কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

শাসকশ্রেণীকে নছীহতের শারঈ পদ্ধতি:

اَلْحَمْدُ لِلهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

ইসলামে কাউকে নছীহত করা, কারো কল্যাণ কামনা করা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; বরং দ্বীন ইসলামই হচ্ছে, নছীহত প্রদান। রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘নছীহত করাই হচ্ছে, দ্বীন। আমরা (ছাহাবায়ে কেরাম) জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য নছীহত? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার কিতাবের, তার রাসূলের এবং মুসলিম শাসক ও মুসলিম জনগণের জন্য’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫)। কিন্তু এই নছীহত কেমন হওয়া উচিৎ, তার রূপরেখাও ইসলাম বলে দিয়েছে। স্থান, কাল, পাত্র ও ক্ষেত্রে বিশেষ নছীহতের পদ্ধতি বিভিন্ন হতে পারে। তবে, কোমলতা, গোপনীয়তা ও হিকমত নছীহতের অন্যতম শর্ত।

কিন্তু বর্তমান শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে হরহামেশা চলছে নানা কর্মসূচী; মিছিল-মিটিং, হরতাল, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, গণসংযোগ, মানববন্ধন আরো কত কি! রেডিও, টিভি, পত্র-পত্রিকা সহ আধুনিক বিভিন্ন মিডিয়ায় চলছে শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে নানা প্রোপাগাণ্ডা, সমালোচনা, উস্কানিমূলক বক্তব্য। একশ্রেণীর আলেমও খুৎবার মিম্বারে, সভা-সমিতিতে, মাহফিলে, জালসায়, লেখনীতে জনসম্মুখে সরকারকে নছীহতের নামে সমালোচনার ঝড় তুলছেন। এমনকি এটাকে সাহসিকতা ও কৃতিত্বের পরিচয় ভেবে গর্বে ফেটে পড়ছেন। কিন্তু এসব কি আসলে আদৌ সরকারকে নছীহত করার শারঈ পদ্ধতি নাকি পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের ঘাতক ভাইরাসে আক্রান্ত জাতি? নাকি খারেজীদের চরমপন্থী চিন্তা-চেতনার বিষবাষ্প প্রবেশ করেছে মন-মস্তিক্ষে? রাজনীতিবিদ, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ কিংবা সাধারণ জনগণ না হয় গণতন্ত্রের জটিল ভাইরাসে আক্রান্ত; কিন্তু তাই বলে একশ্রেণীর আলেম কিভাবে এ ভয়ঙ্কর ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন! আরো আশ্চর্য হতে হয় তখন, যখন কিছু আহলেহাদীছ আলেমের মুখেও সরকারকে নছীহতের এমন চর্চা শুনি! তাহলে কি এক্ষেত্রে সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী কুরআন-হাদীছ চর্চা হচ্ছে না? নাকি গভীর জ্ঞানের অধিকারী (!) সেজে সরকারকে নছীহত সংশ্লিষ্ট শরী‘আতের বক্তব্যগুলো শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে?! রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সরকারকে কোন বিষয়ে নছীহত করতে চায়, সে যেন তাকে তা প্রকাশ্যে না বলে। বরং তার হাত ধরে নির্জনে গিয়ে যেন বলে। যদি তিনি তার নছীহত গ্রহণ করেন, তাহলে তো ভালো আর যদি গ্রহণ না করেন, তাহলে নছীহতকারী তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করল’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৩৩৩, হাসান)। উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-কে বলা হয়েছিল, আপনি কি উছমান (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলবেন না? তিনি বলেছিলেন, তোমরা কি মনে কর যে, তোমাদেরকে শুনিয়ে আমি তার সাথে কথা বলবো? আল্লাহ্র কসম! আমি তার সাথে একাকী কথা বলেছি; আমি এমন দরজা খুলতে চাই না, যার প্রথম উন্মুক্তকারী হবো আমি’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৮৯)। ইমাম নববী (রহঃ) উসামা (রাঃ)-এর শেষোক্ত কথাটির ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ তিনি জনগণের সামনে প্রকাশ্যে শাসকের সাথে কথা বলতে চাননি (আল-মিনহাজ, ১৮/১১৮)। ইবনু আববাস (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কি আমার শাসককে ভাল কাজের আদেশ দিব? তিনি বলেছিলেন, ...তবে, যদি (শাসককে নছীহত) করতেই হয়, তাহলে একাকী বলিও’ (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, আ/৩৭৩০৭)। সর্বযুগের উলামায়ে কেরামের এমন ভূরি ভূরি বক্তব্য পেশ করা যাবে, যার সবগুলোই সরকারকে কোমলতা ও হিকমতের সাথে গোপনে নছীহত করার বিষয়টি প্রমাণ করে। শাসকশ্রেণীকে নছীহত প্রদানের ৪টি অবস্থা হতে পারে: এক. গোপনে একাকী নছীহত করা। এটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি, যার বিরোধিতা করেছে খারেজী এবং তাদের বশংবদরা। দুই. জনগণের সামনে শাসকের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে তাকে নছীহত করা, অথচ গোপনে তাকে নছীহত করা সম্ভব। শাসককে নছীহতের এই অবস্থা হারাম। কারণ- (ক) এটা রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশনার পরিপন্থী। (খ) এটা সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি বিরোধী। (গ) এতে শাসক লাঞ্ছিত হন। অথচ রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পৃথিবীতে আল্লাহ্র শাসককে অপমাণ করবে, আল্লাহ তাকে অপমাণ করবেন’ (সুনানে তিরমিযী, হা/২২২৪, ছহীহ)তিন. একাকী গোপনে শাসককে নছীহত করে পরবর্তীতে তা জনসম্মুখে প্রচার করা। এটাও হারাম। কারণ- (ক) এটা রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশনার পরিপন্থী। (খ) এটা সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি বিরোধী। (গ) এতে আছে লৌকিকতা এবং দুর্বল ইখলাছের আলামত। (ঘ) এতে রয়েছে ফেতনা-ফাসাদের সমূহ সম্ভাবনা। (ঙ) এর মাধ্যমে শাসককে অপদস্থ করা হয়। চার. শাসকের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন সভা-সমিতি, জালসা, খুৎবার মিম্বারের মাধ্যমে তাকে নছীহত করা। সরকারকে নছীহতের এ অবস্থাও হারাম। কারণ- (ক) এর মাধ্যমে গীবত চর্চা হয়। (খ) কখনও অপবাদও চর্চা হয়। (গ) এর মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়, ফলে ফেতনার বীজ অঙ্কুরিত হয়। শাসককে শরী‘আত পরিপন্থী পদ্ধতিতে নছীহত করলে হিতে বিপরীত হয়, ফেতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে, শরী‘আত মোতাবেক নছীহত করলে অনাবিল শান্তি নেমে আসবে।

অতএব, মহান আল্লাহ আমাদেরকে সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি অনুসরণপূর্বক শাসকশ্রেণীকে নছীহত করার এবং তাদের সাথে সার্বিক লেনদেন করে ইহকালে শান্তি ও পরকালে মুক্তি লাভের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

Magazine