মানব-ইচ্ছাশক্তি ও আল্লাহর কুদরতের ভারসাম্য:
কুরআনের নির্দেশনা ও ইসলামী তফসীরসমূহ মানবজীবনের এক গভীর সত্য উন্মোচন করে— আল্লাহর সার্বভৌম কুদরত ও মানুষের ইচ্ছাশক্তির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম, কিন্তু অর্থবহ ভারসাম্য বিদ্যমান। অনেকেই প্রশ্ন করেন, যদি সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়, তবে মানুষের স্বাধীনতা ও কর্মের গুরুত্ব কোথায়? ইসলামী আক্বীদা এই আপাত দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট ও যুক্তিসংগতভাবে সমাধান করে। আল্লাহ তাআলা সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রক। তিনি মানুষকে দিয়েছেন ইচ্ছাশক্তি (إرادة) ও নির্বাচনক্ষমতা (اختيار), যার মাধ্যমে সে সৎ ও অসৎ পথের মধ্যে বেছে নিতে পারে এবং সে তার সিদ্ধান্তের জন্য দায়বদ্ধ থাকে। আল্লাহ বলেন,فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ ‘যে চায়, সে ঈমান আনুক আর যে চায়, সে কুফরী করুক’ (আল-কাহফ, ১৮/২৯)। এই আয়াত মানুষকে তার স্বাধীন ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বীকৃতি দেয়। তবে একই সঙ্গে আল্লাহ আরও বলেন,وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ ‘তোমরা কিছুই ইচ্ছা করতে পার না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন’ (আল-ইনসান, ৭৬/৩০)। অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছা বাস্তব ও কার্যকর, কিন্তু তা সর্বশেষে আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছার সীমার মধ্যে পরিচালিত হয়। এখানেই নিহিত রয়েছে ঈমান ও কর্মের গভীর সমন্বয়।
আল্লাহর কুদরত অসীম, তবুও মানুষের নৈতিক সিদ্ধান্ত, আত্মপরিশোধন ও কর্ম সেই কুদরতের পরিকল্পনারই অংশ। সমাজে পরিবর্তন, উত্থান-পতন ও বরকত বা বিপদের আবির্ভাব কেবল আল্লাহর ইচ্ছার ফল নয়; বরং মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও নৈতিক আচরণের সঙ্গে তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। অতএব, মানব-বিশ্বাস, নৈতিকতা, চিন্তা ও আচরণই তার ভাগ্য ও সমাজের বাস্তবতার নিয়ামক।
ইতিহাসের সাক্ষ্য:
ইতিহাস মানব-ইচ্ছাশক্তি, নৈতিকতা ও আল্লাহর কুদরতের পারস্পরিক সম্পর্কের জীবন্ত দলীল। কুরআন ও তাফসীরসমূহে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, কোনো জাতির উন্নতি বা পতন তাদের ঈমান, নৈতিকতা ও কর্মের সরাসরি প্রতিফলন।
অতীতের বহু জাতি তথা আদ, ছামূদ, ফেরাউন ও বনী ইসরাঈল এই চিরন্তন নীতির সাক্ষ্য বহন করে। তারা যখন সত্য, ন্যায় ও তাক্বওয়ার পথে অটল ছিল; তখন আল্লাহ তাদের শক্তি, বরকত ও নেতৃত্ব দান করেছিলেন। কিন্তু যখন তারা অবাধ্যতা, যুলম ও ভোগবিলাসে নিমগ্ন হলো—তখন সেই বরকত ও মর্যাদা তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো।
আল্লাহ তাআলা বলেন,فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً ‘তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমরা তাদের অভিশপ্ত করলাম এবং তাদের হৃদয় কঠোর করে দিলাম’ (আল-মায়েদাহ, ৫/১৩)। আর আদ সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেন, فَأَمَّا عَادٌ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ... فَأَهْلَكَهُمُ اللَّهُ بِرِيحٍ صَرْصَرٍ ‘তারা পৃথিবীতে অহংকার করল... অতঃপর আল্লাহ তাদের প্রবল ঝঞ্ঝাবাতাসে ধ্বংস করলেন’ (আল-হাক্কাহ, ৬৯/৬-৭)।
আর যে জাতি আল্লাহভীরু ও ন্যায়পরায়ণ, তারাই নেতৃত্ব ও বরকতের অধিকারী হয় আর যারা অন্যায় ও ভোগবাদে নিমগ্ন, তারা হারায় সম্মান, শান্তি ও আল্লাহর অনুগ্রহ। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও যমীন থেকে বরকতের দ্বার উন্মুক্ত করে দিতাম’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৯৬)।
