ছাদাক্বাতুল ফিত্বর কী?
রামাযান মাসের ছিয়ামকে যে কোনো ভুলভ্রান্তি হতে পবিত্র করার জন্য প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষ থেকে এক ছা‘ পরিমাণ বিশেষ খাদ্যদ্রব্য রামাযানের শেষে ও ঈদের ছালাতের পূর্বে দান করাকে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর বা যাকাতুল ফিত্বর বলা হয়।[1]
ফিৎরা আদায়ের উদ্দেশ্য :
দু’টি উদ্দেশ্যে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ফরয হিসাবে প্রদান করতে হবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلاَةِ فَهِىَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلاَةِ فَهِىَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ.
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিয়াম পালনকারীদের অপ্রয়োজনীয় কার্যকলাপ ও অশ্লীল বাক্যালাপের পাপ থেকে পবিত্রকরণের জন্যে এবং দুঃস্থ মানবতার খাবারের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পূর্বে আদায় করবে, তা ছাদাক্বায়ে ফিত্বর হিসাবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পরে আদায় করবে, তা সাধারণ ছাদাক্বাহ হিসাবে গণ্য হবে।[2]
ফিৎরা ফরয হিসাবে প্রদান করতে হবে :
ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করা ফরয। হাদীছে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رضى الله عنهما قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ، وَالذَّكَرِ وَالأُنْثَى، وَالصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ، وَأَمَرَ بِهَا أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلاَةِ.
ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রত্যেক স্বাধীন, গোলাম, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসাবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক ছা‘ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের ছালাতের পূর্বেই আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।[3]
উক্ত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয়, ছাদাক্বাতুল ফিত্বর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য ফরয করেছেন এবং তা ঈদের ছালাতে বের হওয়ার পূর্বেই আদায় করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। অতএব কেউ ঈদের ছালাতের পরে আদায় করলে তা ফিৎরা হিসাবে গণ্য হবে না; বরং তা ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণিত হাদীছ অনুযায়ী সাধারণ ছাদাক্বাহ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণিত হাদীছেওقَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلاَةِ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হলো, ‘লোকদের ঈদের ছালাতে বের হওয়ার পূর্বে’।
ফিৎরার পরিমাণ এক ছা‘ :
ফিৎরা আদায়ের পরিমাণ এক ছা‘ অর্থাৎ আড়াই কেজি বা তার চেয়ে কিছু বেশী। হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِى سَعِيدٍ رضى الله عنه قَالَ كُنَّا نُطْعِمُ الصَّدَقَةَ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ
আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা এক ছা‘ পরিমাণ যব দ্বারা ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতাম।[4]
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ.
আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক ছা‘ পরিমাণ খাদ্য অথবা এক ছা‘ পরিমাণ যব অথবা এক ছা‘ পরিমাণ খেজুর অথবা এক ছা‘ পরিমাণ পনির অথবা এক ছা‘ পরিমাণ কিসমিস দিয়ে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতাম।[5]
উক্ত হাদীছ দু’টিসহ অন্যান্য হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, খাদ্যদ্রব্য থেকে এক ছা‘ পরিমাণ ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতে হবে। আর খাদ্যদ্রব্য থেকে এক ছা‘ পরিমাণ ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করা ছিল ছাহাবীদের আমল। অত্রএব এক ছা‘ পরিমাণ অর্থাৎ আড়াই কেজি খাদ্যদ্রব্য থেকেই ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করা উচিত।
অর্ধ ছা‘ ফিৎরা দেওয়া যাবে কি না?
হাদীছে এসেছে,
عَنْ نَافِعٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ قَالَ أَمَرَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم بِزَكَاةِ الْفِطْرِ، صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ. قَالَ عَبْدُ اللَّهِ رضى الله عنه فَجَعَلَ النَّاسُ عِدْلَهُ مُدَّيْنِ مِنْ حِنْطَةٍ.
নাফে‘ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসাবে এক ছা‘ পরিমাণ খেজুর বা এক ছা‘ পরিমাণ যব দিয়ে আদায় করতে নির্দেশ দেন। আব্দুল্লাহ বলেন, অতঃপর লোকেরা যবের সমপরিমাণ হিসাবে দু’মুদ (অর্ধ ছা‘) গম আদায় করতে থাকে।[6] হাদীছে আরও বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَبِى سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ رضى الله عنه قَالَ كُنَّا نُعْطِيهَا فِى زَمَانِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم صَاعًا مِنْ طَعَامٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ، فَلَمَّا جَاءَ مُعَاوِيَةُ وَجَاءَتِ السَّمْرَاءُ قَالَ أُرَى مُدًّا مِنْ هَذَا يَعْدِلُ مُدَّيْنِ.
আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এক ছা‘ খাদ্যদ্রব্য বা এক ছা‘ খেজুর বা এক ছা‘ যব বা এক ছা‘ কিসমিস দিয়ে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতাম। মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে যখন গম আমদানী হলো, তখন তিনি বললেন, এক মুদ গম।[7]
সকল প্রকার খাদ্যদ্রব্য থেকে এক ছা‘ পরিমাণ ফিৎরা দিতে হবে। এটাই বিভিন্ন ছহীহ হাদীছের দাবী এবং নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও চার খলীফার যুগের বাস্তব আমল। মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফতকালে যখন সেখানে গম আমদানী হলো তখন তিনি বললেন, আমার মতে গমের এক মুদ (অন্য বস্তুর) দু’মুদের সমান। তিরমিযীর বর্ণনায় আছে,
فَعَدَلَ النَّاسُ إِلَى نِصْفِ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ
‘লোকেরা গমের অর্ধ ছা‘-এর সাথে অন্য বস্তুর এক ছা‘-এর হিসাব করলেন’।[8] অতএব বুঝা যায় যে, এক ছা‘ খেজুর, কিসমিস, পনির, যব এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের যে মূল্য ছিল সে পরিমাণ মূল্য ছিল অর্ধ ছা‘ গমের। সে কারণে মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু অর্ধ ছা‘ ফিৎরা আদায়ের ফৎওয়া দিয়েছেন। কিন্তু ছাহাবীদের অনেকেই তার প্রতিবাদ করেছেন। যেমন আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিবাদ করে বলেছেন,
فَأَمَّا أَنَا فَلاَ أَزَالُ أُخْرِجُهُ كَمَا كُنْتُ أُخْرِجُهُ أَبَدًا مَا عِشْتُ.
‘আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন সর্বদা ঐভাবেই ফিৎরা আদায় করব, যেভাবে আগে আদায় করতাম’।[9]
ইমাম হাকেম রাহিমাহুল্লাহ ও ইবনু খুযায়মাহ রাহিমাহুল্লাহ ছহীহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন,
عَنْ عِيَاضِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ، قَالَ: قَالَ أَبُو سَعِيدٍ وَذُكِرَ عِنْدَهُ صَدَقَةُ الْفِطْرِ، فَقَالَ: «لَا أُخْرِجُ إِلَّا مَا كُنْتُ أُخْرِجُهُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ حِنْطَةٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ» . فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: أَوْ مُدَّيْنِ مِنْ قَمْحٍ؟ فَقَالَ: «لَا، تِلْكَ قِيمَةُ مُعَاوِيَةَ، لَا أَقْبَلُهَا وَلَا أَعْمَلُ بِهَا».
ইয়ায ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তার নিকট রামাযানের ছাদাক্বাহ সম্পর্কে বর্ণনা করা হলে তিনি বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় যে পরিমাণ ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতাম, তা ব্যতীত অন্যভাবে বের করব না। এক ছা‘ খেজুর, এক ছা‘ গম, এক ছা‘ যব, এক ছা‘ পনির। ক্বওমের মধ্যে কোনো একজন ব্যক্তি প্রশ্ন করল, গমের দু’মুদ দ্বারা কি আদায় হবে না? আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, না। এটা মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মূল্য নির্ধারণ। আমি সেটা গ্রহণ করব না; বাস্তবায়নও করব না।[10]
ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যারা মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কথামতো গমের দু’মুদ বা অর্ধ ছা‘ আদায় করাকে গ্রহণ করেছে, তাতে ত্রুটি রয়েছে। কেননা এ ব্যাপারে ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্য ছাহাবী বিরোধিতা করেছেন, যারা দীর্ঘ সময় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন এবং তারা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবগত ছিলেন। মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের রায় দিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনে বলেননি। আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীছে ইত্তিবা‘ ও সুন্নাত গ্রহণের প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।[11]
খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে অর্থ দিয়ে ফিৎরা আদায় :
খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে অর্থ দিয়ে ফিৎরা আদায় করলে তা ফিৎরা হিসাবে গণ্য হবে না। কারণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবীদের আমল ছিল খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করা। অথচ তখনও মুদ্রা দীনার ও দিরহামের প্রচলন ছিল। কিন্তু নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তাঁর ছাহাবীগণ জীবনে একবার অর্থ দিয়ে ফিৎরা আদায় করেছেন, এই মর্মে কোনো ছহীহ হাদীছ পাওয়া যায় না। এতদসত্ত্বেও কিছু যেদী আলিম ও তাদের মুরীদগণ অর্থ দিয়ে ফিৎরা আদায়ের ফৎওয়া দিয়ে থাকেন এবং ছহীহ আক্বীদাপন্থীদের সমালোচনা করেন। খাদ্যদ্রব্য দিয়েই ফিৎরা আদায় করতে হবে, এটাই সুন্নাত।
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশানুযায়ী খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতে হবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
عَنْ نَافِعٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ قَالَ أَمَرَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم بِزَكَاةِ الْفِطْرِ، صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ.
নাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসাবে এক ছা‘ পরিমাণ খেজুর বা এক ছা‘ পরিমাণ যব দিয়ে আদায় করতে নির্দেশ দেন।[12] ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তার স্বীয় কিতাব ছহীহ বুখারীর মধ্যে যত হাদীছ এনেছেন ও সকল হাদীছের কিতাবে যত হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, সমস্ত হাদীছের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিৎরা আদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবীদের আমল ছিল এক ছা‘ খেজুর, এক ছা‘ কিসমিস, এক ছা‘ যব, এক ছা‘ পনির দিয়ে ফিৎরা আদায় করা। আর এগুলো আরব দেশের প্রধান খাদ্য ছিল। বর্তমানে আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য চাল অথবা কারও কাছে গম। তাই আমাদেরকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারী হিসাবে প্রধান খাদ্যদ্রব্য চাল অথবা গম দিয়ে ফিৎরা আদায় করা উচিত।
উল্লেখ্য, কেউ সারা জীবন ভাত খেয়ে আসছে কিন্তু ফিৎরা আদায়ের সময় গম দিয়ে অথবা গমের মূল্য দিয়ে ফিৎরা আদায় করে। কারণ গমের মূল্য কম, চালের মূল্য বেশি। এই মানসিকতা নিয়ে ফিৎরা আদায় করলে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং এর পরিণতি পরকালে কঠিন ও ভয়াবহ হবে। কারণ সে ইসলামকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
ফিৎরা আদায়ের সময় :
ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ঈদের ছালাতে লোকদের বের হবার পূর্বে আদায় করা সুন্নাত। কারণ হাদীছে ইরশাদ হয়েছে, ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, প্রত্যেক দাস, স্বাধীন, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসাবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক ছা‘ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের ছালাতে বের হবার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।[13] হাদীছে আরও উল্লেখ আছে,
عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ يُعْطِى عَنِ الصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ رضى الله عنهما يُعْطِيهَا الَّذِينَ يَقْبَلُونَهَا، وَكَانُوا يُعْطُونَ قَبْلَ الْفِطْرِ بِيَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ.
নাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছোট এবং বড় সবার পক্ষ থেকে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করতেন। এমনটি তিনি আমার সন্তানের পক্ষ থেকেও আদায় করতেন। আর ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে দিতেন, যারা তা গ্রহণ করত এবং তারা ঈদুল ফিত্বরের একদিন বা দু’দিন পূর্বে আদায় করতেন।[14] আরেকটি হাদীছে এসেছে,
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিয়াম পালনকারীদের অপ্রয়োজনীয় কার্যকলাপ ও অশ্লীল বাক্যালাপের পাপ থেকে পবিত্রকরণের জন্য এবং দুঃস্থ মানবতার খাবারের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পূর্বে আদায় করবে, তা ছাদাক্বাতুল ফিত্বর হিসাবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পরে আদায় করবে, তা সাধারণ ছাদাক্বাহ হিসাবে গণ্য হবে।[15]
উপর্যুক্ত তিনটি বিশুদ্ধতম হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয়, ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ঈদের দিন সকালে ছালাতে বের হওয়ার পূর্বে আদায় করা সবচেয়ে ভালো। ঈদের আগে সর্বোচ্চ একদিন বা দুইদিন আগে আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, ঈদের ছালাতের পরে আদায় করলে সাধারণ ছাদাক্বাহ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
ফিৎরার হক্বদার কারা :
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلاَةِ فَهِىَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلاَةِ فَهِىَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ.
