কিচেন থেকে টুংটাং শব্দ শুনে রাফি বুঝতে পারল, নিশ্চয়ই রাজিয়ার কাজ। রাজিয়া হচ্ছে রাফির একমাত্র ছোট বোন। তার মা রাবেয়া বেগম দুপুরের খাবার খেয়ে একটা ভাতঘুম দেন, উঠেন আছরের আযান হলে। এখনো আছরের আযান হয়নি, তার মানে কিচেনে রাজিয়া ছাড়া কেউ নয়।
রাফি চুপিচুপি রাজিয়ার পেছনে গিয়ে মাথায় একটা ঠোক দিয়ে বলল, ‘কাপের মধ্যে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? নাকি জাদু বলে পানি হয়ে যাবে চা?’ রাজিয়া কাপ থেকে পানি ফেলে লিকার নিয়ে চা বানাতে বানাতে বলল, ‘জাদু-টাদু কিছু না, সিম্পল ফিজিক্স। চায়ের কাপ হয়ে থাকে একদম ঠাণ্ডা। যখনই ঠাণ্ডা কাপে লিকার নিয়ে চা বানাই, অল্পক্ষণেই চা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। খেয়ে মজা পাই না। চা খেতে হয় গরম গরম। তাই আগে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে কাপ গরম করে নিয়েছি। এখন আর চা দ্রুত ঠাণ্ডা হবে না’।
রাফি একটা ঘুমের হাই তুলে বলল, ‘মস্ত বড় আবিষ্কার। এবার ফিজিক্সে নো-বেলটা তাহলে তুই পাবি’। রাজিয়া বলল, ‘নতুন আবিষ্কারের কিছু না। ল অব থার্মোডাইনামিক্স। তাপ গরম বস্তু থেকে শীতল বস্তুতে চলে যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। ইয়ার্কি বন্ধ করে আমাকে একটা হেল্প করো ভাইয়া’।
রাজিয়া রাফির হাতেও এক কাপ চা দিয়ে একটা কাগজ নিয়ে এসে বলল, ‘কী হেল্প লাগবে, সেটাও জিজ্ঞেস করলে না?’ রাফি চা খেতে খেতে হেয়ালি করে বলল, ‘তাতেও নাহি মিলে নিস্তার, বলেন—কী পর সমাচার?’
—আব্বু দুপুরে বাইরে যেতে আমাকে একটা গল্প দিয়ে বললেন, এই গল্পের সঙ্গে কুরআনের কোন আয়াতের সম্পর্ক আছে, সেটা জানাতে। আমি তো গল্প পড়ে আয়াত মেলাতে পারছি না।
—গল্পের বিষয়বস্তু কী?
—টাইটানিক জাহাজ ডুবে যাওয়া।
রাফি চায়ের কাপ রেখে বলল, ‘টাইটানিক জাহাজের সঙ্গে আবার কুরআনের আয়াতের মিল পেল কীভাবে?’ বিষয়টা ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা, গল্পটা পড়ে দেখি আগে। রাফি তিন পৃষ্ঠার গল্প পড়ে যা বুঝল, সংক্ষেপে এই—
১০ই এপ্রিল, ১৯১২। মাইকেল জন অতি অস্থিরতার সঙ্গে টাইটানিকে চড়তে যাত্রা করেন। প্রথম শ্রেণির সাধারণ টিকিটের মূল্য ছিল তৎকালীন ১৫০ ইউরো, বর্তমানে প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা। এই অকল্পনীয় দামেও টিকিট সংগ্রহ করা সহজ কথা ছিল না। মাইকেল জন বড় বিজনেসম্যান হয়েও অনেক কষ্টে টিকিট সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। আজ তিনি খুব আনন্দিত। কারণ তিনিও টাইটানিকে ভ্রমণ করে সাক্ষী হতে যাচ্ছেন বিশ্ব ইতিহাসের। কিন্তু পথিমধ্যে গাড়িতে কিছু একটা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়ায় তিনি টাইটানিকে উঠতেই পারেননি। অথচ টাইটানিক যাত্রাস্থল সাউথ্যাম্পটন থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে যাত্রা শুরু করেছে।
মাইকেল জন টাইটানিক ভ্রমণ মিস করে অনেক হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বাসায় এসে নাওয়াখাওয়া একপ্রকার বন্ধ অবস্থা। সবার সঙ্গে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করছে, সেই সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অনেক অভিযোগ আর মন্দ কথা বলে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করছে। তার মতে, গড কেন যাত্রাপথে তার ভালো গাড়িতে যান্ত্রিক ত্রুটি করলেন, যার ফলে ভ্রমণ মিস হয়েছে, নষ্ট হয়েছে এতগুলো টাকা।