ইসলামের ইতিহাসও একই সত্য প্রতিফলিত করে। মুসলিমরা যখন কুরআনের বিধান মেনে ন্যায় ও তাক্বওয়ার পথে ছিল, তারা হয়েছিল জ্ঞান ও নেতৃত্বের অগ্রদূত। আর অবাধ্যতা ও বিভেদে লিপ্ত হলে, তারা হারিয়েছে শক্তি ও মর্যাদা। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ ‘নিশ্চয়ই এই পৃথিবী আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করবে’ (আল-আম্বিয়া, ২১/১০৫)। তিনি আরও বলেন,إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ‘নিশ্চয়ই পৃথিবী আল্লাহর, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন আর পরিণাম তাদের জন্য, যারা আল্লাহভীরু’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১২৮)।
কৃতজ্ঞতার ফল ও নেয়ামতের বৃদ্ধি:
আল্লাহ তাআলা কৃতজ্ঞ বান্দাকে শুধু বস্তুগত নেয়ামতে নয়, বরং আত্মিক প্রশান্তি, ঈমানের দৃঢ়তা ও সমাজে বরকতের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব জাতি ঈমান ও তাক্বওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল, তারা পেয়েছিল স্থায়িত্ব, জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও ঐক্য। যেমন- নবী দাঊদ ও সুলায়মান আলাইহিমাস সালাম-এর যুগে বনূ ইসরাঈল কৃতজ্ঞতার ফলে পেয়েছিল সমৃদ্ধি ও নেতৃত্ব। আল্লাহ তাআলা তাদের উদ্দেশ্যে বলেন,اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ ‘হে দাঊদ পরিবার! কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আমল করো আর আমার কৃতজ্ঞ বান্দা খুবই অল্প’ (সাবা, ৩৪/১৩)। এই আয়াত নির্দেশ করে যে, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা শুধু কথায় নয়; বরং কর্মে, যেখানে মানুষ তার প্রাপ্ত অনুগ্রহকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে এবং আত্মার উন্নয়ন সাধন করে।
কৃতজ্ঞতা যে কেবল ব্যক্তিগত জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনে তা নয়; বরং জাতির নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। আল্লাহ তাআলা বলেন,لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি তোমাদেরকে আরও বেশি দান করব’ (ইবরাহীম, ১৪/৭)।
এখানে কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের প্রশংসা নয়; বরং আল্লাহর আদেশ মেনে চলা, নেয়ামতের মূল্যায়ন করা এবং ন্যায় ও সত্যের পথে অটল থাকা। কৃতজ্ঞ জাতি আল্লাহর নেয়ামত রক্ষা করে, নৈতিকভাবে দৃঢ় থাকে এবং সমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে আল্লাহ তাদের নেয়ামত, শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
অন্যদিকে যে জাতি অকৃতজ্ঞ, অবাধ্য ও অনৈতিকতায় লিপ্ত হয়, তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাদের জীবনে বিপদ, বিভাজন ও পতন নেমে আসে। কুরআনে বলা হয়েছে,ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً... فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ ‘আল্লাহ একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন, যা ছিল নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ... কিন্তু তারা আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হলো, ফলে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষুধা ও ভয়ের পোশাক পরিয়ে দিলেন তাদের কর্মের কারণে’ (আন-নাহল, ১৬/১১২)। অকৃতজ্ঞতার ফলে আল্লাহর অনুগ্রহ বিলুপ্ত হয়, সমাজে নৈতিক দুর্বলতা ও বিভাজন দেখা দেয় এবং জাতি ধীরে ধীরে তাদের অস্তিত্বের ভারসাম্য হারায়।
