তর: ইসলামী শরীআতকে পাশ কাটিয়ে মানব রচিত আইন এর উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে আইনজীবী হওয়া মূলত জায়েয নয়, কেননা তা দ্বীনের একটি মৌলিক নীতিকে ধ্বংস করে দেয়। আর তা হলো, আল্লাহ তাআলার চেয়ে উত্তম বিধানদাতা বা বিচারক আর কেউ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহরই’ (ইউসুফ, ১২/৪০)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘অতএব, তাদের জন্য ধ্বংস, তাদের হাত যা লিখেছে তার কারণে এবং তাদের জন্য ধ্বংস, তারা যা উপার্জন করে তার কারণে’ (আল-বাকারা, ২/৭৯)। তবে মানুষের অধিকার আদায়, প্রয়োজন-নির্ভরতা, ক্ষতি ও অনিষ্ট কমানো এবং মুসলিমদের ওপর থেকে যুলম দূর করার ক্ষেত্রে জরুরী প্রয়োজন ও প্রয়োজনীয়তার শারঈ নীতিমালা বিবেচনা করে কিছু শর্তসাপেক্ষে আইনজীবী হওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। শর্তগুলো হলো- ১. সে এসব আইন এবং এসব আইনের প্রণেতাদের থেকে এবং জরুরী প্রয়োজন ছাড়া এসব আইনের অধীনে বিচার গ্রহণ করা থেকে আল্লাহর কাছে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করবে। ২. এমন কোনো মামলায় সে ওকালতি করবে না, যেখানে রায় আল্লাহর বিধানের বিরোধী ও পরিপন্থী হবে, যেমন- ব্যভিচারী, চোর, সূদখোর ইত্যাদির পক্ষে এমনভাবে মামলা পরিচালনা করা যাবে না, যাতে তাদের অন্যায়কে সমর্থন করা হয়। ৩. তার ওকালতির উদ্দেশ্য হতে হবে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, অন্যায় প্রতিহত করা অথবা মাযলুমকে সাহায্য করা। যদি সে দেখতে পায় যে, তার মক্কেলের পক্ষেই সত্য ও ন্যায় রয়েছে, তাহলে সে তার পক্ষে দাঁড়াবে এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করবে। ৪. এসব প্রচলিত আদালতের মাধ্যম ছাড়া অধিকার আদায় বা যুলম প্রতিহত করার অন্য কোনো উপায় না থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, সে অনুযায়ী বিচার করে না, তারা কাফের’ (আল-মায়েদা, ৫/৪৪)।
প্রশ্ন (২৫): আমার বাচ্চার বয়স ৭ বছর। সে প্রচুর মোবাইলে আসক্ত। পড়াশুনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। আগে কুরআন পড়ত, এখন তাও পড়ে না। আমার করণীয় কী? প্রহার করা ঠিক হবে কি?
প্রশ্নকারী : আশিক
ঢাকা।
উত্তর: ৭ বছরের শিশুকে মোবাইলের আসক্তির কারণে প্রহার করা উচিত নয়। ধৈর্য, নিয়মিত তত্ত্বাবধান ও ভালোবাসার মাধ্যমে তার অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করাই উত্তম। বিশেষ করে কুরআন পড়া ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে নিচের পদক্ষেপ গুলো নেওয়া উচিত- ১. মোবাইল বাচ্চার নাগালের (দৃষ্টির) বাইরে রাখুন। ২. মোবাইলের বিকল্প দিন; খেলাধুলা, গল্পের বই, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করুন। ৩. কুরআনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করুন। চাপ না দিয়ে প্রতিদিন ৫–১০ মিনিট দিয়ে শুরু করুন এবং অল্প পড়লেও প্রশংসা করুন। বাবা-মা নিজেরাও সামনে কুরআন পড়ুন। ৪. কুরআনকে মোবাইলের পুরস্কারে পরিণত করবেন না। ‘কুরআন পড়লে মোবাইল দেব’—এভাবে না বলে কুরআনের প্রতি আলাদা ভালোবাসা ও আনন্দ তৈরি করুন। ৫. ঘুমের আগে মোবাইল বন্ধ রাখুন। সম্ভব হলে মোবাইল/ট্যাব শোবার ঘরের বাইরে রাখুন।
প্রশ্ন (২৬): কোনোব্যক্তিআমারঅনেকক্ষতিকরলেএবংকষ্টদিলেতারমৃত্যু, দুর্ঘটনাবাঅন্যকোনোক্ষতিরজন্যবদদু‘আকরাকিজায়েয? ইসলামেরদৃষ্টিতেএক্ষেত্রেসঠিককরণীয়কী?
উত্তর: কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কষ্ট পেলে তার বিরুদ্ধে লা‘নত করা বা বদদু‘আ করা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ নয় এবং প্রকৃত মুমিন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যও নয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি লা‘নতকারী বা বদদু‘আকারী হতে পারে না’ (তিরমিযী, হা/১৯৭৭)। অপর হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয় আমি প্রেরিত হইনি লা‘নতকারী হিসেবে; বরং আমি প্রেরিত হয়েছি রহমত হিসেবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯৯)। কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কষ্ট পেলে করণীয় হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং ক্ষমা করে দেওয়া। কারণ আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন (আল-বাকারা, ২/১৫৩)। আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, إنما يوفى الصابرون أجرهم بغير حساب ‘নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে অগণিত ছওয়াব প্রদান করা হবে’ (আয-যুমার, ৩৯/১০)।
প্রশ্ন (২৭): অমুসলিমরাকিমসজিদেপ্রবেশকরতেপারবে? যদিএটাজায়েযহয়,তাহলেঅমুসলিমরাহারামাইনেকেনপ্রবেশকরতেপারবেনা? আরঅমুসলিমরাকিকুরআনস্পর্শকরতেপারবে?
প্রশ্নকারী : আব্দুল হাই
উত্তরা, ঢাকা।
উত্তর: পৃথিবীর সব মসজিদে অমুসলিমরা প্রবেশ করতে পারলেও হারামাইনে প্রবেশ করতে পারবে না। কেননা হারামাইনের বিষয়টি স্বতন্ত্র। দাজ্জালের বিষয়টিও স্বতন্ত্র। সেও হারামাইনে প্রবেশ করতে পারবে না (ছহীহ বুখারী, হা/১৮৮১)। আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَٰذَا ‘হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মুশরিকরা অপবিত্র। সুতরাং তারা যেন এই বছরের পর থেকে মাসজিদে হারামের নিকটেও না আসে’ (আত-তাওবা, ৯/২৮)। উল্লেখ্য, হারামাইন (দুই হারাম) বলতে হারামে মাক্কী এবং হারামে মাদানীকে বুঝানো হয়। মক্কার মসজিদে হারামসহ তার পার্শ্ববর্তী নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে হারামে মাক্কীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর মদীনার মসজিদে নববীসহ তার পার্শ্ববর্তী নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে হারামে মাদানীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় (ছহীহ বুখারী, হা/৩০৫৩; ফাতহুল বারী, ৬/১৭১)। তবে অমুসলিম ব্যক্তি বিশেষ প্রয়োজনে অনুমতি নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে অবস্থানকালীন তাঁর নিকট ওয়াফদে নাজরান, ওয়াফদে ছাক্বীফ ইত্যাদি বিধর্মী প্রতিনিধি দল ও ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়েছে, এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। অনুরূপভাবে সুমামা ইবনু উছাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) মসজিদের খুটিতে বেঁধে রাখা হয়েছিল (ছহীহ বুখারী, হা/৪৬২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৬৪)। অমুসলিম ব্যক্তি কুরআনুল কারীম স্পর্শ করতে পারবে না (ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৬৯; আল মাজমূ‘, ইমাম নববী, ২/৭১)। তবে সে সত্য জানার জন্য কুরআনুল কারীমের অনুবাদ ও তাফসীরগ্রন্থ স্পর্শ এবং অধ্যয়ন করতে পারবে।
প্রশ্ন (২৮): আপেল শক্ত, বেদানার রক্ত, মিষ্টির ঝোল, গপাগপ তোল। চিড়িয়াখানার মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে, ছেলেদের দেখলে ডানচোখ মারে। ও ভাবি পিঠা কুড়াতে যাবি, পিঠা নিল চোরে, বর আসল ঘরে, বরের নাম জাব্বার, আল্লাহু আকবার। এলাকার শিশুরা এই ছন্দ বলে খেলাধুলা করে। এটা কি জায়েয?
উত্তর: উক্ত ছন্দ বলে খেলাধুলা করা হারাম। কারণ এতে শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি সমস্যা রয়েছে- ১. আল্লাহর নাম নিয়ে উপহাস। জাব্বার আল্লাহর একটি নাম। আল্লাহর নাম নিয়ে উপহাস করলে ঈমান ভঙ্গ হয়ে যায়। ২. ‘আল্লাহু আকবার’ তাকবীর নিয়ে উপহাস। তাকবীর বলার বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে। যেখানে সেখানে তাকবীর বলা যায় না। আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ সম্মান ও গাম্ভীর্য বজায় রেখে তাকবীর পাঠ করতে হয়। অতএব, এটাকে খেলাধুলার ছন্দে অন্তর্ভুক্ত করা জায়েয নয়। ৩. মেয়েদের হাফপ্যান্ট পরা। এটা ইসলামের পর্দা ও হিজাব সংশ্লিষ্ট বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। ৪. মেয়েদের ডানচোখ মারা। এটা মূলত নারীদের শালীনতা ও লাজলজ্জা বিরোধী বাক্য। এরকম অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বাক্য ব্যবহার করা কখনোই জায়েয হতে পারে না। ৫. দেবর-ভাবি সম্পর্ককে রসালোভাবে উপস্থাপন করা। এতে পর্দার বিধানকে উপেক্ষা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, শিশুদের খেলাধুলার প্রয়োজন আছে বলে এসব অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ছন্দ তাদের শূন্য মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়া ইসলামবিরোধী ব্যক্তিদের চক্রান্ত। এসব যেকোনোভাবে প্রতিহত করতে হবে। সুতরাং শিশুদের জন্য শরীআতসম্মত, শালীন, রুচিসম্মত ও শিক্ষামূলক ছন্দ রচনা করে তাদেরকে মুখস্থ করাতে হবে।
হালাল-হারাম
প্রশ্ন (২৯): আমিএকটিগার্মেন্টসইন্ডাস্ট্রিতেফ্যাশনডিজাইনারহিসেবেকাজকরি। কাজেরঅংশহিসেবেবিভিন্নধরনেরপোশাক, কখনোশালীনতারপরিপন্থীপোশাকওডিজাইনকরতেহয়এবংথ্রিডিতেমানুষেরঅবয়বে (Dummy) কাপড়গুলোপরিয়েচেককরি। এধরনেরকাজেরমাধ্যমেঅর্জিতবেতনশরীআতেরদৃষ্টিতেহালালহবেকি?
প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ আনাম
সাভার, ঢাকা।
উত্তর: গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করা থেকে বেঁচে থাকা ভালো। কেননা ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে অশালীন ডিজাইন, অঙ্গ বুঝা যায় এমন পাতলা বা টাইট পোশাক ডিজাইন করা এবং শরীআতবিরোধী কাজে যুক্ত হতে হয়। এর মাধ্যমে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হয়, যা থেকে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ولا تعاونوا على الإثم والعدوان ‘আর তোমরা গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।
প্রশ্ন (৩০): কসাইখানার ব্যবসা করা যাবে কি? আর ব্যবসা হালাল হওয়ার জন্য কী কী শর্ত মানতে হবে?
প্রশ্নকারী : মো. রুহুল আমিন
শিবগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।
উত্তর: কসাইখানার ব্যবসা (পশু ক্রয় করে জবাই করার পর তার গোশত বিক্রি করা) মৌলিকভাবে জায়েয। তবে এক্ষেত্রে কিছু শর্তাবলি রয়েছে-
১. পশু হালাল হতে হবে। যেমন- উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি (আল-মায়েদা, ৫/১)।
২. আল্লাহর নামে (বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে) জবাই করতে হবে (আল-আনআম, ৬/১২১)।
৩. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতী পদ্ধতিতে পশু যবেহ করতে হবে। যেমন- ছুরি ধার দিয়ে নেওয়া, যবেহের পর ছুরি দিয়ে শ্বাসনালি, কণ্ঠনালিতে আঘাত না করা, পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া ছড়ানো বা পা কাটা যাবে না (তিরমিযী, হা/১৪০৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩১৭০)।
৪. মৃত পশুর (জবাই ব্যতীত অন্য কোনোভাবে মারা যাওয়া পশু) গোশত বিক্রি করা যাবে না (আল-মায়েদা, ৫/৩)।
৫. যেসব পশুকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা হয়েছে, সেসব পশুকে জবাই করে তার গোশত বিক্রি করা যাবে না, কারণ এগুলোর গোশত খাওয়া হালাল নয় (আল-মায়েদা, ৫/৩)।
৬. ব্যবসার সাধারণ শর্ত পালন করতে হবে। যেমন- ওযনে কম না দেওয়া, মিথ্যা না বলা বা মিথ্যা কসম না করা ইত্যাদি।
প্রশ্ন (৩১): আমি সেনাবাহিনীতে চাকরি করি। সামনে আসছে ঈদে মীলাদুন্নবী। সেই দিন সরকারি ছুটি। সেই দিনে বড় খানার আয়োজন করা হয়৷ প্রশ্ন হলো, সেই খাবার কি আমার জন্য হালাল?
উত্তর: ইসলামে বাৎসরিক ঈদ মাত্র দুইটি তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। ঈদ হলো ইবাদত। সুতরাং ঈদে মীলাদুন্নাবী নামে নতুন ঈদ আবিষ্কার করা মানে নতুন ইবাদত আবিষ্কার করা, যা নিকৃষ্ট বিদআত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ ؛ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ". ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকো; কারণ (দ্বীনের মধ্যে) প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বিষয় হলো বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআত হলো ভ্রষ্টতা’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭)। অন্য হাদীছে এসেছে, وَكُلُّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ ‘আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; নাসাঈ, হা/১৫৭৮)। অপর হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করবে (বিদআত চালু করবে), তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ এবং সকল মানুষের অভিসম্পাত’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৮৬৭)।
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وَمَنْ أَحْدَثَ حَدَثًا أَوْ آوَى مُحْدِثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ ‘যে বিদআত করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা, মানুষ এবং সকলের লা‘নত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোনো ফরয আমল এবং কোনো নফল কবুল করবেন না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৫৫)। সুতরাং ঈদে মীলাদুন্নাবীর নামে প্রচলিত এই নিকৃষ্ট বিদআত সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সকল অনুষ্ঠান ও খাবার বর্জন করতে হবে। কারণ এমন খাবারে বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা মানে উক্ত বিদআতকে সমর্থন করা, যা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। বরং এসব আয়োজন প্রত্যাখ্যান করার ফায়েদা আছে, তা হলো, মানুষ এই বিদআত সম্পর্কে জানবে এবং আগামীতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে।
পারিবারিক বিষয়
প্রশ্ন (৩২): আমার বিয়ে পারিবারিকভাবে ২ বছর আগে মসজিদে হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, মসজিদে অনেক লোক উপস্থিত ছিল; তবে আলাদা করে কোনো সাক্ষী নির্ধারণ করা হয়নি। এ অবস্থায় আমার বিয়ে শরীআত অনুযায়ী ছহীহ ও সম্পূর্ণ হয়েছে কি-না?
প্রশ্নকারী : মাহাবুব
দিনাজপুর।
উত্তর: বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য দুজন মুসলিম সাক্ষী লাগবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অভিভাবক ও দুজন ন্যায়পরায়ণ (আদল) সাক্ষী ছাড়া বিবাহ নেই’ (ছহীহুল জামে’, হা/৭৫৫৭)। তবে যেহেতু উক্ত বিবাহের সময় অনেক লোক উপস্থিত ছিল, সুতরাং বিবাহ ছহীহ হয়েছে।
প্রশ্ন (৩৩): কোনো বিধবা মহিলা কি তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করতে পারবে?
