কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

অন্ধভাবে মাযহাব মানার ভয়াবহ পরিণাম (পর্ব-৫)

৪র্থ উদাহরণ : ছালাতে দাঁড়ানো প্রসঙ্গ- ছালাতে পায়ের সাথে পা, কাঁধের সাথে কাঁধ ও টাখনুর সাথে টাখনু মিলানো প্রসঙ্গে।

যদি ছালাত আদায়কারী একাকী হন, তাহলে তিনি সোজা কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করার সময় কীভাবে দাঁড়াবেন? জামা‘আতে দাঁড়ানোর নিয়ম হচ্ছে, পার্শ্ববর্তী মুছল্লী­ ভাইয়ের কাঁধের সাথে কাঁধ, পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাঁড়াতে হবে। দুই মছল্লী­র মাঝে ফাঁকা রাখা যাবে না। ছালাতে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে ছাহাবী আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ، فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي، وَكَانَ أَحَدُنَا يُلْزِقُ مَنْكِبَهُ بِمَنْكِبِ صَاحِبِهِ، وَقَدَمَهُ بِقَدَمِهِ

‘তোমরা তোমাদের কাতার সোজা কর, কেননা আমি আমার পিছনের দিক থেকেও তোমাদেরকে দেখতে পাই। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা আমাদের প্রত্যেকেই তার পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির কাঁধের সাথে কাঁধ ও পায়ের সাথে পা মিলাতাম’।[1]

ছাহাবী আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু আরো একটি হাদীছ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

رُصُّوا صُفُوفَكُمْ وَقَارِبُوا بَيْنَهَا وَحَاذُوا بِالْأَعْنَاقِ، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنِّي لَأَرَى الشَّيْطَانَ يَدْخُلُ مِنْ خَلَلِ الصَّفِّ كَأَنَّهَا الْحَذَفُ

‘তোমরা তোমাদের কাতারসমূহে মিলেমিশে দাঁড়াবে, এক কাতারকে অপর কাতারের নিকটে রাখবে। তোমাদের ঘাড়সমূহকে সোজা রাখো। সেই মহান সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি শয়তানকে দেখি সে কাতারের ফাঁকসমূহে প্রবেশ করে কালো ভেড়ার বাচ্চার মতো’।[2]

ছাহাবী নু‘মান ইবনে বাশীর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

رَايْتُ الرَّجُلَ مِنَّا يُلْزِقُ كَعْبَهُ بِكَعْبِ صَاحِبِهِ.

‘আমি আমাদের মুছল্লীদের একজন অপর জনের পায়ের গোড়ালির সাথে গোড়ালি মিলিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি’।[3]

অপর এক হাদীছ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أَقِيمُوا الصُّفُوفَ وَحَاذُوا بَيْنَ الْمَنَاكِبِ وَسُدُّوا الْخَلَلَ وَلِينُوا بِأَيْدِي إِخْوَانِكُمْ وَلَا تَذَرُوا فُرُجَاتٍ لِلشَّيْطَانِ وَمَنْ وَصَلَ صَفًّا وَصَلَهُ اللَّهُ، وَمَنْ قَطَعَ صَفًّا قَطَعَهُ اللَّهُ

‘তোমরা কাতার সোজা কর এবং কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে দাঁড়াও। দু’জনের মধ্যকার (পায়ের) ফাঁক বন্ধ কর এবং তোমাদের ভাইদের প্রতি সদয় হও। ফাঁকা রেখে শয়তানকে সুযোগ দিও না। কেননা যে ব্যক্তি কাতারে (পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু) মিলিয়ে দাঁড়ায়, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন। আর যে ব্যক্তি কাতারের মধ্যে (পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু) মিলায় না, আল্লাহও তাঁর সাথে সম্পর্ক কর্তন করেন’।[4]

নু‘মান ইবনে বাশীর রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত অপর হাদীছে এসেছে,

أَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى النَّاسِ بِوَجْهِهِ، فَقَالَ: «أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ» ثَلَاثًا، «وَاللَّهِ لَتُقِيمُنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ» قَالَ: فَرَأَيْتُ الرَّجُلَ يَلْزَقُ مَنْكِبَهُ بِمَنْكِبِ صَاحِبِهِ وَرُكْبَتَهُ بِرُكْبَةِ صَاحِبِهِ وَكَعْبَهُ بِكَعْبِهِ

