কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

জেরুযালেম ও বায়তুল ‍মুক্বাদ্দাস: ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা (পর্ব-৮)

post title will place here

ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ ও বায়তুল মুক্বাদ্দাস: মিশর এবং সিরিয়া একক কেন্দ্রীয় শাসনভুক্ত হওয়ার পর সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ বায়তুল মুক্বাদ্দাস বিজয় করার উদ্দেশ্যে রওনা করলেন। বায়তুল মুক্বাদ্দাস বিজয়ের উদ্দেশ্যে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ তথা হিত্তিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৪ জুলাই, ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৫৮৩ হিজরীর রবীউছ ছানী মাসে। ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ সর্বপ্রথম বুহায়রা তাবারিয়া নামক পানির খাল নিজের দখলে নিয়ে নেন। উল্লেখ্য, এই বুহায়রা তাবারিয়ার কথা দাজ্জাল জানতে চেয়েছিল, যা তামীম দারী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। উক্ত বুহায়রা তাবারিয়া বর্তমানে ইসরাঈলের সীমানার অন্তর্ভুক্ত। ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন মরুভূমির উত্তপ্ত গরমে ইউরোপিয়ানদের পরাজিত করতে। এজন্য তিনি তার সেনাবাহিনীকে পূর্ব থেকেই যুদ্ধস্থল থেকে নিকটবর্তী স্থানে প্রচুর পরিমাণে কাঠখড় জমা করার আদেশ দিয়েছিলেন।

ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ ক্রুসেডারদেরকে ফাঁদে ফেলে ধীরে ধীরে মরুভূমির দিকে টেনে আনেন। ক্রুসেডাররা প্রথমে বুঝতে না পেরে মুসলিম বাহিনীকে ধাওয়া করতে করতে গভীর মরুভূমিতে এসে পড়ে। পূর্ব আদেশ অনুযায়ী তাদেরকে মরুভূমিতে নিয়ে আসার পর চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। একদিকে মরুভূমিতে জুন-জুলাই মাসের গরম, অন্য দিকে আগুনের গরম। চতুর্মুখী গরমে যখন তারা পানির জন্য অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখন নিকটস্থ কোনো পানির ব্যবস্থা তাদের ছিল না। পানির আধার ছিল ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ-এর অধীনে। তারা বুঝে ফেলে যে, তারা ফাঁদে পা দিয়েছে। যখন গরম তাদের সহ্যক্ষমতার বাহিরে চলে যায়, তখন তারা শরীর থেকে বর্ম খুলে ফেলতে শুরু করে। ফলত, তাদের শরীর তিরন্দাজদের সহজ নিশানায় পরিণত হয়ে যায়। এভাবে মহান আল্লাহর সহয়তায় মাত্র ১২ হাজার সৈন্যবাহিনীর সামনে প্রায় লক্ষাধিক বিশাল সেনাবাহিনী ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ-এর কৌশলের সামনে পরাজিত ও নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। রাজা রেনল্ডকে ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ নিজ হাতে হত্যা করেন তার দ্বিচারিতা ও চুক্তিভঙ্গের কারণে। রাজা গাইকে তিনি মুক্তি দিয়ে দেন। হিত্তিনের যুদ্ধে বিজয় লাভ করার পর ধারাবাহিকভাবে ফিলিস্তীনের বিভিন্ন শহর বিজয় করতে থাকেন তিনি। ঐতিহাসিকগণের দাবি অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, মাত্র দুই-তিন মাসের মধ্যে ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ যত সিরিয়ান শহর ক্রুসেডারদের অধীনে ছিল তার সবগুলোই বিজয় করে বায়তুল মুক্বাদ্দাসে প্রবেশ করেন।

২৭ রজব, ৫৮৩ হিজরীতে ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ বায়তুল মুক্বাদ্দাসে প্রবেশ করেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু যেমন চেষ্টা করেছিলেন বিনা রক্তপাতে বায়তুল মুক্বাদ্দাস বিজয় করার, ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহও আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বায়তুল মুক্বাদ্দাসে যেন রক্ত না ঝরে। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু দুই দীনার নিয়ে সবাইকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ ১০ দীনার নিয়ে সবাইকে মুক্ত করে দিলেন। অথচ এই শহরেই ৪০-৫০ বছর আগে যখন ক্রুসেডাররা এসেছিল, তখন ৭০ হাজার মুসলিমকে হত্যা করেছিল। এটাই ইসলামের উদারতা!