প্রশ্নকারী : কামরুল
পাবনা।
উত্তর: কুমারী হোক কিংবা বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা হোক কোনো নারীর জন্য পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা বৈধ নয়। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যেকোনো নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করবে, তার বিবাহ বাতিল! তার বিবাহ বাতিল! তার বিবাহ বাতিল!’ (তিরমিযী, হা/১১০২; মিশকাত, হা/৩১৩১)।
প্রশ্ন (৩৪): অনেকইমাম, মুহাদ্দিছদেরব্যাপারেশুনেছিতারাবিবাহকরেননি। কোনোকারণবশতআমিওযদিএমনথাকতেচাই,তাহলেইসলামেকোনোনিষেধাজ্ঞাআছেকি?
প্রশ্নকারী : হানযালা
লালমনিরহাট।
উত্তর: ক. বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ। একজন মুসলিমের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করা। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনজন ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ইবাদতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ তাঁর আগের ও পরের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য হতে একজন বলল, আমি আজীবন রাতভর ছালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সবসময় ছিয়াম পালন করব এবং কখনো বাদ দেব না। অন্য একজন বলল, আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ‘তোমরা কি ওই সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশি অনুগত; অথচ আমি ছিয়াম পালন করি, আবার কখনো তা থেকে বিরতও থাকি। আমি (রাতে) ছালাত আদায় করি এবং ঘুমাই। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং যারা আমার আদর্শকে উপেক্ষা করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩)।
এছাড়াও বিবাহের দ্বীনী এবং দুনিয়াবী উপকারিতা রয়েছে।
প্রথমত, দ্বীনী উপকারিতা- ১. তাওহীদপন্থী জনবল বৃদ্ধি করা। সারা পৃথিবীতে তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছানো এবং আল্লাহর কালিমা সুউচ্চ করার লক্ষ্যে তাওহীদপন্থী জনবল বৃদ্ধি করা অতীব প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে বিবাহই একমাত্র মাধ্যম। এজন্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেমময় ও অধিক পরিমাণ সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীকে বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তিনি এই উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মতের সামনে গর্ব করতে পারেন (আবূ দাঊদ, হা/২০৫০)।
২. দৃষ্টি হেফাযত করা (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৫)।
৩. লজ্জাস্থান হেফাযত করা (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৫)।
৪. হালাল পন্থায় যৌন চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে বিশেষ ছওয়াব অর্জন (ছহীহ মুসলিম, হা/১০০৬)।
দ্বিতীয়ত, দুনিয়াবী উপকারিতা-
১. মানসিক প্রশান্তি লাভ (আর-রূম, ৩০/২১)।
২. অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জন (আন-নূর, ২৪/৩২)।
৩. নারীর জন্য উত্তম অভিভাবক নির্ধারণ (আন-নিসা, ৪/৩৪)।
৪. পুরুষের জন্য বাড়ি ও বাড়ির সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা (আন-নিসা, ৪/৩৪)।
৫. পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের স্বাদ আস্বাদন।
৬. বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
৭. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সন্তানদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করা।
খ. যেসকল ইমাম ও মুহাদ্দিছগণ বিয়ে করেননি, তাদের কেউ অন্যদেরকে বিয়ে করতে অনুৎসাহিত করেননি। বরং বিবাহ যে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ এ ব্যাপারে তাদের স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। সুতরাং তাদের এই বক্তব্য অনুসরণীয়; তাদের কর্ম অনুসরণীয় নয়। কেননা তাদের বিয়ে না করার মূল কারণ সম্পর্কে আমরা অবগত নই। কিন্তু বর্তমানে বিবাহ ছাড়া ফিতনামুক্ত থাকার নিশ্চয়তা নেই; বরং ফিতনাগ্রস্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিবাহ করা আবশ্যক।
প্রশ্ন (৩৫): আমাদের আগে দুইটা তালাক হয়ে গেছে। এর মধ্যে একদিন স্বামী রেগে বললেন, ‘বাপের বাড়ি গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে। আমার অনুমতি ছাড়া গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে’। স্বামীর মনে তালাকের নিয়্যত ছিল কি-না সে নিশ্চিত নয়। এখন বাপের বাড়ি গেলে তালাক পতিত হবে কি?
প্রশ্নকারী : নুর জাহান
ঢাকা।
উত্তর: তালাকের জন্য ‘তালাক’ শব্দ ব্যবহার করেই তালাক দিতে হবে। অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করে তালাক দিলে তালাক পতিত হবে না (আত-তালাক, ৬৫/১)। সুতরাং স্বামীর স্ত্রীকে বলা ‘বাপের বাড়ি গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে’ এবং স্ত্রীর পরবর্তীতে বাবার বাড়ি যাওয়ার মাধ্যমে তালাক পতিত হবে না।
প্রশ্ন (৩৬): আমার স্ত্রী বিয়ের ২ মাসের মাথায় আমার অনুমতি ছাড়াই বাপের বাড়ি চলে যায়। পরে আমি তাকে আনতে গেলে সে ফিরে আসে না। তার শর্ত হলো যদি সংসার করতে হয়, তাহলে তার বাপের বাড়িতে গিয়ে করতে হবে; অন্যথায় ডিভোর্স দিতে বলে। এখন আমি কি করব? আমার কাছে দেনমোহরের টাকাও নেই।
উত্তর: স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাবার বাড়িতে যাওয়া স্ত্রীর জন্য জায়েয নয়। আবার সংসার করার জন্য স্বামীকে ঘরজামাই হওয়ার শর্তারোপ করা অন্যায় ও শরীআত বিরোধী শর্ত। এমন শর্ত বাতিল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, من اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَهُوَ بَاطِلٌ، وَإِنِ اشْتَرَطَ مِائَةَ شَرْط ‘যে ব্যক্তি এমন শর্ত করবে যা কুরআনুল কারীমে নেই (শরীআত বিরোধী শর্ত), তাহলে তা বাতিল; যদিও সে একশটি শর্ত করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২১৫৫)। সাধারণত এমন অন্যায় শর্ত করার পেছনে মূল কারণ থাকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া। সুতরাং করণীয় হলো উভয়পক্ষ থেকে নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ মুরব্বী নির্ধারণ করে সমঝোতা করার চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا ‘তাদের উভয়ের (স্বামী-স্ত্রী) মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার হতে একজন ও তার (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন শালিশ নিযুক্ত করবে; তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত (আন-নিসা, ৪/৩৫)। আর যদি এতেও সমাধান না হয়, তাহলে স্ত্রীকে শাসন করার উদ্দেশ্যে স্বামী তালাক প্রদান করতে পারে।
মীরাছ
প্রশ্ন (৩৭): আমিজানিযেআমারবাবারহারামউপার্জনআছে। কিন্তুসেব্যাপারেআমারকথাবলারসুযোগনেই। এমতাবস্থায়তারমৃত্যুরপরসেইসম্পদকিআমিগ্রহণকরতেপারব? এতেকিআমারপাপহবে?
প্রশ্নকারী : শাকিল শুভ
বগুড়া।
উত্তর: এসময় সম্পদ যদি কারো থেকে আত্মসাৎ করা না হয় বা জোর করে দখল করা না হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ দান করে দিবে। আর বাকি অংশ ভোগ করতে পারে। তবে এর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অসুস্থতায় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলে তিনি বলেন, একটি মাত্র কন্যা ব্যতীত আমার কোনো ওয়ারিছ নেই। এখন আমি আমার সম্পদের দু-তৃতীয়াংশ ছাদাকা করতে পারি কি? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, ‘না’। আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেন, ‘না’। আমি বললাম, এক-তৃতীয়াংশ। তিনি বললেন, ‘এটাও অনেক বেশি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৬৮)।
নারী বিষয়ক
প্রশ্ন (৩৮): মহিলাদের ক্ষেত্রে বাড়ির বাইরে চোখে সুরমা দেওয়ার মাসআলা কী? ঘরেও যদি সুরমা দেয় এবং বাইরে যাওয়ার আগে মুখ ধুয়ে নেয়, তবে চোখে সুরমা কিছুটা লেগে থাকে, তাহলে বাইরে গেলে কি গুনাহ হতে পারে?
উত্তর: ইসমিদ সুরমা ব্যবহার করলে দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার হয় এবং চোখের পাপড়ি গজায় (আবূ দাঊদ, হা/৩৮৭৮)। যার মাধ্যমে নারীদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, যা (সৌন্দর্য) আল্লাহ তাআলা গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন (আন-নূর, ২৪/৩১)। অতএব, নারীদের জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় চোখে সুরমা ব্যবহার করে গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে তা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে ঘরে সুরমা ব্যবহার করার পর বাইরে যাওয়ার পূর্বে তা মুছবে/ধৌত করবে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে সামান্য চিহ্ন থেকে যায়, যা স্পষ্ট সাজসজ্জা হিসেবে প্রতীয়মান হয় না, তাহলে গুনাহ হবে না।
প্রশ্ন (৩৯): এক শায়খ বলেছেন, বিউটি পার্লারের সব জিনিস দিয়ে কনেকে সাজানো যাবে, কিন্তু পার্লারে গিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, পার্লারে গেলে সমস্যা কি? ইসলামে কি নারীরা নারীদের সাজাতে পারে না?
প্রশ্নকারী : জোহরা তাবাসসুম
রাজশাহী।
উত্তর: বিউটি পার্লারে মহিলাদের যেভাবে সাজানো হয় একজন মহিলা অন্য আম তথা সাধারণ মহিলার মাধ্যমে সেভাবে সাজতে পারবে না। এজন্য মার্কেটে অবস্থিত বিউটি পার্লারে সাজগোজ করা যাবে না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কোনো নারী অপর নারীর শরীর স্পর্শ করে স্বামীর সামনে যেন তা বর্ণনা না করে। কারণ হতে পারে স্বামী উক্ত নারীকে অন্তরের চোখ দিয়ে দেখতে থাকবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৪০; মিশকাত, হা/৩০৯৯)। বরং কনেকে বাড়িতে ঘরোয়া পরিবেশে বোন, দাদি, নানি, মামি বা খালারা সাজাবে এবং সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত সমস্ত প্রসাধনী সামগ্রী অবশ্যই হালাল হতে হবে।
প্রশ্ন (৪০): আমার এক বোন ফ্রান্সে থাকেন। ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী কেউ পাবলিক স্থানে যদি নিকাব পরিধান করে, তাহলে জরিমানা করে। এমতাবস্থায় তার করণীয় কী?
প্রশ্নকারী : ইশতিয়াক তানযিম
সিলেট।
উত্তর: নারীর জন্য পরপুরুষের সামনে নিকাব ইত্যাদি দ্বারা মুখমণ্ডল আবৃত করে পর্দা করা ফরয (আল-আহযাব, ৩৩/৫৯)। প্রথমত, একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত এমন জায়গায় বসবাস করা উচিত নয়, যেখানে ইসলাম মেনে চললে জরিমানা প্রদান করতে হয়। দ্বিতীয়ত, যদি প্রয়োজনে এমন জায়গায় বসবাস করতেই হয়, তাহলে জরিমানা প্রদান করে হলেও পর্দার বিধান পালন করা আবশ্যক (তিরমিযী, হা/১১৭৩)। এক্ষেত্রে ইসলামের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় নেই।
কুরআন-হাদীছের ব্যাখ্যা
প্রশ্ন (৪১): উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বিচারের সময় একজন মুসলিমকে হত্যা করে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন। এই ঘটনা ওয়াজ মাহফিলে বলা হয়ে থাকে। এই ঘটনা কি ঠিক?
উত্তর: উক্ত ঘটনা সঠিক নয়। মূল ঘটনাটি নিম্নে দেওয়া হলো- আবূল আসওয়াদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিবাদ নিয়ে এলে তিনি তাদের মধ্যে বিচার করলেন। কিন্তু যার বিরুদ্ধে বিচার হলো, সে বলল, আমাদেরকে উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে নিয়ে চলুন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা উভয়ে তার কাছে যাও’। তারা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গিয়ে ঘটনা জানালে তিনি বললেন, সত্যিই কি এমন হয়েছে? সে বলল, হ্যাঁ। তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের অপেক্ষা করতে বলে তরবারি নিয়ে বের হয়ে সেই ব্যক্তিকে হত্যা করলেন, যে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল। অপর ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে এসে ঘটনা জানালে তিনি বললেন, ‘আমি মনে করিনি যে উমার কোনো মুমিনকে হত্যা করার মতো দুঃসাহস করবেন’। অতঃপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ. ‘তোমার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের বিবাদে তোমাকে বিচারক মেনে নেয়...’ (আন-নিসা, ৪/৬৫)।
প্রশ্ন (৪২): উহুদযুদ্ধেমুসলিমদেরপরাজয়েরকারণকীছিল? ধন-সম্পদেরলোভকিকারণগুলোরমাঝেছিল?
প্রশ্নকারী : সাকিব
সোনাগাজী, ফেনী।
উত্তর: ক. উহুদ যুদ্ধের প্রারম্ভে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মুসলিমদের বিজয় দান করেছিলেন। কিন্তু কিছু তিরন্দাজদের নির্দেশনা অমান্য এবং গনীমত অর্জনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করার কারণে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মুসলিমদের পক্ষে আসেনি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم بِإِذْنِهِ حَتَّىٰ إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُم مِّن بَعْدِ مَا أَرَاكُم مَّا تُحِبُّونَ وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ ‘আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন যখন তোমরা আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদেরকে বিনাশ করছিলে, যে পর্যন্ত না তোমরা সাহস হারালে এবং নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে মতভেদ সৃষ্টি করলে আর যা তোমরা ভালোবাস তা তোমাদের দেখানোর পর তোমরা অবাধ্য হলে। তোমাদের কতক ইহকাল চাচ্ছিল আর কতক পরকাল চাচ্ছিল। এরপর তিনি পরীক্ষা করার জন্যে তোমাদেরকে তাদের হতে ফিরিয়ে দিলেন। অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল’ (আলে ইমরান, ৩/১৫২)। খ. উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমরা ছাহাবী ছিলেন। তাদের ক্ষেত্রে ‘সম্পদের লোভ’ শব্দটি বেমানান। কিছু তিরন্দাজ ছাহাবীদের ভুল ছিল এই যে, তারা ভেবেছিলেন বিজয় অর্জন হয়েই গেছে; মুশরিকরা আর যুদ্ধে এগোতে পারবে না। তাই আনন্দে গনীমতের প্রতি মনোযোগ দিয়েছিলেন। অথচ নির্দেশনা ছিল, إِنْ رَأَيْتُمُونَا ظَهَرْنَا عَلَيْهِمْ فَلَا تَبْرَحُوا ‘যদি তোমরা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় প্রত্যক্ষ কর, তবুও তোমরা নিজ স্থান থেকে সরবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪০৪৩)। এই নির্দেশনা অমান্য করার ফলে যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মুসলিমদের পক্ষে আসেনি। কিন্তু তাদের এই ভুলকে মহান আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়ে বলেছেন, ولقد عفا عنكم ‘আর তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন’ (আলে ইমরান, ৩/১৫২)।
প্রশ্ন (৪৩): একজন মুমিনের ঘুমানো, খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যএগুলো কি ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়? যদি হয় তাহলে কীভাবে নিয়্যত করলে ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে?