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিয়াম পালনকারীদের অপ্রয়োজনীয় কার্যকলাপ ও অশ্লীল বাক্যালাপের পাপ থেকে পবিত্রকরণের জন্যে এবং দুঃস্থ মানবতার খাবারের উদ্দেশ্যে যাকাতুল ফিত্বর ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পূর্বে আদায় করবে, তা ছাদাক্বায়ে ফিত্বর হিসাবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পরে আদায় করবে, তা সাধারণ ছাদাক্বাহ হিসাবে গণ্য হবে।[16]
একদল উলামায়ে কেরাম এ হাদীছের আলোকে বলেছেন, ছাদাক্বাতুল ফিত্বরের খাত একটাই; তা হচ্ছে, গরীব-মিসকীন। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ, আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম, শায়খ উছাইমীন, শায়খ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ এ মতের পক্ষে। সঊদী আরবের ফতওয়া বোর্ডের স্থায়ী কমিটি ‘ফাতাওয়াল লাজনা আদ-দায়েমাহ’ও এ মত দিয়েছেন।
অপরদিকে, ইমাম শাওক্বানী রাহিমাহুল্লাহ ও কিছু ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য হলো, যাকাতের হক্বদার হলো মোট আট শ্রেণীর ব্যক্তি। সুতরাং ছাদাক্বাতুল ফিত্বর ঐ আটটি খাতে ব্যয় করতে হবে। কেননা ছাদাক্বাতুল ফিত্বরকে বুখারী ও মুসলিম এর বিভিন্ন হাদীছে যাকাতুল ফিত্বর নামে উল্লেখ করা আছে। যেমন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
فَمَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلاَةِ فَهِىَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ.
‘যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের পূর্বে ছাদাক্বাতুল ফিত্বর আদায় করবে তার যাকাত কবুল হবে’।[17] এখানে ফিৎরাকে যাকাত নামে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও উল্লেখ আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
أَمَرَ النَّبِىُّ - صلى الله عليه وسلم - بِزَكَاةِ الْفِطْرِ
‘নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতুল ফিত্বর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন’।[18]
উক্ত হাদীছ দু’টি থেকে প্রমাণিত হয় যে, ছাদাক্বাতুল ফিত্বরও যাকাতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যাকাতের হক্বদার যারা হবে, ছাদাক্বাতুল ফিত্বরের হক্বদারও তারাই হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
‘(ফরয) ছাদাক্বাগুলো তো হচ্ছে শুধুমাত্র ফক্বীর মিসকীনদের জন্য, আর এই ছাদাক্বাহ (আদায়ের) জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং যাদের মন রক্ষা করতে (অভিপ্রায়) হয় (তাদের), আর দাস মুক্ত করার কাজে এবং ঋণগ্রস্তদের (হাওলাত পরিশোধে), আল্লাহর রাস্তায় আর মুসাফিরদের সাহায্যার্থে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে ফরয (নির্ধারিত), আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী অতি প্রজ্ঞাময়’ (তওবাহ, ৬০)।
পরিশেষে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ অনুসারে ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করার তাওফীক্ব দান করো, যেন ছাদাক্বাতুল ফিত্বর কবুল হয় ও আদায়ের উদ্দেশ্য যথাযথভাবে সফল হয়। আমীন!
[1]. ফিক্বহুল হাদীছ, ১/৭০৩।
[2]. আবুদাঊদ, হা/১৬০৯; মিশকাত, হা/১৮১৮।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; মিশকাত, হা/১৮১৫।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৫।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৫; মিশকাত, হা/১৮১৬।
[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৭।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৮; নাসাঈ, হা/২৫৮১৩।
[8]. তিরমিযী, হা/৬৭৫।
[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩১; ইবনে মাজাহ, হা/১৮২৯।
[10]. মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৯৫।
[11]. ফাতহুল বারী, ৩/৪৩৮; মুসলিম শরহে নববী, ১/৩১৭- ৩১৮।
[12]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৭।
[13]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৮৪; মিশকাত, হা/১৮১৫।
[14]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫১১।
[15]. মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৪৮৮।
[16]. আবুদাঊদ, হা/১৬০৯; মিশকাত, হা/১৮১৮।
[17]. ইবনে মাজাহ, হা/১৮২৭।
[18]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫০৭।
