কুরআন সম্পর্কে একটি কথা আমরা সবাই সাধারণত জানি যে, কুরআন আল্লাহ তাআলা হেদায়াতের জন্য এবং মানুষকে ভ্রান্ত পথ থেকে সঠিক পথে নিয়ে আসার জন্য নাযিল করেছেন। কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন,إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ ‘নিশ্চয় এই কুরআন সেই পথের দিকনির্দেশ করে, যা সর্বাধিক সঠিক’ (আল-ইসরা, ১৭/৯)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ ‘নিশ্চয় তুমি যাকে ভালোবাস তাকে তুমি হেদায়াত দিতে পারবে না, বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন’ (আল-কাছাছ, ২৮/৫৬)।
মহান আল্লাহ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বার্তাবাহক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি মানুষকে খুশির ও ভয়ের সংবাদ দিবেন এবং সঠিক পথের দিকে দাওয়াত দিবেন। আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا * وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرً ‘হে নবী! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ হিসেবে’ (আল-আহযাব, ৩৩/৪৫-৪৬)। এই দুটি আয়াতে আল্লাহ রাসূলকে হেদায়েতের মালিক বলেননি। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন পবিত্র কুরআনের কথা বললেন, তখন উনি বললেন যে, পবিত্র কুরআন হচ্ছে মানুষের হেদায়াতের জন্য এবং তিনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একটা নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট একটা জীবনকাল দিয়ে পাঠালেন। তাঁর সময় ও জীবনের পরিধি শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আল্লাহ তাআলা তাকে এই দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিলেন, কিন্তু মানবজাতির হেদায়াতের জন্য মহান আল্লাহ কুরআনকে কিন্তু আমাদের সামনেই রেখে দিয়েছেন। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, কারো বিপথ থেকে সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য কুরআন পড়া এবং তা নিয়ে চিন্তা-গবেষণাই যথেষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন মূলত এখানেই তৈরি হয়, আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা সাধারণত সবাই কুরআন পড়ে এবং কুরআন পড়া জানে, কিন্তু তারপরও কেন তারা গুনাহের দিকে ও বিপথে অগ্রসরমান? উদাহরণস্বরূপ যদি বলি, যখন রামাযান মাস আসে তখন সাধারণত আমাদের মাঝে কুরআন পড়া অথবা কুরআন পাঠ করতে হবে এ জাতীয় আলোচনাগুলো বেশি আসায় অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমরা রামাযান মাসে একটু বেশি কুরআন পড়ি, আমাদের ব্যবসায়ীরা এই মাসে সবচেয়ে বেশি কুরআন পড়ে এবং দান-খায়রাত করে; তারপরও দেখবেন এই মাসে আমাদের দোকান মালিকরা অন্য সময়ের চেয়ে পণ্যের দাম বেশি নিচ্ছে, খাবার গুদামজাত করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। এর অর্থ কি এটা দাঁড়ায় না যে, এই কুরআন তেলাওয়াত তার হৃদয়ে সেই প্রভাব ফেলতে পারেনি, যার মাধ্যমে আমরা এই ধরনের যুলম থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখব? কুরআন তেলাওয়াত করলে মানুষ পথপ্রদর্শিত হয়, মানুষ সঠিক পথের দিশা পায়, মানুষ হেদায়াতের রাস্তায় আসে; কিন্তু সেটা বাস্তবে কেন হচ্ছে না? আমাদের সবার বাসাতেই বুকসেলফে কুরআন থাকে, কিন্তু আমাদের সবার জীবনটা কি কুরআন অনুযায়ী পরিচালিত হয়? আমরা সবাই কি আমাদের জীবনে কুরআনকে অনুসরণ করতে পারি?