প্রশ্নকারী : কাওছার আহমেদ
টাউনহল, ময়মনসিংহ।
উত্তর: আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন (আয-যারিয়াত, ৫১/৫৬)। ইবাদত বলা হয়, আল্লাহ তাআলার যাবতীয় নির্দেশ পালন করা এবং যাবতীয় নিষেধ মান্য করা। আল্লাহ তাআলা হালাল উপার্জনের নির্দেশ প্রদান করেছেন (আল-জুমুআহ, ৬২/১০)। তাই আল্লাহর এই নির্দেশ পালনের নিয়্যতে ব্যবসা করা বা চাকরি লাভের উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। খাওয়াদাওয়া ও ঘুমের ক্ষেত্রে এই নিয়্যত করতে হবে যে, এর মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা অর্জন হবে, যা সুন্দরভাবে ইবাদত পালনে সহায়তা করবে। মুআয বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, أحتسب نومتي كما أحتسب قومتي ‘আমি ঘুমের ক্ষেত্রেও ছওয়াব প্রত্যাশা করি যেমনিভাবে রাতের ছালাতের ক্ষেত্রে ছওয়াব প্রত্যাশা করি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৪১)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি এশার ছালাত জামাআতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধরাত দাঁড়িয়ে (ক্বিয়ামুল লায়ল বা তাহাজ্জুদ) ছালাত আদায় করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত জামাআতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারারাত দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করল’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৬)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক। অবশ্যই তার সকল বিষয় তার জন্য কল্যাণময়। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারো জন্য হতে পারে না। যদি তার কোনো আনন্দ আসে, তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণময়। আর যদি তার উপরে কোনো দুঃখজনক কিছু আপতিত হয়, তাহলে সে ছবর করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৯৯)।
প্রশ্ন (৪৪): মিশরেরপিরামিডেসংরক্ষিতযেফেরাউনেরমমি (লাশ) রাখাহয়েছে, সেটিকিকুরআনেবর্ণিতমূসা আলাইহিস সালাম-এরঘটনারসাথেসম্পর্কিতফেরাউনেরলাশ?
প্রশ্নকারী : ইয়াসিন মিয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া (সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী)।
উত্তর: মিশরের পিরামিডে সংরক্ষিত যেই লাশকে কুরআনুল কারীমে বর্ণিত ফেরাউনের লাশ বলে প্রচার করা হয় সেটা আসলে নিশ্চিতভাবে তার লাশ বলা যায় না। বরং এই প্রচারিত লাশটি উন্মোচিত হয় ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে (আন্তর্জাতিক আরবী বিশ্বকোষ, ১৩/৩৫০)। এর আগে লাশটি কোথায় ছিল? প্রাচীন ইতিহাস বা তাফসীরগ্রন্থে এর আলোচনা নেই কেন? এমন অনেক প্রশ্ন রয়েছে যেগুলোর সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। বরং প্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরে কুরতুবীতে এর বিপরীত বক্তব্য পাওয়া যায়। তা হলো, সূরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতে ফেরাউনের শরীরকে না ডুবিয়ে মানুষদের জন্য শিক্ষার উপকরণ বানানোর যে কথা উল্লিখিত হয়েছে, এর ব্যাখ্যা হলো বনী ইসরাঈলের কিছু লোক বিশ্বাস করত, ফেরাউনের কখনো মৃত্যু হবে না। তাদের এই বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করতে মহান আল্লাহ তাআলা এই কথা বলেন। তিনি সমুদ্রের এক পাশে অবস্থিত উঁচু স্থানে তার লাশ নিক্ষেপ করেন। এরপর বনী ইসরাঈলের লোকেরা দেখে, ফেরাউনের সত্যিই মৃত্যু হয়েছে। তাদের বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করা হয়। এরপর তার লাশকে আল্লাহ তাআলা সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন (তাফসীরে কুরতুবী, ৮/৩৮০)।
প্রশ্ন (৪৫): তারাসবাইসমাননয়। আহলেকিতাবদেরমধ্যেকিছুলোকএমনওআছেযারাঅবিচলভাবেআল্লাহরআয়াতসমূহপাঠকরেএবংরাতেরগভীরেতারাসিজদাকরে (আলেইমরান, ৩/১১৩)। এইআয়াতেরসংক্ষিপ্তব্যাখ্যাজানতেচাই।
প্রশ্নকারী : মো. ফয়েজউল্লাহ
২৪/২৮, মিরপুর ১২, ঢাকা ১২১৬।
উত্তর: উক্ত আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো, এই আয়াতে আহলে কিতাবদের সেসব আলেমদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। যেমন- আব্দুল্লাহ বিন সালাম, আসাদ বিন উবাইদ, ছা‘লাবা বিন সা‘ইয়াহ প্রমুখ। তারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও আল্লাহর ইবাদত যথাযথভাবে পালন করতেন এবং ইসলাম গ্রহণের পরেও তা অব্যাহত রেখেছেন। অতএব, এসকল আহলে কিতাবদের সমপর্যায়ের হতে পারবে না সেসব আহলে কিতাব, যাদের ব্যাপারে কুরআনুল কারীমের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিন্দা করেছেন (তাফসীরে ইবনু কাছীর, ২/৯১)।
প্রশ্ন (৪৬): মাসিক আল-ইতিছামের এক ফাতওয়ায় লাল রঙের পোশাক পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু হাদীছে এসেছে, আমি তাঁকে লাল পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৫১)। এটা কি বিপরীত হয়ে গেল না?
প্রশ্নকারী : ফয়সাল
বাসাইল, টাঙ্গাইল।
উত্তর: মাসিক আল-ইতিছামের ফাতওয়া এবং প্রশ্নে বর্ণিত হাদীছের মাঝে বৈপরীত্য নেই। পুরুষের জন্য নিরেট ও অমিশ্রিত লাল রঙের পোশাক পরিধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমাকে লাল রঙের পোশাক পরিধান করতে নিষেধ করা হয়েছে (নাসাঈ, হা/৫২৬৬)। বারা বিন আযিব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে (পুরুষদেরকে) লাল রঙের গদি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৬৩)। প্রশ্নে বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যা হলো, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই লাল রঙের পোশাক পরিধান করেছিলেন তা ছিল লাল ও কালো সুতা দ্বারা তৈরি এক ধরনের ইয়ামানী পোশাক। এটা নিরেট ও অমিশ্রিত লাল রঙের পোশাক ছিল না (যাদুল মাআদ, ইবনুল কাইয়িম, ১/১৩২-১৩৪)।
বিবিধ
প্রশ্ন (৪৭): ইসলামে বিষণ্নতা, হতাশা ও মানসিক অশান্তি বা রোগ নিয়ে কী বলে? এগুলো কি শাস্তিস্বরূপ নাকি পরীক্ষা? এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বি
বরিশাল।
উত্তর: ইসলামে বিষণ্নতা, হতাশা, দুঃখ, উদ্বেগ ও মানসিক অশান্তি ইত্যাদি কখনো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পরীক্ষা, কখনো গুনাহ মাফের মাধ্যম, কখনো সতর্কবার্তা, আবার কারও ক্ষেত্রে নিজের গুনাহ ও ভুলের ফলও হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন’ (আল-বাকারা, ২/১৫৫)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদই আসে, তা তোমাদের হাতের কামাইয়ের কারণেই; আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন’ (আশ-শূরা, ৪২/৩০)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা বেদনা, এমনকি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৭৩)। বিষণ্নতা ও মানসিক অশান্তি থেকে পরিত্রাণের উপায়- ১. নিম্নোক্ত দু‘আ পড়া: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাই; অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই; ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে আশ্রয় চাই এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রাধান্য থেকে আশ্রয় চাই’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৮৯৩)। ২. ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা (আল-বাকারা, ২/৪৫)।
প্রশ্ন (৪৮): গুনাহে জারিয়া বা চলমান গুনাহের পথ বন্ধ করতে না পারলে করণীয় কী? যেমন- এমন কোনো ওয়েবসাইট যেখানে লাইক, কমেন্ট করলে ডিলিট করা যায় না, কিংবা ডিলেট করার পদ্ধতি জানা নেই?
উত্তর: কেউ কোনো হারাম পোস্টে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করার পর অনুতপ্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে উক্ত গুনাহ থেকে বিরত হওয়া এবং আন্তরিকভাবে তওবা করা আবশ্যক। সম্ভব হলে করা লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার মুছে ফেলতে হবে। আর তা মুছে ফেলা সম্ভব না হলে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের গুনাহে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো’ (আত-তাগাবুন, ৬৪/১৬)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘গুনাহ থেকে তওবাকারী এমন, যেন সে কোনো গুনাহই করেনি’ (ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫০)। অতএব, গুনাহের বিষয়টি অপসারণের সাধ্য থাকলে তা অপসারণ করবে; সাধ্যের বাইরে হলে আন্তরিক তওবা করবে এবং পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করবে। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো বিষয়ে দায়ী করেন না।
প্রশ্ন (৪৯): আমার প্রতিবেশী একজন হিন্দু লোক আছে, তিনি আমার সাথে খুবই আন্তরিক। আমি মনে মনে আকাঙ্ক্ষা রাখি যদি উনি ইসলাম গ্রহণ করতেন। প্রশ্ন হলো, ইসলাম মেনে কীভাবে তাকে দাওয়াত দিতে পারি?
প্রশ্নকারী : জোবায়ের আহমেদ
পিরিজপুর, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ।
উত্তর: একজন মুশরিককে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে তাকে বুঝাতে হবে যে, মূর্তিপূজা শিরক। আর শিরকের ফলাফল জাহান্নাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক না করে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে মারা যাবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩)। এছাড়া দাওয়াতের ক্ষেত্রে কুরআনী পদ্ধতি অবলম্বন করা অধিক ফলপ্রসূ। কুরআনী পদ্ধতি হলো প্রথমে সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে আলোচনা করা। কারণ এই বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত যে, সৃষ্টিকর্তা একজনই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে (মুশরিকদের) জিজ্ঞেস করেন, কে আসমান ও যমিন সৃষ্টি করেছে এবং কে সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিয়োজিত করেছে? তাহলে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ’ (আল-আনকাবূত, ২৯/৬১)। এরপর বলা হবে, মুশরিকরা যাদের পূজা করে তাদের কেউ সৃষ্টিকর্তা নয়; বরং তারা সবাই একত্রিত হয়ে একটি মাছিও সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ ‘নিশ্চয় তোমরা (মুশরিকরা) আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক (পূজা করো), তারা কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না; যদিও এই কাজে তারা একতাবদ্ধ হয়ে চেষ্টা করে’ (আল-হাজ্জ, ২২/৭৩)। সুতরাং যারা সৃষ্টি করতে পারে না তারা ইবাদতের যোগ্য নয়; বরং আল্লাহ তাআলাই ইবাদতের যোগ্য, কারণ তিনিই সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন, أَفَمَن يَخْلُقُ كَمَن لَّا يَخْلُق أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ‘যিনি সৃষ্টি করেন তিনি কি তাদের মতো, যারা সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়? তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?’ (আন-নাহল, ১৬/১৭)। এর পাশাপাশি কুরআনে বর্ণিত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তিনি কীভাবে মুশরিকদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং শিরকের অসারতা প্রমাণ করেছেন।
প্রশ্ন (৫০): আমার বয়স যখন প্রায় ১০/১১ বছর তখন বাবার পকেট থেকে টাকা, তার দোকান থেকে টাকা, চকলেট, ক্রিম চুরি করতাম। কিন্তু একটি হাদীছে জুতার ফিতা চুরির কারণে জাহান্নামে যাওয়ার কথা জেনে আমি ভীত ও হতাশ হয়ে পড়ি। বাবাকে বললে হয়তো আমার প্রতি বিশ্বাস হারাবে। তার দোকানেও বলতে পারছি না। এখন করণীয় কী?
প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: চুরি করা জঘন্য পাপ। এজন্য আল্লাহ তাআলা চোরের হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন (আল-মায়েদা, ৫/৩৮)। তবে দণ্ড কার্যকর করার দায়িত্ব প্রশাসনের। পিতামাতার করণীয় হলো শৈশব থেকেই সন্তানকে চুরির মতো অপরাধ ও মন্দ দিকের ব্যাপারে দীক্ষিত করা। এরপরও যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান তার বাবার পকেট অথবা দোকান থেকে চুপিসারে টাকা বা অন্য কিছু নিয়ে নেয়, তাহলে এতে তার গুনাহ হবে না। কারণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ ؛ عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ ‘তিন শ্রেণির মানুষ শারঈ বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত নয়- ঘুমন্ত ব্যক্তি, জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত; শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল, মস্তিষ্ক সুস্থ হওয়া পর্যন্ত’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৪০৩)।
তবে যদি সে অন্য কারো টাকা বা বস্তু চুরি করে, তাহলে তার গুনাহ না হলেও উক্ত টাকা বা বস্তু প্রকৃত মালিকের নিকট ফেরত দেওয়া আবশ্যক (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯)। আর যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে তার গুনাহ হবে। এমতাবস্থায় পিতার সাথে আপস করে নিবে। অন্যথায় বাহির থেকে উপার্জন করে দোকানে জমা করবে।
মাসিক আল-ইতিছাম
নভেম্বর-২০২৬
আক্বীদা
প্রশ্ন (১): রাফেযী
কারা? শুধু শীআদের কি রাফেযী বলা হয় নাকি সুন্নীরাও
এদের অন্তর্ভুক্ত? তাদের মৌলিক আক্বীদাগুলো
জানতে চাই।
-মোহাম্মদ শিমুল
ঢাকা।
উত্তর: শীআদের
মধ্যে ২২টি দল রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট আক্বীদাসম্পন্ন হলো রাফেযী সম্প্রদায়। এদের আবির্ভাব হয়েছিল
ইয়াহূদী নেতা আব্দুল্লাহ বিন সাবার মাধ্যমে। রাফেযী শব্দের
অর্থ প্রত্যাখ্যানকারী। একদা একদল শীআ যায়েদ বিন আলী যায়নুল আবেদীন রাহিমাহুল্লাহ-এর
নিকট এসে আবূ বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে মুক্তি চাইল। তখন তিনি বললেন,
তারা তো আমার দাদার (আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর) সহযোগী ছিলেন। তখন তারা বলল, তাহলে
আমরা আপনাকে পরিত্যাগ করলাম। জবাবে তিনি বললেন, তাহলে তোমরা
প্রত্যাখ্যানকারী। সেই থেকে এই চরমপন্থী শীআদেরকে রাফেযী বা প্রত্যাখ্যানকারী বলা
হয় (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৫/৩৯০)। এছাড়া আবূ বকর, উমার ও উছমান রাযিয়াল্লাহু আনহুম-এর খেলাফতকে প্রত্যাখ্যান করার কারণেও তাদেরকে
রাফেযী বলা হয়ে থাকে (মিনহাজুস সুন্নাহ, লি-ইবনি তায়মিয়্যাহ, ১/৩৫, ২/৯৬, ৩/৪৭০)। রাফেযীদের মৌলিক আক্বীদাগুলো হচ্ছে- ১. ইমামত: আলী রাযিয়াল্লাহু
আনহু ও তার বংশধরদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট ১২ জন ইমাম এবং
তাদের ইমামতকে দ্বীনের মৌলিক বিষয় মনে করা। ২. ইমামগণ
ভুল-ত্রুটি ও গুনাহ থেকে নিষ্পাপ। ৩. ইমামগণ অতীত-ভবিষ্যৎ
সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। ৪. তাকিয়্যাহ: ভয় বা ক্ষতির
আশঙ্কায় নিজের প্রকৃত বিশ্বাস গোপন করা বৈধ। দ্বাদশ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-আসকারী গায়বতে আছেন এবং শেষ যুগে
প্রকাশিত হবেন (আল-কাফী, কিতাবুল হুজ্জাহ, ১ম
খণ্ড, কিতাবুল-ঈমান ওয়াল-কুফর)।
প্রশ্ন (২): মুনাফিকরা কি ইসলাম থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে যায়? তারা কি কাফের? কারো বাহ্যিক কর্মকাণ্ড দেখে মুনাফিক বলা যাবে কি?
