বিয়ে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ এবং মানবজীবনের একটি পবিত্র বন্ধন। এর মাধ্যমে শুধু দুজন মানুষের নয়, বরং দুটি পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং একটি নতুন পরিবার গড়ে ওঠে। ইসলাম বিয়েকে সহজ, শালীন ও বরকতময় করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকাল আমাদের সমাজে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, অনেক মুসলিম পরিবারের বিয়ে সুন্নাহর পথে নয়; বরং হারাম ও কুসংস্কারের পথ ধরেই শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিয়েকে আমরা লোকদেখানো, অপচয়, বেপর্দা, অশ্লীলতা এবং গুনাহর এক বিশাল আয়োজনে পরিণত করেছি। বর্তমান সময়ে বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে এমন অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে, যা ইসলামী আদর্শ ও শালীনতার পরিপন্থি।
বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রচলিত হারাম ও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড:
১. গান-বাজনা ও ডিজে/সাউন্ড সিস্টেম: বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয় উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনার মাধ্যমে। ইসলামী পরিবেশের পরিবর্তে শয়তানী আমেজে পুরো অনুষ্ঠান ভরে যায়। অনেক সময় অশ্লীল গান, নাচানাচি ও হৈ-হুল্লোড়কেই আনন্দের অংশ মনে করা হয়।
২. গায়ে হলুদের নামে বেপর্দা ও বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা: গায়ে হলুদ এখন অনেক জায়গায় ইসলামী সংস্কৃতি নয়; বরং হিন্দুয়ানি বা অপসংস্কৃতির অনুকরণে পরিণত হয়েছে। বেগানা নারী-পুরুষ একসঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, ছবি তোলা, শরীরে রং মাখামাখি—এসবকে ‘মজা’ বলা হয়। অথচ এখান থেকেই ফিতনা, লজ্জাহীনতা ও যেনার সূচনা হয়।
৩. দেবর-ভাবি, ভাসুর-ভাবি, চাচাতো/ফুফাতো/মামাতো ভাইবোনের নামে সীমালঙ্ঘন: আমাদের সমাজে একটি ভয়ংকর ভুল ধারণা রয়েছে, ‘আরে, ও তো আপন মানুষ’। কিন্তু শরীআতের দৃষ্টিতে অনেকেই বেগানা। দেবর-ভাবির অতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা, স্পর্শ, রং মাখানো, ছবি তোলা—এসব ইসলাম কখনো বৈধ করেনি। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেবরকে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করেছেন অর্থাৎ এ সম্পর্কের ফিতনা অত্যন্ত ভয়াবহ।
৪. বেপর্দা ও অশালীন সাজসজ্জা: বিয়েতে মেয়েদের এমন সাজে উপস্থাপন করা হয় যেন পর্দা বলে কিছুই নেই। অনেক সময় আত্মীয়স্বজন, ভিডিওগ্রাফার ও ফটোগ্রাফারসহ সবার সামনে কনেকে বসিয়ে রাখা হয়। নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শন যেন এখন অনুষ্ঠান সফলতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫. ফ্রি-মিক্সিং ও অশালীন ফটোসেশন: বিয়ের অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে অবাধে চলাফেরা, হাসাহাসি, সেলফি, ভিডিও ও টিকটক করা এখন সাধারণ ব্যাপার। অনেক সময় এমন ছবি-ভিডিও ধারণ করা হয়, যা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো শুধু গুনাহ নয়, বরং ভবিষ্যৎ ফিতনারও দরজা খুলে দেয়।
৬. নাচ-গান, অশ্লীলতা ও অভিনয়ধর্মী অনুষ্ঠান: অনেক বিয়েতে মেয়েদের নাচ, ছেলেদের নাচ, বর-কনেকে জোর করে নাচানো, নাটকীয় প্রবেশ, কেক কাটা এবং অশালীন উপস্থাপনাকে মডার্ন বলা হয়। অথচ এগুলো লজ্জাশীলতা, ইসলামী আদব এবং বৈবাহিক মর্যাদার সম্পূর্ণ বিপরীত।
৭. অপচয় ও লোকদেখানো প্রতিযোগিতা: কে কত বড় স্টেজ করবে, কে কত দামি ডেকোরেশন করবে, কে কত পদের খাবার পরিবেশন করবে—এগুলো আসলে অহংকারের প্রতিযোগিতা! অনেক পরিবার ঋণ করে, জমি বিক্রি করে কিংবা ধার করে শুধু সমাজকে দেখানোর জন্য বিয়েতে এমন আয়োজন করে থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।