উল্লেখ্য, ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ-এর মৃত্যুর পর তার পরবর্তী বংশধরের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রায় ৪৩ বছর পর পুনরায় ক্রুসেডাররা বায়তুল মুক্বাদ্দাস দখল করে ফেলে। তবে এবারও ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ-এর পরবর্তী বংশধর ছলেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূবী ৬৪২ হিজরীতে পুনরায় ক্রুসেডারদের হাত থেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাস উদ্ধার করেন।

মামলূক সালতানাত ও মঙ্গোলীয়রা: আমরা জানি ৬৪২ হিজরীতে দ্বিতীয়বার বায়তুল মুক্বাদ্দাস উদ্ধার হয় আর ৬৫৬ হিজরীতে মঙ্গোলীয়দের আক্রমণে আব্বাসীয় খেলাফতের পতন হয়। তথা একই সময়ে মুসলিম উম্মাহর উপর একত্রে ক্রুসেডারদের আক্রমণ ও মঙ্গোলীয়দের আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে, যা ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম সময় ছিল। সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ-এর বিজয়ের পরেও ক্রুসেড যুদ্ধ চলমান ছিল। ক্রুসেডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর যাবৎ আটটি ক্রুসেড পরিচালিত হয়েছে। ক্রুসেড চলমান থাকা অবস্থাতেই মঙ্গোলীয়রা মুসলিম সাম্রাজ্যের উপর হামলে পড়ে। তৎকালীন সময়ের এই উভয়মুখী যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝাতেই সংক্ষিপ্তভাবে মঙ্গোলীয়দের হাত থেকে উদ্ধারের ঘটনাটিও আমাদের জানা থাকা দরকার। আর মঙ্গোলীয়দের হাত থেকে উদ্ধারের ঘটনা বলার পূর্বে আমাদের মামলূকদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য জানা থাকা দরকার।

মামলূক শব্দের শাব্দিক অর্থ দাস। মাদরাসা নিযামিয়াসহ তৎকালীন আইয়ূবী শাসনামলের অসংখ্য মাদরাসায় সবসময় কিছু ইয়াতীম ও ক্রীতদাস ছাত্র ফী সাবীলিল্লাহ পড়াশোনা করত। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন যুদ্ধে পালাক্রমে অংশগ্রহণ করত। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে থেকে অনেকে বিভিন্ন সরকারি দায়িত্ব পাওয়াও শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় আইয়ূবী সালতানাতের অন্যতম সুলতান ছলেহ নাজমুদ্দীন আইয়ূব মারা গেলে তার স্ত্রী শাজারাতুদ দুর ক্ষমতার বাগডোর অক্ষুণ্ন রাখতে একজন মামলূক সেনাপতিকে বিবাহ করেন, যার নাম ইযযুদ্দীন আইবেক। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে মামলূকগণই ক্ষমতার আসনে আরোহণ করতে থাকেন। মামলূকগণ একাধারে মঙ্গোলীয় ও ক্রুসেডার উভয়ের সাথেই যুদ্ধ করেছে। উভয় ফেতনা থেকে মুসলিম বিশ্বকে রক্ষা করেছে। মামলূকদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজাহিদ সুলতান হচ্ছেন সায়ফুদ্দীন কুতয্‌, যাহির বেবার্স ও কালাউন। এই তিনজন ইসলামের ইতিহাসের মহান মুজাহিদ।

মামলূকদের ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই তাতারদের স্রোত আরব বিশ্বে আছড়ে পড়ে। তাতারদের বিশাল স্রোত সমুদ্রের ঢেউ এর মতো বাধাহীন গতিতে সামারকান্দ, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, বোখারাকে পায়ের নিচে পিষ্ট করে এই ঢেউ এসে ক্ষুধার্ত রাক্ষসের মতো হামলে পড়ে আব্বাসীয় খেলাফতের দারুল খিলাফাহ বাগদাদে। তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এই নগরীতে চারদিন যাবৎ কয়েক লক্ষ মুসলিমকে জবাই করে তাদের মাথা দিয়ে মিনার তৈরি করা হয়। হালাকু খাঁ, চেঙ্গিস খাঁ তাদের কাছে শিক্ষা-সভ্যতা বলতে কোনোকিছুই ছিল না। ফলত, শিক্ষা ও সভ্যতার কোনো মূল্যও তাদের কাছে ছিল না। তাই তারা শুধু মানুষ হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লাইব্রেরির মতো জ্ঞান ও বিদ্যার কেন্দ্রও তাদের হামলার কবল থেকে রেহাই পায়নি।