-খলিল
কাপাসিয়া, গাজীপুর।
উত্তর: মুনাফিক
দুই প্রকার- ১. আক্বীদাগত/বড় মুনাফিকী (النفاق
الأكبر): অন্তরে
কুফর লুকিয়ে রেখে বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করা। এ ধরনের ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে
কাফের এবং ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে’ (আন-নিসা, ৪/১৪৫)। ২. আমলগত/ছোট মুনাফিকী (النفاق الأصغر): কোনো মুসলিমের মধ্যে মুনাফিকদের কোনো চরিত্র
থাকা; যেমন- মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা ও আমানতের খেয়ানত করা। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি- কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে’ (ছহীহ
বুখারী, হা/৩৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৯)। এ ধরনের মুনাফিকী ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, তবে তা মারাত্মক গুনাহ ও
নিন্দনীয় চরিত্র। কোনো ব্যক্তির বাহ্যিক কর্মকাণ্ড দেখে
অন্তরের বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান না থাকলে তাকে ‘মুনাফিক’ অর্থাৎ (অন্তরে কাফের) বলা যাবে না। কারণ অন্তরের বিষয়
আল্লাহই সর্বাধিক জানেন। তবে কারো মধ্যে মুনাফিকদের কোনো আমলগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ
পেলে বলা যাবে, ‘তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে’; কিন্তু এর মাধ্যমে তাকে কাফের বা ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মুনাফিক ঘোষণা করা
যাবে না।
পবিত্রতা
প্রশ্ন (৩): ফজরে যদি এমন সময়ে ওঠা হয় যে গোসল করার সময় নেই
অর্থাৎ গোসলে করতে গেলে সূর্যোদয় শুরু হবে। অথচ সে রাতে স্ত্রীর সাথে মিলিত
হয়েছে। তাহলে তায়াম্মুম করে ছালাত পড়তে পারবে কি?
-মাহমুদ
সিরাজগঞ্জ।
উত্তর: কেউ যদি ফজরের
সময়ের শেষদিকে ঘুম থেকে উঠে জুনুবী অবস্থায় থাকে এবং গোসল করতে গেলে সূর্য উঠে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবুও সে
গোসল করবে, এরপর ছালাত আদায় করবে, যদিও এর মধ্যে সূর্য উঠে যায়।
আবূ কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছাহাবীগণ
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তাদের ছালাতের সময় ঘুমিয়ে পড়ার কথা উল্লেখ
করলেন। তখন তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, ‘নিশ্চয়ই ঘুমের মধ্যে কোনো অবহেলা নেই। অবহেলা হলো জাগ্রত অবস্থায়। অতএব,
তোমাদের কেউ যদি কোনো ছালাত ভুলে যায় অথবা ছালাতের সময় ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে যখনই
তার ছালাতের কথা স্মরণ হবে, তখনই সে তা আদায় করবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৩৭; তিরমিযী,
হা/১৭৭)। তবে
এমতাবস্থায় তায়াম্মুম করেও ছালাত আদায় করতে পারে।
প্রশ্ন (৪): শুধু প্রস্রাব-পায়খানার জন্য ওয়াশরুমে গেলেই কি ‘আল্লাহুম্মা…খুবুছি ওয়াল খবাইছ’ এই দু‘আ পড়তে
হবে নাকি গোসল করতে গেলে বা ব্রাশ করতে ওয়াশরুমে গেলেও এই দু‘আ পড়তে হবে?
-আশরাফুল আলম ইকো
ফুলদিঘী, বগুড়া সদর, বগুড়া।
উত্তর: শৌচাগারে
প্রবেশের সময় দু‘আ পড়া সুন্নাত হওয়ার কারণ শয়তানদের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা
অর্জন করা। কেননা শয়তানরা আল্লাহ তাআলার যিকিরমুক্ত অপবিত্র ও মানুষের সতর
উন্মুক্ত হওয়ার স্থানগুলোতে উপস্থিত হয়ে অনিষ্ট করার সুযোগ গ্রহণ করে। তাই একজন
মুসলিমের প্রত্যেকবার পায়খানা-প্রস্রাবের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে শৌচাগারে
প্রবেশের সময় দু‘আ পড়বে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ পায়খানায় প্রবেশকালে যেন বলে, اللَّهُمَّ
إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ ‘হে আল্লাহ!
নিশ্চয় আমি পুরুষ ও নারী অপবিত্র জিন শয়তান হতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা
করছি’ (আবূ দাঊদ, হা/৬)। আর ওয়াশরুমে গোসল বা ব্রাশ করতে যাওয়ার জন্য দু‘আ পড়তে হবে না।
প্রশ্ন (৫): তেলাপোকার বিষ্ঠার কারণে যদি কুরআনের পৃষ্ঠায় সামান্য দাগ লাগে, তাহলে এতে কি কোনো পাপ হবে? নাকি কুরআনটি মাটিতে
পুতে দেব?
-জাকারিয়া ইসলাম
পিরোজপুর।
উত্তর: কুরআনুল কারীমকে
সর্বদা সম্মান করা এবং সংরক্ষিত স্থানে রাখা আবশ্যক।
অনিচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের পাতায় তেলাপোকার বিষ্ঠা বা অন্য কোনো অপবিত্রতা সামান্য লাগলে
এতে কোনো গুনাহ হবে না। তবে কুরআনের সম্মান রক্ষার্থে সম্ভব হলে অপবিত্রতা ও তার দাগ
পরিষ্কার করে নিতে হবে। তবে যদি এমন কিছু লাগে যাতে কুরআন পাঠের অনুপযোগী হয়ে
যায়, তাহলে তা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। উছমান রাযিয়াল্লাহু
আনহু-এর শাসনামলে তিনি কুরআনের লিখিত মুছহাফসমূহের এক একখানা মুছহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে
দিলেন এবং এছাড়া আলাদা আলাদা বা একত্রিত কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন (ছহীহ
বুখারী, হা/৪৯৮৭; মিশকাত, হা/২২২১)।
প্রশ্ন
(৬): ওযূ করার সময় পায়ের আঙুলগুলো এমনিই ভালোভাবে ধৌত করলে
হবে নাকি একটি একটি করে আঙুলের ফাঁকে হাতের আঙুল প্রবেশ করিয়ে খিলাল করতে হবে?
-মাসুদ রানা
সৈয়দপুর, নীলফামারী।
উত্তর: ওযূতে ধৈত করতে হয় এমন অঙ্গগুলোতে পানি পৌঁছালে
ওযূ হয়ে যাবে। তবে ওযূতে পা ধৌত করার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো,
দুই পা টাখনুসহ ধৌত করার পাশাপাশি পায়ের আঙুলসমূহ খিলাল করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন, ‘পরিপূর্ণভাবে ওযূ করবে এবং আঙুলসমূহ খিলাল
করবে’ (আবূ দাঊদ, হা/১৪২)। মুসতাওরিদ ইবনু শাদাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ওযূর সময় তাঁর কনিষ্ঠ আঙুল দ্বারা পায়ের
আঙুলসমূহ খিলাল করতে দেখেছি
(আবূ দাঊদ,
হা/১৪৮)।
ছালাত
প্রশ্ন (৭): চার রাকআত বিশিষ্ট ছালাতে যদি প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদের পর ভুল
করে দরূদ পড়ে ফেলি এবং সাথে সাথে যদি স্মরণে আসে, তাহলে কি ছালাত শেষে সাহু সিজদা দিতে হবে? কী কী ভুল হলে সাহু সিজদা
দিতে হয়?
-মোহাম্মদ শিমুল
ঢাকা।
উত্তর: এমতাবস্থায়
সাহু সিজদা লাগবে না। কেননা প্রথম তাশাহহুদে দরূদ
পড়ার প্রমাণ রয়েছে। হাদীছে এসেছে, দুই রাকআতের
পরে তোমরা বসে বলবে, ‘আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি...’, এরপর যে দু‘আ ইচ্ছা হয়
তা পাঠ করবে’ (নাসাঈ,
হা/১১৬৩)। সাহু সিজদা
প্রধানত যেসব ক্ষেত্রে দিতে হয়- ১. ছালাতের
কোনো ওয়াজিব (যেমন- প্রথম তাশাহহুদ) ভুলে বাদ পড়লে সাহু সিজদা দিতে হয়
(ছহীহ বুখারী, ৮২৯/১২৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭০)। ২. ভুলে ছালাতে অতিরিক্ত রুকন বা রাকআত হয়ে গেলে, সাহু
সিজদা দিতে হয় (ছহীহ বুখারী, হা/১২২৬)। ৩. রাকআতের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ হলে শরীআত নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী রাকআত পূর্ণ করে সাহু সিজদা করতে হয় (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭১ ও ৫৭২)।
প্রশ্ন (৮): আমাদের মসজিদের
ইমাম বলেন, তিনি ইমাম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর মাযহাব অনুসারে ছালাত পড়ান। আমি ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী
ছালাত আদায় করি। তিনি বলেছেন, এ কারণে তার পিছনে আমার ছালাত
হবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে এ কথাটি কি সঠিক?
-মেহেদী
কোরবানপুর, মুরাদনগর, কুমিল্লা।
উত্তর: কথাটি
সঠিক নয়; বরং এমতাবস্থায় ছালাত হয়ে যাবে। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, ‘তারা তোমাদের ছালাত আদায় করায়। সুতরাং যদি তারা
ঠিকভাবে ছালাত আদায় করায়, তাহলে তোমাদের ও তাদের ছওয়াব হবে।
আর যদি ভুল করে, তাহলে তোমাদের ছওয়াব হবে এবং এর দায় তাদের
উপর বর্তাবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪; মুসনাদে আহমাদ,
হা/৮৬৪৮)।
প্রশ্ন
(৯): ঈদের
ছালাতে দ্বিতীয়
রাকআতে ইমাম যদি
পাঁচ তাকবীর
দিতে ভুলে
যায় তাহলে
ছালাত হবে
কি? এর জন্য
দ্বিতীয় রাকআতে
সাহু সিজদা
দেওয়া হলে
সেই ছালাত
কি গ্রহণ
হবে নাকি
আবার পড়তে
হবে?
-মাসুদ রানা
সৈয়দপুর, নীলফামারী।
উত্তর:
ঈদের ছালাতে অতিরিক্ত যে তাকবীরগুলো পাঠ
করা হয় তা সুন্নাত; ওয়াজিব নয়। সুতরাং যদি ভুলবশত অতিরিক্ত তাকবীর পাঠ না করা হয়, তাহলে
ছালাত আদায়
হয়ে যাবে এবং সিজদায়ে সাহুর প্রয়োজন নেই (আল-মাজমূ‘, ইমাম নববী, ০৪/১২৩)।
প্রশ্ন (১০): আমার পিতা মৃত্যুর আগে ৫ দিন ICU/HDU-তে ছিলেন। শেষ ৪ দিন জ্ঞান ছিল,
কিন্তু ছালাত আদায় করেছেন কি-না জানা নেই।
যদি না পড়ে থাকেন, তাহলে কি কোনো কাফফারা বা অন্য কিছু
আদায় করতে হবে?
-মো.
আরাফাত হোসেন
কুল্যাগাছা, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ।
উত্তর: কোনো ব্যক্তি জ্ঞান থাকা অবস্থায় অসুস্থ হলেও সামর্থ্য অনুযায়ী দাঁড়িয়ে, না পারলে বসে, তাও না পারলে কাত হয়ে ছালাত আদায় করা ফরয (ছহীহ
বুখারী, হা/১১১৭)। কিন্তু আইসিইউ-তে থাকার কারণে শেষের দিনগুলো ছালাত আদায় করেছেন কি-না তা জানা না গেলে বা ছালাত আদায় করেননি মর্মে নিশ্চিতভাবে জানা গেলেও, তার জন্য শরীআতে নির্ধারিত কোনো কাফফারা নেই। বরং তার সন্তানগণ তার জন্য দু‘আ,
ইস্তিগফার ও দান-ছাদাকা করতে পারেন (ছহীহ
মুসলিম, হা/১৬৩১)।
প্রশ্ন
(১১): কোন
কোন কারণে
পুরুষদের ঘরে
ফরয ছালাত
আদায় করা
যাবে এবং
তা আল্লাহর
কাছে কবুল
হবে?
-আসাদুজ্জামান
চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর:
সাধারণ অবস্থায় পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাআতের
সাথে ছালাত আদায়
করা ওয়াজিব। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু
আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি
আযান শুনল এবং তার কোনো ওযর না থাকা সত্ত্বেও জামাআতে
উপস্থিত হলো না,
তার ছালাত নাই’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৩; ইবনু মাজাহ, হা/৭৯৩)। তবে ভীষণ অসুস্থতা, প্রাণ বা সম্পদের নিরাপত্তা,
প্রচণ্ড বৃষ্টি, কাঁদাযুক্ত রাস্তা অথবা জলাবদ্ধতার কারণে মসজিদে উপস্থিত না হয়ে বাড়িতে
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জামাআতে ছালাত আদায় করা যায়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন, ‘যদি কেউ ভয়ভীতি ও অসুস্থতার
কারণে জামাআতে হাযির হতে অক্ষম হয়, তবে তার জন্য বাড়িতে
ছালাত আদায় করা দূষণীয় নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৯০১; আবূ দাঊদ, হা/৫৫১)।
প্রশ্ন
(১২): মসজিদের ভিতর মোবাইলে দ্বীনী আলোচনার ভিডিও অথবা অন্য
ভালো কোনো ভিডিও দেখা যাবে কি? নাকি মসজিদে দেখলে পাপ হবে?
-সাজিদ
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
উত্তর:
মসজিদ নির্মাণ করা হয় জামাআতে ছালাত আদায়,
খুৎবা শোনা, যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত এবং দ্বীনী আয়োজনে অংশগ্রহণ করার জন্য। রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই ছালাত, এতে
মানুষের কোনো কথাবার্তা বলা বৈধ নয়;
এটি তো কেবল তাসবীহ, তাকবীর এবং কুরআন তিলাওয়াত’ (আবূ দাঊদ, হা/৯৩০)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إياكم وهيشات الأسواق ‘খবরদার!
তোমরা (মসজিদে) বাজারের মতো শোরগোল, ঝগড়া ইত্যাদি থেকে বেঁচে
থাকো’ (ছহীহ
মুসলিম, হা/৪৩২)। অতএব, মসজিদে এসব কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজ করা সমীচীন
নয়। তবে দ্বীনী বক্তব্য হলে শালীনতা রক্ষা করে শুনতে পারে।
প্রশ্ন
(১৩): জানাযার ছালাতে কীভাবে দাঁড়াব? পায়ের সাথে পা লাগাতে হবে কি?
-মুসতাকিম
ফেনী।
উত্তর: হ্যাঁ, জানাযার ছালাতে পায়ের সাথে পা মিল করেই দাঁড়াতে
হবে। কারণ এটাও ছালাত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
নাজাশীর
জানাযায় সারিবদ্ধ হন এবং চার তাকবীরে জানাযা পড়ান (ছহীহ বুখারী, হা/১২৪৫; মিশকাত, হা/১৬৫২)। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,
আমরা জনৈক
ব্যক্তির জানাযায় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
পিছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম (ছহীহ বুখারী, হা/১৩২১; মিশকাত, হা/১৬৫৮)।
যাকাত-দান-ছাদাকা
প্রশ্ন (১৪): বাবা-মায়ের দেওয়া হাতখরচ থেকে দান করলে ছওয়াব
কার হবে—দানকারী সন্তানের, নাকি
অর্থদাতা বাবা-মায়ের, নাকি উভয়ের?
-জাকারিয়া ইসলাম
পিরোজপুর।
উত্তর: বাবা-মায়ের
দেওয়া হাতখরচ বা অর্থ থেকে সন্তান দান করলে সন্তান দানকারী হিসেবে পূর্ণ ছওয়াব পাবে।
একইসঙ্গে বাবা-মাও অর্থ উপার্জন করে সন্তানকে দেওয়ার কারণে সমপরিমাণ ছওয়াবের অংশীদার হবেন। এতে কারও ছওয়াব অপরের
কারণে সামান্যও কমবে না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো
স্ত্রী যদি তার ঘর হতে ক্ষতির উদ্দেশ্য ছাড়া খাদ্যদ্রব্য ছাদাকা করে, তবে এ জন্য সে ছওয়াব লাভ করবে আর উপার্জন করার
কারণে স্বামীও ছওয়াব পাবে এবং খাজাঞ্চিও
অনুরূপ ছওয়াব পাবে। তাদের একজনের কারণে অন্য জনের ছওয়াবে কোনো কমতি হবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৪২৫; ছহীহ মুসলিম,
হা/১০২৪)।
প্রশ্ন (১৫): বিভিন্ন ফাউন্ডেশন কিংবা ব্যক্তিরা মানুষের
কাছ থেকে যাকাত কালেক্ট করে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন, কিংবা মানুষকে আর্থিক সহযোগিতা করেন, আবার কেউ কেউ স্বাবলম্বী প্রকল্পও পরিচালনা করেন। এই ক্ষেত্রে যদি আমার
যাকাতের টাকা তাদের কাছে দেই এবং তারা
যদি যাকাতের প্রাপ্য হক্বদারের কাছে বিতরণ না করেন, তাহলে আমার যাকাত আদায় হবে কি?
