ভূমিকা:
হিংসা মানবজীবনের এক অন্ধকার দিক। এটি কেবল বাহ্যিক আঘাত নয়; বরং অন্তরের ক্ষতও সৃষ্টি করে, যা কখনও শুকাবার না।
ধ্বংসের আগুন যখন জ্বলে ওঠে, তখন তার তাপে শুধু বস্তুগত জিনিসকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়; কিন্তু হিংসার আগুন যখন জ্বলে ওঠে, তখন তা বস্তুগত জিনিসের সাথে মানবিক মূল্যবোধও পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। হিংসার আগুনে আত্মার পবিত্রতা ও শান্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। আজকে আমরা হিংসার ভয়াল দৃশ্য সম্পর্কে মহামূল্যবান কিছু কথা জানব, যা বলেছেন শায়খ ছালেহ আল-উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ‘শারহু হিলয়াহতু ত্বলিবিল ইলম’ গ্রন্থে।
তিনি বলেন, কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ হবে না যে, সে তার অপর ভাইয়ের প্রতি হিংসা করবে। বিশেষ করে যদি সেই হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহ তাকে পার্থিব জগতে অথবা ধর্মীয় জীবনে যে নেয়ামত বা সফলতা দান করেছেন, সেটাকে সামনে রেখে। হিংসা হলো ইয়াহূদীদের আচরণ আর হিংসা কতই-না খারাপ ব্যবহার!
হিংসার পরিচয়:
হিংসা হলো অন্যের উপর আল্লাহর যে নেয়ামত রয়েছে, তার ধ্বংস কামনা করা; যখন আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দাকে ধনসম্পদ দেন, তখন তার ধ্বংস কামনা করা; যখন আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দাকে জ্ঞান দেন, তখন তার ভুলে যাওয়া কামনা করা; যখন কোনো বান্দা তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখে থাকেন, তখন তার বিপদ কামনা করা।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘হিংসা হলো অন্যের উপরে আল্লাহর নেয়ামতকে ঘৃণা করা’।[1] অর্থাৎ সেই ব্যক্তির অন্যের নেয়ামতের ধ্বংস কামনা করে না, কিন্তু তার সেই নেয়ামতকে সে অপছন্দ বা ঘৃণার চোখে দেখে।
তবে সে যদি শুধু অপরের নেয়ামতের মতোই নিজের জন্যও প্রত্যাশা করে, তাহলে সেটা অহংকারের মধ্যে গণ্য হবে না; বরং সেটা গিবতাহের অন্তর্ভুক্ত, যা করা জায়েয রয়েছে। সুধী পাঠক! আজ আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হিংসা। অপরের প্রতি হিংসা করার অনেক ক্ষতিকারক দিক রয়েছে। নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো:
(১) হিংসা কাবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এই গুনাহ ছালাত, ছিয়াম ও ছাদাক্বার মতো মহৎ কর্ম দ্বারাও মোচন হবে না; বরং তার জন্য তওবা করা আবশ্যক।
(২) হিংসার জন্য ভয়াবহ শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, যদিও হাদীছটি যঈফ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তা হলো, ‘নিশ্চয় হিংসা সৎ আমলসমূহকে খেয়ে ফেলে, যেমনভাবে আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে’।[2]
(৩) হিংসা ইয়াহূদীদের আচরণ। আর কে এমন আছে যে চাইবে, সে ইয়াহূদীদের গুণ নিজের মধ্যে ধারণ করবে?