‘রাসূল মানুষদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ৩বার বলেন, তোমরা তোমাদের কাতার সোজা কর। আল্লাহ্র কসম! হয় তোমরা তোমাদের কাতার সোজা করবে অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহে বিভেদ সৃষ্টি করে দিবেন। বর্ণনাকারী ছাহাবী নু‘মান ইবনে বাশীর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি মানুষকে একে অপরের কাঁধের সাথে কাঁধ, হাঁটুর সাথে হাঁটু এবং গোঁড়ালির সাথে গোঁড়ালি মিলিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি’।[5]

ছাহাবী আবু মাস‘ঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَمْسَحُ مَنَاكِبَنَا فِي الصَّلَاةِ، وَيَقُولُ: اسْتَوُوا، وَلَا تَخْتَلِفُوا، فَتَخْتَلِفَ قُلُوبُكُمْ ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতে আমাদের কাঁধ স্পর্শ করে বলতেন, বরাবর হয়ে দাঁড়াও, এলোমেলো হয়ে দাঁড়াইও না; তাহলে তোমাদের হৃদয়সমূহ এলোমেলো হয়ে যাবে’। হাদীছটির শেষে বর্ণনাকারী ছাহাবী বলেন, فَأَنْتُمُ الْيَوْمَ أَشَدُّ اخْتِلَافًا ‘আজ তোমাদের ইখতেলাফ অপেক্ষাকৃত মারাত্মক’।[6]

ইমাম বুখারী কাতার ঠিক করা সম্পর্কিত হাদীছ নিয়ে আসার আগে অনুচ্ছেদ রচনা করেন এভাবে, بَابُ إِلْزَاقِ المَنْكِبِ بِالْمَنْكِبِ وَالقَدَمِ بِالقَدَمِ فِي الصَّفِّ ‘অনুচ্ছেদ: কাতারে কাঁধে কাঁধ এবং পায়ের পাতার সাথে পায়ের পাতা মিলানো’।[7]

কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের মাযহাবী ভাইয়েরা এসব হাদীছকে তোয়াক্কা না করে মনমত বিশৃঙ্খলভাবে ছালাতে দাঁড়ায়।

৫ম উদাহরণ : ইমামের খুৎবারত অবস্থায় কোন মুছল্লী মসজিদে প্রবেশ করলে আগে দু’রাক‘আত ছালাত না পড়ে বসা প্রসঙ্গ।

মুসলিম মাত্রই কুরআন-হাদীছের আদেশ মানার জন্য আদিষ্ট। কুরআনে বলা হয়েছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ কর আর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুম‘আর দিনে ইমামের খুৎবারত অবস্থায় কোন মুছল্লী মসজিদে প্রবেশে করলে তার করণীয় সর্ম্পকে বলেন,

إِذَا جَاءَ أَحَدُكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ، فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ

‘জুম‘আর দিন তোমাদের কেউ যদি ইমাম খুৎবা দেওয়া অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করে। তখন সে যেন দু’রাক‘আত ছালাত পড়ে বসে’।[8] অপর বর্ণনায় এসেছে, জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْطُبُ النَّاسَ يَوْمَ الجُمُعَةِ، فَقَالَ: «أَصَلَّيْتَ يَا فُلاَنُ؟» قَالَ : لاَ، قَالَ: «قُمْ فَارْكَعْ رَكْعَتَيْنِ».

‘কোন এক জুম‘আর দিন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবা দিচ্ছিলেন, এমন অবস্থায় এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করলেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি ছালাত পড়ে বসেছো? উত্তরে তিনি বলেন, না। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দাঁড়াও, দু’রাক‘আত ছালাত পড়’।[9]

কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে, আমাদের মাযহাবপন্থী ভাইয়েরা এ সুন্নাতের বিরোধী আমল করেন। আগে বসেন, তারপর ছালাত পড়েন। যদি জিজ্ঞেস করেন কেন, বলবে খুৎবার সময় ছালাত পড়া জায়েয না। কারণ খুৎবা ছালাতেরই অংশ। অতএব এ সময় ছালাত পড়া যাবে না। কিন্তু তাদেরকে দেখবেন ফজরের ছালাত চলছে এক রাক‘আত শেষ হলেও তারা ফরয বাদ দিয়ে সুন্নাত আদায়ে ব্যস্ত। এখন এদেরকে কী বলবেন?