-রাজু আহমেদ
কুমিল্লা।
উত্তর: কোনো ব্যক্তি
বা ফাউন্ডেশন যদি যাকাত বিতরণের প্রতিনিধি وَكِيل)) হিসেবে যাকাত সংগ্রহ করে, তাহলে তাদের দায়িত্ব
শরীআত নির্ধারিত খাতসমূহে যাকাতের সম্পদ যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া।
তারা যদি যাকাতের অর্থ নির্ধারিত হক্বদারদের কাছে না দিয়ে অন্য
কোনো অননুমোদিত খাতে ব্যয় করে, তাহলে শুধু তাদের কাছে যাকাতের অর্থ হস্তান্তর করার
মাধ্যমে যাকাত আদায় হবে না। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যাকাত ব্যয়ের খাত
নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ছাদাকা (যাকাত) তো
কেবল ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়ের কাজে
নিযুক্ত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন তাদের জন্য, দাসমুক্তিতে,
ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে
নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ (আত-তাওবা, ৯/৬০)।
জায়েয-নাজায়েয
প্রশ্ন (১৬): গ্রামে ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি ছেড়ে দিয়ে
পালন করার কারণে অনেক সময় অনেকের ফসল নষ্ট হয়। ফসল বা ক্ষতির বিনিময়ে ছাগল ধরে
খেয়ে ফেললে গুনাহ হবে কি? অন্যের ক্ষতি করে এভাবে গবাদিপশু পালন করা যাবে কি?
-তোফায়েল আমিন
গাইবান্ধা।
উত্তর: পশু যদি
দিনের বেলায় শস্য খেয়ে নেয়,
তাহলে এতে জমির মালিক দায়ী। আর যদি রাতের বেলা শস্য খেয়ে নেয়, তাহলে পশুর মালিক দায়ী। বারা ইবনু আযেব রাযিয়াল্লাহু
আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম (নিম্নরূপ) ফায়সালা
প্রদান করেছিলেন, ‘বাগ-বাগিচার দেখাশোনার দায়িত্ব
দিনের বেলা তার মালিকের উপর (দিনের বেলা লোকসানের জন্য মালিক দায়ী থাকবে)।
গৃহপালিত জন্তুর রাতের বেলায় দেখাশোনার দায়িত্ব তার মালিকের উপর ন্যস্ত। রাতের বেলায় গৃহপালিত পশুর ক্ষতির জন্য পশুর মালিক দায়ী থাকবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৬৯; ইবনু মাজাহ, হা/২৩৩২)। তবে
বর্তমান সামাজিক অবস্থায় গবাদিপশু অনেক ক্ষতি করে। কাজেই পশুর মালিককে দিনের বেলাও
তার পশু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর ক্ষতির কারণে মালিকের অনুমতি ছাড়া তার পশু ধরে জবাই করে খাওয়া বৈধ নয়।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘ইসলামে নিজের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ, অন্যের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪১)। অতএব, ফসলের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি পশুর মালিকের সঙ্গে
পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে বৈধ বিচারিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি
করতে হবে; নিজের হাতে প্রতিশোধ নেওয়া বা পশু জবাই করে নেওয়া বৈধ নয়।
প্রশ্ন (১৭): ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে কি? এতে সূদের
সাথে জড়িত অনেক বিষয় ও কেনাকাটায়
বিভিন্ন অফার থাকে। বিদেশ ভ্রমণেও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।
-আকরাম
বেরাইদ, ঢাকা।
উত্তর: স্বাভাবিকভাবে
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা উচিত নয়। কেননা এতে ঋণ ও বিলম্বিত পরিশোধের ক্ষেত্রে
সূদ নেওয়ার শর্ত রয়েছে, যা থেকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূরে থাকতে বলেছেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ছালাতে
সর্বদাই ঋণ থেকে আশ্রয় চাইতেন (নাসাঈ,
হা/৫৪৮৭)। জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
লা‘নত করেছেন সূদখোরের উপর, সূদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও তার সাক্ষী দুজনের উপর এবং বলেছেন, ‘এরা সবাই সমান’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮)। আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম
করেছেন (আল-বাকারা, ২/২৭৫)। তবে
নিরুপায় হয়ে গ্রহণ করা ভিন্ন বিষয়।
প্রশ্ন (১৮): আমি অনলাইনে ব্যবসা করি এবং ফেসবুকে পণ্যের
ভিডিও আপলোড করি। যদি এসব ভিডিওতে কোনো বাদ্যযন্ত্র বা মিউজিক ব্যবহার না করে শুধু
মানুষের কণ্ঠে গাওয়া ভোকাল সাউন্ড ব্যবহার করি, যার কথায় কোনো অশ্লীলতা বা হারাম বিষয়
নেই এবং ভিডিওও শরীআতসম্মত হয়, তাহলে তা ব্যবহার করা কি জায়েয? যদি জায়েয
না হয়, তাহলে এর বিকল্প কী হতে পারে?
-রুপাক্ষী
রাজশাহী।
উত্তর: ভিডিওতে
যদি কোনো মিউজিক/বাদ্যযন্ত্র না থাকে, কথায় অশ্লীলতা, শিরক, হারাম বা অনৈতিক বিষয় না থাকে, পুরুষের স্বাভাবিক কণ্ঠ হয়, নারীর কণ্ঠ না হয়, কণ্ঠকে এমনভাবে পরিবেশন করা না হয় যা
অশ্লীল গান বা ফিতনার দিকে নিয়ে যায় এবং ভিডিওর দৃশ্যও শরীআতসম্মত হয়, তাহলে এ ধরনের ভোকাল ব্যবহার করা যায়। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
ঈদের দিন তার কাছে দুই আনছারী কিশোরী ছিল, তারা বুআসের
যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে গান করছিল। আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু আপত্তি করলে রাসূলুল্লাহ
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও’ (ছহীহ
বুখারী, হা/৯৫০)।
প্রশ্ন (১৯): AI
কোনো মানুষের চরিত্র দিয়ে ফেসবুক
বা ইউটিউবে কুরআনের আয়াত, হাদীছ, দু‘আ
ও যিকির শেখানো এবং তা থেকে আয় করা কি জায়েয?
-নাফিউন হক্ব
কুমিল্লা।
উত্তর: ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামI-এ কোনো
মানুষের চরিত্র ব্যবহার করে কুরআন, হাদীছ, দু‘আ ও যিকির
শেখানো যাবে না। কেননা তাতে মিথ্যা আরোপ, প্রতারণা, চেহারা ও
কণ্ঠের বিকৃতি, আয়াত ও হাদীছের মূল ইবারতে, অনুবাদে, সূত্রে, মাসআলায় ভুলের সম্ভাবনা, চরিত্রের অতিরিক্ত অভিনয়, হাস্যরস, নাটকীয়
অঙ্গভঙ্গি, আকর্ষণীয় মুখভঙ্গি বা বিনোদনমূলক উপস্থাপনা, দ্বীনের নামে বাণিজ্যিক
আকর্ষণ (যেমন- ভিউ, সাবস্ক্রিপশন, বিজ্ঞাপন বা আয় বাড়ানোর জন্য কুরআন-হাদীছকে অতিরিক্ত ক্লিকবেইট,
নাটকীয়তা ও চমকপ্রদ উপস্থাপনা), কণ্ঠ/চেহারার অপব্যবহার করা হয়, যেগুলো ইসলামী শরীআতে
হারাম। সুতরাং সেখান থেকে আয় করাও জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও
অন্তর—এসবের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (আল-ইসরা, ১৭/৩৬)।
প্রশ্ন (২০): সরকারি রাস্তা বা ফুটপাতের জায়গায় স্থানীয়
প্রশাসনের অনুমোদনের ভিত্তিতে দোকান/অস্থায়ী ভ্যান বসিয়ে ব্যবসা করা কি জায়েয হবে? যদি জায়েয না হয়,
তাহলে এটা কোন ধরণের গুনাহ হবে?
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: সাধারণত সরকারি রাস্তা বা ফুটপাত জনসাধারণের চলাচলের জন্য
নির্ধারিত। যদি সেখানে দোকান বা অস্থায়ী ভ্যান বসানোর কারণে জনসাধারণের চলাচলে
অসুবিধা হয় এবং তাদের কষ্ট হয়, তাহলে
তা জায়েয নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি বৈধভাবে নির্দিষ্ট স্থান নির্দিষ্ট
সময়ের জন্য অস্থায়ী দোকান বা ভ্যান বসানোর অনুমতি দেয় এবং এতে মানুষের চলাচলে
ক্ষতি না হয়, তাহলে সেই অনুমতির সীমার মধ্যে ব্যবসা করা জায়েয (ছহীহ
বুখারী, হা/২৪৬৫)। অনথ্যায় জায়েয নয়।
প্রশ্ন
(২১): বাইনান্সে
Spot Trade করা যাবে কি? কেউ আবার
স্পট ট্রেডকে
স্টক ব্যবসার
মতো মনে
করে কাজ
করছে।
-আব্দুর রাকিব
চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর:
বাইনান্স একটি অনলাইন বাজার, যেখানে বিটকয়েন
(Bitcoin), ইথারেয়াম (Ethereum) এবং বাইনান্স কয়েনের (BNB) মতো শত শত ভার্চুয়াল মুদ্রা
কেনা, বিক্রি ও বিনিময় করা যায়। এই বাইনান্সে স্পট ট্রেড (সরাসরি ডিজিটাল মুদ্রা
ক্রয়-বিক্রয়) করা জায়েয নয়। কারণ এই ডিজিটাল মুদ্রাগুলো শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে মাল বা
সম্পদ নয়, আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলো স্বীকৃত মুদ্রাও নয়। সুতরাং যারা স্পট ট্রেডকে
স্টক বিজনেসের মতো মনে করছে তারা ভ্রান্তির শিকার। কারণ স্টক বিজনেসের জন্য পণ্যটি
শরীআত স্বীকৃত সম্পদ হতে হবে। আর ডিজিটাল মুদ্রা শরীআত স্বীকৃত
সম্পদ নয়। কারণ শরীআত স্বীকৃত সম্পদ হওয়ার জন্য অন্তত তিনটি শর্তে উত্তীর্ণ
হতে হয়- ১. ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে এমন সম্পদ হতে হবে, যার মূল্য নির্ধারণ করা যায়।
২. মালিকানা বৈধ উপায়ে হস্তান্তর করা যায়। ৩. منفعة مباحة অর্থাৎ
তার দ্বারা বৈধভাবে উপকৃত হওয়া যায় (ছহীহ ফিকহুস সুন্নাহ, ৪/২৫১)। এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একত্রে বিদ্যমান থাকে না ডিজিটাল
মুদ্রার মধ্যে। তাই এটা সম্পদ নয়। আবার বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বাইনান্সের সরাসরি
আইনি বৈধতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্রিপ্টো লেনদেনের বিষয়ে সতর্কবার্তা
দেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বা ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা তোলা ঝুঁকিপূর্ণ
ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অতএব, বাইনান্সে স্পট ট্রেডসহ যাবতীয় লেনদেন জায়েয নয়।
প্রশ্ন (২২): আমার নাম মো. আলমগীর হোসেন। ইতিছাম ফাতওয়া বোর্ড থেকে
আমার নাম পরিবর্তন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এনআইডি, মাস্টার্স পর্যন্ত সকল সার্টেফিকেট, ছেলের জন্ম নিবন্ধনসহ অনেক কাগজে পরিবর্তন করা
অত্যন্ত জটিল। তাই কাগজে পরিবর্তন
না করে মৌখিকভাবে ‘হোসাইন বিন
আব্দুল আউয়াল’ নাম রাখা যাবে কি? এর জন্য কি পুনরায় আকীকা
করতে হবে?
-মো. আলমগীর হোসেন
চারাবাগ, আশুলিয়া, সাভার,
ঢাকা।
উত্তর: কাগজপত্রে
নাম পরিবর্তন বিষয়টি অত্যন্ত জটিল হওয়ার কারণে কাগজপত্রে তা ঠিক রেখে শুধু মৌখিক
ও সামাজিকভাবে ‘হোসাইন বিন আব্দুল আউয়াল’ নামে
পরিচিত হওয়া যায়। আর এর জন্য পুনরায় আকীকা করতে হবে না। নবী
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এক ছাহাবীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার নাম কী?’ তিনি বললেন, হাযন (কঠিন)। নবী ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি
সাহল (সহজ)’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬১৯০)। আকীকা শিশু
জন্মগ্রহণের সপ্তম দিনে করতে হয়। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন, ‘প্রত্যেক শিশু তার আকীকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে। তার
জন্মের সপ্তম দিনে আকীকা করতে হয়’ (আবূ দাঊদ,
হা/২৮৩৮)।
প্রশ্ন
(২৩): আমাদের
গ্রামে ঈদের
দিন খেলাধুলার
আয়োজন করা
হয় এবং
গ্রামবাসীর কাছ
থেকে টাকা
তুলে পুরস্কার
দেওয়া হয়। এ রকম আয়োজন
করা যাবে
কি?
-মুহাইমিনুল ইসলাম
দিনাজপুর।
উত্তর:
বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ উপলক্ষ্যে যেসব
খেলাধুলার আয়োজন দেখা যায় তা একাধিক কারণে জায়েয নয়। যেমন- ১. খেলাগুলো শরীআতসম্মত
হয় না। ২. উচ্চ আওয়াজে গান বাজানো হয় ও প্রতিবেশীদের কষ্ট দেওয়া হয় (ছহীহ বুখারী, হা/৬০১৬)। ৩. নারী-পুরুষের অবাধ অংশগ্রহণ থাকে (আন-নূর, ২৪/৩০-৩১)। ৪. চাপ সৃষ্টি করে টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে ঈদের
দিন বৈধ উপায়ে কাউকে কষ্ট না দিয়ে হালাল খেলাধুলা আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে। টাকা উঠিয়ে
যদি হারজিতের পুরস্কার দেওয়া হয়, তাহলে তা জুয়া হবে এবং খেলায় অংশগ্রহণকারীদের টাকা
দিয়ে পুরস্কার দেওয়া যাবে না। তৃতীয় পক্ষ বা স্পন্সর নিয়ে পুরস্কার দিলে সমস্যা নেই
(আল-মায়েদা, ৫/৯০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৬৯৫)।
প্রশ্ন (২৪): বাংলাদেশের
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আইনজীবী হওয়া কি ইসলামসম্মত? আমার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আইনি হয়রানি থেকে
রক্ষা করা। তবে দেশের বিচারব্যবস্থায় ইসলামী শরীআহ চালু নেই, প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
এ অবস্থায় আইনজীবী পেশা গ্রহণ করা কি জায়েয?
-নাঈম
কুমিল্লা।
উত্তর: ইসলামী শরীআতকে পাশ কাটিয়ে মানব রচিত আইন এর উচ্চ ডিগ্রি
অর্জন করে আইনজীবী হওয়া মূলত জায়েয নয়, কেননা তা দ্বীনের একটি মৌলিক নীতিকে ধ্বংস করে দেয়। আর তা হলো, আল্লাহ তাআলার চেয়ে উত্তম বিধানদাতা বা বিচারক আর কেউ নেই। আল্লাহ তাআলা
বলেন, ‘বিধান দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহরই’ (ইউসুফ, ১২/৪০)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘অতএব, তাদের জন্য
ধ্বংস, তাদের হাত যা লিখেছে তার কারণে এবং তাদের জন্য ধ্বংস,
তারা যা উপার্জন করে তার কারণে’ (আল-বাকারা, ২/৭৯)। তবে মানুষের অধিকার আদায়, প্রয়োজন-নির্ভরতা, ক্ষতি ও
অনিষ্ট কমানো এবং মুসলিমদের ওপর
থেকে যুলম দূর করার ক্ষেত্রে জরুরী
প্রয়োজন ও প্রয়োজনীয়তার শারঈ নীতিমালা বিবেচনা করে কিছু
শর্তসাপেক্ষে আইনজীবী হওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ
রয়েছে। শর্তগুলো হলো- ১. সে এসব আইন
এবং এসব আইনের প্রণেতাদের থেকে এবং জরুরী প্রয়োজন ছাড়া এসব
আইনের অধীনে বিচার গ্রহণ করা থেকে আল্লাহর কাছে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করবে। ২.
