(২৮) কাফ্ফারা আদায় করা :
কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত কয়েকটি কাফ্ফারা সর্ম্পকে নিমেণ বর্ণিত হল।
(ক) হত্যার কাফ্ফারা : মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالْأُنْثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوْفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيْفٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُوْلِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ.
‘হে ঈমানদারগণ! নিহতদের সম্বন্ধে তোমাদের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ বিধিবদ্ধ হল: স্বাধীনের পরিবর্তে স্বাধীন, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারী; কিন্তু যদি কেউ তার ভাই কর্তৃক কোন বিষয়ে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়, তবে যেন ন্যায়ভাবে তাগাদা করে এবং তা পরিশোধ করে। এটা তোমাদের প্রতিপালনের পক্ষ হতে লঘু বিধান ও করুণা। অতঃপর যে কেউ সীমালঙ্ঘন করবে, তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। হে জ্ঞানবান লোকেরা! ক্বিছাছ (প্রতিশোধ) গ্রহণে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে যেন তোমরা আল্লাহভীরু হও’ (বাক্বারাহ, ২/১৭৮-১৭৯)। হাফেয ইবনে কাছীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কুরআনের বিধানটা মানবজাতি যদি মেনে নিত, তাহলে কতই না ভালো হত! অন্যায়ভাবে হত্যাকারীকে, হত্যার বদলে হত্যা করা হলে মানুষের অনেক জীবন বাঁচত, যখন কেউ জানবে যে, আমি কাউকে হত্যা করলে আমাকেও হত্যা করা হবে, তখন সে অবশ্যই নিজের জীবনের ভয় করবে এবং অন্যকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকবে।[1] মহান আল্লাহ বলেন,
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيْهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوْحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ.
‘আর আমরা তাদের প্রতি তাদের (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং বিশেষ যখমেরও বিনিময় রয়েছে। ফলে যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, তবে এটা তার জন্য (পাপের) কাফ্ফারা হয়ে যাবে’ (মায়েদাহ, ৫/৪৫)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আর কোন মুমিনের কাজ নয় অন্য মুমিনকে হত্যা করা, তবে ভুলবশতঃ হলে (ভিন্ন কথা)। যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তাকে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং দিয়াত (রক্ত পণ দিতে হবে) যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিজনদের কাছে। তবে তারা যদি ছাদাক্বাহ (ক্ষমা) করে দেয় (তাহলে দিতে হবে না)। আর সে যদি তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় এবং সে মুমিন হয়, তাহলে একজন মুমিন দাস মুক্ত করবে। আর যদি এমন ক্বওমের হয়, যাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সন্ধিচুক্তি রয়েছে, তাহলে দিয়াত দিতে হবে, যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিবারের কাছে এবং একজন মুমিন দাস মুক্ত করতে হবে। তবে যদি না পারে, তাহলে একাধারে দু’মাস ছিয়াম পালন করবে। এটি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ক্ষমাস্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। আর যে ইচ্ছাকৃত কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান হচ্ছে জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর আল্লাহ তার উপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লা‘নত করবেন এবং তার জন্য বিশাল আযাব প্রস্ত্তত করে রাখবেন’ (নিসা, ৪/৯২-৯৩)।
উল্লেখ্য, জমহূর উলামায়ে কেরামের মতে, হত্যাকারীর জন্য আল্লাহ এবং তার মাঝে তওবা রয়েছে। যদি সে খুশু-খুযূ-ভয়-ভীতি সহকারে আল্লাহ্র নিকট তওবা করে ও অনুতপ্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহ্র দিকে ফিরে যায়, সৎআমল করে, তাহলে মহান আল্লাহ তার-খারাপ আমলটি পরিবর্তন করে ভাল কাজে রূপান্তরিত করবেন, বরং হত্যাকৃত ব্যক্তিকে (হত্যাকারী ব্যাক্তির) যুলুমের ক্ষতিপূরণ দিবেন এবং তার চাওয়াতে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِيْنَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُوْنَ النَّفْسَ الَّتِيْ حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللهُ غَفُوْرًا رَحِيْمًا وَمَنْ تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوْبُ إِلَى اللهِ مَتَابًا.