৬ষ্ঠ উদাহরণ : জানাযার ছালাতে ইমামের দাঁড়ানো স্থান সংক্রান্ত হাদীছ

জানাযার ছালাতে ইমাম পুরুষের মাথা বরাবর ও মহিলাদের কোমর বরাবর দাঁড়াবেন, এটাই সুন্নাত। পক্ষান্তরে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের বুক বরাবর দাঁড়ানো রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের খেলাফ। আর এ ব্যাপারে যারা অযথা তথাকথিত ক্বিয়াস করে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের বুক বরাবর দাঁড়ান, তারা পক্ষান্তরে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছের বিরোধিতা করেন। এ ব্যাপারে নিচে প্রমাণ পেশ করা হল :

১ম দলীল : জুনদুব ইবনে সামুরা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

صَلَّيْتُ وَرَاءَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَصَلَّى عَلَى أُمِّ كَعْبٍ، مَاتَتْ وَهِيَ نُفَسَاءُ، فَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلصَّلَاةِ عَلَيْهَا وَسَطَهَا.

‘আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে উম্মে কা‘বের জানাযার ছালাত পড়েছি, তিনি নেফাসের কারণে মারা যান। এ জানাযার ছালাতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার (মাঝ) কোমর বরাবর দাঁড়ালেন’।[10]

২য় দলীল : আবু গালেব আল-হান্নাত বলেন,

رَأَيْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ «صَلَّى عَلَى جِنَازَةِ رَجُلٍ، فَقَامَ حِيَالَ رَأْسِهِ، فَجِيءَ بِجِنَازَةٍ أُخْرَى، بِامْرَأَةٍ» فَقَالُوا: يَا أَبَا حَمْزَةَ صَلِّ عَلَيْهَا، «فَقَامَ حِيَالَ وَسَطِ السَّرِيرِ» فَقَالَ لَهُ الْعَلَاءُ بْنُ زِيَادٍ: يَا أَبَا حَمْزَةَ هَكَذَا رَأَيْتَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ مِنَ الْجِنَازَةِ مُقَامَكَ مِنَ الرَّجُلِ، وَقَامَ مِنَ الْمَرْأَةِ مُقَامَكَ مِنَ الْمَرْأَةِ؟ قَالَ: نَعَمْ.

‘আমি আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে একজন পুরুষ ব্যক্তির জানাযার ছালাত পড়াতে দেখলাম। তিনি জানাযার ছালাতে পুরুষের মাথা বরাবর দাঁড়ালেন। অতঃপর অপর একজন মহিলার লাশ নিয়ে আসা হল এবং তাকে জানাযা পড়াতে বলা হল। অতঃপর তিনি মহিলার কোমর বরাবর দাঁড়ালেন। অতঃপর আ‘লা ইবনে যিয়াদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু হামযা! আপনি কি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এভাবে দাঁড়াতে দেখেছেন? প্রতি উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ’।[11]

৭ম উদাহরণ : মহিলাদের জামা‘আতে ছালাত না পড়া প্রসঙ্গ।

জামা‘আতে ছালাত আদায় করা বেশী ছওয়াবের কাজ। আর একাজ পুরুষ-মহিলা সকলের জন্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করে গেছেন। ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِذَا اسْتَأْذَنَتِ امْرَأَةُ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَمْنَعْهَا ‘যদি তোমাদের কারো স্ত্রী মসজিদে ছালাতের জন্য যেতে চায়, তাহলে সে যেন তাকে নিষেধ না করে’।[12]

ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لَا تَمْنَعُوا نِسَاءَكُمُ الْمَسَاجِدَ إِذَا اسْتَأْذَنَّكُمْ إِلَيْهَا ‘তোমরা আল্লাহ্র এ বান্দীদেরকে (মহিলাদের) মসজিদে যাওয়া থেকে নিষেধ কর না, যখন তারা মসজিদে যাওয়ার জন্য অনুমতি চায়’।[13]

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لاَ تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ ‘তোমরা আল্লাহ্র এ বান্দীদের (মহিলাদের) মসজিদে যেতে নিষেধ কর না’।[14]