আত্মপরিবর্তনের প্রক্রিয়া কৃতজ্ঞতা থেকেই শুরু হয়। যে ব্যক্তি বা জাতি নিজের প্রাপ্ত অনুগ্রহকে স্বীকার করে, তা সঠিক পথে ব্যবহার করে এবং আল্লাহর কাছে বিনয় প্রকাশ করে; সেই প্রকৃতপক্ষে আত্মিক ও সামাজিক উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। কৃতজ্ঞতা মানুষের অন্তরে নম্রতা, দায়িত্ববোধ ও আশা জাগায়, যা তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় করে তোলে। ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শোকর এমন এক ঈমানী স্তর, যা মানুষের অন্তরকে আল্লাহর অনুগ্রহে দৃঢ় করে এবং অকৃতজ্ঞতার অন্ধকার থেকে তাকে মুক্তি দেয়।[1]
মানুষের ইচ্ছা ও আল্লাহর কদর:
শায়খ ইবনু বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মানুষকে বুদ্ধি, ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা নিজের জন্য কল্যাণ বা অকল্যাণ বেছে নিতে পারে, তবে তার জীবনের কোনো ঘটনাই আল্লাহর কদরের বাইরে নয়— এ বক্তব্য দ্বারা তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহর পূর্বনির্ধারণ সত্য হলেও মানুষ নিজের কর্মের জন্য দায়ী। কারণ আল্লাহ তাকে সঠিক ও ভুল উভয় পথই দেখিয়েছেন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন কোনো প্রাণ নেই, যার জান্নাত বা জাহান্নামে অবস্থান নির্ধারিত নয়’। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমরা কাজ করব কেন? আমরা কি (লিখিত নিয়তির উপর) নির্ভর করব না? তিনি বললেন, ‘না, তোমরা কাজ করো। কারণ প্রত্যেকের জন্য সেই পথই সহজ করে দেওয়া হয়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে’।[2] এরপর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াতগুলো পাঠ করলেন,فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى-وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى-فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى-وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى-وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى-فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى ‘যে ব্যক্তি দান করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং উত্তম প্রতিদানের প্রতি বিশ্বাস রাখে— আমরা তার জন্য সহজ করে দেব উত্তম পথ। আর যে কৃপণতা করে, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে এবং উত্তম প্রতিদানকে অস্বীকার করে— আমরা তার জন্য সহজ করে দেব কঠিন পথ’ (আল-লায়ল, ৯২/৫–১০)।
উক্ত আয়াতসমূহ ও নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ এক গভীর সত্য উন্মোচন করেছে যে, মানুষের কর্ম আল্লাহর নির্ধারণের বাইরে নয়; বরং আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে তার অন্তর্নিহিত প্রবণতা, উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পথ সহজ করে দেন। যে ব্যক্তি সত্য, তাক্বওয়া ও ন্যায়ের পথে চলার সংকল্প গ্রহণ করে, আল্লাহ তার জন্য সে পথকে সহজ ও সুগম করে দেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপ, অবাধ্যতা ও অবিশ্বাসের পথ বেছে নেয়, আল্লাহ তার জন্য সেই বিপথগামী পথকেই সহজ ও স্বাভাবিক করে দেন।
অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছা ও আল্লাহর কদরের মধ্যে বিরোধ নেই, বরং পরিপূরক সম্পর্ক বিদ্যমান। মানুষ তার অন্তরের নিয়্যত ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ অর্জন করতে পারে, আর আল্লাহ তার আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতিদানে তার জন্য উত্তম পথ উন্মুক্ত করে দেন।
পাপের পরিণতি ও তওবার প্রভাব:
ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, পাপের সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো- এটি মানুষকে আল্লাহর নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করে এবং বিপদ ও অশান্তির দরজা খুলে দেয়। মানুষের কাছ থেকে কোনো নেয়ামত কেড়ে নেওয়া হয় না, যতক্ষণ না সে গুনাহ করে এবং কোনো বিপদ নেমে আসে না, যতক্ষণ না পাপ সংঘটিত হয়। এই নীতি কেবল অতীতের ইতিহাস নয়, আজও মানব-সভ্যতার প্রতিটি স্তরে এর প্রতিফল স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