‘যারা আল্লাহ্র সঙ্গে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করে না এবং যারা আল্লাহ যাকে হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং যারা ব্যভিচার করে না। যারা এগুলো করবে, তারা শাস্তি ভোগ করবে। ক্বিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে এবং তারা সেখানে লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল থাকবে। তবে তারা ব্যতীত, যে তওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম সম্পাদন করে। আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। বস্ত্তত আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। আর যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকর্ম করে, সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্র দিকে ফিরে আসে’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/ ৬৮-৭১)। মহান আল্লাহ বলেন,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ أَسْرَفُوْا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَحْمَةِ اللهِ إِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ.
‘তুমি বল, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু’ (আয-যুমার, ৩৯/৫৩)। এ আয়াতটি হল আম, যা সমস্ত পাপকে শামিল করে। যদিও সেটি কুফর হয়, শিরক হয় অথবা নিফাক্ব হয়। যে সমস্ত ব্যক্তি তাদের পাপ থেকে খালেছ নিয়তে তওবা করবে, মহান আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন। মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيْمًا.
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহ্র সাথে শরীক করে, সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে’ (আন-নিসা, ৪/৪৮)। এ আয়াতটিও আম, যা সমস্ত গুনাহের মধ্যে প্রবেশ করবে, তবে শিরক ব্যতীত। আল্লাহ অধিক জানেন।[2] অতএব পাপ করলেই তওবাতুন নাছূহা করতে হবে অনতিবিলম্বে।
(খ) যিহারের কাফফারা : এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
الَّذِيْنَ يُظَاهِرُوْنَ مِنْكُمْ مِنْ نِسَائِهِمْ مَا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْنَهُمْ وَإِنَّهُمْ لَيَقُوْلُوْنَ مُنْكَرًا مِنَ الْقَوْلِ وَزُوْرًا وَإِنَّ اللهَ لَعَفُوٌّ غَفُوْرٌ- وَالَّذِيْنَ يُظَاهِرُوْنَ مِنْ نِسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا فَتَحْرِيْرُ رَقَبَةٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا ذَلِكُمْ تُوْعَظُوْنَ بِهِ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ - فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِيْنًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ وَتِلْكَ حُدُوْدُ اللهِ وَلِلْكَافِرِيْنَ عَذَابٌ أَلِيْمٌ.
‘তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে,[3] তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষামাশীল। আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে, অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। কিন্তু যে তা পারবে না, সে লাগাতার দু’মাস ছিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না, সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এজন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহ্র (নির্ধারিত) সীমা এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব’ (মুজাদালাহ, ৫৮/২-৪) ।
(গ) কসম ভঙ্গের কাফফারা : এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللهُ بِاللَّغْوِ فِيْ أَيْمَانِكُمْ وَلَكِنْ يُؤَاخِذُكُمْ بِمَا عَقَّدْتُمُ الْأَيْمَانَ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِيْنَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُوْنَ أَهْلِيْكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيْرُ رَقَبَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ذَلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ وَاحْفَظُوْا أَيْمَانَكُمْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ.
