সংগঠন কি জামা‘আত নয়?
সম্মানিত পাঠক! সংগঠন জামা‘আত নাকি জামা‘আত নয় সেকথা দেখার আগে আসুন আমরা কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানি: আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বিভিন্ন সময় এবং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছে। যেমনঃ আত-ত্বয়েফাহ আল-মানছূরাহ, আল-ফেরক্বাহ আন-নাজিয়াহ, আহলুল হাদীছ, আছহাবুল হাদীছ, আহলুল আছার, গুরাবা, সুন্নী, সালাফী ইত্যাদি। এসবগুলো নামেই তারা পরিচিত।
এই ব্যাপক অর্থে প্রসিদ্ধ চার মাযহাবের প্রকৃত অনুসারীদের উপরও এসব নাম প্রযোজ্য হবে। কারণ, ইমাম চতুষ্টয় আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইমাম ছিলেন। তবে প্রসিদ্ধ চার ইমামের কোন একজনের অনুসারী যদি তার ইমামের আক্বীদা গ্রহণ না করে ভ্রান্ত ভিন্ন কোন আক্বীদা গ্রহণ করে, তাহলে সে তার দায়িত্ব বহন করবে। অনুরূপভাবে এসব নামে গঠিত কোন সংগঠন যদি কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নিঃস্বার্থ অনুসারী হয়ে থাকে, তাহলে তারাও আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। তবে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বলতে কস্মিনকালেও নির্দিষ্ট কোন দল, মাযহাব বা জামা‘আতকে বুঝাবে না। কেউ কুরআন-হাদীছ ও সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি থেকে সরে গেলে সে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে না; সে যে যুগের, যে দেশের, যে মাযহাবের বা যে দলেরই হোক না কেন। অনুরূপভাবে কোন দল যদি নিজেদেরকে ‘আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত’ নামে নামকরণ করে হরহামেশা আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নীতি বিরোধী কাজ করে এবং নানামুখী শিরক-বিদ‘আতই তাদের সাধনা হয়, তাহলে এই নামকরণ তাদের বিন্দুমাত্র উপকারে আসবে না; বরং তারা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। তারা হবে দাবীদার আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত; সত্যিকার আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত নয়।
যে ব্যক্তি সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি অনুযায়ী কুরআন ও হাদীছ বুঝবে এবং তদ্নুযায়ী আমল করবে, সে-ই আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই তার অবস্থান হোক না কেন। এমনকি গভীর জঙ্গলে একাকী অবস্থানকারী ব্যক্তিও যদি নিঃস্বার্থভাবে সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মেনে চলে, সেও আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। মনে রাখতে হবে, প্রচলিত সংগঠনগুলির মত আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত হতে হলে কাউকে কোন নেতার অনুমতির প্রয়োজন হয় না এবং কোন সদস্য ফরম বা ভর্তি ফরমও পূরণ করতে হয় না। প্রয়োজন হয় না কোন আমীর বা নেতার হাতে বায়‘আতের ও শপথ বাক্য পাঠের। শুধুমাত্র সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি অনুযায়ী নিঃশর্তভাবে কুরআন-হাদীছ মেনে চললেই হয়।
