কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

বই থেকে স্ক্রিন: একটি জাতির নীরব পতন

post title will place here

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির প্রতি সর্বপ্রথম যে অহী নাযিল করেছেন, তা ছিল ‘পড়ুন’ (اقْرَأْ)। এটি কেবল একটি শব্দ নয়; বরং একটি সভ্যতা নির্মাণের ঘোষণা। যে উম্মাহর সূচনা হয়েছিল পাঠ, জ্ঞান, গবেষণা ও কলমের মাধ্যমে, সেই উম্মাহরই একটি বড় অংশ আজ বই থেকে মুখ ফিরিয়ে ক্ষণস্থায়ী বিনোদনের পর্দায় বন্দি হয়ে পড়েছে।

এক সময় মুসলিমদের ঘরে ঘরে বই ছিল, গ্রন্থাগার ছিল জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র, আলেমরা রাতের পর রাত গবেষণায় নিমগ্ন থাকতেন, শিক্ষার্থীরা শত শত মাইল অতিক্রম করে একটি হাদীছ সংগ্রহ করতেন। আর আজ? হাতে বইয়ের পরিবর্তে স্মার্টফোন, পাঠাগারের পরিবর্তে নিউজফিড, গবেষণার পরিবর্তে রিলস, গভীর চিন্তার পরিবর্তে অবিরাম স্ক্রলিং। এটি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও সভ্যতাগত সংকট। কারণ যে জাতি বই থেকে দূরে সরে যায়, সে জাতি ধীরে ধীরে চিন্তাশক্তি, গবেষণা, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ জ্ঞানের স্থান দখল করে আবেগ, যুক্তির স্থান দখল করে গুজব, আর প্রজ্ঞার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় অগভীরতা। তাই বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

শিশু থেকে বৃদ্ধ, ছাত্র থেকে শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে চাকরিজীবী—প্রায় সব শ্রেণির মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করছেন। অথচ একটি ভালো বই পড়ার জন্য প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট সময়ও অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়। যে সময়ে কয়েকটি মূল্যবান অধ্যায় পড়ে জ্ঞান বৃদ্ধি করা যেত, সেই সময়ে শত শত অর্থহীন ভিডিও দেখে দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত নয়; পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনেও এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বই বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, অনেক প্রকাশনী কার্যক্রম সীমিত করেছে, কোনোটা বন্ধ হয়ে গেছে, আরও অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াই করছে, নতুন লেখক নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, গবেষণার ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে, পাঠকের সংখ্যা কমছে—এ সবকিছুই একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো মুসলিম উম্মাহর এই বইবিমুখতা তাদের জ্ঞানের দুর্বলতা, মতভেদ, ভ্রান্ত আক্বীদার বিস্তার, চিন্তার দারিদ্র্য এবং বিশ্বসভ্যতায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেদিন মুসলিমরা বইকে ভালোবেসেছিল, সেদিন তারাই ছিল পৃথিবীর জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, গণিত ও সভ্যতার অগ্রদূত।

এই প্রবন্ধে কুরআন-সুন্নাহ, সালাফে ছালেহীনের জীবন, ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটের আলোকে আলোচনা করা হবে—কেন মানুষ বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এর ভয়াবহ পরিণতি কী, মুসলিম সমাজের অধঃপতনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কতটা গভীর, প্রকাশনা শিল্প কেন সংকটে এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ কীভাবে আবার বইমুখী হতে পারে। যে জাতির প্রথম শব্দ ছিল ‘ইক্বরা’ (اقْرَأْ), সেই জাতির হাতে আবারও বই ফিরিয়ে দেওয়াই আজ সময়ের অন্যতম বড় দাওয়াত।

‘ইকরা’ থেকে ‘স্ক্রল’ একটিউম্মাহরপরিবর্তিতযাত্রা: আল্লাহ তাআলা যখন মানবজাতির জন্য সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ইসলাম নাযিল করলেন, তখন প্রথম নির্দেশ ছিল না ছালাত, ছিয়াম বা যাকাত; বরং নির্দেশ ছিল, اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ‘পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (আল-আলাক, ৯৬/১)। এটি নিছক একটি শব্দ নয়, বরং একটি সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর। ইসলামের সূচনাই হয়েছে জ্ঞান, পাঠ, গবেষণা ও চিন্তার মাধ্যমে। যে উম্মাহর প্রথম শিক্ষা ছিল ‘পড়ো’, সে উম্মাহর হাতে বই থাকবে, কলম থাকবে, গবেষণা থাকবে—এটাই ছিল স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ن وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ‘নূন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার’ (আল-কলম, ৬৮/১)। আবার তিনি বলেন, قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না—তারা কি সমান হতে পারে?’ (আয-যুমার, ৩৯/৯)। এ থেকেই স্পষ্ট যে, ইসলাম এমন একটি জাতি গঠন করতে চেয়েছে, যারা চিন্তা করবে, পড়বে, গবেষণা করবে এবং জ্ঞানের মাধ্যমে পৃথিবীকে আলোকিত করবে। কিন্তু আজ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের অবসর মানেই স্মার্টফোন। কয়েক মিনিটের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেও অজান্তেই ঘণ্টা দুয়েক কেটে যায়। অসংখ্য ছোট ভিডিও, রিলস, শর্টস ও অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট মানুষের মনোযোগকে এমনভাবে বন্দি করেছে যে, একটি ২০০ পৃষ্ঠার বই পড়া তো দূরের কথা, অনেকেই পাঁচ পৃষ্ঠাও একাগ্রচিত্তে পড়তে পারেন না। এ যেন ‘ইক্বরা’ থেকে ‘স্ক্রল’-এ যাত্রা, যেখানে পাঠের পরিবর্তে পর্দা, জ্ঞানের পরিবর্তে বিনোদন, গবেষণার পরিবর্তে ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা স্থান করে নিয়েছে।