এমন কোনো মামলায় সে ওকালতি করবে না, যেখানে রায় আল্লাহর বিধানের
বিরোধী ও পরিপন্থী হবে, যেমন- ব্যভিচারী,
চোর, সূদখোর ইত্যাদির পক্ষে এমনভাবে মামলা পরিচালনা করা যাবে না, যাতে তাদের
অন্যায়কে সমর্থন করা হয়। ৩. তার ওকালতির উদ্দেশ্য হতে হবে
অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, অন্যায় প্রতিহত করা অথবা মাযলুমকে
সাহায্য করা। যদি সে দেখতে পায় যে, তার মক্কেলের পক্ষেই
সত্য ও ন্যায় রয়েছে, তাহলে সে তার পক্ষে দাঁড়াবে এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা
করবে। ৪. এসব প্রচলিত আদালতের মাধ্যম ছাড়া অধিকার আদায় বা যুলম প্রতিহত করার অন্য কোনো উপায় না থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, সে অনুযায়ী বিচার
করে না, তারা কাফের’ (আল-মায়েদা, ৫/৪৪)।
প্রশ্ন (২৫): আমার বাচ্চার বয়স ৭ বছর। সে প্রচুর
মোবাইলে আসক্ত। পড়াশুনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। আগে কুরআন পড়ত, এখন তাও পড়ে না। আমার করণীয় কী? প্রহার করা ঠিক হবে কি?
-আশিক
ঢাকা।
উত্তর: ৭ বছরের
শিশুকে মোবাইলের আসক্তির কারণে প্রহার করা উচিত নয়। ধৈর্য, নিয়মিত তত্ত্বাবধান ও
ভালোবাসার মাধ্যমে তার অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করাই উত্তম। বিশেষ করে কুরআন পড়া
ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে নিচের পদক্ষেপ গুলো নেওয়া উচিত- ১. মোবাইল বাচ্চার
নাগালের (দৃষ্টির) বাইরে রাখুন।
২. মোবাইলের বিকল্প দিন;
খেলাধুলা, গল্পের বই, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করুন। ৩.
কুরআনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করুন। চাপ না দিয়ে প্রতিদিন ৫–১০ মিনিট
দিয়ে শুরু করুন এবং অল্প পড়লেও প্রশংসা করুন। বাবা-মা নিজেরাও সামনে কুরআন পড়ুন।
৪. কুরআনকে মোবাইলের পুরস্কারে পরিণত করবেন না। ‘কুরআন পড়লে মোবাইল দেব’—এভাবে না বলে কুরআনের প্রতি
আলাদা ভালোবাসা ও আনন্দ তৈরি করুন। ৫. ঘুমের আগে মোবাইল বন্ধ
রাখুন। সম্ভব হলে মোবাইল/ট্যাব শোবার ঘরের বাইরে রাখুন।
প্রশ্ন
(২৬): কোনো
ব্যক্তি আমার
অনেক ক্ষতি
করলে এবং
কষ্ট দিলে
তার মৃত্যু,
দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো
ক্ষতির জন্য
বদদু‘আ করা
কি জায়েয? ইসলামের দৃষ্টিতে এ ক্ষেত্রে সঠিক
করণীয় কী?
-মো. লোবাব ইসলাম
নাকাই হাট, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।
উত্তর:
কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কষ্ট পেলে
তার বিরুদ্ধে লা‘নত করা বা বদদু‘আ করা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ নয় এবং প্রকৃত মুমিন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যও
নয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি লা‘নতকারী বা বদদু‘আকারী হতে
পারে না’ (তিরমিযী,
হা/১৯৭৭)। অপর হাদীছে রাসূল
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয় আমি প্রেরিত হইনি লা‘নতকারী হিসেবে; বরং
আমি প্রেরিত হয়েছি রহমত হিসেবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯৯)।
কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা কষ্ট পেলে করণীয় হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং ক্ষমা করে
দেওয়া। কারণ আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন (আল-বাকারা, ২/১৫৩)। আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, إنما يوفى الصابرون أجرهم بغير حساب ‘নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে
অগণিত ছওয়াব প্রদান করা হবে’ (আয-যুমার, ৩৯/১০)।
প্রশ্ন
(২৭): অমুসলিমরা
কি মসজিদে
প্রবেশ করতে
পারবে? যদি
এটা জায়েয হয়,
তাহলে অমুসলিমরা
হারামাইনে কেন
প্রবেশ করতে
পারবে না? আর অমুসলিমরা
কি কুরআন
স্পর্শ করতে
পারবে?
-আব্দুল হাই
উত্তরা, ঢাকা।
উত্তর:
পৃথিবীর সব মসজিদে অমুসলিমরা প্রবেশ করতে
পারলেও হারামাইনে প্রবেশ করতে পারবে না। কেননা হারামাইনের বিষয়টি স্বতন্ত্র। দাজ্জালের বিষয়টিও স্বতন্ত্র। সেও হারামাইনে প্রবেশ করতে পারবে না (ছহীহ বুখারী, হা/১৮৮১)। আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا
الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَٰذَا ‘হে
ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মুশরিকরা অপবিত্র। সুতরাং তারা যেন এই বছরের পর থেকে মাসজিদে হারামের
নিকটেও না আসে’ (আত-তাওবা,
৯/২৮)।
উল্লেখ্য, হারামাইন (দুই হারাম) বলতে হারামে মাক্কী এবং হারামে মাদানীকে বুঝানো
হয়। মক্কার মসজিদে হারামসহ তার পার্শ্ববর্তী নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে হারামে মাক্কীর
অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর মদীনার মসজিদে নববীসহ তার পার্শ্ববর্তী নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে
হারামে মাদানীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় (ছহীহ বুখারী, হা/৩০৫৩; ফাতহুল বারী, ৬/১৭১)। তবে অমুসলিম ব্যক্তি বিশেষ প্রয়োজনে অনুমতি
নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে
অবস্থানকালীন তাঁর নিকট ওয়াফদে নাজরান, ওয়াফদে ছাক্বীফ ইত্যাদি বিধর্মী প্রতিনিধি দল
ও ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়েছে, এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। অনুরূপভাবে সুমামা ইবনু উছাল
রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) মসজিদের খুটিতে বেঁধে রাখা হয়েছিল (ছহীহ বুখারী, হা/৪৬২; ছহীহ মুসলিম,
হা/১৭৬৪)। অমুসলিম ব্যক্তি
কুরআনুল কারীম স্পর্শ করতে পারবে না (ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৬৯; আল মাজমূ‘, ইমাম নববী, ২/৭১)। তবে সে সত্য জানার জন্য কুরআনুল কারীমের অনুবাদ
ও তাফসীরগ্রন্থ স্পর্শ এবং অধ্যয়ন করতে পারবে।
প্রশ্ন
(২৮): আপেল শক্ত, বেদানার রক্ত, মিষ্টির ঝোল, গপাগপ তোল। চিড়িয়াখানার মেয়েরা হাফপ্যান্ট
পরে, ছেলেদের দেখলে ডানচোখ মারে। ও ভাবি পিঠা কুড়াতে যাবি, পিঠা নিল চোরে, বর আসল ঘরে,
বরের নাম জাব্বার, আল্লাহু আকবার। এলাকার শিশুরা এই ছন্দ বলে খেলাধুলা করে। এটা কি
জায়েয?
-নাহিদ আলী
সরদহ, চারঘাট, রাজশাহী।
উত্তর:
উক্ত ছন্দ বলে খেলাধুলা করা হারাম। কারণ
এতে শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি সমস্যা রয়েছে- ১. আল্লাহর নাম নিয়ে উপহাস। জাব্বার
আল্লাহর একটি নাম। আল্লাহর নাম নিয়ে উপহাস করলে ঈমান ভঙ্গ হয়ে যায়। ২. ‘আল্লাহু আকবার’
তাকবীর নিয়ে উপহাস। তাকবীর বলার বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে। যেখানে সেখানে তাকবীর বলা যায়
না। আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ সম্মান ও গাম্ভীর্য বজায় রেখে তাকবীর
পাঠ করতে হয়। অতএব, এটাকে খেলাধুলার ছন্দে অন্তর্ভুক্ত করা জায়েয নয়। ৩. মেয়েদের হাফপ্যান্ট
পরা। এটা ইসলামের পর্দা ও হিজাব সংশ্লিষ্ট বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। ৪. মেয়েদের ডানচোখ
মারা। এটা মূলত নারীদের শালীনতা ও লাজলজ্জা বিরোধী বাক্য। এরকম অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ
বাক্য ব্যবহার করা কখনোই জায়েয হতে পারে না। ৫. দেবর-ভাবি সম্পর্ককে রসালোভাবে উপস্থাপন
করা। এতে পর্দার বিধানকে উপেক্ষা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, শিশুদের খেলাধুলার প্রয়োজন আছে
বলে এসব অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ছন্দ তাদের শূন্য মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়া ইসলামবিরোধী
ব্যক্তিদের চক্রান্ত। এসব যেকোনোভাবে প্রতিহত করতে হবে। সুতরাং শিশুদের জন্য শরীআতসম্মত, শালীন, রুচিসম্মত ও শিক্ষামূলক ছন্দ রচনা করে
তাদেরকে মুখস্থ করাতে হবে।
হালাল-হারাম
প্রশ্ন
(২৯): আমি
একটি গার্মেন্টস
ইন্ডাস্ট্রিতে ফ্যাশন
ডিজাইনার হিসেবে
কাজ করি।
কাজের অংশ
হিসেবে বিভিন্ন
ধরনের পোশাক,
কখনো শালীনতার
পরিপন্থী পোশাকও
ডিজাইন করতে
হয় এবং
থ্রিডিতে মানুষের
অবয়বে (Dummy) কাপড়গুলো পরিয়ে চেক করি।
এ ধরনের
কাজের মাধ্যমে
অর্জিত বেতন
শরীআতের দৃষ্টিতে
হালাল হবে
কি?
-আব্দুল্লাহ আনাম
সাভার, ঢাকা।
উত্তর:
গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ফ্যাশন ডিজাইনার
হিসেবে কাজ করা থেকে বেঁচে থাকা ভালো। কেননা ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে অশালীন
ডিজাইন, অঙ্গ বুঝা যায় এমন পাতলা বা টাইট পোশাক ডিজাইন করা এবং শরীআতবিরোধী কাজে যুক্ত
হতে হয়। এর মাধ্যমে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হয়, যা থেকে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ولا تعاونوا على الإثم والعدوان ‘আর তোমরা গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো
না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।
প্রশ্ন
(৩০): কসাইখানার ব্যবসা করা যাবে কি? আর ব্যবসা হালাল হওয়ার জন্য কী কী শর্ত মানতে
হবে?
-মো. রুহুল আমিন
শিবগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।
উত্তর:
কসাইখানার ব্যবসা (পশু ক্রয় করে জবাই করার
পর তার গোশত বিক্রি করা) মৌলিকভাবে জায়েয। তবে এক্ষেত্রে কিছু শর্তাবলি রয়েছে-
১.
পশু হালাল হতে হবে। যেমন- উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি (আল-মায়েদা, ৫/১)।
২.
আল্লাহর নামে (বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে) জবাই করতে হবে (আল-আনআম, ৬/১২১)।
৩.
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতী পদ্ধতিতে পশু যবেহ করতে হবে। যেমন- ছুরি
ধার দিয়ে নেওয়া, যবেহের পর ছুরি দিয়ে শ্বাসনালি, কণ্ঠনালিতে আঘাত না করা, পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার
আগে চামড়া ছড়ানো বা পা কাটা যাবে না (তিরমিযী, হা/১৪০৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩১৭০)।
৪. মৃত পশুর (জবাই ব্যতীত অন্য কোনোভাবে মারা যাওয়া পশু) গোশত বিক্রি করা যাবে না (আল-মায়েদা, ৫/৩)।
৫.
যেসব পশুকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা হয়েছে, সেসব পশুকে জবাই করে তার
গোশত বিক্রি করা যাবে না, কারণ এগুলোর গোশত খাওয়া হালাল নয় (আল-মায়েদা, ৫/৩)।
৬.
ব্যবসার সাধারণ শর্ত পালন করতে হবে। যেমন- ওযনে কম না দেওয়া, মিথ্যা না বলা বা মিথ্যা
কসম না করা ইত্যাদি।
প্রশ্ন
(৩১): আমি সেনাবাহিনীতে চাকরি করি। সামনে আসছে ঈদে মীলাদুন্নবী। সেই দিন সরকারি ছুটি।
সেই দিনে বড় খানার আয়োজন করা হয়৷ প্রশ্ন হলো, সেই খাবার কি আমার জন্য হালাল?
-মো. হামিদুল ইসলাম রুপম
হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট।
উত্তর:
ইসলামে বাৎসরিক ঈদ মাত্র দুইটি তথা ঈদুল
ফিতর ও ঈদুল আযহা। ঈদ হলো ইবাদত। সুতরাং ঈদে মীলাদুন্নাবী নামে নতুন ঈদ আবিষ্কার করা
মানে নতুন ইবাদত আবিষ্কার করা, যা নিকৃষ্ট বিদআত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَإِيَّاكُمْ
وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ ؛ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ
ضَلَالَةٌ".
‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত বিষয়গুলো
থেকে বিরত থাকো; কারণ (দ্বীনের মধ্যে) প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বিষয় হলো বিদআত, আর প্রত্যেক
বিদআত হলো ভ্রষ্টতা’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭)।
অন্য হাদীছে এসেছে, وَكُلُّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ ‘আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার
পরিণাম জাহান্নাম’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; নাসাঈ, হা/১৫৭৮)। অপর হাদীছে
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘যে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করবে (বিদআত চালু করবে), তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ
এবং সকল মানুষের অভিসম্পাত’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৮৬৭)।
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন, وَمَنْ أَحْدَثَ حَدَثًا أَوْ آوَى مُحْدِثًا
فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ، لَا
يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلَا عَدْلٌ ‘যে বিদআত করবে বা বিদআতীকে
আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা, মানুষ এবং সকলের লা‘নত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোনো ফরয আমল এবং কোনো নফল কবুল করবেন না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৫৫)। সুতরাং
ঈদে মীলাদুন্নাবীর নামে প্রচলিত এই নিকৃষ্ট বিদআত সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সকল অনুষ্ঠান ও খাবার বর্জন করতে হবে। কারণ এমন খাবারে বা অনুষ্ঠানে
অংশগ্রহণ করা মানে উক্ত বিদআতকে সমর্থন করা, যা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। বরং এসব আয়োজন
প্রত্যাখ্যান করার ফায়েদা আছে, তা হলো, মানুষ এই বিদআত সম্পর্কে জানবে এবং আগামীতে
অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে।
পারিবারিক বিষয়
প্রশ্ন (৩২): আমার বিয়ে পারিবারিকভাবে ২ বছর আগে মসজিদে হয়েছে।
আলহামদুলিল্লাহ, মসজিদে অনেক
লোক উপস্থিত ছিল; তবে আলাদা করে কোনো সাক্ষী নির্ধারণ করা
হয়নি। এ অবস্থায় আমার বিয়ে শরীআত অনুযায়ী ছহীহ ও সম্পূর্ণ হয়েছে কি-না?