বুঝা গেলো, কোন দা‘ওয়াতী সংগঠন বা ইসলামী সংগঠন সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মেনে চললে তারা হাদীছে উল্লেখিত ‘জামা‘আত’-এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। তবে হাদীছে জামা‘আত বলতে যে শুধুমাত্র তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে, এমন দাবী কস্মিনকালেও ঠিক নয়; বরং কেউ এমনটি বললে তা হবে অন্যায়, বাড়াবাড়ি এবং শরী‘আতের অপব্যাখ্যা। শায়খ আলী ইবনে হাসান আল-হালাবী বলেন,لِذَلِكَ فَإِنَّنَا نُؤَكِّدُ أَنَّ كُلَّ تَنْظِيْمٍ مِّنَ التَّنْظِيْمَاتِ أَوْ حَرَكَةً مِّنَ الْحَرَكَاتِ أَوْ جَمَاعَةً مِّنَ الْجَمَاعَاتِ إِنَّمَا هِيَ جَمَاعَةٌ مِّنَ الْمُسْلِمِيْنَ، وَلَيْسُوْا -مُتَفَرِّقِيْنَ أَوْ مُجْتَمِعِيْنَ- (جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِيْنَ)؛ كَمَا أَنَّ الَّذِيْ لَا يَنْتَسِبُ إِلَى تَنْظِيْمٍ إِسْلَامِيٍّ أَوْ حَرَكَةٍ إِسْلَامِيَّةٍ فَإِنَّهُ لَا يَكُوْنُ مُفَارِقًا لِلْجَمَاعَةِ، وَإِذَا مَاتَ لَمْ تَكُنْ مِيْتَتُهُ جَاهِلِيَّةً. هَذَا كُلُّهُ مَعَ الْأَخْذِ بِعَيْنِ الْاِعْتِبَارِ أَنَّنَا نَتَحَدَّثُ عَنْ وَضْعٍ قَائِمٍ لَا عَنْ حُكْمٍ شَرْعِيٍّ، إِذِ الْحُكْمُ الشَّرْعِيُّ الَّذِيْ لَا مَجَالَ لِلْاِخْتِلَافِ فِيْهِ هُوَ مَا سَنَخْلُصُ إِلَيْهِ –بَعْدُ-، وَقَدْ ظَهَرَتْ أَمَارَاتُهُ –قَبْلُ-: اَلْمَنْعُ مِنْ هَذِهِ الْحِزْبِيَّاتِ الدَّخِيْلَةِ عَلَى مَنْهَجِ الْإِسْلَامِ وَالْبُعْدُ عَنْ كُلِّ مَا يُؤَدِّيْ إِلَى التَّفَرُّقِ وَالْاِخْتِلَافِ. ‘একারণে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যে কোন সংগঠন বা আন্দোলন বা জামা‘আত মুসলিমদের একটি জামা‘আত হিসাবে গণ্য হবে। -তারা বিচ্ছিন্ন থাক্ বা সমবেত থাক্- তাদেরকে ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’ বা ‘মুসলিম জামা‘আত’ বলা যাবে না। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কোন ইসলামী সংগঠন বা ইসলামী আন্দোলনে যোগদান করে না, সে জামা‘আত ছিন্নকারী গণ্য হবে না এবং সে মারা গেলে তার মৃত্যু জাহেলী মৃত্যু হবে না। এটা কিন্তু আমরা বাস্তবতার আলোকে বলছি; শরী‘আতের হুকুম বর্ণনা করছি না। কারণ শরী‘আতের দৃষ্টিতে ইসলামী আদর্শে প্রবিষ্ট এসব দলাদলি নিষিদ্ধ এবং যা কিছু বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়, তা থেকে দূরে থাকা যরূরী, যার সারাংশ আমরা একটু পরে পেশ করবো এবং যার আলামত ইতিমধ্যে গত হয়ে গেছে’।[1]
সম্মানিত পাঠক! এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পরস্পর মিলে ঝুলে থাকাই ভাল। এমনকি দু’জন মুসলিমও যদি আন্তরিকতা বজায় রেখে চলতে পারে, তাহলে নিঃসন্দেহে সেটাই উচিত; পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত হওয়া মোটেও সমীচীন নয়; বরং নিষিদ্ধ। পরস্পরের বিভক্তি ও দলাদলি কোন সময় কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না এবং তা ইসলামের আদর্শও নয়। মহান আল্লাহ বলেন,وَأَطِيعُوا اللهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ‘আর আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি ও প্রতিপত্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে’ (আল-আনফাল, ৮/৪৬)। রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন, عَلَيْكُمْ بِالجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ، مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الجَنَّةِ فَلْيَلْزَمُ الجَمَاعَةَ... ‘তোমরা জামা‘আতবদ্ধ জীবন-যাপন কর এবং বিভক্তি থেকে সাবধান থাকো। কেননা শয়তান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দু’জন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে, সে যেন জামা‘বদ্ধভাবে থাকে...’