এখানে একটি আয়াত বারবার আমার স্মরণে আসে এবং কুরআনের যে সমস্ত আয়াত অনেক বেশি গভীর, যেই আয়াতগুলো মানুষকে অনেক বেশি চিন্তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে সেই সমস্ত আয়াতের একটা আয়াত হচ্ছে, আল্লাহ বলেন,لَوْ أَنزَلْنَا هَٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ ‘যদি আমি এই কুরআন কোনো পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি অবশ্যই তাকে দেখতে পেতে সে আল্লাহর ভয়ে বিনম্র হয়ে গেছে এবং ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়েছে। আর এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে’ (আল-হাশর, ৫৯/২১)।
পাহাড়ের মতো একটা জড়বস্তু, বিশাল সৃষ্টি, হিমালয় পর্বতের কথা আপনি চিন্তা করুন, সে কত বিশাল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, কুরআন যদি এরকম বিশাল কোনো পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করা হতো, তাহলে এই কুরআনে মহান আল্লাহ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তাঁর যে পরিচয় এখানে দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তার সৃষ্টি সম্পর্কে যে কথাগুলো এখানে বলেছেন সেটা ওই পাহাড় বুঝার পরে এবং জানার পরে ভয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেত। অথচ আমরা মানুষ, আমরা জড়বস্তু নই, আমাদের বিবেক-বুদ্ধি সবকিছু থাকার পরেও যখন আমরা কুরআন তেলাওয়াত করি, কুরআন পাঠ করি; তখন আমরা কতদিন কুরআন তেলাওয়াত করে আল্লাহর ক্ষমতা ও দাম্ভিকতার কথা পড়ে ভয় পেয়েছি এবং আল্লাহর দয়া, জাহান্নাম ও জান্নাতের আলোচনা জেনে আমাদের চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়েছে? যেমন ক্বিয়ামতের ভয়ংকর বর্ণনায় আল্লাহ বলেন,يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا - فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا - لَا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْتًا ‘তারা তোমাকে পাহাড়সমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, আমার রব সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেবেন। তারপর তিনি যমীনকে সমতল প্রান্তর বানিয়ে দেবেন। তুমি সেখানে কোনো বক্রতা বা উঁচু-নিচু কিছুই দেখতে পাবে না (ত্বো-হা ২০/১০৫-১০৭)। আবার অন্যত্র তিনি বলেছেন, وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدتُّمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنطَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ خَلَقَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ‘তারা তাদের চামড়াকে বলবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে কেন? তারা বলবে, আমাদেরকে কথা বলিয়েছেন আল্লাহ, যিনি প্রত্যেক জিনিসকে কথা বলিয়েছেন। তিনিই তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, আর তাঁর দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (ফুছছিলাত, ৪১/২১)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ - وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ - وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ - لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ‘সেদিন মানুষ পালাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও তার বাবা থেকে এবং তার স্ত্রী ও তার সন্তানদের থেকে’ (আবাসা, ৮০/৩৪-৩৭)।
বিচার দিবসে হৃদয় প্রকম্পিতকারী এই বিবরণী পড়ার সময় কি আমরা বিন্দুমাত্র ভয় পাই? আমাদের হৃদয় নরম হয়? সত্যি বলতে হয় না। অথচ আল্লাহ বলছেন,إِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَٰنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا ‘যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হতো, তখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত এবং কাঁদত (মারইয়াম, ১৯/৫৮)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,إِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مِن قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ سُجَّدًا - وَيَقُولُونَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِن كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا - وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا ‘নিশ্চয় যারা এর আগে জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছিল, যখন তাদের কাছে এটি তেলাওয়াত করা হয়, তারা চিবুকের উপর সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তারা বলে, পবিত্র আমাদের রব! নিশ্চয়ই আমাদের রবের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হওয়ারই ছিল। আর তারা চিবুকের উপর লুটিয়ে পড়ত কাঁদতে কাঁদতে এবং এটি তাদের বিনয় আরও বাড়িয়ে দেয়’ (আল-ইসরা, ১৭/১০৭–১০৯)।