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنِّي لَأَدْخُلُ فِي الصَّلاَةِ وَأَنَا أُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلاَتِي مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ ‘আমি যখন ছালাত শুরু করি, তখন মনে করি, ছালাত লম্বা করব। কিন্তু যখন বাচ্চাদের কান্না শুনতে পাই, তখন সংক্ষিপ্ত করি। কারণ মায়েরা তাদের বাচ্চাদের কান্নাতে কষ্ট পায়’।[15]

মা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, إِنْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُصَلِّي الصُّبْحَ، فَيَنْصَرِفُ النِّسَاءُ مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوطِهِنَّ، مَا يُعْرَفْنَ مِنَ الغَلَسِ ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ঘোরাচ্ছন্ন অন্ধকারে ফজরের ছালাত পড়তেন যে, মহিলারা চাদর বেষ্টিত হয়ে বের হয়ে আসতেন, কিন্তু তাদেরকে অন্ধকারের কারণে কেউ চিনতে পারত না’।[16]

এছাড়াও আরো অনেক ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, মহিলারা মসজিদে জামা‘আতের সাথে ছালাত পড়তে পারবে। কিন্তু হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত গ্রন্থ হিদায়ার ব্যাখ্যা ‘আল-ইনায়াহ’, ‘ফাতহুল কাদীর’ ও ‘আল বিনায়াহ’-তে এসেছে, মহিলাদের জন্য জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় না করার ব্যাপারে নাকি পরবর্তী আলেমগণের ইজমা‘ হয়েছে’।[17]

না কখনো না, বরং ইজমা হয়েছে মাযহাবের ইজমা। কারণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছহীহ হাদীছের বিরুদ্ধে ইজমা হতে পারে না। যারা মাযহাবকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার উপর প্রাধান্য দেন, তাদের দ্বারা এ ধরনের ইজমা মানা সম্ভব, কিন্তু আল্লাহ ও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রেমিকদের জন্য নয়।

৮ম উদাহরণ :তাকবীরে তাহরীমার পরে হাত না বেঁধে ছেড়ে দেওয়া।

ছালাত হচ্ছে মুসলিম হওয়ার সবচেয়ে বড় দাবী। ছালাত হচ্ছে মুমিনদের মে‘রাজ, আর ছালাতে তাকবীরাতুল ইহরাম বা তাকবীরে তাহরীমার পরে ডান হাত বাম হাতের উপরে রাখা সুন্নাত। এ ব্যাপারে অসংখ্য ছহীহ হাদীছ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে ছাহাবী ও তাবেঈগণের প্রায় সকলের মতও একই। কিন্তু মালেকী মাযহাবপন্থী ভাইদের যদি জিজ্ঞেস করেন, কেন তাকবীরে তাহরীমার পরে হাত ছেড়ে দেন, অথচ এটা সুন্নাতের খেলাফ। তারাও অন্যান্য মাযহাবের ভাইদের মত উত্তরে বলেন, আমাদের মাযহাবে আছে। আমাদের মাযহাবের বড় বড় আলেমগণ বলেন, হাত ছেড়ে দিতে হবে। তাই আমরা ছেড়ে দেই।[18]

তাহলে দেখুন, অসংখ্য হাদীছ প্রমাণ করে, ছালাতে তাকরীরে তাহরীমার পরে বুকের উপর অথবা নাভির উপর হাত বাঁধতে হবে। কিন্তু আমাদের এ মালেকী মাযহাবপন্থী ভাইয়েরা এ সকল সুন্নাতকে ছেড়ে দিচ্ছে শুধু মাযহাবের প্রতি অন্ধভক্তির কারণে। মাযহাব মানা, ইমাম মানা যেন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ ও হাদীছ মানার চেয়ে বড় তাদের কাছে।

ছালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে বুকের উপর রাখার হাদীছ হল,

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ : «كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ اليَدَ اليُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ اليُسْرَى فِي الصَّلاَةِ»

সাহ্ল ইবনে সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছালাতে লোকদেরকে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখার নির্দেশ দেওয়া হত’।[19]