(৪) হিংসা ঈমানী ভ্রাতৃত্বকে নষ্ট করে। কারণ সে তো চায় যে, অপর বান্দার নেয়ামতের ক্ষতি সাধিত হোক। আর মুমিন তো তারাই যারা অপরের জন্য তাই ভালোবাসে, যা সে তার নিজের জন্য ভালোবাসে।
(৫) হিংসা করলে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টি জেগে উঠে এবং তা তাক্বদীরের বিচারের প্রতি অসন্তুষ্টি জন্ম দেয়। কারণ সে যদি আল্লাহর এই ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টই থাকত, তাহলে অবশ্যই সে বলত যে, এটা আল্লাহর ফয়সালা। সুতরাং এটাই ভালো এবং সে অপরের প্রতি হিংসায় নিজেকে জড়াত না।
(৬) হিংসুক যতবার অন্যের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনু্গ্রহ দেখে, ততবারই তার দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পায় এবং সে হিংসার আগুনে দগ্ধ হয়। সুতরাং হিংসা হলো জ্বলন্ত অগ্নি, যা হিংসুককে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।
(৭) হিংসুকরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না’ (আন-নূর, ২৪/২১)।
(৮) হিংসা মানুষের মাঝে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়।
(৯) হিংসা অন্যের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করে। যেমন- আদম আলাইহিস সালাম-এর সন্তান ক্বাবীল তার নিজ ভাই হাবীলকে হত্যা করে শুধু হিংসার কারণে।
(১০) হিংসা করার ফলে সে নিজের অজান্তেই নিজের উপরে আল্লাহ যে নেয়ামত দিয়েছেন, তার প্রতি তুচ্ছজ্ঞান করে। আল্লাহ তাকে যে নেয়ামতে ডুবিয়ে রেখেছেন, একটি বারের জন্য হলেও সেটা সে অনুধাবন করে না। এজন্য দেখা যায়, খুব কম মানুষকেই ঐ রকম নেয়ামত দেওয়া হয়েছে এবং সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে দেখা যায় যে, তাদের উপর আল্লাহ অগণিত নিয়ামত দান করার পরও তাদের মাঝে হিংসার লেশমাত্র দেখা যায় না। আর হিংসা তো তারাই করে, যারা তাদের নিজের উপরে বর্ষিত নেয়ামতকে তুচ্ছজ্ঞান করে। যদি তুচ্ছজ্ঞান না করত, তাহলে সে কিছুতেই হিংসার মতো জঘন্য কাজে জড়াত না।
(১১) হিংসা এতটাই বিষাক্ত যে, তা ঈমানকে বরবাদ করে দেয়।
(১২) হিংসা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে আর অন্তরকে শক্ত করে দেয়। কারণ হিংসুক সর্বদা আল্লাহর নেয়ামতকে পর্যবেক্ষণ করে। যখনই তার সামনে অন্যের নেয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়, তখনই সে যেন তার চেহারায় চপেটাঘাত করে। এর ফলে সে নিজেকে আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর ইবাদত থেকে অনেক দূরে রাখে।
(১৩) হিংসায় রয়েছে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে গোপন রাখা এবং অন্যের গুণাবলিকে আড়াল করার স্বভাব। কারণ হিংসুকেরা এমনটাই করে। আপনি দেখতে পাবেন, যখন হিংসুকের সামনে প্রশংসিত ব্যক্তি সম্পর্কে ভালো কিছু বলা হয়, তখন সে বলে, হ্যাঁ, এটা ঠিক, সে ভালো, আল্লাহ যা চান তাই হয়, সে মানুষের উপকার করে থাকে। কিন্তু তার পরপরই সে কিছু ত্রুটি বা দোষ বর্ণনা করে, যেন তার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয় এবং তার চরিত্রের উপর কলঙ্কের কালো দাগ স্পষ্ট বুঝা যায়।
হিংসা মানব সমাজের জন্য একটি অভিশাপ। এটি শুধু বাহ্যিক ক্ষতি নয়; মানুষের অন্তরেরও ক্ষতি সাধন করে। তবে সদ্ভাব, সহানুভূতি ও ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। প্রতিটি মানুষ যদি তার অন্তরে শান্তি ও ভালোবাসা লালন করে, তাহলে হিংসার অন্ধকার দূর হয়ে সমাজে সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ আমাদেরকে হিংসার মতো জঘন্য কাজ থেকে বিরত রাখুন- আমীন!
হুসাইন আহমাদ
শিক্ষার্থী, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. ছহীহ আমরাযুল কুলূব ওয়া শিফাউহা, পৃ. ১৭।
[2]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯০৩।