।[2] অন্য হাদীছে এসেছে, فَعَلَيْكَ بِالْجَمَاعَةِ فَإِنَّمَا يَأْكُلُ الذِّئْبُ الْقَاصِيَةَ ‘অতএব, তোমার উপর জামা‘আতবদ্ধ থাকা যরূরী। কেননা দলচ্যুত বকরীকে নেকড়ে বাঘে ভক্ষণ করে থাকে’।[3] সেজন্য ইসলামে এত জামা‘আতের আয়োজন: প্রতিদিন ৫ বার জামা‘আতে ছালাত আদায় করতে হয়, প্রতি জুম‘আ বার জামে‘ মসজিদে সবাইকে সমবেত হতে হয়, প্রতি বছর দুইবার আরো বৃহত্তর পরিসরে ঈদের জামা‘আতের আয়োজন করতে হয়। তারাবীহ্র জামা‘আত, জানাযার জামা‘আত তো আছেই। ইসলামের এতসব জামা‘আতের মধ্যে নিঃসন্দেহে মুসলিমদের জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের ইঙ্গিত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্নভাবে ইসলাম মুসলিম উম্মাহ্কে জামা‘আতবদ্ধ থাকতে উৎসাহিত করে; হৃদ্যতা, আন্তরিকতা, ভালবাসা, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে চলতে অনুপ্রেরণা যোগায়, বরং জোর নির্দেশনা দেয়।
সুধী পাঠক! ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দা‘ওয়াতী কাজকে বেগবান করা ও শক্তি সঞ্চার করার লক্ষ্যে বোধ করি সংগঠনের জন্ম হয়েছিল। আমি ছহীহ আক্বীদার সংগঠনের কথা বলছি। কিন্তু সেই মহৎ উদ্দেশ্য কি আমরা ধরে রাখতে পেরেছি? উপরিউক্ত ইসলামী আদর্শ কি আমরা মেনে চলতে পারছি? আমাদের অনেকেই আজ পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-কলহ, গীবত-তোহমত, গালি-গালাজ, বহিষ্কার-তিরস্কার, মিথ্যাচার, ক্ষতিসাধন, মানহানি, রেষারেষি, কাদা ছুড়াছুড়ি ইত্যাদি গর্হিত কাজ ও কাবীরা গুনাহে মশগূল রয়েছি! ঈমানী ভ্রাতৃত্বের সুপ্রশস্তগণ্ডিকে সংগঠনের ছোট্ট ও সংকীর্ণ চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী করে ঈমানের এ বিস্তৃত ও মযবূত ভ্রাতৃত্বকে শ্বাসরোধে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে! এখন আর দ্বীনী ভাই পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় সংগঠনের ভাই! সংগঠন ও দলের ভাই-ই যে এখানে সব, ঈমান ও আক্বীদার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ কোথায়! পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি, ভালবাসা-মহববত, সহানুভূতি, সহমর্মিতাকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে! পারস্পরিক সেণহ-মমতা এবং শ্রদ্ধাবোধ গেল কোথায়? তুচ্ছ এবং ঠুনকো কিছু হতে না হতেই কেন দলছুট, বহিষ্কার আর ভাঙ্গনের এই করুণ দৃশ্য? কেন আত্ম-অহংকার ও আত্মম্ভরিতাকে বলি দিয়ে উদারতা ও মহানুভবতার উৎকৃষ্ট নমুনা প্রদর্শন করা যাচ্ছে না? সবার আক্বীদা-আমল অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও কোন্ স্বার্থ সবাইকে হিংসাপরায়ণ এবং সংকীর্ণ করে রাখছে? সবাই দরজা খোলা রাখার বুলি আওড়ালেও সেখানে কোন্ অদৃশ্য বেড়া দেয়া হচ্ছে যে, কেউ সেদিক দিয়ে প্রবেশ করতে পারছে না? প্রবীণ আর নবীন বা পুরনো আর নতুনের দোহাই দিয়ে কতকাল আর যিদ, অহঙ্কার, শত্রুতা, হিংসাহিংসী, মান-অভিমান চলবে?! তাহলে কি যিদ, আমিত্ব, প্রতিশোধের অভিপ্রায়, ক্ষমতালিপ্সা আর প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারই বেশী প্রাধান্য পাচ্ছে, না-কি দা‘ওয়াতী ময়দানে ইখলাছ আর নিষ্ঠার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে? না-কি কোন হীন স্বার্থ চরিতার্থের অভিলাষ লুকিয়ে আছে হৃদয়ের গহীন কোণে?