৯ম উদাহরণ : তিন রাক‘আত বিতর ছালাতের পদ্ধতি।

তিন রাক‘আত বিতর পড়ার প্রমাণ হাদীছে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি তিন রাক‘আত বিতর পড়ার পদ্ধতিও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত। কিন্তু হানাফী মাযহাবে যে পদ্ধতিতে তারা বিতরের তিন রাক‘আত পড়েন বা যে পদ্ধতি তাদের মাযহাবে বলা হয়েছে, এটা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদ্ধতির খেলাফ, ছহীহ হাদীছের খেলাফ। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা বিতরের তিন রাক‘আত ছালাত মাগরিবের ন্যায় পড় না, বরং এক তাশাহুদ ও এক বৈঠকে পড়তে বলেছেন, কিন্তু হানাফী মাযহাবপন্থী ভাইয়েরা এখানেও ছহীহ হাদীছের খেলাপ আমল করেন। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لَا تُوتِرُوا بِثَلَاثٍ، وَأَوْتِرُوا بِخَمْسٍ أَوْ سَبْعٍ وَلَا تُشَبَّهُوا بِصَلَاةِ الْمَغْرِبِ.

‘তোমরা তিন রাক‘আত বিতরের ছালাত মাগরিবের মত পড় না, বরং পাঁচ ও সাত রাক‘আত বিতর পড় এবং তোমাদের বিতর ছালাত মাগরিবের ন্যায় পড় না’।[20]

আর হানাফী মাযহাবপন্থী ভাইয়েরা মাগরিবের ন্যায় পড়ার ব্যাপারে যত দলীল পেশ করেন, সেগুলো যঈফ। তাদের প্রদত্ত দলীল ও পর্যালোচনা :

তাদের প্রদত্ত ১ম দলীল : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

وِتْرُ اللَّيْلِ ثَلاثٌ كَوِتْرِ النَّهَارِ صَلاةِ الْمَغْرِبِ

‘রাতের বিতর তিন রাক‘আত, দিনের বিতরের মত অর্থাৎ মাগরিবের ছালাতের মত’।[21]

হাদীছটির পর্যালোচনা :

হাদীছের একজন রাবী ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়া আল-কূফী, তাঁর সম্বন্ধে ইমাম দারাকুৎনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

لم يرويه عن الاعمش مرفوعا غيره، وهو ضعيف

‘ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়া ব্যতীত অন্য কেউ আ‘মাশ থেকে এ হাদীছ মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা করেননি, আর ইনি হচ্ছেন দুর্বল’।[22] এ হাদীছ সম্বন্ধে ইমাম বায়হাক্বী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

وقد رفعه يحي بن زكريا الكوفي عن الاعمش وهو ضعيف، وروايته تخالف رواية الجماعة عن الاعمش.

‘ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়া আল-কূফী এ হাদীছটিকে আ‘মাশ থেকে মারফূ‘ হিসাবে বর্ণনা করেন। আর ইয়াহ্ইয়া হচ্ছে যঈফ। আর তার বর্ণিত রেওয়ায়াত অন্যদের আ‘মাশ থেকে বর্ণিত রেওয়ায়াতের খেলাফ’।[23]

তাদের প্রদত্ত ২য় দলীল : আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

الْوِتْرُ ثَلاثٌ، كَصَلاةِ الْمَغْرِبِ

‘বিতর হচ্ছে তিন রাক‘আত মাগরিবের ছালাতের মত’।[24]

হাদীছটির পর্যালোচনা :

উল্লি­খিত হাদীছে ঈসমাইল ইবনে মুসলিম আল-মাক্কী নামক একজন রাবী আছেন। তার সম্বন্ধে ইমাম ইয়াহ্ইয়া ইবনে মাঈন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ليس بشيء ‘তিনি গ্রহণযোগ্য কোন ব্যক্তি নন’।[25]

ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لا يكتب حديثه ‘তার বর্ণিত হাদীছ লেখা যাবে না’।[26] অর্থাৎ তার হাদীছ দুর্বল বা অগ্রহণযোগ্য, তাই তার হাদীছ লেখা ঠিক নয়।

ইমাম নাসাঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وهو متروك ‘ইসমাঈল হচ্ছেন একজন প্রত্যাখ্যাত রাবী’।[27]

(চলবে)


[1]. বুখারী, হা/৭২৫, ‘আযান’ অধ্যায়, ‘কাঁধের সাথে কাঁধ ও পায়ের সাথে পা মিলানো’ পরিচ্ছেদ; মুসলিম, ২য় খ-, হা/৮৫১ (ই.ফা.বা); আবুদাঊদ, ১ম খণ্ড, হা/৬৬২-৬৬৬ (ই.ফা.বা); তিরমিযী, ১ম খণ্ড, হা/২২৭ (ই.ফা.বা)।