-মাহাবুব
দিনাজপুর।
উত্তর: বিবাহ বৈধ
হওয়ার জন্য দুজন মুসলিম সাক্ষী লাগবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন, ‘অভিভাবক ও দুজন ন্যায়পরায়ণ (আদল) সাক্ষী ছাড়া বিবাহ নেই’ (ছহীহুল জামে’, হা/৭৫৫৭)। তবে যেহেতু উক্ত বিবাহের সময় অনেক লোক উপস্থিত ছিল, সুতরাং বিবাহ ছহীহ হয়েছে।
প্রশ্ন (৩৩): কোনো বিধবা মহিলা কি তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করতে
পারবে?
-কামরুল
পাবনা।
উত্তর: কুমারী হোক
কিংবা বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা হোক কোনো নারীর জন্য পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া
বিবাহ করা বৈধ নয়। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল
ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যেকোনো নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করবে, তার বিবাহ বাতিল! তার বিবাহ বাতিল! তার বিবাহ বাতিল!’ (তিরমিযী, হা/১১০২; মিশকাত, হা/৩১৩১)।
প্রশ্ন (৩৪): অনেক ইমাম, মুহাদ্দিছদের ব্যাপারে শুনেছি তারা বিবাহ করেননি। কোনো কারণবশত আমিও যদি এমন থাকতে চাই, তাহলে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি?
-হানযালা
লালমনিরহাট।
উত্তর:
ক. বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান
এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ। একজন
মুসলিমের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করা। আনাস রাযিয়াল্লাহু
আনহু থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনজন ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাদেরকে এ সম্পর্কে
জানানো হলো, তখন তারা ইবাদতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ তাঁর আগের
ও পরের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য হতে একজন বলল,
আমি আজীবন রাতভর ছালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সবসময় ছিয়াম
পালন করব এবং কখনো বাদ দেব না। অন্য একজন বলল, আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে
করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের
নিকট এলেন এবং বললেন, ‘তোমরা কি ওই সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম!
আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশি অনুগত;
অথচ আমি ছিয়াম পালন করি, আবার কখনো তা থেকে বিরতও থাকি। আমি (রাতে) ছালাত আদায়
করি এবং ঘুমাই। আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং যারা আমার আদর্শকে উপেক্ষা করবে, তারা
আমার দলভুক্ত নয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩)।
এছাড়াও
বিবাহের দ্বীনী এবং দুনিয়াবী উপকারিতা রয়েছে।
প্রথমত,
দ্বীনী উপকারিতা- ১. তাওহীদপন্থী জনবল বৃদ্ধি করা। সারা পৃথিবীতে তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছানো
এবং আল্লাহর কালিমা সুউচ্চ করার লক্ষ্যে তাওহীদপন্থী জনবল বৃদ্ধি করা অতীব প্রয়োজন।
আর এক্ষেত্রে বিবাহই একমাত্র মাধ্যম। এজন্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেমময়
ও অধিক পরিমাণ সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীকে বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তিনি
এই উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মতের সামনে গর্ব করতে পারেন (আবূ দাঊদ, হা/২০৫০)।
২.
দৃষ্টি হেফাযত করা (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৫)।
৩.
লজ্জাস্থান হেফাযত করা (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৫)।
৪.
হালাল পন্থায় যৌন চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে বিশেষ ছওয়াব অর্জন (ছহীহ মুসলিম,
হা/১০০৬)।
দ্বিতীয়ত,
দুনিয়াবী উপকারিতা-
১.
মানসিক প্রশান্তি লাভ (আর-রূম,
৩০/২১)।
২.
অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জন (আন-নূর, ২৪/৩২)।
৩.
নারীর জন্য উত্তম অভিভাবক নির্ধারণ (আন-নিসা, ৪/৩৪)।
৪.
পুরুষের জন্য বাড়ি ও বাড়ির সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা (আন-নিসা, ৪/৩৪)।
৫.
পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের স্বাদ আস্বাদন।
৬.
বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
৭.
প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সন্তানদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করা।
খ.
যেসকল ইমাম ও মুহাদ্দিছগণ বিয়ে করেননি, তাদের কেউ অন্যদেরকে বিয়ে করতে অনুৎসাহিত করেননি।
বরং বিবাহ যে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ এ ব্যাপারে তাদের স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।
সুতরাং তাদের এই বক্তব্য অনুসরণীয়; তাদের কর্ম অনুসরণীয় নয়। কেননা তাদের বিয়ে না করার
মূল কারণ সম্পর্কে আমরা অবগত নই। কিন্তু বর্তমানে
বিবাহ ছাড়া ফিতনামুক্ত থাকার নিশ্চয়তা নেই; বরং ফিতনাগ্রস্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা
রয়েছে। তাই বিবাহ করা আবশ্যক।
প্রশ্ন
(৩৫): আমাদের আগে দুইটা তালাক হয়ে গেছে। এর মধ্যে একদিন স্বামী রেগে বললেন, ‘বাপের
বাড়ি গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে। আমার অনুমতি ছাড়া গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে’। স্বামীর
মনে তালাকের নিয়্যত ছিল কি-না সে নিশ্চিত নয়। এখন বাপের বাড়ি গেলে তালাক পতিত হবে কি?
-নুর জাহান
ঢাকা।
উত্তর:
তালাকের জন্য ‘তালাক’ শব্দ ব্যবহার করেই
তালাক দিতে হবে। অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করে তালাক দিলে তালাক পতিত হবে না (আত-তালাক, ৬৫/১)। সুতরাং স্বামীর স্ত্রীকে বলা ‘বাপের বাড়ি
গেলে চিরজীবনের জন্য যাবে’ এবং স্ত্রীর পরবর্তীতে বাবার বাড়ি যাওয়ার মাধ্যমে তালাক
পতিত হবে না।
প্রশ্ন
(৩৬): আমার স্ত্রী বিয়ের ২ মাসের মাথায় আমার অনুমতি ছাড়াই বাপের বাড়ি চলে যায়।
পরে আমি তাকে আনতে গেলে সে ফিরে আসে না। তার শর্ত হলো যদি সংসার করতে হয়, তাহলে তার
বাপের বাড়িতে গিয়ে করতে হবে; অন্যথায় ডিভোর্স দিতে বলে। এখন আমি কি করব? আমার কাছে
দেনমোহরের টাকাও নেই।
-মো. রাজীব হোসেন
আশুলিয়া বাজার, সাভার, ঢাকা।
উত্তর:
স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাবার বাড়িতে যাওয়া
স্ত্রীর জন্য জায়েয নয়। আবার সংসার করার জন্য স্বামীকে ঘরজামাই হওয়ার শর্তারোপ করা
অন্যায় ও শরীআত বিরোধী শর্ত। এমন শর্ত বাতিল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من
اشْتَرَطَ شَرْطًا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ فَهُوَ بَاطِلٌ، وَإِنِ اشْتَرَطَ
مِائَةَ شَرْط ‘যে ব্যক্তি
এমন শর্ত করবে যা কুরআনুল কারীমে নেই (শরীআত বিরোধী শর্ত), তাহলে তা বাতিল; যদিও সে
একশটি শর্ত করে’ (ছহীহ
বুখারী, হা/২১৫৫)। সাধারণত এমন
অন্যায় শর্ত করার পেছনে মূল কারণ থাকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া। সুতরাং
করণীয় হলো উভয়পক্ষ থেকে নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ মুরব্বী নির্ধারণ করে সমঝোতা করার চেষ্টা
করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ
أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ
بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا ‘তাদের
উভয়ের (স্বামী-স্ত্রী) মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার হতে একজন
ও তার (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন শালিশ নিযুক্ত করবে; তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ
তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ
অবহিত (আন-নিসা, ৪/৩৫)। আর যদি এতেও সমাধান না হয়, তাহলে স্ত্রীকে শাসন
করার উদ্দেশ্যে স্বামী তালাক প্রদান করতে পারে।
মীরাছ
প্রশ্ন
(৩৭): আমি
জানি যে আমার বাবার
হারাম উপার্জন
আছে। কিন্তু
সে ব্যাপারে
আমার কথা
বলার সুযোগ
নেই। এমতাবস্থায়
তার মৃত্যুর
পর সেই
সম্পদ কি আমি গ্রহণ
করতে পারব?
এতে কি আমার পাপ
হবে?
-শাকিল শুভ
বগুড়া।
উত্তর:
এসময় সম্পদ যদি কারো থেকে আত্মসাৎ করা না
হয় বা জোর করে দখল করা না হয়, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ দান করে দিবে। আর বাকি অংশ ভোগ করতে
পারে। তবে এর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর
অসুস্থতায় রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
তাকে দেখতে গেলে তিনি বলেন, একটি মাত্র কন্যা ব্যতীত
আমার কোনো ওয়ারিছ নেই। এখন আমি আমার সম্পদের দু-তৃতীয়াংশ ছাদাকা করতে পারি কি? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
উত্তর দিলেন, ‘না’। আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক?
তিনি বললেন, ‘না’। আমি বললাম, এক-তৃতীয়াংশ। তিনি বললেন, ‘এটাও অনেক বেশি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৬৮)।
নারী বিষয়ক
প্রশ্ন (৩৮): মহিলাদের ক্ষেত্রে বাড়ির বাইরে চোখে সুরমা
দেওয়ার মাসআলা কী?
ঘরেও যদি সুরমা দেয় এবং বাইরে যাওয়ার আগে মুখ ধুয়ে নেয়, তবে চোখে সুরমা কিছুটা লেগে থাকে, তাহলে বাইরে গেলে
কি গুনাহ হতে পারে?
-উম্মুল
মুয়াজ
সিরাজগঞ্জ।
উত্তর: ইসমিদ সুরমা
ব্যবহার করলে দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার হয় এবং চোখের পাপড়ি গজায় (আবূ দাঊদ, হা/৩৮৭৮)। যার মাধ্যমে নারীদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, যা (সৌন্দর্য) আল্লাহ তাআলা গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে প্রকাশ
করতে নিষেধ করেছেন (আন-নূর, ২৪/৩১)। অতএব, নারীদের জন্য
বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় চোখে সুরমা ব্যবহার করে গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে
তা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে ঘরে সুরমা ব্যবহার করার পর বাইরে যাওয়ার
পূর্বে তা মুছবে/ধৌত করবে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে সামান্য চিহ্ন
থেকে যায়, যা স্পষ্ট সাজসজ্জা হিসেবে প্রতীয়মান হয় না, তাহলে গুনাহ হবে না।
প্রশ্ন
(৩৯): এক শায়খ বলেছেন, বিউটি পার্লারের সব জিনিস দিয়ে কনেকে সাজানো যাবে, কিন্তু পার্লারে
গিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, পার্লারে গেলে সমস্যা কি? ইসলামে কি নারীরা নারীদের সাজাতে পারে
না?
-জোহরা তাবাসসুম
রাজশাহী।
উত্তর:
বিউটি পার্লারে মহিলাদের যেভাবে সাজানো
হয় একজন মহিলা অন্য আম তথা সাধারণ মহিলার মাধ্যমে সেভাবে সাজতে পারবে না। এজন্য মার্কেটে
অবস্থিত বিউটি পার্লারে সাজগোজ করা যাবে না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘কোনো নারী অপর
নারীর শরীর স্পর্শ করে স্বামীর সামনে যেন তা বর্ণনা না করে। কারণ হতে পারে স্বামী
উক্ত নারীকে অন্তরের চোখ দিয়ে দেখতে থাকবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৪০; মিশকাত, হা/৩০৯৯)। বরং
কনেকে বাড়িতে ঘরোয়া পরিবেশে বোন, দাদি, নানি, মামি বা খালারা সাজাবে এবং সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত
সমস্ত প্রসাধনী সামগ্রী অবশ্যই হালাল
হতে হবে।
প্রশ্ন
(৪০): আমার এক বোন ফ্রান্সে থাকেন। ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী কেউ পাবলিক স্থানে যদি নিকাব
পরিধান করে, তাহলে জরিমানা করে। এমতাবস্থায় তার করণীয় কী?
-ইশতিয়াক তানযিম
সিলেট।
উত্তর:
নারীর জন্য পরপুরুষের সামনে নিকাব ইত্যাদি
দ্বারা মুখমণ্ডল আবৃত করে পর্দা করা ফরয (আল-আহযাব, ৩৩/৫৯)।
প্রথমত, একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত এমন জায়গায় বসবাস করা উচিত নয়, যেখানে ইসলাম মেনে চললে
জরিমানা প্রদান করতে হয়। দ্বিতীয়ত, যদি প্রয়োজনে এমন জায়গায় বসবাস করতেই হয়, তাহলে
জরিমানা প্রদান করে হলেও পর্দার বিধান পালন করা আবশ্যক (তিরমিযী, হা/১১৭৩)। এক্ষেত্রে ইসলামের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় নেই।
কুরআন-হাদীছের
ব্যাখ্যা
প্রশ্ন (৪১): উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বিচারের সময় একজন
মুসলিমকে হত্যা করে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন। এই ঘটনা
ওয়াজ মাহফিলে বলা হয়ে থাকে। এই ঘটনা কি ঠিক?
-মোস্তফা মনোয়ার
হারাগাছ, রংপুর।
উত্তর: উক্ত ঘটনা
সঠিক নয়। মূল ঘটনাটি নিম্নে দেওয়া হলো- আবূল আসওয়াদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বিবাদ নিয়ে এলে তিনি তাদের মধ্যে
বিচার করলেন। কিন্তু যার বিরুদ্ধে বিচার হলো, সে বলল, আমাদেরকে উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে নিয়ে চলুন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা উভয়ে তার কাছে যাও’। তারা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গিয়ে ঘটনা
জানালে তিনি বললেন, সত্যিই কি এমন হয়েছে? সে বলল, হ্যাঁ। তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের অপেক্ষা করতে বলে তরবারি নিয়ে বের হয়ে সেই
ব্যক্তিকে হত্যা করলেন, যে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল। অপর
ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ফিরে এসে ঘটনা জানালে তিনি বললেন, ‘আমি মনে
করিনি যে উমার কোনো মুমিনকে হত্যা করার মতো দুঃসাহস করবেন’। অতঃপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, فَلَا
وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ. ‘তোমার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না
তারা নিজেদের বিবাদে তোমাকে বিচারক মেনে নেয়...’ (আন-নিসা, ৪/৬৫)।
প্রশ্ন
(৪২): উহুদ
যুদ্ধে মুসলিমদের
পরাজয়ের কারণ
কী ছিল?
ধন-সম্পদের
লোভ কি কারণগুলোর মাঝে
ছিল?
-সাকিব
সোনাগাজী, ফেনী।
উত্তর:
ক. উহুদ যুদ্ধের প্রারম্ভে আল্লাহ তাআলা
তাঁর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মুসলিমদের বিজয় দান করেছিলেন। কিন্তু কিছু তিরন্দাজদের নির্দেশনা
অমান্য এবং গনীমত অর্জনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করার কারণে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত
ফলাফল মুসলিমদের পক্ষে আসেনি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللَّهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم
بِإِذْنِهِ حَتَّىٰ إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُم مِّن
بَعْدِ مَا أَرَاكُم مَّا تُحِبُّونَ وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن
يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنكُمْ
وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ ‘আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন
যখন তোমরা আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদেরকে বিনাশ করছিলে, যে পর্যন্ত না তোমরা সাহস হারালে
এবং নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে মতভেদ সৃষ্টি করলে আর যা তোমরা ভালোবাস তা তোমাদের দেখানোর
পর তোমরা অবাধ্য হলে। তোমাদের কতক ইহকাল চাচ্ছিল আর কতক পরকাল চাচ্ছিল। এরপর তিনি পরীক্ষা
করার জন্যে তোমাদেরকে তাদের হতে ফিরিয়ে দিলেন। অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং
আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল’ (আলে ইমরান, ৩/১৫২)। খ. উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমরা ছাহাবী ছিলেন।
তাদের ক্ষেত্রে ‘সম্পদের লোভ’ শব্দটি বেমানান। কিছু তিরন্দাজ ছাহাবীদের ভুল ছিল এই
যে, তারা ভেবেছিলেন বিজয় অর্জন হয়েই গেছে; মুশরিকরা আর যুদ্ধে এগোতে পারবে না। তাই
আনন্দে গনীমতের প্রতি মনোযোগ দিয়েছিলেন। অথচ নির্দেশনা ছিল, إِنْ رَأَيْتُمُونَا ظَهَرْنَا عَلَيْهِمْ
فَلَا تَبْرَحُوا ‘যদি
তোমরা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় প্রত্যক্ষ কর, তবুও তোমরা নিজ স্থান থেকে সরবে না’
(ছহীহ বুখারী, হা/৪০৪৩)। এই নির্দেশনা অমান্য করার ফলে যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল
মুসলিমদের পক্ষে আসেনি। কিন্তু তাদের এই ভুলকে মহান আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়ে বলেছেন,
ولقد
عفا عنكم ‘আর
তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন’ (আলে ইমরান, ৩/১৫২)।
প্রশ্ন
(৪৩): একজন মুমিনের ঘুমানো, খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এগুলো কি ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়? যদি হয় তাহলে কীভাবে
নিয়্যত করলে ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে?