কিন্তু আমাদের সাথে কি কখনও এরকম ঘটেছে? না, আমাদের সাথে ঘটেনি। তাহলে কি আমরা এটা বলতে পারি যে, আসলে আমরা সবাই কুরআন তেলাওয়াত করছি, আমাদের সবার কাছেই কুরআন আছে; কিন্তু তা আমাদের হৃদয়ে ভয়ও আনতে পারেনি এবং কুরআনের যেটা মূল কাজ তথা মহান আল্লাহ যে জন্য পাঠিয়েছেন সেটাও কার্যকর হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-সহ আমাদের ছাহাবায়ে কেরাম, আমাদের আলেমগণ কুরআন তেলাওয়াত করে ডুকরে-ডুকরে কাঁদতেন। আমি নিচে কিছু ঘটনা উল্লেখ করছি।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ‘তুমি আমার কাছে কুরআন তেলাওয়াত করো’। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আপনার কাছে কুরআন পড়ব, অথচ এটি তো আপনার উপরই নাযিল হয়েছে? তিনি বললেন, ‘আমি এটি অন্যের মুখ থেকে শুনতে ভালোবাসি’। তখন আমি তাঁর কাছে সূরা নিসা তেলাওয়াত করতে লাগলাম। যখন আমি এই আয়াতে পৌঁছালাম, ‘অতএব, কী অবস্থা হবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী আনব এবং আপনাকে (হে মুহাম্মাদ) তাদের উপর সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব?’ (আন-নিসা, ৪/৪১) তিনি বললেন, ‘এখন যথেষ্ট’। আমি তাঁর দিকে ফিরে তাকালাম, দেখলাম, তাঁর দুই চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে।[1]
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অসুস্থতার সময় বললেন, ‘আবূ বকরকে নির্দেশ দাও, তিনি যেন লোকদের নিয়ে ছালাত পড়ান’। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি বললাম, ‘আবূ বকর আপনার স্থানে দাঁড়ালে কান্নার কারণে মানুষকে শুনাতে পারবেন না, বরং উমারকে নির্দেশ দিন যেন তিনি ছালাত পড়ান’।[2]
ইয়াহইয়া ইবনু আল-ফাযল আল-আনিসী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি এমন এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, যিনি মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির সম্পর্কে উল্লেখ করছিলেন, এক রাতে তিনি ছালাতে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি প্রবলভাবে কাঁদতে শুরু করলেন। তার কান্না এত বেড়ে গেল যে, তাঁর পরিবারের লোকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তারা তাকে জিজ্ঞেস করল (কেন কাঁদছেন), কিন্তু তিনি তাদের সাথে কথা বলতে পারলেন না। তিনি কান্নাতেই মগ্ন রইলেন। তখন তারা আবূ হাজেমের কাছে লোক পাঠাল। তিনি এসে জিজ্ঞেস করলেন, কীসে আপনাকে কাঁদাল? তিনি বললেন, একটি আয়াত আমার সামনে এসেছে। তিনি বললেন, কোন আয়াত? তিনি বললেন, وَبَدَا لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مَا لَمْ يَكُونُوا يَحْتَسِبُونَ ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের সামনে এমন কিছু প্রকাশ পাবে, যা তারা কল্পনাও করেনি’। এ কথা শুনে আবূ হাজেমও তাঁর সাথে কেঁদে ফেললেন।[3]
উমার ইবনুল আব্দুল আযীয এক রাতে ছালাতে সূরা ‘ওয়াল লায়লে ইযা ইয়াগশা’ পড়ছিলেন। যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছালেন, فَأَنذَرْتُكُمْ نَارًا تَلَظَّىٰ (অতএব, আমি তোমাদেরকে প্রজ্বলিত আগুন সম্পর্কে সতর্ক করছি), তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তিনি আর সেই আয়াত অতিক্রম করতে পারলেন না। পুনরায় সূরাটি পড়লেন, আবার ওই আয়াতে পৌঁছে অতিক্রম করতে পারলেন না। এভাবে দুই বা তিনবার করলেন। অতঃপর তিনি অন্য একটি সূরা পড়লেন।[4]
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা ঠান্ডা পানি পান করে কেঁদে ফেললেন এবং তার কান্না তীব্র হয়ে গেল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কীসে কাঁদাচ্ছে? তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত স্মরণ করেছি, ‘ওয়া হীলা বায়নাহুম ওয়া বায়না মা ইয়াশতাহূন’ (তাদের ও তাদের কাম্যবস্তুর মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করা হবে)। আমি বুঝলাম, জাহান্নামবাসীরা কিছুই কামনা করবে না, শুধু ঠান্ডা পানি ছাড়া। যেমনটি আল্লাহ বলেন,وَنَادَى أَصْحَابُ النَّارِ أَصْحَابَ الْجَنَّةِ أَنْ أَفِيضُوا عَلَيْنَا مِنَ الْمَاءِ أَوْ مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ ‘জাহান্নামবাসীরা জান্নাতীদের উদ্দেশ্যে বলবে, আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও অথবা যা আল্লাহ তোমাদেরকে রিযিক্ব দিয়েছেন তা থেকে কিছু দাও’।[5]