মাত্র চার দিন পর যখন তিনি খবর পেলেন, ১৫ই এপ্রিল স্বপ্নের জাহাজ টাইটানিক উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে গেছে এবং শত শত যাত্রী সাগরে মারা পড়েছে, তখন মুহূর্তের মধ্যে জন দুঃখ হতাশার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আনন্দিত হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, গড যদি গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি দিয়ে তার যাত্রা মিস না করাতেন, তাহলে তিনিও মৃতদের একজন হতে পারতেন। তাছাড়া ১৫০ ইউরোর চেয়ে তার জীবন বেশি মূল্যবান।
জামিল সাহেব গল্পের শেষে সৃজনশীল প্রশ্নের মতো লিখে রেখেছেন, ‘গল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত লিখো’।
রাজিয়া এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কূলকিনারা হয়েছে, ভাইয়া? নাকি তোমার মাথাও আমার মতো হ্যাং হয়ে গেছে?’ রাফি বলল, ‘হ্যাংয়ের যুগ আছে এখন? চ্যাটজিপিটি-কে জিজ্ঞেস করলাম, সমুদ্রে দুর্ঘটনা বা বিপদ-আপদ নিয়ে কুরআনে কোন আয়াত আছে? চ্যাটজিপিটি আয়াত বের করে দিয়েছে। লিখে ফেল। অবশ্য গল্পে একটা ব্যাপার ভুল আছে’।
রাজিয়া কলম হাতে নিয়ে বলল, ‘কোন ব্যাপার?’
—আমি গুগল করে দেখছি, প্রায় ১২ জনের বেশি টাইটানিকের টিকিট কেটেও বিভিন্ন কারণে ভ্রমণ মিস করেছে। তাদের মধ্যে মাইকেল জন নামে কেউ নেই। আব্বু মাইকেল জন পেল কোত্থেকে?
—আমার মনে হয়, এরকম হুবহু ঘটনা ঘটেনি বলে আব্বু বাস্তব চরিত্রের নাম ব্যবহার করেননি, তাঁর গল্পে একটা রূপক নাম নিয়েছেন। তুমি আয়াত বলো, লিখে রাখি।
রাফি হাতে ফোন নিয়ে বলল, সূরা বনী ইসরাঈলের ৬৭ নম্বর আয়াত— ‘আর যখন তোমাদেরকে সমুদ্রে বিপদ স্পর্শ করে, তখন তিনি ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাক, তারা (তোমাদের মন থেকে) হারিয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে রক্ষা করে স্থলে আনেন, তখন তোমরা বিমুখ হয়ে যাও। আর মানুষ তো খুব অকৃতজ্ঞ’।
জামিল সাহেব আছরের পর বাসায় ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে, এক কাপ চা খেয়ে সকালের বাসি পত্রিকা দেখছেন। কিছুক্ষণ পর রাজিয়া এসে আনন্দিত মনে গল্পের সঙ্গে লিখে রাখা আয়াত দেখিয়ে বলল, ‘তোমার গল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত আয়াত খুঁজে বের করেছি, আব্বু’।
জামিল সাহেব চশমা চোখে দিয়ে আয়াতের ওপর চোখ বুলিয়ে চুপ করে রইলেন। রাজিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ‘তুমি কি ভেবেছ, আমি পারব না, আব্বু?’ জামিল সাহেব হাতের ইশারায় রাজিয়াকে বসতে বললেন। রাজিয়া খুশি মনে বসল।
জামিল সাহেব বললেন, ‘গল্পের মূল জিনিস তুই ধরতে পারিসনি। তোর লেখা আয়াত হচ্ছে, মারাত্মক বিপদে পড়লে সবাই অন্য উপাসনা ছেড়ে এক আল্লাহকে ডাকে। হয়তো টাইটানিকের যাত্রীরা ডুবে যাওয়ার সময় তাই করেছিল। কিন্তু আমাদের মূল বিষয় টাইটানিক ডুবে যাওয়া নয়; টাইটানিকে উঠতে না পেরে মাইকেলের বেঁচে যাওয়াটাই মূল বিষয়। এই সহজ ব্যাপার ধরতে পারলি না কেন?’