সবচেয়েদুঃখজনকবিষয়হলো- এই পরিবর্তনকে আমরা অগ্রগতি মনে করছি, অথচ বাস্তবে এটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। কারণ একটি জাতির চিন্তার গভীরতা নির্ধারিত হয় তার পাঠাভ্যাস দিয়ে, স্ক্রল করার গতিতে নয়। আজ বইয়ের দোকানে ক্রেতার চেয়ে দর্শক বেশি। বইমেলায় ছবি তোলার মানুষ বেশি, বই কেনার মানুষ কম। অনেক প্রকাশনী বিক্রি কমে যাওয়ায় নতুন বই প্রকাশে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। এটিকেবলএকটিশিল্পেরসংকটনয়, বরংজ্ঞানভিত্তিকসমাজব্যবস্থারসংকট। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন মুসলিমরা বইকে আপন করে নিয়েছিল, তখন তারা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়েছিল। আর যখন তারা বই ছেড়ে বিলাসিতা, অলসতা ও অনর্থক কাজে নিমগ্ন হয়েছে, তখনই তাদের নেতৃত্ব অন্যের হাতে চলে গেছে। এটি ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন’।[1]

দ্বীনের গভীর জ্ঞান কখনোই কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখে অর্জিত হয় না; বরং এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পাঠ, চিন্তা, গবেষণা, আলেমদের সান্নিধ্য এবং উপকারী বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক।

সামাজিকযোগাযোগমাধ্যমআধুনিকযুগেরনীরবসময়-চোর: আজকের পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থ, সম্পত্তি বা প্রযুক্তি নয়; বরং সময় ও মনোযোগ (Attention)। কারণ যার সময় ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়; তার চিন্তা, সিদ্ধান্ত, অভ্যাস এমনকি জীবনধারাও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ঠিক এই কাজটিই করছে, আর তা হলো মানুষের মনোযোগকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্দার সঙ্গে আটকে রাখা। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের মূল উদ্দেশ্য কেবল তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং ব্যবহারকারীকে যত বেশি সময় সম্ভব সেখানে ধরে রাখা। তাই একটির পর একটি ভিডিও, রিলস, শর্টস ও নোটিফিকেশনের মাধ্যমে মানুষের কৌতূহলকে ক্রমাগত উসকে দেওয়া হয়। ফলত, মানুষ নিজের অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে ফেলে, অথচ দিন শেষে তার অর্জন থাকে খুবই সামান্য। এটি এমন এক নীরব চুরি, যার শব্দ শোনা যায় না; কিন্তু যার ক্ষতি একটি পুরো জীবনকে গ্রাস করতে পারে।

সময়েরব্যাপারেইসলামেরদৃষ্টিভঙ্গি: আল্লাহ তাআলা সময়ের গুরুত্ব বুঝাতে শপথ করে বলেন,

وَالْعَصْرِ-إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ-إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ

‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’ (আল-আছর, ১০৩/১–৩)। ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি মানুষ কেবল সূরা আল-আছর নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত, তবে এটিই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।[2] কারণ এই সংক্ষিপ্ত সূরাটি মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতার মৌলিক নীতি তুলে ধরে।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকাগ্রস্ত, তা হলো সুস্থতা ও অবসর’।[3] আজ অবসর সময়ের সবচেয়ে বড় ভোক্তা হয়ে উঠেছে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

অনর্থক কাজে সময় নষ্টের ব্যাপারে হাদীছে সতর্কবাণী করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ ‘মানুষের উত্তম ইসলামের লক্ষণ হলো, সে অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করবে’।[4] তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ ‘কিয়ামতের দিন বান্দার পদযুগল সরবে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে- সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’।[5] তাহলে আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা স্ক্রল করার হিসাব আমরা কীভাবে দেব?