নাফে‘ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা কখনো সূরা আল-বাক্বারার শেষের এই দুই আয়াত পড়লে কাঁদতেন, وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ (তোমরা যা তোমাদের অন্তরে প্রকাশ কর বা গোপন রাখো...)। এরপর তিনি বলতেন, এটি তো এক কঠিন হিসাব-নিকাশ![6]
ইবনু আবী মুলায়কা বলেন, আমি মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সাথে সফর করেছি। তিনি যখন কোথাও অবস্থান করতেন, রাতের অর্ধেক সময় ছালাতে দাঁড়াতেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তার ক্বিরাআত কেমন ছিল? তিনি বলেন, তিনি এই আয়াত পড়লেন, وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ (মৃত্যুযন্ত্রণার মুহূর্ত সত্যসহ এসে উপস্থিত হবে। এটাই তা, যেখান থেকে তুমি পলায়ন করতে)। তিনি তা ধীরে ধীরে পড়তেন এবং শব্দ করে কান্না করতেন।[7]
মালেক ইবনু দীনার এই আয়াত পড়লেন, لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَصَدِّعًا مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ (যদি আমি এই কুরআন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম, তবে তুমি তাকে আল্লাহর ভয়ে বিনম্র ও বিদীর্ণ হতে দেখতে), তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আমি তোমাদের শপথ করে বলছি, যে বান্দা এই কুরআনের প্রতি ঈমান আনে, তার হৃদয় বিদীর্ণ না হয়ে পারে না।[8]
উক্ত ঘটনাগুলোর সাথে একটি আয়াত উল্লেখ না করলেই নয়, আল্লাহ তাআলা বলছেন,إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ‘নিশ্চয় মুমিন তো তারাই যখন আল্লাহর নাম উল্লেখ করা হয়, তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে। আর যখন তাঁর আয়াতসমূহ তাদের কাছে তেলাওয়াত করা হয়, তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে’ (আল-আনফাল, ৮/২)।
তারা ভয় পেতেন, তাদের হৃদয় কুরআন তেলাওয়াতে কেঁপে উঠত; কিন্তু আমাদের কিছুই হয় না। কোথাও একটা কিছু মিস করছি। হয়তো আমরা এই আয়াতগুলো পড়ি না অথবা পড়লেও বুঝি না। সাধারণত আমরা তো অর্থই জানি না। অথচ আল্লাহ বলেছেন,أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا ‘তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? আর যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে বহু অসংগতি ও বিরোধ খুঁজে পেত’ (আন-নিসা, ৪/৮২)। অর্থাৎ কুরআনের শুধু অর্থ জানা নয়; বরং চিন্তা-ভাবনা করে উচিত, গবেষণা করা উচিত। আমরা চিন্তা করা তো দূরের কথা অর্থসহ কয়জনই তেলাওয়াত করি। যদিও বা আল্লাহ কুরআনের অসংখ্য আয়াতে কুরআন চিন্তা-ভাবনা করে পড়ার কথা বলেছেন। যারা চিন্তা করে না, কুরআন বুঝে না তাদের হৃদয়কে তিনি তালাবদ্ধ হৃদয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا ‘তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহের উপর তালা ঝুলছে?’ (মুহাম্মাদ, ৪৭/২৪)। সারমর্ম কথায় আমরা বলতে পারি কুরআন অর্থ-সহ পড়ার চেষ্টা করাই যথেষ্ট নয় বরং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, তদববুর করা আমাদের জন্য জরুরী।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক
ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, ভারত; বিএ (অনার্স),
কিং আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, সঊদী আরব।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/৮০০।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৮।
[3]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৫৫৪।
[4]. ইবনু রজব হাম্বলী, আত-তাখউইফ মিনান নার, পৃ. ১০৪।
[5]. ইমাম আহমাদ, কিতাবুয যুহদ, পৃ. ১৫৬।
[6]. ইমাম আহমাদ, কিতাবুয যুহদ, পৃ. ১৫৮।
[7]. ফাযায়েলুছ ছাহাবা, ইমাম আহমাদ, ২/৯৫০; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/৩৪২।
[8]. কিতাবুয যুহদ, ইবনু রজব হাম্বলী, পৃ. ২৫৮।