‘আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন শপথের ব্যাপারে, কিন্তু যে শপথ তোমরা দৃঢ়ভাবে কর, সে শপথের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফ্ফারা হল দশজন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাওয়ায়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অতঃপর যে সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন ছিয়াম পালন করবে। এটা তোমাদের শপথের কাফ্ফারা, যদি তোমরা শপথ কর। আর তোমরা তোমাদের শপথ হেফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর’ (আল-মায়েদাহ, ৫/৮৯)।
(গ) রামাযানে স্ত্রী সহবাসের কাফফারা : হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنَّ الأَخِرَ وَقَعَ عَلَى امْرَأَتِهِ فِىْ رَمَضَانَ فَقَالَ أَتَجِدُ مَا تُحَرِّرُ رَقَبَةً قَالَ لَا قَالَ فَتَسْتَطِيْعُ أَنْ تَصُوْمَ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ قَالَ لَا قَالَ أَفَتَجِدُ مَا تُطْعِمُ بِهِ سِتِّيْنَ مِسْكِيْنًا قَالَ لَا قَالَ فَأُتِىَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَقٍ فِيهِ تَمْرٌ وَهُوَ الزَّبِيْلُ قَالَ أَطْعِمْ هَذَا عَنْكَ قَالَ عَلَى أَحْوَجَ مِنَّا مَا بَيْنَ لَابَتَيْهَا أَهْلُ بَيْتٍ أَحْوَجُ مِنَّا قَالَ فَأَطْعِمْهُ أَهْلَكَ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কী হয়েছে? সে বলল, আমি ছিয়াম অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করেছি। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আযাদ করার মত কোন ক্রীতদাস তুমি পাবে কী? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি একাধারে দু’মাস ছিয়াম পালন করতে পারবে? সে বলল, না। এরপর তিনি বললেন, ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে কি? সে বলল, না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেমে গেলেন, আমরাও এ অবস্থায় ছিলাম। এ সময় নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ‘আরাক’ তথা খেজুর ঝুড়ি পেশ করা হল। আবার নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, প্রশ্নকারী কোথায়? তিনি বললেন, এগুলো নিয়ে ছাদাক্বাহ করে দাও। তখন লোকটি বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার চাইতেও অভাবগ্রস্তকে ছাদাক্বাহ করব? আল্লাহর শপথ! মদীনার উভয় প্রান্তের মধ্যে আমার পরিবারের চেয়ে অভাবগ্রস্ত আর কেউ নেই। তখন আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে উঠলেন এবং তার দাঁত দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেন, এগুলো তোমার পরিবারকে খাওয়াও’।[4]
(২৯) ওয়াদা পূরণ করা :
মহান আল্লাহ বলেন,وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে’ (বনী ইসরাঈল, ১৭/৩৪)। এ বিষয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لاَ إِيمَانَ لِمَنْ لاَ أَمَانَةَ لَهُ وَلاَ دِينَ لِمَنْ لاَ عَهْدَ لَهُ- ‘ঐ ব্যক্তির ঈমান নেই, যার আমানত নেই এবং ঐ ব্যক্তির দ্বীন নেই, যার ওয়াদা ঠিক নেই’।[5]
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির জন্য যে সমস্ত বিষয় হালাল করেছেন, সেগুলো হালাল হিসাবে গ্রহণ করা বরং যে সমস্ত বিষয় হারাম করেছেন, সেগুলো হারাম হিসাবে মেনে নেওয়া, আর যে সমস্ত বিষয় ফরয করেছেন তা ফরয হিসাবে গ্রহণ ও জীবনে বাস্তবায়ন করা। এ বিষয়ে কুরআনে যা বর্ণিত হয়েছে তা জীবনে বাস্তবায়ন করা, ওয়াদা পূরণ করা, খিয়ানত না করা।[6] হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ.
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান, সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক্ব। যার মধ্যে তার কোন একটি স্বভাব থাকবে তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিক্বীর একটি স্বভাব থেকে যায়। (১) আমানত রাখা হলে তার খিয়ানত করে (২) যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা বলে (৩) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে (৪) বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালিগালাজ করে’।[7] এ বিষয়ে অন্য হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاَثٌ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَان.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মুনাফিক্বের আলামত তিনটি: (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে (২) যখন সে অঙ্গীকার করে তখন ভঙ্গ করে (৩) তার নিকট আমানত রাখলে তার খিয়ানত করে’।[8]
(চলবে)
[1]. ইবনে কাছীর, হা/১৬৬।
[2]. ইবনে কাছীর, ৪/২০৯ পৃঃ।
[3]. স্ত্রীকে মায়ের সাথে অথবা মায়ের কোন অঙ্গের সাথে তুলনা করাকে ‘যিহার’ বলে। প্রাচীন আরব সমাজে স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হত। ইসলামে এর মাধ্যমে সরাসরি বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তবে অসঙ্গত কথা বলার কারণে কাফ্ফারা দিতে হয়।
[4]. বুখারী, হা/১৯৩৬; মুসলিম, হা/১১১১; আহমাদ, হা/৭২৯০।
[5]. আহমাদ, হা/১২৪০৬; মিশকাত, হা/৩৫।
[6]. ইবনু কাছীর, ৫/৮ পৃঃ।
[7]. বুখারী, হা/৩৪; মুসলিম, হা/৫৮; আহমাদ, হা/৬৭৬৮।
[8]. বুখারী, হা/৩৩; মুসলিম, হা/৫৯; আহমাদ, হা/৮৬৮৫।