যখন সমাজে অন্যায়, অবিচার, গাফেলতি ও নৈতিক অধঃপতন বৃদ্ধি পায়, তখন আল্লাহর রহমত ও শান্তির ছায়া সরে যায় এবং শান্তি ও নিরাপত্তার স্থানে নেমে আসে ভয়, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। কিন্তু যখন মানুষ তওবা করে, নিজের অন্তরকে বিশুদ্ধ করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন আল্লাহও তার রহমতের দরজা খুলে দেন। অন্তরের পরিবর্তনই বাহ্যিক পরিবর্তনের সূচনা করে। আল্লাহর বিধান হলো,ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَىٰ قَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ‘আল্লাহ কোনো জাতির উপর যে নেয়ামত দান করেছেন, তা ততক্ষণ কেড়ে নেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অন্তর পরিবর্তন করে’ (আল-আনফাল, ৮/৫৩)। অতএব, মানুষের কল্যাণ বা দুর্দশা তার নিজের হাতের কর্মফল। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন,وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ‘তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের হাতের কর্মের ফল; তবে তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন’ (আশ-শূরা, ৪২/৩০)।
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অমূল্য বাণী এ সত্যকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে যে, কোনো বিপদ আসে না পাপ ছাড়া এবং কোনো বিপদ দূর হয় না তওবা ছাড়া। এই উক্তিটি মানবজীবনের এক গভীর ও অনড় সত্যকে প্রকাশ করে— যখন মানুষ পাপে নিমজ্জিত হয়, তখন তার জীবন থেকে প্রশান্তি, বরকত ও আল্লাহর অনুগ্রহ ধীরে ধীরে সরে যায়। কিন্তু যখন সে আন্তরিক তওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ তাআলা তার অবস্থা পরিবর্তন করে দেন— দুরবস্থা থেকে সমৃদ্ধিতে, বিপদ থেকে শান্তিতে, অপমান থেকে মর্যাদায়। তওবা-ই মানুষের জীবনে নবজাগরণের সূচনা করে, এটি মুছে দেয় অন্ধকার অতীতের কলঙ্ক, পরিশুদ্ধ করে হৃদয় এবং ফিরিয়ে আনে আল্লাহর সান্নিধ্যের সেই মধুর প্রশান্তি, যা সকল সুখ-সমৃদ্ধির মূল উৎস।
আল্লাহর বিলম্ব মানে ভুলে যাওয়া নয়:
অনেকেই মনে করে, আল্লাহ তাআলা গুনাহগারদের সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেন না বলেই হয়তো তিনি গাফেল বা উদাসীন। কিন্তু না, আল্লাহ কখনো গাফেল নন। তাঁর বিলম্ব করা মানে ভুলে যাওয়া নয়; বরং তা মানুষের জন্য এক ধরনের পরীক্ষা ও অবকাশ। আল্লাহ তাআলা সময় দেন, সুযোগ দেন। কারণ তিনি দেখতে চান, মানুষ এই স্বাধীনতাকে কি সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে ব্যবহার করে, নাকি তা দিয়ে অন্যায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও অহংকারের পথে এগিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন,وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ ‘তুমি মনে করো না যে, আল্লাহ যালেমদের কর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ। তিনি কেবল তাদেরকে ঐ দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন চোখগুলো আতঙ্কে স্থির হয়ে যাবে’ (ইবরাহীম, ১৪/৪২)। যদি সে এই অবকাশকে ভুলভাবে ব্যবহার করে, তবে সেই সুযোগই একসময় তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ আয়াত স্পষ্ট করে যে, আল্লাহর অবকাশ কোনো অনুমোদন নয়; বরং এটি এক কঠিন পরীক্ষার সূচনা। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যালেমকে অবকাশ দেন; কিন্তু যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন আর ছেড়ে দেন না’।