নবীন-প্রবীণ কোন সংগঠন কি অহি দ্বারা সত্যায়িত? তাহলে নবীন-প্রবীণ নিয়ে এত টানাটানি কিসের?! আসলে যখনই কারো মধ্যে দলীয় চিন্তা প্রবেশ করে, তখনই তার মন সংকীর্ণ হয়ে যায়; এমনকি মানবীয় নানা গুণও সে হারাতে বসে। এক পর্যায়ে তার হৃদয় সংকীর্ণতার চরমসীমায় পৌঁছে যায়; তখন দলের বাইরে আর কোন চিন্তা সে করতে পারে না। সে বদ্ধমূল বিরূপ ধারণা নিয়ে বসে থাকে, সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যায়; তার কল্যাণচিন্তা, পরোপকারিতা, সাহায্য-সহযোগিতা, বেদনা-সহমর্মিতা, স্নেহ-ভালবাসা, সম্মান-মর্যাদা কোনকিছুই দলীয় দেওয়াল টপকাতে পারে না। মুমিনদের বৈশিষ্ট্য তো অনেক দূরের ব্যাপার, এমনকি মানবীয় গুণও সে হারিয়ে ফেলে; অন্যের অনিষ্ট সাধন, হিংসা-প্রতিহিংসা, যুলম-নির্যাতন, লাঞ্ছনা-অপমান এসব পশুত্বের স্বভাব তার মধ্যে ভর করে। দল মানুষকে হিংসা-বিদ্বেষ শেখায়, শত্রুতা শেখায়, শান্তি-নিরাপত্তা নষ্ট করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, ঘনিষ্টজনকে শত্রু বানিয়ে দেয়। দলীয় গণ্ডির সংকীর্ণ সীমানায় অন্যায় ন্যায়ে পরিণত হয়, যুল্ম ইনছাফে রূপ নেয়, সম্মানিত ব্যক্তি অসম্মানিত হয় আর অসম্মানিত ব্যক্তি সম্মানিত হয়। এখানে পরহেযগারিতা, দ্বীনদারিতা, আমানতদারিতা, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ইত্যাদির কানাকড়িও মূল্য থাকে না, সবই ফিঁকে হয়ে যায়। কারণ সবকিছুই যে দেখা হয় দলীয় রঙ্গীন চশমায়!
প্রচলিত বস্তুবাদী সংগঠনগুলোর মত এসব সংগঠনেও এখন রীতিমত শুরু হয়েছে বিভিন্নমুখী পক্ষপাতিত্ব! বিভিন্ন চাকুরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে, নানামুখী সুযোগ-সুবিধা ভাগ ও ভোগের ক্ষেত্রে সবকিছুতেই চলছে সীমাহীন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ! ছহীহ আক্বীদা-আমল, উত্তম চরিত্র ইত্যাদির কোন মূল্য থাকছে না এখানে! সবকিছুর ঊর্ধ্বে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে সংগঠনকে! অনেকেই তাদের পোস্ট, অবস্থান ও পদমর্যাদাকে সংগঠনের বাইরের মানুষগুলোকে হয়রানি, বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত করার নগ্ন হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে! ভিসা নষ্ট, চাকুরি খোয়ানো, ছাত্রত্ব বাতিল ইত্যাদি নানা হুমকি-ধমকি তো চলছেই হরহামেশা!
এসব জঘন্য চরিত্রকে কি হিযবিয়্যাত ও দলাদলি বলা চলে না? এগুলোকে জাহিলিয়্যাত বলতে কি একটুও ভাবতে হবে? এসব হিযবিয়্যাত ও জাহিলিয়্যাত না হলে আর কাকে হিযবিয়্যাত ও জাহিলিয়্যাত বলে?
প্রিয় পাঠক! কোন সংগঠনকে দা‘ওয়াতী কার্যক্রমের একটি মাধ্যমের বাইরে অন্য কিছু প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই মাধ্যম এক সময় পরিণত হয় মূল লক্ষ্যে, শুরু হয় দলের প্রতি অন্ধভক্তি এবং অন্যদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও অভক্তি। সংগঠনে থাকলে অসৎ মানুষটিও হয়ে যায় দুধে ধোয়া; কিন্তু সংগঠনের বাইরে চলে গেলে সোনার মানুষটিও পরিণত হয় নিকৃষ্ট ব্যক্তিত্বে। কাল যিনি ছিলেন মাথার মুকুট, শুধু দলে না থাকার কারণে আজ সেই মুকুট হয়ে গেছে পদদলিত। এই মিত্রতা ও শত্রুতার মানদণ্ড হয় কেবল দলীয় গণ্ডি; এখানে আক্বীদা, আমল, পরহেযগারিতা ও যোগ্যতার কোন মূল্য থাকে না। সত্যি বলতে সারা দুনিয়ার সব সংগঠনের অবস্থা প্রায় একই!