৮. যৌতুক ও উপহারের নামে যুলম: অনেক জায়গায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবি করা হয়। কখনো মোটরসাইকেল, কখনো টাকা, কখনো আসবাবপত্র, কখনো সোনাদানা চাওয়া হয়। বলা হয়, ‘চাওয়া হয়নি, তবে আশা তো আছে’—এই ভাষাতেও যুলম চলে। এটি শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, বরং মারাত্মক অন্যায়।
৯. মোহরানা নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু আদায় করা হয় না: বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরয বিষয়গুলোর একটি হলো মোহর। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? মুখে এক লাখ, দুই লাখ বা পাঁচ লাখ টাকা মোহর ধার্য করা হয়; কিন্তু তা পরিশোধের কোনো বাস্তব ইচ্ছা থাকে না। এ যেন কাগজে-কলমে ধর্ম পালন আর বাস্তবে অবহেলা। অথচ মোহর স্ত্রীর হক্ব এবং তা আদায় করা স্বামীর দায়িত্ব।
১০. সুন্নাহ ছেড়ে কুসংস্কার ও সমাজের চাপ: ‘শুভ দিন না হলে বিয়ে নয়’, ‘এই দিন ভালো, ওই দিন খারাপ’, ‘অমুক রীতি না মানলে বিয়ে হবে না’—এসব কুসংস্কার আমাদের সমাজে এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান। কুরআন-সুন্নাহর চেয়ে সমাজের কথাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
১১. ইবাদতহীন বিয়ে: কত বিয়েতে ছালাতের পরিবেশ নেই, কুরআন তেলাওয়াত নেই, দু‘আ নেই, সুন্নাহ অনুযায়ী খুৎবা নেই, আল্লাহর ভয় নেই; কিন্তু গান, ছবি ও হৈ-হুল্লোড় সবই আছে! তাহলে সেই বিয়েতে রহমত নাযিল হবে কীভাবে?
কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
প্রশ্ন হলো, এত হারাম, বেপর্দা, গান-বাজনা, অশালীনতা, অপচয়, কুসংস্কার, যৌতুক, বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং মোহর আদায়ে গাফিলতির ভিড়ে আমাদের বিয়েগুলো কি সত্যিই হালাল পদ্ধতিতে হচ্ছে? নাকি আমরা হালাল বিয়ের নামে হারামকে সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করেছি?
সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো আজ আমাদের অনেক সংসারে বরকত নেই। বিয়ে হচ্ছে জাঁকজমকের সঙ্গে, কিন্তু সংসার টিকছে না। দুদিন যেতে না যেতেই অশান্তি, সন্দেহ, ঝগড়া, মান-অভিমান, অশ্রদ্ধা ও অবিশ্বাস দেখা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ঘটছে তালাক, বিচ্ছেদ ও পারিবারিক ভাঙন।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, যে সম্পর্কের শুরুতেই আল্লাহর নাফরমানী থাকে, সেখানে আল্লাহর রহমত ও বরকত টিকে থাকবে কীভাবে? যে বিয়ের শুরু হারাম দিয়ে, সে সংসারে শান্তি না থাকা কি অস্বাভাবিক?
আজ তালাকের সংখ্যা বাড়ছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা কমছে, অল্পতেই সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, পরিবারে রহমতের পরিবর্তে অশান্তি নেমে আসছে। এর পেছনে আমাদের বিয়ের হারাম সংস্কৃতি কি একটি বড় কারণ নয়?
আমাদের করণীয়:
বিয়ে সহজ করতে হবে। সুন্নাহ অনুযায়ী বিয়ে করতে হবে। গান-বাজনা, নাচ, বেপর্দা ও ফ্রি-মিক্সিং বন্ধ করতে হবে। গায়ে হলুদের নামে অপসংস্কৃতি বর্জন করতে হবে। মোহরানা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করে আদায় করতে হবে। যৌতুকের সব পথ বন্ধ করতে হবে। অপচয় কমাতে হবে। কুরআন তেলাওয়াত, দু‘আ, খুৎবা এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে বিয়ের সূচনা করতে হবে। সমাজের ভয় নয়, বরং আল্লাহর ভয়কে বড় করে দেখতে হবে।
শেষ কথা:
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিয়ে ইবাদত, প্রদর্শনী নয়; বিয়ে সুন্নাহ, অপসংস্কৃতি নয় এবং বিয়ে বরকতের পথ, গুনাহের মঞ্চ নয়। আসুন, আমরা আমাদের বিয়ে, পরিবার ও সমাজকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে গড়ে তুলি। হারামমুক্ত বিয়ে হোক, বরকতময় সংসার হোক, তালাকমুক্ত সমাজ গড়ে উঠুক। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন- আমীন!
এম. এ. আলীম
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