রাজিয়া নিম্নস্বরে বলল, ‘সেটা ধরতে পেরেছি’।
—ধরতে পারলে এই আয়াত তো আসার কথা না?
রাজিয়া চুপ করে রইল। জামিল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, গত মাসে সূরা আল-বাক্বারাহ অর্থসহ পড়তে বলেছিলাম। পড়েছিস? রাজিয়া মেজাজ খারাপ করে মনেমনে বলল, ‘ভাইয়ার ওপর নির্ভর করাটাই বিরাট ভুল হয়েছে। এআই মুফতী সেজে আছে। ছুটাচ্ছি আজ এআই মুফতীগিরি’।
জামিল সাহেব বললেন, ‘বিড়বিড় করছিস কেন? পড়িসনি?’ রাজিয়া সংবিৎ ফিরে বলল, ‘জি, পড়েছি’।
—গল্পে আমরা কী বুঝলাম? আমাদের অনেক চাওয়া আছে, যা আমরা নিজের জন্য ভালো মনে করি, কিন্তু আল্লাহ আমাদের তা দেন না। কারণ আমাদের চাওয়া ব্যাপারটাতেই আমাদের নিজেদের জন্য অকল্যাণ আছে। এমন একটা আয়াত আছে না সূরা আল-বাক্বারায়?
—এখন ক্লিয়ার বুঝতে পেরেছি, আব্বু। এক মিনিট, আয়াতটা খুঁজে বের করছি।
রাজিয়া পটাপট বাংলা হাদিস অ্যাপস থেকে সূরা আল-বাক্বারার ২১৬ নম্বর আয়াত বের করে শুনাল, ‘হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না’। তার মানে ভালো কিছু চেয়ে এবং নিজের যথাসাধ্য চেষ্টা করেও যদি না পাওয়া যায়, রাগান্বিত হওয়া যাবে না, আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট হওয়া যাবে না। হতে পারে সেটাতে কোনো অকল্যাণ আছে। আবার খারাপ কিছু ঘটলেও ছবর করতে হবে। হয়তো তাতেও কোনো কল্যাণ আছে, যা আল্লাহ জানেন। আমরা জানি না।
জামিল সাহেব বললেন, ‘এইতো বুঝেছিস। ভবিষ্যতে ভেবেচিন্তে উত্তর দিতে হবে। দেখতো, তোর মাকে বলেছিলাম আরেক কাপ চা দিতে, এখনো দিচ্ছে না কেন? মনে হচ্ছে আরেকটা চা খেলে ভালো লাগবে’। রাবেয়া বেগম অনতিদূর থেকে বললেন, ‘তাতে অকল্যাণ আছে, সুগার’। জামিল সাহেব চশমার ওপর দিয়ে একবার তাকিয়ে ভিন্ন কিছু বললেন না। রাজিয়া হাসতে হাসতে কিচেনের দিকে গেল।
-মুগনিউর রহমান তাবরীজ
আই.টি ম্যানেজার, হাবরুল উম্মাহ মডেল মাদরাসা, লক্ষ্মীপুর।