-কাওছার আহমেদ
টাউনহল, ময়মনসিংহ।
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর ইবাদত করার
জন্য সৃষ্টি করেছেন (আয-যারিয়াত,
৫১/৫৬)। ইবাদত বলা হয়, আল্লাহ তাআলার যাবতীয় নির্দেশ
পালন করা এবং যাবতীয় নিষেধ মান্য করা। আল্লাহ তাআলা হালাল উপার্জনের নির্দেশ প্রদান
করেছেন (আল-জুমুআহ,
৬২/১০)। তাই আল্লাহর এই নির্দেশ পালনের নিয়্যতে
ব্যবসা করা বা চাকরি লাভের উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। খাওয়াদাওয়া
ও ঘুমের ক্ষেত্রে এই নিয়্যত করতে হবে যে, এর মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা অর্জন
হবে, যা সুন্দরভাবে ইবাদত পালনে সহায়তা করবে। মুআয বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, أحتسب نومتي كما أحتسب قومتي ‘আমি
ঘুমের ক্ষেত্রেও ছওয়াব প্রত্যাশা করি যেমনিভাবে রাতের ছালাতের ক্ষেত্রে ছওয়াব প্রত্যাশা করি’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৪১)। রাসূল
ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেন, ‘যে ব্যক্তি এশার ছালাত
জামাআতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধরাত দাঁড়িয়ে
(ক্বিয়ামুল লায়ল বা তাহাজ্জুদ) ছালাত আদায় করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত
জামাআতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারারাত দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করল’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৬)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘মুমিনের
ব্যাপার আশ্চর্যজনক। অবশ্যই তার সকল বিষয় তার জন্য কল্যাণময়। আর এটি মুমিন ছাড়া
অন্য কারো জন্য হতে পারে না। যদি তার কোনো আনন্দ আসে,
তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য
কল্যাণময়। আর যদি তার উপরে কোনো দুঃখজনক কিছু আপতিত হয়,
তাহলে সে ছবর করে, সেটাও
তার জন্য কল্যাণকর হয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৯৯)।
প্রশ্ন
(৪৪): মিশরের
পিরামিডে সংরক্ষিত
যে ফেরাউনের
মমি (লাশ)
রাখা হয়েছে,
সেটি কি কুরআনে বর্ণিত
মূসা আলাইহিস
সালাম-এর ঘটনার
সাথে সম্পর্কিত
ফেরাউনের লাশ?
-ইয়াসিন মিয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া (সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী)।
উত্তর:
মিশরের পিরামিডে সংরক্ষিত যেই লাশকে কুরআনুল
কারীমে বর্ণিত ফেরাউনের লাশ বলে প্রচার করা হয় সেটা আসলে নিশ্চিতভাবে তার লাশ বলা যায়
না। বরং এই প্রচারিত লাশটি উন্মোচিত হয় ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে (আন্তর্জাতিক আরবী বিশ্বকোষ, ১৩/৩৫০)। এর আগে লাশটি কোথায় ছিল? প্রাচীন ইতিহাস বা তাফসীরগ্রন্থে
এর আলোচনা নেই কেন? এমন অনেক প্রশ্ন রয়েছে যেগুলোর সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। বরং প্রসিদ্ধ
তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরে কুরতুবীতে এর বিপরীত বক্তব্য পাওয়া যায়। তা হলো, সূরা ইউনুসের
৯২ নম্বর আয়াতে ফেরাউনের শরীরকে না ডুবিয়ে মানুষদের জন্য শিক্ষার উপকরণ বানানোর যে
কথা উল্লিখিত হয়েছে, এর ব্যাখ্যা হলো বনী ইসরাঈলের কিছু লোক বিশ্বাস করত, ফেরাউনের
কখনো মৃত্যু হবে না। তাদের এই বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করতে মহান আল্লাহ তাআলা এই কথা
বলেন। তিনি সমুদ্রের এক পাশে অবস্থিত উঁচু স্থানে তার লাশ নিক্ষেপ করেন। এরপর বনী ইসরাঈলের
লোকেরা দেখে, ফেরাউনের সত্যিই মৃত্যু হয়েছে। তাদের বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করা হয়।
এরপর তার লাশকে আল্লাহ তাআলা সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন (তাফসীরে কুরতুবী, ৮/৩৮০)।
প্রশ্ন
(৪৫): তারা
সবাই সমান
নয়। আহলে
কিতাবদের মধ্যে
কিছু লোক
এমনও আছে
যারা অবিচলভাবে
আল্লাহর আয়াতসমূহ
পাঠ করে
এবং রাতের
গভীরে তারা
সিজদা করে
(আলে ইমরান,
৩/১১৩)। এই আয়াতের সংক্ষিপ্ত
ব্যাখ্যা জানতে
চাই।
-মো. ফয়েজউল্লাহ
২৪/২৮, মিরপুর ১২, ঢাকা ১২১৬।
উত্তর:
উক্ত আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো, এই
আয়াতে আহলে কিতাবদের সেসব আলেমদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। যেমন-
আব্দুল্লাহ বিন সালাম, আসাদ বিন উবাইদ, ছা‘লাবা বিন সা‘ইয়াহ প্রমুখ। তারা ইসলাম গ্রহণের
পূর্বেও আল্লাহর ইবাদত যথাযথভাবে পালন করতেন এবং ইসলাম গ্রহণের পরেও তা অব্যাহত রেখেছেন।
অতএব, এসকল আহলে কিতাবদের সমপর্যায়ের হতে পারবে না সেসব আহলে কিতাব, যাদের ব্যাপারে
কুরআনুল কারীমের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিন্দা করেছেন (তাফসীরে ইবনু কাছীর, ২/৯১)।
প্রশ্ন
(৪৬): মাসিক আল-ইতিছামের এক ফাতওয়ায় লাল রঙের পোশাক পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু হাদীছে
এসেছে, আমি তাঁকে লাল পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৫১)। এটা কি
বিপরীত হয়ে গেল না?
-ফয়সাল
বাসাইল, টাঙ্গাইল।
উত্তর:
মাসিক আল-ইতিছামের ফাতওয়া এবং প্রশ্নে বর্ণিত
হাদীছের মাঝে বৈপরীত্য নেই। পুরুষের জন্য নিরেট ও অমিশ্রিত
লাল রঙের পোশাক পরিধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমাকে লাল রঙের পোশাক পরিধান করতে
নিষেধ করা হয়েছে (নাসাঈ,
হা/৫২৬৬)। বারা বিন আযিব
রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
রাসূল ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমাদেরকে (পুরুষদেরকে) লাল রঙের গদি ব্যবহার
করতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ
বুখারী, হা/৫৮৬৩)। প্রশ্নে বর্ণিত
হাদীছের ব্যাখ্যা হলো, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই
লাল রঙের পোশাক পরিধান করেছিলেন তা ছিল লাল ও কালো সুতা দ্বারা তৈরি এক ধরনের ইয়ামানী
পোশাক। এটা নিরেট ও অমিশ্রিত লাল রঙের পোশাক ছিল না (যাদুল মাআদ, ইবনুল কাইয়িম, ১/১৩২-১৩৪)।
বিবিধ
প্রশ্ন (৪৭): ইসলামে বিষণ্নতা, হতাশা ও মানসিক
অশান্তি বা রোগ নিয়ে কী বলে? এগুলো কি
শাস্তিস্বরূপ নাকি পরীক্ষা? এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
-গোলাম রাব্বি
বরিশাল।
উত্তর: ইসলামে বিষণ্নতা, হতাশা, দুঃখ, উদ্বেগ ও মানসিক অশান্তি ইত্যাদি
কখনো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পরীক্ষা, কখনো গুনাহ মাফের মাধ্যম, কখনো
সতর্কবার্তা, আবার কারও ক্ষেত্রে নিজের গুনাহ ও ভুলের ফলও হতে পারে। আল্লাহ তাআলা
বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা
ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর আপনি
ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন’ (আল-বাকারা, ২/১৫৫)। আল্লাহ
তাআলা আরও বলেন, ‘তোমাদের
ওপর যে বিপদই আসে, তা তোমাদের হাতের কামাইয়ের কারণেই; আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে
দেন’ (আশ-শূরা, ৪২/৩০)। রাসূলুল্লাহ
ছাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা,
দুঃখ, কষ্ট বা বেদনা, এমনকি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ এর মাধ্যমে
তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৭৩)। বিষণ্নতা ও মানসিক অশান্তি থেকে পরিত্রাণের উপায়- ১. নিম্নোক্ত দু‘আ পড়া: اللَّهُمَّ إِنِّي
أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ
وَالْكَسَلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ
غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ অর্থ: ‘হে আল্লাহ!
আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাই; অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই;
ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে আশ্রয় চাই এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রাধান্য থেকে আশ্রয় চাই’
(ছহীহ বুখারী, হা/২৮৯৩)। ২. ছালাতের
মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা (আল-বাকারা, ২/৪৫)।
প্রশ্ন (৪৮): গুনাহে জারিয়া বা চলমান গুনাহের পথ বন্ধ করতে
না পারলে করণীয় কী?
যেমন- এমন কোনো
ওয়েবসাইট যেখানে লাইক, কমেন্ট করলে ডিলিট করা যায় না, কিংবা ডিলেট করার পদ্ধতি জানা নেই?
-মো.
হাবিবুল্লাহ
ভুরুঙ্গামারী, কুড়িগ্রাম।
উত্তর: কেউ কোনো হারাম
পোস্টে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করার পর অনুতপ্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে উক্ত গুনাহ থেকে বিরত
হওয়া এবং আন্তরিকভাবে তওবা করা আবশ্যক। সম্ভব হলে করা লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার মুছে
ফেলতে হবে। আর তা মুছে ফেলা সম্ভব না হলে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার
করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের গুনাহে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা
সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো’ (আত-তাগাবুন, ৬৪/১৬)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘গুনাহ থেকে তওবাকারী এমন, যেন সে কোনো
গুনাহই করেনি’ (ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫০)। অতএব, গুনাহের বিষয়টি অপসারণের সাধ্য থাকলে তা অপসারণ
করবে; সাধ্যের বাইরে হলে আন্তরিক তওবা করবে এবং পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করবে।
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো বিষয়ে দায়ী করেন না।
প্রশ্ন
(৪৯): আমার প্রতিবেশী একজন হিন্দু লোক আছে, তিনি আমার সাথে খুবই আন্তরিক। আমি মনে মনে
আকাঙ্ক্ষা রাখি যদি উনি ইসলাম গ্রহণ করতেন। প্রশ্ন হলো, ইসলাম মেনে কীভাবে তাকে দাওয়াত
দিতে পারি?
-জোবায়ের আহমেদ
পিরিজপুর, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ।
উত্তর:
একজন মুশরিককে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের
ক্ষেত্রে তাকে বুঝাতে হবে যে, মূর্তিপূজা শিরক। আর শিরকের ফলাফল জাহান্নাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘যে ব্যক্তি
আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক না করে মারা যাবে,
সে জান্নাতে
প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে মারা যাবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩)। এছাড়া দাওয়াতের ক্ষেত্রে কুরআনী পদ্ধতি অবলম্বন করা অধিক ফলপ্রসূ। কুরআনী পদ্ধতি
হলো প্রথমে সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে আলোচনা করা। কারণ এই বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত যে, সৃষ্টিকর্তা
একজনই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে (মুশরিকদের) জিজ্ঞেস করেন, কে আসমান ও
যমিন সৃষ্টি করেছে এবং কে সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিয়োজিত করেছে? তাহলে তারা অবশ্যই
বলবে, আল্লাহ’ (আল-আনকাবূত,
২৯/৬১)। এরপর বলা হবে, মুশরিকরা যাদের পূজা করে
তাদের কেউ সৃষ্টিকর্তা নয়; বরং তারা সবাই একত্রিত হয়ে একটি মাছিও সৃষ্টি করতে সক্ষম
নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا
وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ
‘নিশ্চয় তোমরা (মুশরিকরা) আল্লাহ ব্যতীত
যাদেরকে ডাক (পূজা করো), তারা কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না; যদিও এই কাজে
তারা একতাবদ্ধ হয়ে চেষ্টা করে’ (আল-হাজ্জ, ২২/৭৩)। সুতরাং যারা সৃষ্টি করতে পারে না তারা ইবাদতের যোগ্য
নয়; বরং আল্লাহ তাআলাই ইবাদতের যোগ্য, কারণ তিনিই সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন, أَفَمَن يَخْلُقُ كَمَن لَّا يَخْلُق أَفَلَا
تَذَكَّرُونَ ‘যিনি
সৃষ্টি করেন তিনি কি তাদের মতো, যারা সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়? তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে
না?’ (আন-নাহল, ১৬/১৭)। এর পাশাপাশি কুরআনে বর্ণিত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর
ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তিনি কীভাবে মুশরিকদের দাওয়াত দিয়েছেন এবং শিরকের অসারতা
প্রমাণ করেছেন।
প্রশ্ন
(৫০): আমার বয়স যখন প্রায় ১০/১১ বছর তখন বাবার পকেট থেকে টাকা, তার দোকান থেকে টাকা,
চকলেট, ক্রিম চুরি করতাম। কিন্তু একটি হাদীছে জুতার ফিতা চুরির কারণে জাহান্নামে যাওয়ার
কথা জেনে আমি ভীত ও হতাশ হয়ে পড়ি। বাবাকে বললে হয়তো আমার প্রতি বিশ্বাস হারাবে। তার
দোকানেও বলতে পারছি না। এখন করণীয় কী?
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর:
চুরি করা জঘন্য পাপ। এজন্য আল্লাহ তাআলা
চোরের হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন (আল-মায়েদা, ৫/৩৮)।
তবে দণ্ড কার্যকর করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
পিতামাতার করণীয় হলো শৈশব থেকেই সন্তানকে চুরির মতো অপরাধ ও মন্দ দিকের ব্যাপারে
দীক্ষিত করা। এরপরও যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান তার বাবার পকেট অথবা দোকান থেকে চুপিসারে
টাকা বা অন্য কিছু নিয়ে নেয়, তাহলে এতে তার গুনাহ হবে না। কারণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
رُفِعَ
الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ ؛ عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ
الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ ‘তিন শ্রেণির মানুষ শারঈ বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত নয়-
ঘুমন্ত ব্যক্তি, জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত; শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল, মস্তিষ্ক
সুস্থ হওয়া পর্যন্ত’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৪০৩)।
তবে
যদি সে অন্য কারো টাকা বা বস্তু চুরি করে, তাহলে তার গুনাহ না হলেও উক্ত টাকা বা বস্তু
প্রকৃত মালিকের নিকট ফেরত দেওয়া আবশ্যক (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯)।
আর যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে তার গুনাহ হবে। এমতাবস্থায় পিতার সাথে আপস করে নিবে।
অন্যথায় বাহির থেকে উপার্জন করে দোকানে জমা করবে।