[2]. আবুদাঊদ, হা/৬৬৭, ‘ছালাত’ অধ্যায়; নাসাঈ, হা/৮১৫।

[3]. ছহীহ বুখারী (মু‘আল্লাক্ব সূত্রে), ১/১৪৬ পৃঃ।

[4]. আবুদাঊদ, হা/৬৬৬, হাদীছটি ‘ছহীহ’।

[5]. আবুদাঊদ, হা/৬৬২, হাদীছটি ‘ছহীহ’।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩২।

[7]. ছহীহ বুখারী, ১/১৪৬ পৃঃ।

[8]. মুসলিম, হা/৮৭৫; মিশকাত, হা/১৪১১।

[9]. বুখারী, হা/১১৬৬, ‘তাহাজ্জুদ ছালাত’ অধ্যায়; মুসলিম, হা/৮৭৫, ‘জুম‘আর ছালাত’ অধ্যায়।

[10]. বুখারী, মুসলিম।

[11]. আবুদাঊদ, হা/৩১৯৪, ‘জানাযা’ অধ্যায়; তিরমিযী, হা/১০৩৪, ‘জানাযা’ অধ্যায়।

[12]. বুখারী, মুসলিম ‘মহিলাদের তাদের স্বামীর নিকট থেকে মসজিদে যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা’ অধ্যায়।

[13]. মুসলিম, হা/১০১৭, ‘মহিলাদের মসজিদে যাওয়া’ অধ্যায়।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৯০০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৪২।

[15]. বুখারী, হা/৭০৭, ‘শিশুর কান্না শুনে ছালাত হালকা করা’ অধ্যায়; মুসলিম, হা/১৯২, ‘শিশুর কান্না শুনে ইমামদের ছালাত সংক্ষিপ্ত করা’ অধ্যায়; আবুদাঊদ, হা/৭৮৯; নাসাঈ, হা/৮২৫; আহমাদ, ৩/১০৯ পৃঃ।

[16]. বুখারী, মুসলিম।

[17]. আল-ইনায়াহ, ১/৩২০ পৃঃ, ‘ছালাতের নিয়ামাবলী’ অধ্যায়; আল-বিনায়াহ, ২/২৮৬ পৃঃ; ফাতহুল ক্বাদীর।

[18]. আল-মুদাওনা, ১/৭৬ পৃঃ; আত-তামহীদ, ২০/৭৪-৭৫ পৃঃ; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১/১৬৬ পৃঃ।

[19]. বুখারী, হা/৭৪০, ‘আযান’ অধ্যায়; আবুদাঊদ, ১ম খণ্ড, হা/৭৫৯ (ই.ফা.বা); তিরমিযী, ১ম খণ্ড, হা/২৫২ (ই.ফা.বা)।

[20]. ইবনে হিববান, হা/২৪২৯; দারাকুৎনী, ২/২৪ পৃঃ; বায়হাক্বী, ৩/৩১ পৃঃ; হাকেম, ১/৩০৪ পৃঃ; ইমাম ইবনে হাজার এ হাদীছের বুখারী মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী বলেছেন।

[21]. দারাকুৎনী, ২/২৭-২৮ পৃঃ।

[22]. দারাকুৎনী, ২/২৮ পৃঃ।

[23]. সুনানে কুবরা, বায়হাক্বী, ৩/৩১ পৃঃ; ইবনে আব্দুল হাদী, তানকীহ আত-তাহক্বীক্ব, ২/৪১৯ পৃঃ; তানকীহুল কালাম, পৃঃ ৪৪৭।

[24]. তাবারানী, হা/১০৮৯; মাজরুহুীন, ১/১২১ পৃঃ।

[25]. ইবনে আব্দুল হাদী, তানকীহ আত-তাহক্বীক্ব, ২/৪১৯ পৃঃ।

[26]. ইবনে আদী, আল-কামেল, ১/২৮৩ পৃঃ।

[27]. ওয়াল মাতরুকীন, আল-যু‘আফা; নাসাঈ, পৃঃ ৫২ নং ৩৬।

Magazine