মনোযোগেরঅবক্ষয়: গভীর চিন্তার শত্রু হলো অমনোযোগিতা। বই পড়া মানুষকে ধৈর্য শেখায়, চিন্তা করতে শেখায় এবং বিশ্লেষণ করতে শেখায়। কিন্তু ছোট ছোট ভিডিও মানুষকে দ্রুত উত্তেজনা ও তাৎক্ষণিক বিনোদনের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে দীর্ঘ লেখা পড়া, গবেষণা করা বা মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। এ কারণেই আজ অনেক শিক্ষার্থী একটি অধ্যায় পড়তে বিরক্তিবোধ করে, কিন্তু একই সময়ে শতাধিক ছোট ভিডিও সে দেখে ফেলতে পারে। এটি কেবল অভ্যাসের পরিবর্তন নয়; বরং মানুষের চিন্তার ধরনও পরিবর্তন করে দিচ্ছে।

মুসলিমযুবসমাজ ও স্ক্রলিং: যুবসমাজই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু যখন একজন যুবকের দিনের কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিনে হারিয়ে যায়, তখন সে— (১) জামাআতের সাথে ছালাত আদায় করার সুযোগ পায় না। (২) কুরআন তিলাওয়াত থেকে দূরে সরে যায়। (৩) ইসলামী বই পড়া কমিয়ে দেয়। (৪) দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। (৫) দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হারায়। (৬) পরিবারকে সময় দিতে পারে না। (৭) আত্মউন্নয়নের পরিবর্তে অন্যদের সাথে তুলনা, বিনোদন ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে।

এর ফলে ব্যক্তি দুর্বল হয়, পরিবার দুর্বল হয়, সমাজ দুর্বল হয়, আর শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে পুরো উম্মাহ। একটি নির্মম বাস্তবতা আজ অনেকেই দাবি করেন যে, ‘আমার বই পড়ার সময় নেই’। কিন্তু একই ব্যক্তি প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দেন। অর্থাৎ সমস্যাটি সময়ের অভাব নয়; বরং সময়ের অগ্রাধিকার (Priority)-এর অভাব। যে জাতি বই পড়ার জন্য সময় বের করতে পারে না, কিন্তু বিনোদনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে পারে, সে জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব (Intellectual Leadership) হারানো অস্বাভাবিক নয়।

পঠনবিমুখতা: মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের অন্যতম কারণ হলো পঠনবিমুখতা বা বইবিমুখতা। কোনো জাতির শক্তি কেবল তার জনসংখ্যা, অর্থনীতি বা সামরিক সামর্থ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার জ্ঞান, চিন্তা, গবেষণা ও আদর্শে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি বইকে ভালোবেসেছে, জ্ঞানকে সম্মান করেছে এবং গবেষণাকে উৎসাহিত করেছে—তারাই সভ্যতার নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যে জাতি বই থেকে দূরে সরে গেছে, তারা ধীরে ধীরে অন্যের চিন্তার অনুসারীতে পরিণত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের প্রথম যুগে কুরআন, হাদীছ, ফিক্বহ, ভাষা, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও দর্শনসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। হাজার হাজার গ্রন্থ রচিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশাল গ্রন্থাগার, আর আলেমরা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন জ্ঞান সংরক্ষণ ও প্রচারে। সেই জ্ঞানচর্চার ফলেই মুসলিমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী বিশ্বসভ্যতার অগ্রভাগে অবস্থান করেছে।

কিন্তু আজ পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। মুসলিম বিশ্বের বহু স্থানে বই পড়ার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্ষণস্থায়ী বিনোদন এবং তাৎক্ষণিক তথ্যের প্রবাহ গভীর অধ্যয়নের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ শিরোনাম পড়ে মতামত দিচ্ছে, কিন্তু বই পড়ে বিষয়টি বুঝার আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে জ্ঞানের অতল গভীরে ডুব দেওয়ার চেয়ে, বিষয়ের উপরিভাগে ভাসাভাসা সাঁতার কাটার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে।

জ্ঞানচর্চাপরিত্যাগেরপরিণতি: আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا ‘আর বলুন, হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন’ (ত্বা-হা, ২০/১১৪)। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তাঁর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্পদ বা ক্ষমতা বৃদ্ধির দু‘আ শেখাননি; বরং জ্ঞান বৃদ্ধির দু‘আ শিখিয়েছেন। এটি ইসলামে জ্ঞানের মর্যাদা কত উচ্চ, তা স্পষ্ট করে দেয়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন’।[6]

এখানে ‘তাফাক্কুহ’ (গভীর অনুধাবন) শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। গভীর জ্ঞান অর্জন কখনোই কয়েক মিনিটের ভিডিও বা সংক্ষিপ্ত পোস্টের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অধ্যয়ন, চিন্তা ও বইয়ের সঙ্গ।

(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)

শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৩৭।

[2]. তাফসীরুল ইমাম শাফেঈ, ৪/১৪৬১; তাফসীর ইবনু কাছীর, ১/২০৩।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১২।

[4]. তিরমিযী, হা/২৩১৭, ‘হাসান’।

[5]. তিরমিযী, হা/২৪১৭, ‘হাসান ছহীহ’।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৩৭।

Magazine