তাতাররা বাগদাদ দখল করে সামনে এগোতে থাকল মিশরের দিকে। কেননা বাগদাদের পর তখন একমাত্র শক্তিশালী মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল মামলূকদের সাম্রাজ্য। মামলূকদের পতন হয়ে গেলে মক্কা-মদীনার পথে বাধাদানকারী কোনো শক্তি আর বাকী থাকবে না। মামলূকদের পতনের অর্থ একত্রে মসজিদে আক্বছার পতন, মিশরসহ আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর পতন। পাশাপাশি মক্কা-মদীনার নিরাপত্তাও হুমকির মুখোমুখি হওয়া। তাই সায়ফুদ্দীন কুতয্ নিজেই মিশর থেকে বের হয়ে আইনে জালূত নামক স্থানে তাতার বাহিনীর মুখোমুখি হন। ২৫ রামাযান, ৬৫৮ হিজরীতে আইনে জালূতের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে প্রথমবারের মতো হালাকু খাঁ, চেঙ্গিস খাঁ বুঝতে পারল যে, দুনিয়াতে কেউ আছে তাদেরকে মোকাবিলা করার মতো। মামলূকদের হাতে তাদের কঠিন এবং ভয়ঙ্করতম পরাজয় হলো। মামলূকদের হাতে তাদের এই পরাজয়ের পর তাদের গতি থেমে যায়। সায়ফুদ্দীন কুতয্‌, যাহিরুদ্দীন বেবার্স ও কালাউন এই তিনজন মিলে সমগ্র আরব এলাকা থেকে ক্রুসেডার এবং মঙ্গোলীয়দের সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে ফেলেন। তবে মঙ্গোলীয়দের একটা অংশ ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তথা তারা একটা অসভ্য জাতি হিসেবে সবকিছু ধ্বংস করে দিলেও মুসলিমদের দাওয়াহ, তাবলীগ, আচার-ব্যবহার; মুসলিম মেয়েদের মধ্যে যারা বন্দি হিসেবে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করেছিল অথবা স্ত্রী হিসেবে প্রবেশ করেছিল তাদের আচার-ব্যবহার, কৃষ্টি-কালচার, সংস্কৃতিতে প্রভাবিত হয়ে হালাকু খাঁ, চেঙ্গিস খাঁর পৌত্র এবং পৌত্রের পরবর্তী বংশধরেরা মুসলিম হয়ে যায়। যাদের বংশ থেকেই তৈমুর লং এর আবির্ভাব হয়। তাদের পরবর্তীরাই মোঘল হিসেবে ভারতে দীর্ঘদিন শাসন পরিচালনা করে। তারা আজও খান নামে মুসলিমদের মধ্যে মুসলিম হিসেবে বসবাসরত রয়েছে।

আজও যেভাবে বায়তুল মুক্বাদ্দাস উদ্ধার সম্ভব: আজকে আমরা সারা পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহ এবং মুসলিম জাতি যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছি তাতে আমাদের মনে হতে পারে যে, আমরা হয়তো সবচেয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি বা আমাদের যুগেই হয়তো জেরুযালেম বা বায়তুল মুক্বাদ্দাসের সবচেয়ে খারাপ ও কঠিন অবস্থা। তবে আমাদের আজকের অবস্থার চেয়ে সেদিনের অবস্থা আরো বহুগুণ ভয়াবহ ছিল, যা আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। উপরের ইতিহাস থেকে যে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আমরা সারমর্ম হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তা হচ্ছে—

১. ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী রাহিমাহুল্লাহ-এর মতো করে শীআ ও মুনাফেক্বদের বিষয়ে শক্ত অবস্থান গ্রহণ। তাদের বাতিল ও ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করা।

২. মাদরাসা নিযামিয়ার মতো মাদরাসা গড়ে তোলা। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্বীনের জ্ঞান ছড়াতে ভূমিকা পালন করবে।

৩. মামলূক ছাত্রদের মতো দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন কাজে যুক্ত হওয়া জরুরী।

৪. মিশর ও সিরিয়াকে এক শাসনভুক্ত করতে হবে তথা যতদিন লেবানন, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তীন ও মিশর আলাদা আলাদা থাকবে, ততদিন ভৌগলিক কৌশলগত কারণেই জেরুযালেম মুক্ত করা এক প্রকার অসম্ভব।

৫. রাজনৈতিক ঐক্য দিয়ে জেরুযালেম বিজয় করা সম্ভব নয়। জেরুযালেমের পুরো বিষয়টি ধর্মীয়। এজন্য জেরুযালেম-কেন্দ্রিক সকল পদক্ষেপ হতে হবে শুধু ধর্মীয় কারণে ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র দিয়ে জেরুযালেম বিজয় করা সম্ভব নয়।

(চলবে)

ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বি. এ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

Magazine