সংগঠন আল্লাহ্র পথে দা‘ওয়াতের একটি মাধ্যম হিসাবে গণ্য হতে পারে। আক্বীদা-আমল বিশুদ্ধির সংস্কার আন্দোলন থাকতে পারে। তাই বলে কি ঐভাবে! কস্মিনকালেও না। বরং অতীব যরূরী কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে চলতে পারে। যেমন- (১) সংগঠনে কুরআন-হাদীছ ও সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি পরিপন্থী কোন কার্যক্রম থাকবে না। বরং কুরআন-হাদীছ সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী বুঝতে হবে। (২) বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমলকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। (৩) সংগঠনে বায়‘আত বলে কিছু থাকবে না। কারণ, বায়‘আত মুসলিম উম্মাহ্র একক খলীফা এবং কোন দেশের মুসলিম সরকারের সাথে নির্দিষ্ট; কোন সংস্থা, সংগঠন, দল বা জামা‘আতের নেতার জন্য তা আদৌ বৈধ নয়। মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন দ্বীনী সংগঠনে যেসব বায়‘আত চলছে, সেগুলো ছূফীতান্ত্রিক সংগঠনগুলো থেকে ধার করা বিদ‘আতী বায়‘আত; ইসলামের নামে সেগুলো চালানো বিভ্রাট বৈ কিছুই নয়। (৪) ঈমানী মহান ও প্রশস্ত ভ্রাতৃত্বের গণ্ডিকে সাংগঠনিক সংকীর্ণ ভ্রাতৃত্বের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার অপচেষ্টা থেকে দূরে থাকতে হবে। ‘অলা ও বারা’র সত্যিকার বাস্তবায়ন সংগঠনে থাকতে হবে। (৫) হৃদয়ের কালিমা দূর করে সংগঠনের ভেতরের এবং বাইরের সকল মুসলিম ভাইয়ের সাথে দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে চলতে হবে; বরং এই ভ্রাতৃত্বকে সব সম্পর্কের উপরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, হৃদয় পরিষ্কার না হলে জান্নাতে যাওয়া কঠিন। (৬) সকল মুসলিমের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা থাকতে হবে, একে অন্যের দোষত্রুটি না বলে ভাল দিকগুলো বলতে হবে এবং কারো মধ্যে বিদ্যমান ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের জন্য হিকমতের সাথে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। (৭) সংগঠনকে দা‘ওয়াতের একটি মাধ্যমের বাইরে অন্য কিছু মনে করা যাবে না; সংগঠন কখনই হক-বাতিলের মানদণ্ড বিবেচিত হবে না। (৮) মানুষকে সংগঠনের পতাকাতলে আহবান না জানিয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের শীতল ছায়াতলে আহবান জানাতে হবে।
পরিশেষে বলব, আল্লাহ্র জন্য একনিষ্ঠ, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারী এবং মুসলিম উম্মাহ্র প্রকৃত হিতাকাঙ্ক্ষী প্রত্যেকটি মুসলিমের উচিত, সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ্র উপরে মুসলিম উম্মাহকে একত্রিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো এবং দলাদলি ও বিভক্তি সৃষ্টি করতে পারে- এমন যাবতীয় পথ এড়িয়ে চলা। প্রত্যেকটি মুসলিম যদি সেই চেষ্টা করতে পারে, তাহলে ধীরে ধীরে দলাদলি, হিংসা-বিদ্বেষ নিপাত যাবে এবং বিপরীতে ঈমানী ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের আক্বীদা ও আমল যেমন এক, তেমনি আমাদের হৃদয়গুলোও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে হয়ে যাক এক- দয়াময় আল্লাহ্র কাছে করি এই ফরিয়াদ। আমীন!
(চলবে)
[1]. আলী ইবনে হাসান আল-হালাবী, আদ-দা‘ওয়াতু ইলাল্লাহি বায়নাত তাজাম্মু‘ইল হিযবী ওয়াত-তা‘আউন আশ-শারঈ, (মাকতাবাতুছ ছহাবাহ, জেদ্দা, তা. বি.), পৃঃ ৯৩।
[2]. সুনানে তিরমিযী, হা/২১৬৫, ‘ছহীহ’।
[3]. সুনানে আবু দাঊদ, হা/৫৪৭, ‘হাসান’।