[3] তাদেরকে পর্যায়ক্রমে শাস্তির আওতায় আনেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ ‘আমি ধীরে ধীরে তাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাব এমনভাবে, যা তারা বুঝতেও পারবে না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৮২)। অতএব, আল্লাহর দেরি করা তাঁর করুণা ও প্রজ্ঞার অংশ। তিনি মানুষকে সুযোগ দেন, যেন সে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে; কিন্তু যদি সে ফিরে না আসে, তবে আল্লাহর বিচার অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং তখন আর কোনো অবকাশের সুযোগ থাকে না।
অর্থাৎ আল্লাহ কাউকে প্রদত্ত নেয়ামত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না সে নিজেই নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে। যখন মানুষ আনুগত্য ত্যাগ করে অবাধ্যতার পথে চলে যায়, কৃতজ্ঞতার স্থলে অকৃতজ্ঞ হয়, তখন আল্লাহও তার অবস্থা পরিবর্তন করেন অর্থাৎ বরকতের স্থলে সংকট, শান্তির স্থলে অশান্তি, সম্মানের স্থলে অপমান নেমে আসে। এটি তাদেরই কর্মের ন্যায়সংগত প্রতিফল তথা যা তারা করেছে, তারই যথাযথ ফল তারা পেয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কারও প্রতি বিন্দুমাত্রও অন্যায় করেন না।
তওবার আলোয় জীবনের নবজাগরণ:
মানুষের অন্তরের পরিবর্তন ছাড়া বাহ্যিক উন্নয়ন সম্ভব নয়—এই নীতি কুরআন ও হাদীছে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَمَا أَنْتَ بِمُغَيِّرٍ مَّا بِقَوْمٍ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ وَهُمْ أَنْ يَجِدُواْ مِن دُونِهِ وَكِيلًا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অন্তর পরিবর্তন করে। আর যখন আল্লাহ কোনো জাতির জন্য অকল্যাণ ইচ্ছা করেন, তখন তা রোধ করার কেউ নেই এবং তারা আল্লাহ ব্যতীত কোনো অভিভাবক পায় না’ (আর-রা‘দ, ১৩/১১)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের অন্তরে সংশোধন, নৈতিকতার পুনঃস্থাপন এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথে ফিরে আসে, আল্লাহ তার বাহ্যিক অবস্থাও পরিবর্তন করে দেন অর্থাৎ শাস্তি, বিপদ ও কষ্টকে পরিণত করেন নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও মর্যাদায়। এই নীতি আল্লাহর সুন্নাহ, যা যুগ যুগ ধরে সকল মানবজাতির জন্য কার্যকর।
عنْ أبي حَمْزَةَ أَنَس بن مَالِكٍ الأَنْصَارِيِّ خَادِمِ رسول االله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رضي االله عنه قال قال رسول االله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ للَّهُ أَفْرحُ بتْوبةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِآُمْ سقطَ عَلَى بعِيرِهِ وقد أَضلَّهُ في أَرضٍ فَلاةٍ.
আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাদেম, আবূ হামযা আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দা তওবা করার জন্য ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বেশি আনন্দিত হন, যে তার উট জঙ্গলে হারিয়ে ফেলার পর পুনরায় ফিরে পায়’।[4]
ছহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এভাবে এসেছে যে,
لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلاَةٍ فَانْفَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَأَيِسَ مِنْهَا فَأَتَى شَجَرَةً فَاضْطَجَعَ فِى ظِلِّهَا قَدْ أَيِسَ مِنْ رَاحِلَتِهِ فَبَيْنَا هُوَ كَذَلِكَ إِذَا هُوَ بِهَا قَائِمَةً عِنْدَهُ فَأَخَذَ بِخِطَامِهَا ثُمَّ قَالَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ اللَّهُمَّ أَنْتَ عَبْدِى وَأَنَا رَبُّكَ. أَخْطَأَ مِنْ شِدَّةِ الْفَرَحِ.
‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তওবায় যখন সে তওবা করে তোমাদের সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশি খুশি হন, যে তার বাহনের উপর চড়ে কোনো মরুভূমি বা জনহীন প্রান্তর অতিক্রমকালে বাহনটি তার নিকট থেকে পালিয়ে যায় আর খাদ্য ও পানীয় সব তার পিঠের উপর থাকে। অতঃপর বহু খোঁজাখুঁজির পর নিরাশ হয়ে সে একটি গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বাহনটি হঠাৎ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায়। সে তার লাগাম ধরে খুশির আতিশয্যে বলে ওঠে, হে আল্লাহ! তুমি আমার দাস আর আমি তোমার প্রভু! সীমাহীন খুশির কারণে সে ভুল করে ফেলে’।[5]
তওবা কেবল আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যম নয়, বরং এটি আত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রেরণা। যে ব্যক্তি বা জাতি অন্তর থেকে ফিরে আসে, তার জন্য আল্লাহ বরকত, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রেরণ করেন। অন্যদিকে যারা অবাধ্য থাকে, তারা আল্লাহর সুন্নাহ অনুসারে তাদের কৃতকর্মের কারণে বিপদের সম্মুখীন হয়। এভাবেই মানবজীবনে নৈতিক সংশোধন ও তওবা সর্বাধিক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার:
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতীয় পরিবর্তনের সূচনা অন্তর থেকেই হয়। মানুষ যদি আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, পাপ ও অবাধ্যতা ত্যাগ করে, ন্যায় ও তাক্বওয়ার পথে চলতে শুরু করে, তবে আল্লাহ তাঁর কৃপায় তাদের অবস্থা ও সমাজ পরিবর্তন করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ اللّهَ لاَ يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنْفُسِهِمْ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (আর-রা‘দ, ১৩/১১)।
একজন কবির হৃদয়স্পর্শী উপদেশও এ সত্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়, তিনি বলেন,
إِذَا كُنْتَ فِي نِعْمَةٍ فَارْعَهَا، فَإِنَّ الذُّنُوبَ تُزِيلُ النِّعَمَا
وَحُطَّهَا بِطَاعَةِ رَبِّ الْعِبَادِ، فَرَبُّ الْعِبَادِ سَرِيعُ النِّقَمَ
অর্থাৎ ‘যদি তুমি কোনো নেয়ামতে থাকো, তাহলে তা সংরক্ষণ করো, কারণ পাপ সেই নেয়ামতকে বিলীন করে দেয়। আর আল্লাহর আনুগত্যের প্রাচীর দিয়ে তাকে রক্ষা করো, কারণ বান্দাদের রব দ্রুত প্রতিফলন দেন’।
এতে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ যদি অন্তরের পরিবর্তন ঘটায়, তওবা করে, আল্লাহর আনুগত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসে; তবে নেয়ামত, শান্তি ও প্রাচুর্য ফিরে আসে। আর যদি কৃতঘ্নতা ও অবাধ্যতায় ডুবে থাকে; তবে বিপদ, দারিদ্র্য ও অস্থিরতা নেমে আসে।
সূরা আত-তাকভীরের আলোচ্য আয়াতসমূহ আল্লাহর পরম ক্ষমতা ও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির মাঝে গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে। মানুষ তার চিন্তা, ইচ্ছা ও কর্মের জন্য দায়ী; তবে সেই ইচ্ছা তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন তা আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। অতএব, আমাদের দায়িত্ব হলো আল্লাহর তাওফীক্ব প্রার্থনা করে সঠিক পথে চলা, নিজের অন্তর ও আচরণকে সংশোধন করা এবং সমাজে ন্যায়, তাক্বওয়া ও নৈতিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। তখনই আল্লাহ রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করেন এবং দান করেন শান্তি, প্রাচুর্য ও মর্যাদা। সত্যিই অন্তরের পরিবর্তনই ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের সূচনা করে।
-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল
প্রভাষক (আরবী), বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বরিশাল।
[1]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, সূরা আর-রা‘দ, ১৩/১১; আত-তাকভীর, ৮১/২৮–২৯; তাফসীর আস-সা‘দী, সূরা আর-রা‘দ, ১৩/১১।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৬২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৭।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৮৬।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩০৯।
[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৭।
